মন্ত্র — পরিশ্রম ও সাধনার শিক্ষামূলক গল্প | কালাম আজাদ

ভাগ্য বদলাতে গাধা-ঘোড়ার অপেক্ষা, নাকি নিজের সাধনায় জয়? একটি কিশোরীর জীবনবদলের গল্প — যেখানে ভুল উপদেশ আর সঠিক দীক্ষার মাঝে লুকিয়ে আছে আসল “মন্ত্র”।

মন্ত্র — (অনুপ্রেরণার গল্প) 

গ্রামের মেয়ে লতিফা। মধ্যবিত্ত ঘরের ৩ ভাইয়ের বোন সে। বাবার মুদি দোকানের আয় ভালো। গেরস্তি আছে। লতিফা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, টেনেটুনে পাস করে। না, সে মেধাবী না, পরিশ্রমীও না। ঘরের কাজে তার বিপুল আগ্রহ; বিশাল আনন্দ। ক্লাসের বই তার দুচোখের বিষ। তবু স্কুলে যায়। ১৪ বছর বয়সি কিশোরী জীবন সম্পর্কে তার নিজের মতো করে ভাবে। ভাবনাটি গৃহিণীপনার, তার মা-দাদির অথবা গৃহকর্ত্রীর মতো দাপুটেপনার ।

এই সময়ে তার খালাতো বোন শামিমা দুদিনের জন্য বেড়াতে এলো তাদের বাড়িতে। কলেজে পড়া স্মার্ট সুন্দরী ফ্যাশনদুরস্ত মেয়ে শামিমা। লতিফা শামিমা আপুর ভক্ত হয়ে গেল একেবারে। সে জিজ্ঞেস করে আপু, কী করলে তোমার মতো হতে পারি বলো তো?

শামিমা শরীর নাচিয়ে হাসে। দূর পাগলি মেয়েদের কারও মতো হবার দরকারটা কী? কয়েকটা পাস-টাস দিয়ে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। ফকিরনির যেমন গন্তব্য হেঁসেল – রাজরানিরও তাই। এসব ফিকির বাদ দে— পড়াশোনা যখন ভালো লাগে না বলছিস, পড়িস না। দুই তিনবার ফেল মারলেই দেখবি খালা-খালু বেঁহুশ হয়ে গেছে তোকে বিয়ে দেবার জন্য। এই তো হয়ে গেল। একটা গাধা যদি পেয়ে যাস সারাজীবন চড়তে পারবি অনায়াসে। ঘোড়া যদি পাস তবে কিন্তু চেপে বসতে হবে, লাগাম শক্ত করে ধরতে হবে, আর হরদম চাবুক মারতে হবে। একটু বেখেয়াল হলে আছাড় খেতে হবে। মায়, হাত পা-ও ভাঙতে পারে। শোন আমি কিন্তু একটা গাধা খুঁজছি, পেলেই চড়ে বসবো। বুঝলি, বিয়ে করলেই মেয়েদের জন্য কেল্লাফতে।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শামিমার কথা শোনে লতিফা। আসলে সে-ও তো এরকম চিন্তাই করে! আপু শুধু সুন্দর করে মন্ত্রের মতো বলে গেল।

বয়োঃসন্ধির কুহেলিকায় কত রকমের ভান আর ফন্দি আঁটলো লতিফা । স্কুলে না-যাবার ফন্দি, পরীক্ষা না-দেবার ফন্দি এবং গৃহকর্মে মনপ্রাণ উজাড় করে মার মন জয়ের ফন্দি। হ্যাঁ, তিনবার ফেল করল ক্লাস এইটে। কিন্তু কই বিয়ের কথা তো ঘরের কেউ উচ্চারণও করছে না।

এমনই এক বিবমিষা সময়ে তার বড়ো ভাই শহর থেকে এলো । শামিমার ছবি সংবলিত একটা খবর সে দেখাচ্ছে সবাইকে। শামিমা এমএ পাস করেছে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। দ্বন্দ্বে পড়ে যায় লতিফা। শামিমা আপু গাধা ঘোড়া কোনওটাতেই চড়লো না তো! তাহলে সে কি তাকে বিভ্রান্ত করেছে?

