মুখের কথাই কি কখনো ভাগ্যের লিখন হয়ে যায়? পাঁচ বন্ধুর নির্মল আড্ডায় হাসতে হাসতে বলা একটি কথা কীভাবে পরিণত হলো এক নিষ্ঠুর বাস্তবতায় — নিয়তির এমনই এক নির্মম পরিহাসের গল্প।
নিয়তি — গল্পের সারসংক্ষেপ
পাঁচ বন্ধুর নিয়মিত সন্ধ্যার আড্ডা। একদিন বন্ধু আহাদ খবর নিয়ে আসে, তার বাবা হঠাৎই তার বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেলেছেন। বন্ধুরা মজা করে বারবার বলে, “এমন সুখের মরণ যদি আমাদেরও হতো!” বিয়ের দিন বরযাত্রায় তিন বন্ধু আনন্দে মেতে গাড়ি ঘোরাতে বলে ড্রাইভারকে, দিনটিকে স্মরণীয় করতে। কিন্তু পথের মাঝেই এক ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনায় সব আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিয়োগান্তক পরিণতিতে।
পাঁচ বন্ধুর আড্ডা বসে রোজ। সন্ধেটা ক্যাটরিনা ক্যাফেতে না-এলে তাদের রাতের পড়া, খাওয়া এমনকী ঘুমও অসন্তোষে ভরে যায়। সরকারি স্কুলে ‘একসঙ্গে পড়তো। এখন ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে পড়লেও সন্ধ্যার আড্ডা হতেই হবে। শহরের পাশাপাশি পাড়ার ছেলে সবাই । পাঁচজনেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির ।
তাদের বাবারা ব্যবসায়ী আর চাকুরে।
আহাদ সেদিন আসছে না, দেরি করছে। আসবে তবে দেরি করছে দেখে বাকি চারজনের মনের বাতি ঠিক জ্বলে উঠছে না ।
আহাদ এলো উজ্জ্বল আলো হয়ে। বুয়েটে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে এমনিতে নির্ভার সে। নায়কীয় স্বাস্থ্য চেহারার প্রভা ঠিক রেখেই বসতে বসতে বলে, মৃত্যুদিবস ঠিক হয়ে গেলরে ব্যাটারা ।

কী, কী, কী, কী – চারটি প্রশ্ন সমস্বরে ।
বিয়ের তারিখ ঠিক করে ফেললেন সুবহান সাহেব। ১৭ জানুয়ারি ।
সত্যি নাকি?
হ্যাঁ, সত্যি। দজ্জাল সুবহান মিয়াকে তোরা জানিস তো।
আমরা তিনটা ভাইবোনকে তিনটা বিড়ালছানা বানিয়ে রেখেছেন। দুপুরে বললেন, রেডি হয়ে আয়, যাবি আমার সঙ্গে ।
কোথায়, বলার অধিকার আমার দাদার পোলা – কোনওদিন তো দেননি ।
গেলাম, কনে দেখলাম। পছন্দ কি না জানতে চাইলেন না; তারিখ ঠিক করে ফেললেন ।
এই, মেয়ে কি তোর পছন্দ না? জানতে চাইলো জহির ।
পছন্দরে বাবা পছন্দ, সুবহান সাহেব ছেলের পছন্দ হবে না এমন মেয়েকে বউ করবেন এমন তোরা ভাবিস ক্যামনে? বলল আরেক বন্ধু ।
খবরদার আমার বাবাকে অপমান করবি না, খুন করে ফেলবো।
আবারও সবাই কোরাসে বলল, আহা এমন সুখের মরণ যদি আমাদেরও হতো!
