তেরো বছর বয়সে কান্নাভেজা চোখে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া এক কিশোরী, চল্লিশ বছর পর যাকে বলতে শোনা যায় — জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কেটেছে তার স্বামীর সাথেই। ভালোবাসা, কষ্ট আর বিশ্বাসের এক অবিস্মরণীয় গল্প “গল্প বুড়ি”।
একজন নারীর বিয়ের গল্প | কালাম আজাদ

হাজী বুড়ির গল্পের আসরে গেলাম এক সন্ধ্যায়। হাজী বুড়ি দুবছর হয় হজ করে এসেছেন। এখনও হজের গল্প করেন। তাঁর বর্ণনা এত আকর্ষণীয় আর মনোমুগ্ধকর যে, ছেলে বুড়োরা প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় আসে তাঁর গল্পের আসরে। বুড়ি বিধবা হয়েছেন বহু বছর আগে। নিঃসন্তান তাই নিজের এক ভাইপোকে দত্তক হিসেবে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন। আলিমউদ্দিনকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে বিয়ে শাদী করিয়ে এক নাতনির দাদিও হয়েছেন।
গেরস্তি নিরিখে গ্রামের ধনী মহিলা তিনি। কয়েক বুড়োর অনুরোধে গেলাম এক সন্ধ্যায়। গ্রামের মানুষের মুখে শোনা যায় তাঁর বয়স একশ’র ওপরে। বাস্তবে ৮০/৮৫ হবে মনে হলো। বুড়ি বিধবা, যতটা সুন্দরী হওয়া সম্ভব তিনি ততটাই। আমি দেখে অবাক হয়েছিলাম—তিনি তো মাদার তেরেসাই।
মাদার তেরেসার মাথার কাপড়ে ডোরা থাকতো, তাঁর শাড়ির ডোরা নাই; এটুকুই তফাত। হজের কথা তিনি শোনালেন নিজের মতো করে—তবে যে কোনও ওয়াজের চেয়ে সুন্দর। তাওয়াফের বর্ণনা শুনেই ভক্ত হয়ে গেলাম আমি।
এরপর মাঝে মাঝে যাই—পরবর্তী অংশটা বলতে অনুরোধ করি। আরাফা আর মিনার বর্ণনায় তিনি কাঁদলেন; কাঁদালেন আমাদের কয়েকজনকে।
এর মধ্যেই জানলাম তিনি হালতুন্নবীর পাঠিকা ৪০/.৫০ বছর আগে থেকে। গ্রামের মহিলারা তাঁর নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন।
আমি তাঁকে দাদি ডাকলাম আর তাঁর খুব প্রিয় নাতিও হয়ে গেলাম মাত্র কয়েক দিনে। তিনি আমাকে শত প্রশ্ন করেন, আমি জবাব দিই, তাতেই তাঁর কাছে এক মহাপন্ডিত হয়ে গেলাম।
যখন খুব কাছাকাছি হলাম তখন তাঁর হালাতুন্নবী পাঠও শুনলাম। অনুচ্চ সুরে তাঁর পুথিপাঠ যে কোন সংগীতের চেয়ে মধুময় মনে হতো আমার কাছে।
এখন আমি তাঁর সঙ্গে হাসি তামাশা করতে পারি। তাঁর জীবনের কথাও জানতে পারি। তিনিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার স্ত্রী-সন্তানের কথা জিজ্ঞেস করেন। তাঁদের জন্য কলাটা, কমলাটা দেন আমার হাতে।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম আপনার বিয়েশাদি আর সংসারের কথা বলেন না কেন? সারা গ্রামে কেচ্ছা বুড়ি হয়ে আছেন, অথচ আপনার কথা কেউ তেমন জানে না।
হাসলেন বুড়ি।