পাশের বাড়ির শান্ত বিএসসি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি এসেছে। খুব ভালো ছাত্র সে। সে গেল শান্তর বাড়িতে।

শান্ত ভাইয়া তোমার সঙ্গে আমার গোপন কথা আছে।

শান্তর বোন শরিফা বলে, এই ভাইয়ার সঙ্গে তোর আবার গোপন কথা কী রে?

রেগে গেল লতিফা । যার সঙ্গে কথা তারেই বলব! তাতে তোমার কী! শান্ত তার পড়ার ঘরে নিয়ে গেল লতিফাকে।

কী এমন গোপন কথারে লতিফা! সে জিজ্ঞেস করে। ঝর ঝর করে চোখের পানি ফেললো লতিফা।

ভাইয়া কী করে ভালো পড়াশোনা করা যায় আমাকে বলো। মন দিয়ে পড়তে হয়, আর কী! শান্ত বলে ।

লতিফা শান্তর হাত ধরে, ভাইয়া তুমি আমাকে কয়েকটা দিন পড়াও। কী করে মন দিয়ে পড়তে হয় তা আমাকে শিখিয়ে দাও। লতিফা পায়ে ধরে শান্তর । তার হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কাঁদে।

শান্ত তাকে হাত ধরে তুলে বলে, যা, পড়াবো তোকে যদ্দিন বাড়িতে আছি, রোজ সন্ধ্যায় আমি যাবো তোদের বাড়িতে ।

সেদিন সন্ধ্যায়ই শান্ত তাকে বোঝাতে থাকে। না, বই থেকে নয় সে বলে চলে :

মন দিয়ে পড়তে হলে প্রথমেই মনটা সাফ করতে হয়রে লতিফা। আমাকে পড়তেই হবে এই শপথ করতে হয় মনে মনে। তারপর পড়া শুরু করলেই তোর মজা লেগে যাবে, তা নয়। বরং কষ্ট হবে। তোকে বার বার পড়তে হবে। বেশি বুরা লাগলে সেই পড়াটাই লিখতে হয়। কয়েকবার পড়ে সেই পড়াটা লিখলেই বিষয়টা সোজা আর মজার হয়ে যায়। কোনও বিষয়ে, ধর ইংলিশ কয়েকটা চ্যাপ্টার যদি এই রকম করে পড়িস তাহলেই তোর নেশা ধরে যাবে। বার বার তোর হাতে উঠে আসবে ওই ইংলিশ বইটাই । 

খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শোনে লতিফা; তারপর বলে আজ আমাকে ইংলিশটা একটু পড়িয়ে দাও শান্ত ভাইয়া। কাল আমি পরীক্ষা দেবো তোমার কাছে।

মেন্টরের দিকনির্দেশনায় শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের পথচলা — মন্ত্র গল্প
সঠিক পথপ্রদর্শকই বদলে দিতে পারে একটি জীবনের গতিপথ। ছবি প্রতিকী। Photo by Artem Podrez

এই হলো শুরু। পরদিন শান্ত পড়াতে এসে দারুণ খুশি। তুই পারবিরে বলে পিঠে আলতো থাপ্পড় দেয় শান্ত। বলে শাবাশ। আগুন ধরে যায় লতিফার মনে। না, শরীরে নয়। আত্মোশক্তির উদ্‌বোধনে সে থর থর করে কাপে । শান্ত তাকে বলে, তুই কী হতে চাস আমাকে বলতো?

