বিশ্বাস যখন যুক্তির উপর জয়ী হয়, তখন প্রতারকরাই লাভবান হয়। এক অসুস্থ, শিক্ষিত মানুষের নিরুপায় বিশ্বাসকে পুঁজি করে কীভাবে একজন ভণ্ড গুনিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিলো — সমাজের গভীরে থাকা কুসংস্কারের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে এই বাণ গল্পে।
বাণ — গল্পের সারসংক্ষেপ
বিজ্ঞানমনস্ক ও উচ্চশিক্ষিত হুদা সাহেব দীর্ঘদিন এক রহস্যময় অসুস্থতায় ভোগেন, যা কোনো আধুনিক চিকিৎসাতেই ধরা পড়ে না। হতাশ হয়ে তিনি এক গুনিনের শরণাপন্ন হন, যিনি নানা কৌশল আর নাটকীয়তার মাধ্যমে তাকে বিশ্বাস করান যে তাকে “বাণ” মারা হয়েছে। কৌশলে ভীতি ও বিশ্বাস তৈরি করে গুনিন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়, আর হুদা সাহেব প্লাসিবো এফেক্টে সাময়িক সুস্থ বোধ করেন — যদিও গল্পের শেষে প্রতারণার প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হুদা সাহেব বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী উচ্চশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। ৪৫ বছর বয়সে তিনি অসুস্থ হলেন। বুক তার পাষাণ ভার হয়ে থাকে । খিদে নেই – সারাদিনে ১০ গ্রাম চাউলও খেতে পারেন না । ধনীমানুষ সকল ডাক্তারি শেষ করলেন, ভারতের উন্নত চিকিৎসাও নিলেন। কেউ কোনও রোগ পায় না— অন্তহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও ।
নিরাশ হলেন না, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথ চালালেন আরও বছর দুই ৷ না, কোনও উপশম নেই।

সেই সময়ে এক শুভানুধ্যায়ী বললেন, ভাইরে এটি ডাক্তারি-কবিরাজি রোগ না—এইটে বাণ! কেউ আপনাকে বাণ মেরেছে! আপনি গুনিন দিয়ে চিকিৎসা করান। মরু প্রাণে চেতনা এলো হুদা সাহেবের। বাণ মারার গুনিন চিকিৎসকের সন্ধান পেলেন চাটগাঁর কোনও গ্রামে। মধু মিয়া নাম। অনেক ব্যস্ত থাকেন। হুদা সাহেবের লোক ১০ দিনের মাথায় কুমিল্লা থেকে নিয়ে এলো তাকে।
তার দাড়ি বুক পর্যন্ত, চুল কোমর অবধি, গঞ্জিকা সেবনে জ্বলন্ত দুই চোখ । চেহারা দেখেই হুদা সাহেব আশ্বস্ত হলেন গুনিন বটে! লোকটা এসেছিল সন্ধ্যায়, সারারাত তার বাসার প্রতি ইঞ্চি জায়গা দেখলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। গাঁজাও টানলো রাতভর। সকালে ঘুমালো ঘণ্টা দুই।
উঠেই নতুন গামছা চাইলো। হুদা সাহেবের কিশোর ছেলেকে হাতে মাপতে দিলো সেই গামছা। মেপে দেখা গেল ছেলের হাতে সাড়ে তিন হাত দিয়ে বলল,মাপো এবার । গামছা। গুনিন গামছা হাতে নিয়ে কচলালো, ভাঁজ করল। তারপর খুলে ছেলেটা আবার মাপলো। দেখা গেল গামছা এবার সাড়ে তিন হাত থেকে দুই ইঞ্চি লম্বা ।
বলল, শালার পুত বাণ মেরেছে।
হুদা সাহেব স্থির বিশ্বাসে উপনীত হলেন, বাণ তো অবশ্যই । তিনি বৃথাই কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করেছেন— এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি আর কবিরাজিতে ।
গুনিন বলল, আটা দাও। সে মারবেল আকারের একটা বল বানালো আটা দিয়ে, রাতে সেটি তাকে খেতে দিলো। সকালে তার পায়খানার বেগ নেই তবু পাঠালো পায়খানায়। পায়খানা কমবেশি না-হওয়া পর্যন্ত তাকে বসতে হলো কমোডে । হলো কিছুটা। মার্বেলের মতো সাদাটে, একটা গুটি ছিল কি না জিজ্ঞেস করল গুনিন ।
