একজন বাবার অভিমান, দুই ভাইয়ের ভালোবাসা, আর ন্যায়বিচারের এক জটিল দ্বন্দ্ব — সম্পত্তির লোভ নয়, বরং ত্যাগ আর ক্ষমাই যেখানে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। এমনই এক মানবিক গল্প “সালিশ”।
সালিশ — গল্পের সারসংক্ষেপ
গ্রামের নিভৃতচারী মুরুব্বি আবু আবদুল্লাহ চৌধুরী অসুস্থ হয়ে গল্পের কথককে ডেকে পাঠান। জানা যায়, তার নিজের বাবা একসময় গ্রামের এক সালিশে অপমানিত হয়ে সমাজবিমুখ হয়ে পড়েছিলেন, আর সেই অসিয়তই আবু মিয়া সারাজীবন পালন করেছেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার সব সম্পত্তি ছোট ছেলে শাব্বিরকে দেবেন, কারণ বড় ছেলে শাজাহান বিদেশে থেকে বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করেননি বলে তার ধারণা। কিন্তু সত্য উন্মোচিত হয় ভিন্নভাবে — উভয় ভাইয়ের মধ্যে ত্যাগ আর ভালোবাসার এক অসাধারণ প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত পরিবারকে পুনরায় একত্রিত করে।
আবু হোসেন গ্রামের সর্বজন প্রশংসিত এক মুরুব্বি। বছরের পর বছর তাঁর নাম শুনেছি সম্মানিত মানুষ হিসেবে। দেখিনি কোনওদিন। কারণ তিনি তাঁর নিজের সীমার মধ্যেই থাকেন কারও সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। একটা অস্থির গ্রাম—প্রতিদিন কত ঝুটঝামেলা এখানে। অথচ এ গ্রামেরই একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক কারও প্রতি বিরাগীও না, অনুরাগীও না। আমি মনে মনে লোকটিকে সম্মান করতে পারি না। নিষ্কর্মা একজন ভালো মানুষকে খুব ভালো মানুষের সম্মান দিতে আমার বাধে।
আবু হোসেন খুবই অসুস্থ। গ্রামের সকলে তাঁকে দেখতে যাচ্ছেন আমাকেও কেউ কেউ বলেন, আসুন। আমি বলি, দেখা যাক—কিন্তু যাই না।
ঘনিষ্ঠজনেরা কেউ কেউ বলেন আপনি গ্রামের ইতর-ভদ্রনির্বিশেষে রোগী দেখতে যান, সুন্নত হিসেবে রোগী দেখতে আমাদের উৎসাহিত করেন। আবু সাহেবকে দেখতে যান না কেন?
আমি নীরব থাকি ।
এক সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে আমার খুব কাছের একজন বললেন, আবু মিয়া আপনাকে দেখতে চান, আমাকে বললেন আপনাকে নিয়ে যেতে – আসুন। চলুন, বলেই আমি রওনা হই। মন বলে, আমি হয়ত এরকম একটা ডাকের প্রত্যাশা করছিলাম। দশ বছর আমি এই গ্রামে থাকি, সবাই আমাকে জানেন। আমিও সবাইকে সাধ্যমতো সহযোগ দিই। এ মানুষটা না আমাকে দেখতে চেয়েছেন – থাক !