লতিফা বলে, আমি এমএ পড়তে চাই, প্রথম হতে চাই! শান্ত তার নাক টিপে দেয় – বাহ! বলে, এই দেখ তোকে একটা শাস্তি দিলাম। তোর কি কষ্ট হয়েছে, লজ্জা লাগছে?

না, হাসতে হাসতে বলে লতিফা।

হ্যাঁ, পড়ায় যারা তারা এমনই শাস্তি দেয়, দিতে হয় কারণ চাপে পড়ে মানুষ শিখে ।

আমি তোকে ভালোবাসার কথা বলি। এই যে আমি তোকে রোজ পড়াই, রোজ যদি আমি তোকে একটা চিঠি দিই আর তুই যদি এর উত্তর দিস বুঝছিস? কয়েকদিনের মধ্যে তুই আমি প্রেমে পড়ে যাবো। তুই কি আমার কথা বুঝেছিস? 

হ্যা সূচক মাথা নাড়ে লতিফা।

পড়াশোনাটা ঠিক তেমনই রোজ তুই ভেবে দেখ, পড়তে থাক, আর পড়ার চিন্তাটা মাথায় রাখলেই তুই প্রেমে পড়বি বইয়ের আর পড়াশোনার। না- হ্যাঁ, ভাইয়া । পড়ে তোর ভালো লাগবে না। আমার কথা বুঝতে পারছিস তো?

শোন তুই এমএ পাস করতে চাস, প্রথম হতে চাস – এটা তোর স্বপ্ন। স্বপ্নের জন্য তোকে শ্রম দিতে হবে। সাধনা করতে হবে। সাধনা কঠিন কিছু চেয়েও বেশি মজা পাবি পড়ায় । নারে সোনা। মনে যদি স্বাদ লেগে যায় সাধনা হবে আনন্দের, তুই ঘুমের আর একটা কথা মনে রাখিস, সংকল্পটা যদি হয় এমএ পাস; তবে মন্ত্র নে― করবো নয় মরবো। বুঝলি এমএ পাসের আগে রাজপুত্রও যদি পঙ্খিরাজ চড়িয়ে তোকে নিতে আসে তুই তাকে ফিরিয়ে দিবি। বল—

দিবি? 

লতিফা বলে নিশ্চয়ই। এমনি করে লতিফার মনোভূমি তৈরি করে দেয় শান্ত ।

মাত্র ২৫ দিনের জাদুকথায় বদলে যায় লতিফা। নাইন, টেন এবং এসএসসিতে তার ফলাফল অকল্পনীয়। শিক্ষকরা অবাক, গ্রামবাসী অবাক,

লতিফা এ প্লাস পেয়েই চলেছে ।

শান্তর পড়ানো নিয়ে পাড়ায় কানাঘুষা ছিল। বদলে যাওয়া লতিফার ফলাফল জানিয়ে দিলো লতিফা প্রেমে পড়েনি, দীক্ষা নিয়েছিল । কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েটি তার চমক দেখালো এবং যথাসময়ে এমএ পরীক্ষায়ও সে প্রথম বিভাগে প্রথম হলো বাংলায় ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সে চাকরির সাক্ষাৎকারে গেল ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ২০ বছরে এসএসসি পাস করেছো দেখছি, কেন বলো তো?

সে পাশে বোর্ডে বসা শামিমাকে দেখিয়ে বলল, তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন নারী জন্মের জন্য গাধা ঘোড়া পাওয়া যায়—তিনবার ফেল করলে। আমি তাই করেছিলাম স্যার। বোর্ডের অন্যেরা প্রফেসর শামিমার দিকে তাকালেন ।

শামিমা বললেন, লতিফা চুপ কর, ওইসব কৈশোরের দুষ্টুমি ছিল। লতিফা বলল, ম্যাডাম, যখন উপদেশগুলো আপনি দিয়েছিলেন তখন আমি কিশোরী ছিলাম ঠিক, আপনি কিন্তু যুবতী ছিলেন।

