মরছো ফকির — পহেলা বৈশাখের রম্য গল্প

ভরাট একটা দিন, মনে মনে অপরাহ্ণের শয্যাবিলাসের পরিকল্পনাও করা হয়ে গেছে। কিন্তু দুই গ্রাম্য বোনের একটা সরল ভুল চেনায় সেই বিশ্রাম তো গেলই, প্রিন্সিপাল সাহেবকে হতে হলো শৈশবের সেই “মরছো ফকির”। হাসি আর লজ্জার মেশানো এক রম্য গল্প।

মরছো ফকির — গল্পের সারসংক্ষেপ

📖 গল্পের ঝলক

কলেজ-ভবনের কোয়ার্টারে থাকেন প্রিন্সিপাল, আর ভবনের নিরাপত্তা সামলান গেটের তালা হাতে বাবুল মিয়া। পয়লা বৈশাখের আয়োজনে শিল্পীমনা প্রভাষক হাবিবুর রহমান যখন কুলা-ডালায় রং লাগাচ্ছেন, ঠিক তখনই গ্রামের বাড়ি থেকে মলা মাছ আর পুদিনা পাতা নিয়ে আসা প্রিন্সিপালের দুই বোন গেট খোলানোর জন্য বাবুলকে খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে “কামলা ব্যাটা” ভেবে ডাক দেন। এরপর বোনদের তিরস্কারে লজ্জায় পড়ে প্রিন্সিপালের মনে পড়ে শৈশবে খ্যাপানো সেই ভিক্ষুকের ছড়া, আর তিনি টের পান, আজ তিনিই “মরছো ফকির কাঁথাওয়ালা”।

দুপুরে খেয়েছি ভালো। সকালে দুই বোন এসে দেখে গেছে। ব্যাংকের কাজগুলিও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা রাগে গোস্বায় পাগল প্রায় ‘বসকে’ ম্যানেজ করে বড়ো একটা সংকট থেকে বেঁচে গেছি। এরকম ভরাট দিন আজকাল পাই না। অতএব অপরাহ্ণের শয্যাবিলাস ভেবেছি নিশ্চিত।
না, তা হলো কই !

পয়লা বৈশাখ নিয়ে এবার কলেজে বেশ উচ্ছ্বাস। প্রভাষক হাবিবুর রহমান বেশ শিল্পীমনা আর চারুকর্মে সিদ্ধহস্ত। বৈশাখি আয়োজনের দায়িত্বও তার ওপর।

সকাল সকাল এসেই তিনি কুলা-ডালায় রং-চং লাগাচ্ছেন। ধীর স্থির তবে আত্মসম্মানবোধে টনটনে একজন রুচিবান মানুষ। তার তরফ থেকে শুনলাম তিনি মিস্ত্রির অভিধা পেয়েছেন।

কুলা-ডালায় লোকশিল্পের নকশা আঁকা হচ্ছে - মরছো ফকির গল্প
পয়লা বৈশাখের আয়োজনে কুলা-ডালায় রং লাগাচ্ছেন প্রভাষক, যাঁকে বোনেরা ভাবলেন “কামলা ব্যাটা”। ছবি প্রতীকী।

কলেজটা পাঁচতলা ভবন। পঞ্চম তলার কোয়ার্টারে আমার বাস। চতুর্থ তলাটা ছাত্রী নিবাস। নিচের ৩টি ফ্লোরে ক্লাসরুম, অফিস, ল্যাব ইত্যাদি। ভবনটির তথা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম আছে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবাদে।

কিন্তু ভালোর মন্দ দিকও থাকে। আমরা যারা বাসিন্দা – হোস্টেলের আবাসিক ছাত্রী, সুপার আর আমি – বাবুল মিয়ার কাছে কারাবন্দি। গেটের তালা লাগানো থাকবেই – এটি বাবুলতরিকা।

গেটে ঝুলছে পুরনো তালা - মরছো ফকির গল্প
এই তালা খোলার আগে সবাই বাবুল মিয়ার হাজিরার অপেক্ষায়। ছবি প্রতীকী।

ফোন দিয়ে তার অপেক্ষা ছাড়া আগমন নির্গমন অসম্ভব। আর বাবুল মিয়া আবার সাত কামের কাজি। ফলে আমরা আল্লাহর পরে বাবুল মিয়ার হাজিরি-গরহাজিরির ওপর থাকি আর আল্লাহর সাহায্য চাই প্রায়দিন প্রতি-আগমন নির্গমনে।

আল্লাহর মর্জিতে ৪ বছরেও খুব জটিল কুটিল কিছু ঘটেনি। কিন্তু ঘটেনি বলে ঘটবে না এমন তো হয় না।

বলেছি আমার দুইবোন গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছিল আমাদের দেখতে। পুকুরের মলা মাছ নিয়ে এসেছে। সঙ্গে আবার আমাদের পছন্দের পুদিনা পাতাও। দুপুরের তৃপ্তির ভোজনও ওই বাপদাদার পুকুরের মাছ আর পুদিনা পাতার কল্যাণে।