আবু সাহেবের বাড়িটি বড়োই পরিচ্ছন্ন, বড়োই সুসজ্জিত ফুলে আর ফলে। রাতের আলোয় মনে হলো পরিকল্পিত এবং ছবির মতো বাড়িটি।
রোগীর রুমটিও সুচারু, নয়ন হরণ। সুন্দর বিছানায় যিনি আধশোয়া বালিশ পিঠে বসে আছেন তিনি এক সৌম্য অভিজাত সুন্দর বৃদ্ধ। চোখ বুজেছিলেন হয়ত! আমার সালামের জবাব দিলেন ভরাট গলায় সসম্ভ্রমে। বসতে বললেন, প্রিন্সিপাল সাহেব কত কাল অপেক্ষা করছি আপনার। এতগুলো বছর রোজ আপনার কথা শুনি আর ভাবি আপনাকে দেখতে যাবো। কিন্তু হয় না। আজ মনে খুব জোর এনে বাশার মিয়াকে আপনাকে নিয়ে আসার জন্য বললাম। কেন ডাকলাম জানেন? নিজেই স্বগত বললেন – গেল রাতে আপনাকে স্বপ্নে দেখলাম এই চেয়ারে বসে কথা বলছেন।
আমি বলি, আমারও ইচ্ছে হতো আপনাকে দেখি, কিন্তু নিরিবিলি জীবন আপনার! মনে হতো যদি বিরক্ত হোন। শরবত এলো, চা-নাস্তাও। চা শেষে আবু মিয়া বললেন, বাশার মিয়া, স্যারের সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। আপনি যদি কিছু মনে না করেন! বাশার মিয়া সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ভেতর বাইরের দরজা বন্ধ করালেন তিনি। সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, আমি অসুস্থ নই প্রিন্সিপাল সাহেব। আমি কিছুটা অবাক হলাম তবে নীরব রইলাম।
তিনি বললেন, আমি মানসিকভাবে অসুস্থ। আমি নিজের সঙ্গেই যুদ্ধে লিপ্ত । আমি বলি, আপনি আমাকে কিছু বলতে চাইলে বলুন। আমি কথা আমানত রাখব।
সে আমি জানি। প্রয়োজনে আমি সব কথা আপনাকে বলবই। আজ শুধু এটুকু জানাই যে, আমার বাবা ভারত থেকে এখানে এসে বসত করেছিলেন। তিনি গ্রামের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন, অনেক ভালো কাজও করেছিলেন। কিন্তু একটা সালিশের রায় দিলে দুপক্ষই তাঁকে মোহাজির, স্থানীয় ভাষায় ‘বৈতল’ বললে তিনি বড়ো আঘাত পান। এরপর বেঁচেছিলেন কয়েক বছর কিন্তু কারও সাতপাঁচে আর যাননি। মৃত্যুর আগে আমাকে তিনি অসিয়ত করেন, যেন আমি সামাজিক কর্মকাণ্ডে না থাকি । আমি সেই ওয়াদা রক্ষা করেছি। আমি সকলের মঙ্গলকামী কিন্তু শামুকের মতো গুটিয়ে থেকে বাঁচার প্রেকটিস করছি। আপনি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারলেন?
আমি বলি দেখুন, পিতার নির্দেশ পালন করছেন, এর মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বললেন, না, আমার বাবা কল্যাণকর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা আমি মনে করি না। আমি তা মেনে নিয়ে খুব ভালো কাজ করেছি তা-ও ভাবি না। কিন্তু আমার বাবার অসিয়ত না-মানাকে আমি সর্বাপেক্ষা অধর্ম জ্ঞান করেছি।
এক অভিমানী মানুষের স্থির কণ্ঠে কথাগুলো বললেন তিনি। নিজেই দিলেন তিনি। প্রসঙ্গান্তরে গেলেন। বললেন, ৪০ বছর আগে তিনি স্ত্রী হারিয়েছেন। ৫ আর ৩ বছরের দুটি ছেলে সন্তানকে প্রতিপালন করেছেন। রাহিমা, রাহিমা ডাক দিলেন তিনি.
প্রৌঢ়া এক বিধবা মাথায় ঘোমটা টেনে রুমে এলেন। বললেন, আমার বোন সে-ও বিধবা হলো আপনার ভাবির মৃত্যুর ৬ মাসের মধ্যে। এরপর ভাই-বোন টানছি এই সংসার।
আমার দুই ছেলে, একজনকে লন্ডন পাঠিয়েছিলাম – হারিয়ে গেছে কোথাও। আমি ভাবি মরে গেছে। রাহিমা আঁতকে উঠে বললেন, ভাইজান! এমন কথা বলবেন না।
আবু মিয়া বললেন, আজ থাক! তবে উনাকে সব বলতে হবে আমার। ছোটোটি চাটগাঁয়ে চাকরি করে। প্রতি সপ্তাহে আসে। তার নিজের বাচ্চা কাচ্চাকে রেখে জন্মদাতার ঋণ শোধ করতে আসে। রাহিমা আমাদের খাবার দাও। খেতে হলো । বললেন, আপনাকে আবারও আসতে হবে। একজন কাজের লোক সংগে দিয়ে বিদায় দিলেন।
একজন সম্পন্ন শিক্ষিত মানুষ। বিএ পাস করেও নিজের সমৃদ্ধ একটি খামার নিয়েই পড়ে আছেন। বৃহৎ একটি গ্রামের গরিব দুঃখীদের যে কেউ চাইলেই মুক্ত হস্তে সাহায্য করেন। না, পরামর্শ দেন না কাউকে। কেউ পরামর্শ চাইলেই করজোড়ে বলেন, ভাইরে, আল্লাহ আমাকে পরামর্শ দেওয়ার পরিমাণ বুদ্ধি দেননি। যাদেরকে এটি দিয়েছেন তাদের কাছে যান। সবাই বোঝে মোড়ল টাইপের পেশাদার লোকদের দিকেই তাঁর ইঙ্গিত।
বুঝলাম লোকটি নির্ভেজাল-খাঁটি একজন ভদ্রলোক ।
খবর আসছিল আবু মিয়ার শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে। যাবো যাবো করছি তেমনই একদিন তাঁর লোক এলো। আবু সাহেব দেখতে চান আমাকে।
গেলাম। তাঁর ঘরে অনেকে বসে আছেন, তিনি শয্যাশায়ী। উকিল-মুহুরিও উপস্থিত। কী বিষয়? আবু মিয়া বললেন, জনাব আমি উইল করতে চাই। উনারা আমার আত্মীয়স্বজন। আমি চাই আপনিও একজন সাক্ষী থাকুন ।
উকিল সাহেব সবাইকে পড়ে শোনান ড্রাফটখানা । বললেন, আবু মিয়া । সারসংক্ষেপ হলো আবু মিয়া তার বড়ো ছেলেকে কোনও সম্পত্তি দিচ্ছেন না। গোটা সম্পত্তি তাঁর দ্বিতীয় ছেলে শাব্বির আহসান চৌধুরী পাবেন । যেহেতু তিনিই সর্বার্থে তার উত্তরাধিকারী।
শুনলেন সকলে! আবু আবদুল্লাহ চৌধুরী (নামটি দলিল থেকেই জানলাম) তাঁর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি তাঁর দ্বিতীয় ছেলের নামে রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন!
আবু মিয়া আমাকে বললেন, দয়া করে কিছু বলুন! আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, ঘোরের মধ্যে ছিলাম । তবু বললাম, এটি যদি আপনার পৈতৃক সম্পত্তি হয় তবে আপনার বোন রহিমার অংশ কোথায়?
তিনি স্মিত হেসে জানালেন সে আমার পালিতা বোন–বাবার ঔরসজাত নয়।
আমি আবার বললাম, গোটা সম্পত্তির কত অংশ উইল করা যায় আর এক ছেলেকে পুরো বঞ্চিত করা যায় কিনা সেটি তো উকিল সাহেবই বলবেন।
উকিল সাহেব জবাব দিতে যাচ্ছিলেন– আবু মিয়া তাকে থামালেন। বললেন, আমি সে বিষয়ে একটি স্টেটমেন্ট যুক্ত করেছি। ছেলেকে আমি লন্ডনে পাঠিয়েছি পৈতৃক জমাজমি বিক্রি করে। বিয়ে করিয়েছি সে-ও আমার সম্পদ থেকে। সে লন্ডনে বিস্তর সম্পত্তি করেছে আমার শাব্বিরকে অংশীদার করেনি। আমি বহুবার তাকে অসুস্থ জানিয়ে আমাকে দেখতে আসার নির্দেশ দিয়েছি।
সে তার রেস্টন ফেস্টন, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার অজুহাত দেখিয়েছে— আসেনি। আমি তার সম্পত্তি সমঝে নেওয়ার কথা লিখেছি – সে বলেছে এসবে তার প্রয়োজন নেই। এসব বিষয় আমি আমার স্টেটমেন্টে যুক্ত করেছি। আর আপনাদেরকে কী বলব বলুন। আমি নীরব থাকি । আবু আবদুল্লাহ চৌধুরী অনেকটা অনুনয় করে বলেন, প্রিন্সিপাল সাহেব আপনি আমার উইলের একজন সাক্ষী হোন, প্লিজ।
মাফ করবেন আমাকে। আমি শুধু আপনার কথা শুনে অন্যপক্ষের অজ্ঞাতে সাক্ষী হতে পারি না। আজ আসি, বলেই আমি চলে এলাম।