চেয়ারম্যান বললেন, তোমরা আত্মীয় বুঝি! তা শামিমা তো এখনও তার গাধা ঘোড়া পেল না। তোমার কি বাহন স্থির হয়েছে? অবশ্য কিনতে হলে টাকাপয়সার বন্দোবস্ত এ বোর্ডই করবে।

না স্যার, গাধা ঘোড়ার ধারণাটি একটা কুসংস্কার এবং মিথ্যাচার। আমি তার খোঁজ করি না। আমার যিনি শিক্ষক, তিনি আছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি বিভাগে। আপনারা আমাকে নিয়োগ দিলে আমি তাঁর স্বপ্ন আর সাধনার সঙ্গী হবো, ইনশাআল্লাহ ।

সাফল্যের মূল মন্ত্র হলো নিয়মিত পড়াশোনা আর অবিচল সাধনা। Photo by Tri Warno

সবাই একসঙ্গে বললেন, ও মোয়াজ্জম হোসেন শান্ত। চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, তোমাকে এই বিভাগের উদীয়মান তারকা হিসেবে স্বাগতম। প্রফেসর শামিমা খালাতো বোনকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই দেখালিরে লতিফা । 

গল্প থেকে শিক্ষা

“মন্ত্র” গল্পটি আমাদের শেখায়, ভাগ্য বা অন্য কারো ওপর নির্ভর করে বসে থাকা কখনো প্রকৃত সাফল্য এনে দেয় না। লতিফা যখন শামিমার ভুল উপদেশে বিশ্বাস করে বিয়ের অপেক্ষায় জীবন কাটাচ্ছিল, তখন সে ছিল লক্ষ্যহীন। কিন্তু শান্তর একটি কথাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় — সাফল্যের জন্য দরকার সংকল্প, শ্রম আর নিয়মিত সাধনা, কোনো জাদুমন্ত্র নয়।

গল্পটি পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, লতিফার এই আকস্মিক পরিবর্তনের রহস্য আসলে কী? উত্তরটা লুকিয়ে আছে সংকল্পে। শান্ত তাকে শিখিয়েছিল, “করবো নয়তো মরবো” — এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগোলে যেকোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। মনের জোর আর স্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে পরিশ্রমও তখন আর কষ্টকর মনে হয় না, বরং তা হয়ে ওঠে আনন্দের।

এই গল্প থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জীবনে সঠিক দিকনির্দেশনার গুরুত্ব কতখানি। শামিমার মতো ভুল উপদেশ একজন কিশোরীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারতো, কিন্তু শান্তর মতো একজন সঠিক পথপ্রদর্শকই বদলে দিয়েছিল লতিফার গোটা জীবন। তাই আশেপাশে কার কথা শোনা হচ্ছে, কার পরামর্শে জীবন গড়া হচ্ছে — এই বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

গল্পের শেষ দিকে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে — এই গল্প থেকে আজকের কিশোর-কিশোরীরা কী শিখতে পারে? উত্তর একটাই: ভাগ্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রমেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। লতিফা প্রমাণ করেছিল, একজন নারী তার নিজের সাধনায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে — কারো “গাধা-ঘোড়ার” ওপর নির্ভর না করেই।

শেষ পর্যন্ত লতিফার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত “মন্ত্র” কোনো জাদু নয়, বরং একনিষ্ঠ সাধনা আর অবিচল বিশ্বাসের নামই মন্ত্র।

শেষ কথা

“মন্ত্র” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনে সাফল্য কোনো ভাগ্যের খেলা নয় — এটি আসে সংকল্প, সঠিক দিকনির্দেশনা আর নিরলস পরিশ্রমের হাত ধরে। লতিফার এই যাত্রা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি আর সাধনা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। আশা করি গল্পটি আপনাদের ভালো লেগেছে এবং জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও শিক্ষামূলক গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।- আমার বাংলা পোস্ট টিম। 

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading