গুরুদক্ষিণা — কৃতজ্ঞতার এক হৃদয়স্পর্শী গল্প

বহু বছর আগে যে ছাত্রীকে হয়তো ভালোভাবে মনেও ছিল না, বিপদের দিনে অচেনা এক গ্রামে সেই ছাত্রীই হয়ে উঠলেন প্রাণরক্ষাকারী। ধর্ম-জাতের সীমানা ছাড়িয়ে ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার এক অবিস্মরণীয় গল্প “গুরুদক্ষিণা”।

গুরুদক্ষিণা — গল্পের সারসংক্ষেপ

📖 গল্পের ঝলক

অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষক সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এক গ্রামে অসুস্থ হয়ে পড়ে যান। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এক সম্পন্ন পরিবারের কাছে, যেখানে গৃহিণী তাকে চিনতে পারেন তার বহু বছর আগের ছাত্রী কল্যাণী হিসেবে। দরিদ্র বিধবার মেয়ে কল্যাণী শিক্ষকের সহায়তায় পড়াশোনা শেষ করে আজ সফল ও সচ্ছল জীবনযাপন করছেন। ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় শিক্ষককে আপ্যায়ন করে কল্যাণীর পরিবার, আর বিদায়বেলায় উপহার দেন “গুরুদক্ষিণা” হিসেবে।

নামটা বদলাতে হলো। তার স্বনামে সে আমার কাছে যত বড়ো, আমার কলম তাকে ততো বড়ো করতে পারবে না ।

কল্যাণী আমার ছাত্রী ছিল। বহু বহু বছর আগে। ছিপছিপে, কালো, মায়াবী চেহারার এক মেয়ে। আমি প্রশাসনিক শিক্ষক— তাকে ক্লাসে পড়াইনি কখনও ।

বিধবা মায়ের মেয়ে। ভীষণ গরিব, বেতন দিতে পারতো না। কাকভোরে তার বিধবা মা আসতেন আমার গিন্নির কাছে টিউশন ফি আর কলেজের অন্যান্য পাওনা পরিশোধের সময় চাইতে। তার পেশা ছিল সেলাইকর্ম। নকশিকাঁথার ১ শিল্পী ছিলেন তিনি।

কল্যাণীও কাজটা শিখেছিল। অতএব, তার জীবিকা হয়ে ওঠে কাঁথাসেলাই। আমার স্ত্রীও তার কাঁথা কিনতেন, পরিচিত জনদের কাঁথা কিনতে অনুরোধও করতেন।

কল্যাণীর মা কোনও ছাড় চেয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না। ওসব তো ৩৫/৩৬ বছর আগের কথা। আমি রিটায়ার করেছি তা-ও তো বেশ কবছর। এখন ফাঁকফোকর পেলে গ্রামেগঞ্জে বেড়াই। মধুমেহ চিবাচ্ছে আমাকে তা-ও প্রায় কুড়ি বছর। ডায়েট, ড্রাগ আর ডিসিপ্লিনের যে কড়াকড়ি ডায়াবেটিসে তা মেনটেইন করা হয় না আমার। বড়ো কোনও সংকটে পড়িনি তাই বেপরোয়া ভাব বেড়েছে ইদানীং।

সুনামগঞ্জের অচেনা প্রত্যন্ত এক গ্রামের পথে পড়ে গিয়েছিলাম। দুটি ছেলে ছুটে এসে ধরে নিয়ে তুলে পাশের সম্পন্ন গেরস্তবাড়িতে। পুরুষ মানুষেরা গঞ্জের বড়ো আড়তদার। গৃহিণী মহিলা আমার পকেটে পেয়ে গেলেন দুটো চকোলেট। বেনু বলল, বুড়ো মানুষের পকেটে চকোলেট মানে ডায়বেটিক রোগী। ধারণা করল সুগার নিল হয়ে গেছে নিশ্চয়।

হুঁশ হলে জানলাম পর পর চার চামচ চিনি ২ আমার দাঁতকপাটি খুলে মুখে রেখেছেন বাড়ির লোকেরা। চোখ মেলে দেখলাম কপালে চকচকে সিঁদুর মাখা রমণী উদ্‌বেগাকুল চোখে চেয়ে আছেন আমার দিকে। দাড়ি টুপিধারী বুড়ো মানুষটাকে এই হিন্দু রমণী সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছেন বুঝে বললাম – মা, আমি মুসলমান। আমি দোয়া করি আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন।

মহিলা বললেন, মানুষ তো বাবা। বেনু আর বাবুল আপনাকে কাঁধে বয়ে এনেছে। দেখে মনে হলো আপনাকে আমি চিনি। কোথায় যেন দেখেছি। বড়ো মায়া হলো। পকেটে চকোলেট দেখে বেনু বলল আপনার সুগার নিল তুলেছি। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি হয়ে গেছে। চিনি দিয়ে বাঁচিয়ে তুলেছি। আপনার খাবার নিয়ে আসছি। যেতে যেতে ফিরে দাঁড়ালেন তিনি।

বললেন, আপনার পরিচয়টা দেওয়া যায় বাবা?

আমি বলি, রাজাগঞ্জে চাকরি করেছি মা। রিটায়ার্ড…

ও ভগবান বলেই মহিলাটি আভূমি প্রণত হলেন। আমি চমকে উঠি, কী করেন গো মা…।

স্যার, আমি আপনার কল্যাণী। আমি আপনার ছাত্রী কল্যাণী। আপনার দয়ায় আই এস সি পাস করেছিলাম স্যার।

আমি বলি, কল্যাণী তোমাকে মনে করতে পারছি না। তুমি যা করেছো তাতো জননীর কাজ। আমার জননী, আমার মা তুমি।

না স্যার, না, আপনি আমার দেবতা। আপনি শুয়ে থাকুন।

আনন্দের কান্নায় আমার বুক ভাসে। কল্যাণীর ছেলে বেনু আমার চুল টানছে।

দাদু! মা আপনাকে পেয়ে বড়ো খুশি। আমার দিদিমাকে আসতে বলা হয়েছে। আপনাকে ক’দিন থাকতে হবে আমাদের সঙ্গে।

আমি বলি, পাগল।

ভাত খেতে যাচ্ছিলাম পেট ভরে – মনে হলো গিন্নি এত ভাত খেতে দিতেন না। বললাম, কল্যাণী আমাকে আরও সবজি দাও। পেট ভরতে হবে, ভাত দিয়ে নয়।

জানি স্যার! আমি নিয়ে আসছি সবজি।

স্যার, মাকে আনাচ্ছি। মা বড়ো খুশি হবে। আপনাকে দেবতা মানে মা । মা বলে, উনি না হলে তোর আই এস সি পাস হতোনারে কল্যাণী। আমি বলি, আই এস সি পাস তোমার কী কাজে লাগলো কল্যাণী?

কী বলেন, স্যার! Health-এ চাকরিটা পেলাম তো আই এস সি পাস বলেই। চাকরিটা ছাড়ালেন আপনাদের জামাই! বললেন, বেনু আর মিনুকে মানুষ করো তুমি। টাকার তো অভাব নেই আমাদের।

আমি বলি, বেনুকে তো দেখলাম। বড়ো ভালো ছেলে তোমার। ডাক্তারি পড়ছে, আজ তো বাঁচালো আমাকে। মিনুটা কোথায়?

স্যার, মিনতি সিলেটে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে। হোস্টেলে থাকে। তাকেও খবর দিয়েছি, সন্ধ্যায় এসে যাবে।

আমি বলি, আজ কি আমাকে যেতে দেবে না মা? তোমার আন্টি তো খুব চিন্তা করবেন।

না, স্যার। এক সপ্তাহ আপনাকে ছাড়বো না। মা এলেই আন্টিকে ফোনে সব জানাবো।

আমার ভেতরটা আনন্দে নাচে।

সন্ধ্যায় এলেন কল্যাণীর মা, বৃদ্ধা তবে সুখী ভরাট চেহারা। তিনি হাজারো মিথ্যা প্রশংসায় একপাড়া মানুষকে মাতিয়ে তুললেন। অর্থ একটাই আমি মহামানব আমার সাহায্যেই তিনি বেঁচেছিলেন, মেয়েটিকে পড়াতে পেরেছিলেন। আমি লজ্জায় লাল নীল হচ্ছি, কে তা দেখে।