একটু খোঁজখবর নিয়ে জানলাম – আবু মিয়ার দ্বিতীয় ছেলে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসেন, বাবার সঙ্গে ঘুমান, তার হাত পা টিপেন। সকালে কোলে করে পুকুরঘাটে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে সাবান মাখিয়ে গোসল করান! ঘাট থেকে কোলে করে (একটা শিশুকে মা যেমন) ঘরে নিয়ে এসে কাপড় পরান— দূরের বড়ো বাজারে নিয়ে যান। তার দেওয়া টাকায় বাপ তাঁর ইচ্ছেমতো বাজার করেন। ছুটির দিনের রাতে ছেলে ট্রেনে চেপে চাটগাঁয় গিয়ে তার অফিস করেন।
এসব শুনে মনে হলো ছেলেটা ফুসলে ফাসলে তার বাবার সম্পত্তি হাতিয়ে নিচ্ছে। না, বিষয়টা তেমন ছিল না। কারণ দুদিন পরেই শাব্বির আমার ঘরে এলেন।
তার সমস্যা জানালেন। আব্বা তাকে সমূহ সম্পত্তি দিতে চাচ্ছেন, অথচ এটি অন্যায়। আব্বা ভাইকে বিদেশে পাঠালেও ভাই টাকাপয়সা দিয়েছেন তার দেওয়া টাকায় খামারের উন্নতি করা হয়েছে। কিন্তু আব্বার কথা শাজাহান তার ঋণ শোধ করেছে। সে আমার কর্তিত একটা আঙুল। কেটে দূরে পড়ে গেছে, তার মধ্যে কোনও যন্ত্রণা নেই। যন্ত্রণা রয়ে গেছে আমার হাতে ও আমার গোটা সত্তায়।
তুই আমার দেহের অংশ-আমার আত্মারও। কেটে বিচ্ছিন্ন হসনি, তোকে শৈশবে লালন করেছিলাম – বার্ধক্যে তুই আমাকে লালন করছিস সুতরাং আমি তোর, তুই আমার। এসবই তাঁর যুক্তি । এখন আমি কী করি স্যার।
তার আন্তরিকতায় বিচলিত হই। বলি আপনার বাবার অবস্থা এখন কেমন? শাব্বির বলেন, ভালো না । ভাইকে জানিয়েছি তিনি আসছেন।
আমি বলি উনি আসুক, এলে আমাকে জানাবেন। দেখা যাক, খোদার কী মর্জি হয় । দুতিন দিনের মাথায় আবু মিয়ার বড়ো ছেলে তার দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে হাজির। ডাক পড়ল আবারও। বড়ো ছেলেটি বিমর্ষ-কিন্তু ক্ষুব্ধ বা নিরাশ মনে হলো না।
বাপ ছেলেতে কথা হলো আমার সম্মুখেই! বাবা বললেন, এসেছিস থাক – যদ্দিন তোর মেয়েদের বা তোর কোনও ক্ষতি না হয়। তবে তুই তোর ভাইয়ের বাড়িতে থাকছিস মনে রাখিস। আমি ত্যাজ্য করেছি তোকে।
শাজাহান বিমৰ্ষতার মধ্যেও হাসিমুখে বললেন, আব্বা, আপনার সম্পত্তি আপনি কাকে দিচ্ছেন সেটা আপনার ব্যাপার। আমি তো আপনার নাতনি দুটিকে আপনার দোয়া নেওয়ার জন্য এনেছি। আর আমার জন্য শুধু ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া আর কোনও চাওয়া নেই তো আব্বা।
আবু মিয়া অভিমান করেই জবাব দিলেন—তাই ভালো। তোর তো কত কত টাকা। রেস্টন ফেস্টন কত আছে শুনেছি। এই ফকিরের ছাইপাশে তোর প্রয়োজন নেই – সে আমি জানি। তবু মনে রাখিস ৫ বছরের তোকে মা-বাপের মতো আমি পালন করেছি! তোদের জন্য সংসার করিনি। মনে রাখিস – তুই এই ফকিরের ছেলে।
শাজাহানের চোখে পানি। বাপের পায়ে দুহাত রেখে বলছেন – আব্বু এটুকুই দাবি আপনি আমার মা-আর বাবা, এটুকু অস্বীকার না-করলে আর কিছু চাই না আমি।
আবু মিয়ার শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। আমরা সবাই বেরিয়ে পড়ি।
সেদিনই রাতে শাব্বির আর শাজাহান এলেন আমার কাছে। শাব্বিরই কথা বললেন, স্যার, আমার ভাই হয়ত সন্দেহ করছেন আমি বাবার সম্পত্তির লোভ করেছি আমিই উইল করিয়ে নিচ্ছি। খোদার কসম করে বলছি তেমন কিছু আমি করিনি। ভাইসাবকে আপনি বলুন – বাবা যদি সব সম্পত্তি আমাকে লিখে দিতে চান, তবে তিনি যেন তাকে কষ্ট না দেন।