প্রথমে দ্বিধান্বিত হলেও হুদা বেশ জোরেই বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখেছি সাদা বলটা ।
গুনিন বলল, শূয়রের বাচ্চা বাণ কাকে বলে দেখাচ্ছি তোর চোদ্দো গোষ্ঠীকে ।
গুনিন বলল, বাবাজি আজ তো আপনাকে মুরগির ঝুল দিয়ে ভাত খেতে হবে।
হুদা সাহেব বললেন, পারি না বাবা । আজ তিন বছর গলার নিচে ভাত নামে না । একটু আধটু জুস খেয়েই বেঁচে আছি আমি ।
গুনিন তাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজে মেঝেতে বসলো মুখোমুখি। চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়লো অনেকক্ষণ । তারপর লম্বা এক ফুঁ দিলো
হুদা সাহেব বললেন, বুকের বাঁধটা ভেঙেছে মনে হচ্ছে। গুনিন হাসলো ।
বলল, বাণের… মেরেছি আমি। রাতে আপনি খাবেন। চায়ের কাপে তিন কাপ ভাত আর মোরগের ঝুল । রাতে তিনি তিন বছর পর তিন কাপ নরম ভাত খেলেন ঝুলে মাখিয়ে
গুনিন হুকুম করল, খাঁটি সরিষার তেল লাগবে ২০০ গ্রাম — নামি কোম্পানির সিল মারা বোতলে ।
এলো ।
হুদা সাহেবকে বন্ধ শিশিতে তিনবার ফুঁ দিতে হলো।
তারপর বোতলটা রাখা হলো গুনিনের থাকার রুমের ঈশান কোণে এক্কেবারে দেয়ালে লাগিয়ে । পরদিন সকালে হুদা সাহেব উঠলেন বেশ সুস্থাবস্থায় । অতিথি অভ্যাগতরা তিন দিন থেকেই আশ্চর্য গুনিন দেখতে আসছে। ঘরভরা মানুষের সামনে তেলের শিশি এনে খোলা হলো। তেল ঢালা হলো স্বচ্ছ এক বাটিতে। আয় আল্লাহ— তেলের মধ্যে ভাসছে একটা আধা ইঞ্চি মাপের তৃণমূল।
গুনিন বলে, বাবারা আজ আমি নিশ্চিত হলাম বাণ মেরেছে মথুরার শূন্য ঠাকুর। এই শালা একটা জোচ্চোর। তা হোক। এটির চিকিৎসা করতে পারবো আমি। ৫০ হাজার ৫ শত ৫০ টাকা ৫০ পয়সা দিতে হবে আমাকে। খরচ হয়ে যাবে পুরো টাকা, আমি এর কানাকড়িও খাবো না। ওস্তাদের নিষেধ আছে। টাকাটা দেন এখন। আজ থেকেই আমি চিকিৎসা শুরু করব।
দুই একজন কিছু বলতে চেয়েছিলেন, থামালেন হুদা সাহেব ।
জি বাবা, টাকা আসছে আপনার আর কিছু লাগলে বলুন।
বললাম তো আমি এর কানাকড়ি নেবো না যাবার সময় বরিশালের ভাড়া আর পথ খরচা যতো লাগে দিও তোমরা আমি আরও সাতদিনে শূন্য ঠাকুরের গিঁট খুলবো একটা একটা করে হুদা সাহেব খুশি। গুনিনের কেরামতি তো তিনি দেখেই ফেলেছেন। গুনিন কতক্ষণ পর পর নতুন নতুন পথ্যের তালিকা দিচ্ছে। ঝাড়-ফুঁকও আছে। দুপুরে আর রাতে খাবারের বরাদ্দও বাড়ছে। প্রতিবার ফুঁক যেন হুদা সাহেবকে খাদ্যের প্রতি লোভী করে তুলছে। কিন্তু তিনি নির্ধারিত পরিমাণ খাচ্ছেন ।
ছয় দিন পর তিনি বললেন, বাবা, আমি সুস্থ গুনিন মধু মিয়া বলেন, নারে বাবা আরও একদিন বাকি আছে বাণের শেষ গিট্টু খুলতে ।
পরদিন গিট্টু খুললেন মধু। প্রচণ্ড গালাগালি করলেন মথুরার শূন্য ঠাকুরকে আর হুদা সাহেবকে শুইয়ে এমন কঠিন দলাই মলাই করলেন হুদার মনে হলো কবর যেন চেপে চেপে তার শৈশবে খাওয়া মায়ের দুধ বের করছে। বাস্তবে মুখে বমি বের হলো। প্রস্রাবও হলো। আর দুমিনিট গেলেই হুদা সাহেব মরতেন। ঠিক এই সময়ে গুনিন মধু মিয়া চিৎকার করল, ইয়াহু, ইয়াহু শূন্য ঠাকুর! তোর বাণ গেল আমার ইয়াহু। রাতে জ্বর নিয়েও দুই প্লেট ভাত খেলেন শামসুল হুদা সাহেব।
