মাঝরাতের নির্জন পথে হঠাৎ দেখা এক “পাগল”-এর মুখে শুদ্ধ ভাষা, নরম আচরণ আর এমন সব কথা, যা শুনে থমকে যেতে হয়। আসলে কে এই মানুষটি? এক কাঁচা পেয়ারায় লুকানো ক্ষমা আর রহস্যের গল্প “রহস্যমানব”।
রহস্যমানব — গল্পের সারসংক্ষেপ
গ্রাম আর শহরের বেশ কিছু তফাত আছে বাংলাদেশে। শহরে পিচঢালা পথ, দুর্গন্ধময় ড্রেন, বেশ্যা, পাগল, নিয়ন বাতি এবং মদ্যঘর আছে। গ্রামে এসবই বিরল, তবে একেবারে নাই তা বলা যাবে না। দুই তিন গ্রামে একজন প্রসিদ্ধ পাগল, কুখ্যাত বেশ্যা পাওয়া যেতে পারে। এটি আমাদের বন্ধু ইবনে বতুতার বর্ণনা। ইবনে বতুতা তার নাম নয়, আমাদের দেওয়া নাম। এর কারণ সে বাংলাদেশের এক বিশেষ পরিব্রাজক। শহরের নয় বিশেষ বিশেষ গ্রামের। আমি ঢাকা থেকে এসে যখন গ্রামে থিতু হলাম তখন পাগলদের তত্ত্বতালাশ করি। উদ্দেশ্য, বতুতার মতে শহরের পাগলদের শখ মিটাবার উপকরণ গ্রামে নেই। গ্রামের পাগলরা খাঁটি পাগল, এদের সকলের মৌলিকত্ব বিদ্যমান।
সুন্দরপুরে একজন পাগলের নামডাক আছে। চা-বাগানের পাশে ঝোপের মতো ঝুপড়িতে তার বাস। ভায়োলেন্ট বলে শুনিনি— তবু আমি তাকে দেখতে যাওয়ার সাহস পাইনি।
ঢাকা থেকে ট্রেনে এসে নামলাম মাঝরাতে। তিন মাইল পথ যেতে হবে, একলা আমার সাহসে কুলাবে না। হঠাৎ দেখি একজন সেই পথে হাঁটছে, আমিও সঙ্গী হলাম তার। বললাম, আপনি কি সুন্দরপুরের দিকে যাবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তার সঙ্গে হাঁটা শুরু করলাম। ২/৩ মিনিট হেঁটেই জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নাম? মন্তু পাগলা, তার জবাব। আমি ভয় পেলাম। তারপর হাঁটছি। সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম আপনি নামে ‘পাগলা’ বললেন কেন? আপনি কি sure যে আপনি পাগল? সশব্দে হাসলেন পাগলা। বললেন, সকলে যখন ‘পাগল’ বলে তখন পাগল তো নিশ্চয়ই। কথাবার্তায় শুদ্ধতা, শালীনতা এবং ভদ্রতা দেখে আমি প্রশ্ন করি, আপনি ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন। আপনার বাড়ি কোথায়? তিনি বললেন, প্রফেসর সাহেব আপনার এই প্রশ্নের জবাব আমি দেবো না। আমি অবাক, এই পাগল আমার পরিচয়ও জানে।

– আপনি পাগল হলেন কেন?
পাগল হওয়া প্রয়োজন ছিল তাই।
– আপনি কীভাবে জীবিকা জোগাড় করেন?
আমি সপ্তাহে একদিন শ্রম দিয়ে রোজগার করি। সারা মাস আমার চলে। – এত স্বল্প আয়ে চলে কীভাবে?
আমি একবেলা আহার করি যৎসামান্য।
—দিনে কি রোজা করেন?
রাখি।
রাতে কী খান?
আমি শুকনো দুটি রুটি পানি দিয়ে খাই। এটা বানাতে কষ্ট হলে আটার মণ্ড খাই ৷
এতে আপনার চলে? কর্মক্ষমতা থাকে?
চলে তো? অভ্যাস করে ফেললে মানুষের বাঁচার জন্য দুটি রুটিই যথেষ্ট জনাব ৷
– আপনার গুরু কে?