আগেই বলেছি বেরিয়েছিলাম ব্যাংকটেঙ্ক ইত্যাদি কাজে। এসেছি দুটায়। মাঝখানে বোনেরা গেছে তাদের ছেলেমেয়েদের বাসায়।

তো বাবুল সাহেব তার ধান্ধায় কোথাও নিশ্চয়ই গেছেন। দুবোনই বড়োসড়ো রোগের আস্তানা। ভাবির সঙ্গে গপসপ করেই তারাও নেমেছে নিচে। না, বাবুল সাহেব নেই। পাঁচ তলায় ফিরে যাবে তেমন তনাইও নাই। কী করা, কী করা! একটা কিছুর শব্দ শোনা গেল দোতলায়। ছোটোজন পা টেনে উপরে ওঠে।

এই তো পাওয়া গেছে। একটা কামলা ব্যাটা কুলায় রং লাগাচ্ছে।

আর যায় কই! ওবা কামলা ব্যাটা — গেইটের ব্যাটা কানো?

হাবিবুর রহমান তো বোবা প্রায়।

জি না, আমি কামলা ব্যাটা না!

আচ্ছারেবা, মিস্তরি ব্যাটারে কামলা কইলাইছি। গেইটওয়ালারে ডাকিয়া দিলাও। ফোনে ডাকুন!

রেহানা, যে তালের মহিলা হয়ত ধমক দিতো— তুমি ডাকতায় পারো না- নি!

আল্লাহ সহায়! বিপদের বন্ধু বাবুল মিয়া হাজির হলে দুই বোন বহিষ্ক্রান্ত হয়েছেন।

মাসকুরা বলছেন, স্যারকে কামলা ব্যাটা, মিস্ত্রি ব্যাটা বলায় তিনি নিশ্চয়ই আহত।

বোনেরা বলে, প্রফেসারকে দিয়ে রং কাজ করাও তুমি কী জাতের প্রিন্সিপাল। ছোটোটি তো বলেই দিলো তোমার জন্য আজ আমাদের লজ্জায় মাথা নত হলো!

শৈশবে এক ভিক্ষুককে আমরা খ্যাপাতাম – মরছো ফকির কাঁথাওয়ালা বলে ।

আজ মনে হচ্ছে আমিই মরছো ফকির কাঁথাওয়ালা।

গল্প থেকে শিক্ষা

“মরছো ফকির” হাসির ছলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পোশাক বা কাজ দেখে মানুষের পরিচয় আন্দাজ করা কতটা বিপজ্জনক। রং-তুলি হাতে যাঁকে বোনেরা মিস্ত্রি ভেবে বসলেন, তিনি আসলে কলেজের শিক্ষক আর একজন গুণী শিল্পী। বাইরের চেহারা দেখে নেওয়া ছোট একটা সিদ্ধান্তই কীভাবে বড় অপ্রস্তুত অবস্থা তৈরি করে, এই গল্প তার সরল উদাহরণ।

গল্পটি শ্রমের মর্যাদার কথাও বলে। কুলা-ডালায় রং করা বা কায়িক কাজ কোনোটাই ছোট নয়, আর শিক্ষক-প্রশাসক-শ্রমিক সবাই সম্মানের সমান দাবিদার। যে কথাটা বোনেরা অজান্তে বলে ফেলেছিলেন, সেটা অন্যের কাজকে ছোট করে দেখার সেই অভ্যাসের দিকেই আঙুল তোলে।

তৃতীয় শিক্ষাটা প্রিন্সিপাল সাহেবের মনোভাব থেকে আসে। বোনদের তিরস্কার আর নিজের অপ্রস্তুত অবস্থাকে তিনি রাগ বা অহংকার দিয়ে ঢাকেননি, বরং হাসিমুখে নিজেকেই “মরছো ফকির” বলে মেনে নিয়েছেন। নিজেকে নিয়ে হাসতে পারা বিনয়েরই এক রূপ।

সবশেষে, গল্পটি দেখায়, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকা জীবনের ছোট ছোট অসুবিধাও কখনো কখনো মজার স্মৃতি হয়ে যায়। পুরো দিনের স্বস্তির মাঝখানে হঠাৎ আসা এই বিপত্তিই আজ আমাদের হাসির খোরাক।

শেষ কথা

“মরছো ফকির” আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে মজার গল্পগুলো অনেক সময় আসে সবচেয়ে অপ্রস্তুত মুহূর্ত থেকেই। এই হালকা-মেজাজি স্মৃতিকথা পাঠকের মুখে হাসি ফোটাবে আর একই সঙ্গে মানুষকে তার কাজ বা পোশাক দিয়ে বিচার না করার কথাটাও মনে করিয়ে দেবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

একটি আহ্বান

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, কবি কালাম আজাদের রম্য গল্প “মরছো ফকির” পড়ে হাসি পেলে বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আপনার জীবনেও এমন কোনো মজার ভুল চেনার অভিজ্ঞতা থাকলে কমেন্টে জানান। তাঁর আরও গল্প ও জীবনী পড়তে ঘুরে আসুন লেখক প্রোফাইল পেজ থেকে।

Leave a Reply