মিনতিও একটা লম্বা প্রণাম লাগাল।

বললাম, লম্বা প্রণাম তোর স্বামীর জন্য রাখ, আমি বুড়োর কাছে তোর উপযুক্ত কোনও প্রণামি নেই। সবাই হাসে, যেন কতো দামি কথা বলেছি ভক্তির বন্যায় তিনদিন ভাসলাম। মেয়ে পেলাম, জামাই পেলাম, দুটি নাতি নাতনি আর একটা বোন তো বোনাস।

চতুর্থ দিনে যখন ছাড়া পেলাম তখন এলো বেনু, সঙ্গে পিঠাপুলি আর একগাদা কাপড়চোপড়, তাও কাশ্মিরী শাল একখানা নয় দুখানা!

বেনুকে বলি, এগুলো কী রে দাদু ভাই?

সে সংক্ষেপে বলে,

গুরুদক্ষিণা!
কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় শিক্ষককে বিদায় জানাচ্ছে কল্যাণীর পরিবার - গুরুদক্ষিণা
বেনুর গুরুদক্ষিণা আর পরিবারের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন শিক্ষক

গল্প থেকে শিক্ষা

“গুরুদক্ষিণা” আমাদের শেখায়, একজন শিক্ষকের প্রভাব কখনো সময়ের সীমানায় আটকে থাকে না। বহু বছর আগে করা এক ছোট্ট সহায়তাও কীভাবে একটি জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে এবং তার প্রভাব প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে যেতে পারে, তা এই গল্পে স্পষ্ট।

গল্পটি আরও দেখায়, ধর্ম আর জাতের ভেদাভেদ প্রকৃত মানবিকতার সামনে কতটা তুচ্ছ হয়ে যায়। একজন হিন্দু পরিবার নিঃস্বার্থভাবে একজন মুসলমান বৃদ্ধকে সেবা করে বাঁচিয়ে তোলে, আর তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর পারিবারিক বন্ধন — এটি সম্প্রীতি আর মানবতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত।

কল্যাণীর মায়ের সংগ্রামও এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দারিদ্র্যের মধ্যেও মেয়েকে শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা এবং শিক্ষকের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস আর অধ্যবসায় জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সবশেষে, “গুরুদক্ষিণা” আমাদের শেখায় — প্রকৃত কৃতজ্ঞতা কখনো ভুলে যাওয়া যায় না। কল্যাণী তার শিক্ষকের অবদান মনে রেখে যেভাবে সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে প্রতিদান দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে ভালো কাজের ফল কখনো নিষ্ফল হয় না।

শেষ কথা

“গুরুদক্ষিণা” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার কোনো ধর্ম-জাত নেই — এটি মানুষে মানুষে তৈরি হওয়া এক পবিত্র বন্ধন। এই গল্প পাঠকের হৃদয়ে উষ্ণতা আর গভীর এক তৃপ্তি রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও হৃদয়স্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।


তথ্যসূত্র

  • নকশিকাঁথা — বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প; গ্রামীণ নারীদের হাতে এর বিস্তার ঘটে। Banglapedia ↑
  • হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় (রক্তে শর্করা কমে গেলে) দ্রুত শোষিত কার্বোহাইড্রেট/চিনি দেওয়া হয়; তবে কতটা দিতে হবে তা পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। American Diabetes Association — Hypoglycemia ↑

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, কবি কালাম আজাদের হৃদয়ছোঁয়া গল্প “গুরুদক্ষিণা” ভালো লাগলে আপনার বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না। হয়তো এই গল্পটি আপনাকেও মনে করিয়ে দেবে, একজন শিক্ষকের জীবনে তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর ভালোবাসা কতটা মূল্যবান।

Leave a Reply