গুরুটুরু নাই । শামসে তাবরেজের নাম শুনেছেন আপনি? [২]
—জি, শুনেছি।
তাকেই মানি আমি ।
নামাজ পড়েন?
পড়ি।
– তাহলে তো আপনি মজুফ ।
মজুফ যা পাগলও তাই ।
– সরি; আপনি তো লেখাপড়া জানা মানুষ । এ জীবন বেছে নিলেন কেন?
আমি বেছে নিইনি। আল্লাহ বেছে দিয়েছেন। পাগলা বলেন।
– আল্লাহকে আপনি দেখেছেন?
না দেখিনি ।
এবাব পাগলার প্রশ্ন : আপনি কী তেলাওয়াত করেন?
– আমি : করিতো মাঝে মাঝে।
খেয়াল করে পড়বেন। কোরআনের প্রতি অক্ষর আর উচ্চারণে কুদরতি আল্লাহ আছেন। তাকে দেখা যায় – কলবের ভেতরে।
–বৈরাগ্য তো ইসলামের পথ নয়।
দুনিয়াদারিও ইসলামের পথ নয়।
–দেখুন আপনার যা করার সেটুকু শেষ হলে বাকিটুকু আল্লাহ চাইলে আপনাকে দিয়ে করিয়ে নেবেন।
মন্তু পাগলার প্রত্যেকটা কথা আমার মনে দাগ কাটছিল। আমার ঠিকানার কাছে চলে এসেছিলাম। বললাম, আমি যাই। তিনি বললেন, আমি কী আপনাকে পৌঁছে দেবো।
আমি বলি, জি না। আমি লোকটার আরও খোঁজ নিলাম, কোনও জালজালিয়াতি আছে কি না । তেমন কিছু পাওয়া গেল না।
কয়েকদিন পর শুনি পুলিশ পাগলাকে থানায় নিয়ে গেছে। আমি নিজের অজান্তেই থানায় পৌঁছলাম। সেখানে সুন্দরী এক তরুণীও ওসির সামনে বসা। পাগলাও বসেছেন কাত হয়ে এক চেয়ারে।
দারগা সাহেব আমাকেও বসতে বললেন।
পাগলা দারগাকে বললেন, আপনি CRPC এর কোন ধারায় আমাকে এখানে আনলেন? মামলা কী?[১]
ওসি বললেন, দেখুন আপনার মেয়ে একজন নামি ডাক্তার। আপনাকে খুঁজে বের করেছেন। তিনি চান আপনি বাসায় যাবেন তার সঙ্গে। আপনার ইচ্ছেমতো থাকবেন।
মন্তু তাকালেন মেয়ের দিকে। বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে আমার মতো থাকতে পারবো না। তোমরাও আমার মতো থাকতে পারবে না। কেন বার বার এসব করো?
কন্যা কথা বলার আগেই বললেন, আমি তিন কোটি টাকার সম্পত্তি তোমার মাকে এবং তোমরা ভাইবোনকে দিয়ে এসেছি। কেন আমাকে জ্বালাচ্ছো তোমরা?
মেয়ে বলে, বাবা আমরা আপনার কাছ থেকে শিক্ষাদীক্ষা সহায়সম্পদ পেয়েছি ঠিকই কিন্তু বাবা পাচ্ছি না। এটি আপনি বুঝতে চান না কেন? আমি তোমাকে বুঝবো না, আমার মাবুদকে বুঝবো বলো? তিনি আমাকে যেমন বলেন, আমি তো তেমনটাই করি।
ঢাকার নামি ব্যারিস্টার মুন্তাজির চৌধুরী মন্তু পাগল হয়ে ঘুরে ফিরে, তার নিজ ইচ্ছায়। তা-ই মনে করো তুমি, তোমার ভাই ও মা। জেনে যাও – শামসে তাবরিজ তার ইচ্ছায় চলতে পারতেন না – আল্লাহ তার হাত ধরে চালাতেন। তুমি মনসুর হাল্লাজকে চিনো না? [৩] চিনবেও না। আমি তার সঙ্গে পরামর্শ করি। আমি নিজের এখতিয়ারে চলি না। তুমি এখন যাও।
মেয়ে বলে, বাবা, মা খুব অসুস্থ। তিনি তোমাকে দেখতে চাচ্ছেন। তোমার কাছে তার ক্ষমা চাওয়ার আর্তি। তুমি একবার আমার সঙ্গে এসো।
চোখ বন্ধ করে মন্তু বললেন, ডাক্তারি কবিরাজি করো। আমি তো ডাক্তার না। তবু আমার তরফ থেকে এটা নাও তার জন্য । তিনি ছোট্ট এক কাঁচা পেয়ারা দিলেন মেয়ের হাতে। বললেন, এটি খেতে দিও। এতে আমার ক্ষমা রাখা আছে। আমি যাই দারগা সাহেব। দারগা নাস্তা খাওয়াতে চাইলেন মন্তু রাজি হলেন না।