পায়ে হাত রেখে সালাম দিয়ে বিদায় জানালেন মধু মিয়াকে আজ পাঁচ বছর তিনি সুস্থ। তবে তার দিন আর রাতের আর্ধেকক্ষণ এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি আর কবিরাজির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে কাটে।
হুদা সাহেবের ছেলেটি বাপের পাগলপনায় লজ্জা পায় – কারণ সে গুনিনের থলেতে খাঁটি সরিষার তেলের একটি শিশি সুরক্ষিত দেখেছে।
গল্প থেকে শিক্ষা
“বাণ” গল্পটি আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের এক তীক্ষ্ণ চিত্র তুলে ধরে। একজন শিক্ষিত, যুক্তিবাদী মানুষও যখন দীর্ঘদিনের কষ্ট আর হতাশায় জর্জরিত হন, তখন তিনিও সহজেই কুসংস্কারের ফাঁদে পা দিতে পারেন — এটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
গুনিনের প্রতিটি কৌশল — গামছা মাপা, আটার বল, তেলের শিশিতে তৃণমূল রাখা — সবই ছিল সুপরিকল্পিত প্রতারণা, যা গল্পের শেষে হুদা সাহেবের ছেলের চোখে ধরা পড়ে। এটি আমাদের শেখায়, রোগ-শোকের কষ্টে থাকা মানুষদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে যারা ব্যবসা করে, তাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা কতটা জরুরি।
গল্পটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে — মানসিক অবস্থার সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতার সম্পর্ক। হুদা সাহেবের সাময়িক উপশম মূলত বিশ্বাস ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের (placebo effect) ফল, প্রকৃত কোনো অলৌকিক চিকিৎসার নয়। তাই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করাই বুদ্ধিমানের কাজ, প্রতারণামূলক পন্থার নয়।
সবশেষে, “বাণ” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আর সচেতনতাই একমাত্র পথ। প্রতারকরা সবসময় মানুষের দুর্বলতম মুহূর্তেই সুযোগ খোঁজে।
- 👉 মন্ত্র
সংকল্প ও নিরলস সাধনাই সাফল্যের প্রকৃত মন্ত্র
- 👉 জিনের ধর্ম
নিয়তির খেলায় বিশ বছর পর উন্মোচিত হয় এক গোপন সত্য
- 👉 নিয়তি
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দেওয়ার এক করুণ শিক্ষা
- 👉 আফসানা
একটি নারীর জীবনসংগ্রামের মর্মস্পর্শী গল্প
- 👉 সস্তা মেয়ে
সমাজের চোখে নারীর মূল্যায়ন নিয়ে এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন
- 👉 গল্প বুড়ি
একজন নারীর বিয়ে নিয়ে জীবনের এক অভিজ্ঞতার গল্প
- 👉 কলঙ্ক
পালিয়ে বিয়ের পরিণতি ঘিরে সমাজ ও সিদ্ধান্তের গল্প
শেষ কথা
“বাণ” গল্পটি হাস্যরসের মোড়কে আমাদের সমাজের এক গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে — কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের ফাঁদ। আশা করি এই গল্প পাঠকদের মধ্যে সচেতনতা ও যুক্তিবাদী চিন্তার বীজ বপন করবে। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও তীক্ষ্ণ ও অর্থবহ গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।