আহাদ বলে, মরবিরে ব্যাটা সবাই একদিন ঠিকই মরবি।
বন্ধুরা সবাই কফি খাচ্ছে আর আকস্মিক বিয়ের উপক্রমণিকার গল্প শুনছে হ্যাঁ, সরবে-নীরবে ।
আহাদ বলে, এই তো গেলাম কলাবাগানে। মোজাম্মেল সাহেব তো এক সময় বাবার কলিগ ছিলেন। দুজনে ড্রয়িংরুমে বসে গ্যাজালেন।
ও হ্যা, আমাকে মোজাম্মেল সাহেব বললেন, তুমি ভেতরে ইশিতার সঙ্গে গিয়ে বোঝাপড়া করো। আমরা তোমাদের বিয়ে ঠিক করেছি অনেক আগে । আজই তারিখ ঠিক করে নেবো। বিশ্বাস কর দোস্ত, কাঁপতে-কাঁপতে ভেতরে গেছি। কল্পনাও করিনি এমন কিছু। দুটো বাপই দজ্জাল বুঝলে । একটা রিডিংরুমে বসানো হলো আমাকে। হাতে নাস্তা নিয়ে ঢুকলো ইশিতা। না, একটুও সাজ করেনি, নিজেকে যেন দেখাতে আসেনি তেমনই ভাব। সালাম দিয়ে বসলো সামনে। সেই শুরু করল, পরীক্ষা কেমন হয়েছে। বললাম, ভালো হয়েছে।
সে বলল, এসব কিছু জানতাম না। আমার ফাইনাল ডিসেম্বরে। ইংরেজি সাহিত্যের পরীক্ষাটা কঠিনও। কিন্তু বাবা গত রাতে কথাটা বললেন। ১১ বছর আগে নাকি বিয়ে পাকা হয়েছে।
আমি বললাম, আমি জেনেছি এখানে ঢুকতে গিয়ে, তা-ও দেখা করার নির্দেশ পেয়েছি, আর কিছু জানি না কিন্তু।
এসব ভেবে আর লাভ নেই। দুই বাবাই একজাতের। আমরাও মনে হয় ওই জাতেরই। তোমার আমার পছন্দের ব্যাপার এখানে নেই। তবু আমি তোমাকে পছন্দ করলাম। তোমার কথা তুমি এখন বলতে পারো। তার কথা মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল শত বছর ধরে এই ভাবে সে বলছে আর আমি শুনে যাচ্ছি, তার সাবলীল ‘তুমি’ সম্বোধন। ‘তুমিটাই’ আমাকে অভিভূত করে দিয়েছিল ।
আমি হেসে বললাম, তোমাকে অপছন্দ করার মতো নির্বোধ আমি না। সাহিত্যের ছাত্র আমি নই – সুন্দর করে বলার চেষ্টা করে লাভ নেই, পারবো না। শুধু বলি, আমি তোমাকে ভালোবাসলাম।
খিলখিলিয়ে হেসে সে বলল, শাবাশ ।
শাব্বির ছাড়া তিন বন্ধু আবার বলল, এমন সুখের মরণ যদি আমাদেরও হতো।
শাব্বির রেগে বলল, হারামজাদারা আর মরণ মরণ করবি না, একবারও না
খবরদার!
হ্যাঁ, ১৭ জানুয়ারি বিপুল সমারোহে বরযাত্রীরা বিয়ের সেন্টারে রওয়ানা হলো। সামান্য পথ। বরের গাড়িতে কাসেম, খলিল আর জহির। শাব্বির গেছে চাটগায় তার চাকরির আকস্মিক ইন্টারভিউ দিতে!
বরযাত্রাকে দীর্ঘ স্মরণীয় করতেই হবে। তিন বন্ধুই ড্রাইভারকে বলে, ১ ঘণ্টা রকেট গতিতে ইচ্ছেমতো ঘোরেন তারপর সেন্টার। দিনটাকে স্মরণীয় করে রাখি আহাদের জন্য আর নিজেদের জন্যও।
ক্যাসেটে গান বাজছে-
‘এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হতো…।’
পথ শেষ হয়নি। মারাত্মক গতিতে একটা দানব ট্রাক গুড়িয়ে দিয়ে গেল বর আর তার সাথীদের।
গল্প থেকে শিক্ষা
“নিয়তি” গল্পটি আমাদের এক গভীর ও কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় — জীবন কতটা অনিশ্চিত, আর মৃত্যু কতটা অপ্রত্যাশিতভাবে এসে হাজির হতে পারে। বন্ধুদের নির্মল রসিকতা, যা ছিল নিছক আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, তা কীভাবে এক মুহূর্তে বাস্তবতার নিষ্ঠুর রূপ নিয়ে দাঁড়ায় — এই গল্প তারই এক মর্মস্পর্শী চিত্রায়ণ।
গল্পটি থেকে যে শিক্ষাগুলো পাওয়া যায়:
প্রথমত, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিয়ে বাঁচা উচিত, কারণ আগামীকাল কী হবে তা কেউই জানে না। আহাদের বন্ধুরা যখন আনন্দের আতিশয্যে গাড়ি ঘুরিয়ে দিনটি স্মরণীয় করতে চেয়েছিল, তারা জানতো না যে এই সিদ্ধান্তই তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তে, বিশেষত নিরাপত্তার প্রশ্নে, সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, গল্পটি আমাদের শেখায় বেপরোয়া আনন্দ-উচ্ছ্বাস কখনো কখনো জীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। উদযাপনের নামে গতির প্রতিযোগিতা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষে, “নিয়তি” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবন ও মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে সৃষ্টিকর্তার হাতে। মানুষের পরিকল্পনা যত সুন্দরই হোক না কেন, নিয়তির লিখন তার নিজস্ব পথেই বাস্তবায়িত হয় — এটি আমাদের বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ হতে শেখায়, প্রতিটি দিনকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়।
শেষ কথা
“নিয়তি” আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করায়, জীবন কতটা ক্ষণস্থায়ী আর অনিশ্চিত। নিয়তি গল্পটি পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী এক অনুভূতি রেখে যাবে বলে আমরা আশা করি — জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দেওয়ার তাগিদ। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও মর্মস্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন। — Amar Bangla Post team.