পরের সপ্তাহে পাগলার ছেলে নামি উকিল আর ডাক্তার মেয়ে এলেন গ্রামের বাজারে। দেখা হলো আমার সঙ্গেও। না, মন্তু পাগলা তার ডেরায় নেই। গত এক সপ্তাহ তাকে কেউ দেখেনি। তারা জানালেন, কাঁচা পেয়ারা খেয়ে তাদের মা পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু মন্তু পাগলা রহস্যমানব হয়ে রইলেন গ্রামবাসীর কাছে।
গল্প থেকে শিক্ষা
“রহস্যমানব” আমাদের শেখায়, বাইরের চেহারা দেখে মানুষকে বিচার করা যায় না। গ্রামের সবাই যাঁকে পাগল বলে জানত, তাঁর কথায় ছিল গভীর জ্ঞান, বিনয় আর আত্মসংযম। প্রতিটি মানুষের পেছনেই এমন এক অজানা গল্প থাকতে পারে।
গল্পটি আরও দেখায়, সম্পদ আর প্রতিপত্তির বাইরেও জীবনের অর্থ খোঁজার একটা পথ আছে। তিন কোটি টাকার সম্পত্তি আর সম্মানজনক পেশা ছেড়ে মন্তু বেছে নিয়েছিলেন সরল, সংযমী জীবন, যা আমাদের নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নিয়ে ভাবতে শেখায়।
তবে গল্পে একটা ভারসাম্যের প্রশ্নও আছে। কথক নিজেই বলেছেন, বৈরাগ্য ইসলামের পথ নয়, আর ব্যারিস্টারের মেয়ের আর্তি মনে করিয়ে দেয়, সন্তান আর স্ত্রীরও পিতা ও স্বামীর কাছে নিজস্ব দাবি থাকে। আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান আর পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
সবশেষে, ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা করার শক্তি এই গল্পের কেন্দ্রে। যে মানুষ সব ছেড়ে গেছেন, তিনিও শেষে একটি ছোট্ট কাঁচা পেয়ারার মাধ্যমে নিজের ক্ষমা পাঠিয়েছেন, যা ভাঙা সম্পর্কের জন্য এক সান্ত্বনার প্রতীক হয়ে থাকে।
শেষ কথা
“রহস্যমানব” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষের পরিচয় আমরা কখনোই পুরোপুরি জানতে পারি না, আর সেই অজানাই তাঁদের গল্পকে চিরস্মরণীয় করে তোলে। মন্তু পাগলার এই রহস্যময় জীবনকাহিনি পাঠকের মনে প্রশ্ন আর প্রশান্তি দুটোই রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
তথ্যসূত্র
- CRPC (Code of Criminal Procedure, 1898): বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮। গল্পে নির্দিষ্ট কোনো ধারা উল্লেখ নেই; তাই এখানে কোনো বিশেষ ধারাকে মন্তুর আটকের আইনি ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বাংলাদেশের আইনভান্ডারে আইনটি পড়ুন। ↑
- শামসে তাবরেজি (Shams-i Tabrizi): ত্রয়োদশ শতকের প্রসিদ্ধ সুফি সাধক; মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির জীবনের সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত। গল্পে নামটি সুফি ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে। Encyclopaedia Iranica-তে রুমি সম্পর্কে পড়ুন। ↑
- মনসুর হাল্লাজ (Mansur al-Hallaj): ইসলামী সুফি ঐতিহ্যের একজন ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত মরমি সাধক। তাঁর জীবন ও চিন্তাধারা ইসলামী মরমিবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। Encyclopaedia Iranica-তে বিস্তারিত পড়ুন। ↑