একটা দলিল বের করলেন তিনি। দিলেন আমার হাতে। লেখা আমার পিতা অসুস্থাবস্থায় আমার নামে তাঁর সম্পত্তি উইল করলেও তিনি আমাকে ওয়াদা করিয়েছেন আমি যেন সম্পত্তির অর্ধেক তাঁকে বা তাঁর উত্তরাধিকারীকে সমঝে দিই।
অঙ্গীকারপত্রখানা আমি শাজাহান সাহেবের হাতে দিই। তিনি পড়লেন নিবিষ্ট হয়ে, তাকালেন আমার দিকে আর বললেন, স্যার কাল সকালে আমাদের বাড়িতে একবার যেতে হবে। আমিও আপনাকে সাক্ষী রেখে একখানা দলিল করে দেব।
পরদিন সকালে গেলাম আবু আবদুল্লাহ সাহেবের বাড়িতে। উকিল সাহেব, মুহুরি আরও কয়েকজন গ্রামীণ মুরুব্বি সেখানে।
শাজাহান সালাম করে ঘরে ঢুকলেন। আমার হাতে একখানা ড্রাফট ধরিয়ে বাপের পায়ের কাছে বসলেন।
শান্ত ধীর কণ্ঠে বললেন, আব্বা – আমি আপনার সিদ্ধান্তমূলে আপনার সম্পত্তিতে সকল দাবি প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আর হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে আমার বিলেতের সকল সম্পত্তির অর্ধেক শাব্বিরকে দেওয়ার অঙ্গীকার করছি । যদি পারেন, শাব্বিরের মতো আমার জন্যও দোয়া করুন, আব্বা।
একজন বৃদ্ধ কী হচ্ছে এসব, এসব কী বলে, হাতের লাঠি টুকতে টুকতে ঘরের বাইরে গেলেন । একজন বললেন, শাজাহানের শ্বশুর তিনি এসব জানার প্রয়োজন ছিল না।
উকিল সাহেব উইলের ড্রাফট ছিঁড়লেন। দুই ভাই গলায় জড়িয়ে কাঁদল কাঁদলেন স্বজনেরা, কাঁদলেন আবু আবদুল্লাহ চৌধুরী। ঘরের সকলে বাকরুদ্ধ কান্নার দমক চেপে চলছেন। একটি সুন্দর পল্লিগ্রামের প্রকৃতিই শুধু প্রজ্জ্বল হাসিতে আলোকিত করল দিকবিদিক।
গল্প থেকে শিক্ষা
“সালিশ” গল্পটি আমাদের সামনে তুলে ধরে পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা, ভুল বোঝাবুঝি আর শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জয়ের এক গভীর চিত্র। আবু মিয়ার অভিমান আর তার বাবার পুরনো তিক্ত অভিজ্ঞতা কীভাবে প্রজন্মান্তরে প্রভাব ফেলে, তা এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
গল্পটি শেখায়, সন্তানের ভালোবাসা কখনো সম্পত্তির পরিমাপে যাচাই করা যায় না। শাব্বির প্রতিদিন বাবার সেবা করেও যখন জানতে পারেন সব সম্পত্তি তাকেই দেওয়া হচ্ছে, তিনি নিজে থেকেই তার ভাইয়ের অধিকার রক্ষার উদ্যোগ নেন — এটি নিঃস্বার্থ ভ্রাতৃপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, শাজাহানের ত্যাগও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিদেশে থেকেও তিনি যখন জানতে পারেন বাবার মনে তার প্রতি ক্ষোভ জমেছে, তিনি নিজের ন্যায্য অধিকার পর্যন্ত ছেড়ে দিতে রাজি হন, শুধু বাবার আশীর্বাদ আর ক্ষমা পাওয়ার জন্য। এটি আমাদের শেখায়, পারিবারিক সম্পর্কে অর্থ-সম্পত্তির চেয়ে ভালোবাসা আর স্বীকৃতির মূল্য অনেক বেশি।
সবশেষে, “সালিশ” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — ন্যায়বিচার ও ক্ষমা একসাথে চলতে পারে, আর পরিবারের বন্ধন সবসময় সম্পত্তির হিসেবের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত।
শেষ কথা
“সালিশ” আমাদের শেখায়, পরিবারের বন্ধন যেকোনো সম্পত্তি বা ভুল বোঝাবুঝির চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। দুই ভাইয়ের এই ত্যাগ আর ভালোবাসার গল্প পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও মানবিক গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।