পিরিত-টিরিত ছিল নারে ভাই। ষণ্ডামার্কা তাগড়া জোয়ানের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল ১৩/১৪ বছর বয়সে। কাইনা টাইন্দা গলাটা ভাইঙ্গা আইলাম শ্বশুরবাড়ি। কীসের বাড়ি? ছোট্ট এক ঘর একজন মাত্র মানুষ, আমার শাশুড়ি। এমন কান্দন দিলাম ষণ্ডার কাছে যাইতে হইল না। শাশুড়িকে জড়াইয়া ঘুমাইতাম, ৩ দিন পর বাপের বাড়ি গেলাম। দাওয়াত দিছিল, জামাইরে। রাইগা টাইগা গেল না। আমি আর আসবো না। ৭/৮ দিন বাদে শাশুড়ি গেলেন আমারে আনতে। মায় শাশুড়িয়ে কানাকানি কইরা জোরে ধইরা পাঠাইলো আমারে। পথে শাশুড়ি কইলেন ডরাইস নারে মাইয়া, আমার কাছে থাকবি তুই। রান্ধাবাড়া সংসারটা শিখবি। তারপর দেখা যাবে।
আমি শাশুড়ির আঁচল ধরে রাখি। চুলায় ফুঁ-টু দিই। তরিতরকারি কুঁটি। তাও রক্ষা নাই। ফাঁক পাইলেই ষন্ডা মিয়া আমারে চিমটা দেয়। আমি চিৎকার কইরা কান্দি। শাশুড়ি তাঁর পোলারে পিট্টি দেন। দৌড়াইয়া ভাগে মানুষটা। বছরের ৬/৭ মাসই আমি বাপের বাড়ি থাকলাম। শেষবার গেলাম শাশুড়ির অসুখ শুইনা।
কলেরার রোগী। রাইতে গেছি। সারা রাইত তাইনের ভেদবমি। সকালেই ইন্তেকাল করলেন। পাড়াপড়শি মুর্দাদাফন করল, স্বামী একফোঁটাও কাঁদলো না। দাফন সাইরা ঘরে আইসা মাটির মধ্যে বইসা রইল। আমার মায় আইছিল। ঠেলেঠুলে আমারে পাঠাইলো তাঁর কাছে।
আমি তাঁর হাত ধরি তুলবার চাইলাম। সে আমার হাতে ধইরা বুক ফাটাইয়া কান্দন শুরু করল। নিসারে আমার মায় চইলা গেল। তুই ছাড়া দুইন্যায় আমার কেউ নাইরে নিসা। আমিও গলা ছাইড়া কানলাম। একু কারও হাত ছাড়লাম না, বিছানায় বইসা রইলাম। কারা জানি ভাত আইনা দিছিল, মায় খাওয়াইবার চেষ্টা করল, আমরা খাইলাম না।
রাতে মায় বাড়িত গেল। আমরা দুইজনে জড়াইয়া রইলাম সারা রাইত। সকালে ঘুম থাইক্যা উঠলাম। স্বামীরে আর ভয় লাগলো না। মনে আইলো ওর বুকেই আমার জাগা। দুইদিন মরাবাড়ির খাবারটাবার আইলো। এর পরেই আমি রানলাম, দুইজনে একসঙ্গে খাইলাম।
স্বামী যে আমারে ছাড়ে না আমিও ছাড়ি না। আমার ভয়ডর শাশুড়ির সঙ্গে কব্বরে গেছে। এই শুরুরে ভাই, ৪০ বছর ওইরকমই ছিলাম দুইজনে।
কোনওদিন দূরে থাকি নাই। থাকলে, তাও বছরে ২/৪ দিন। কত্ত মারতো এই দিনগুলোর জন্য। হ্যাঁ, মারতো, শরীর ফাটাই ফালাইতো মাইরা! নাইয়র যাইবার কথা কইলে কানতো, চিল্লাপাল্লা করতো, তারপরে হাতে মারতো। লাঠিসোঁটা পাইলে সেইটা দিয়াও পিটাইতো।
তারপরেও আমি নাইয়র যাইতাম। একদিন বাদেই মনে হইত হে আমারে নিতে আয় না কেনে? দুই তিন দিনে তাঁর রাগ কমতো। নিজে গিয়া আমারে নিয়া আইতো।
এই তিনদিনে বাজার থাইক্যা শাড়ি-চুড়ি কতো যে আনতো। সে যে এত মারলো মনেই থাকতো না তাঁর। আদরে সোহাগে ভরিয়ে দিতো আমারে। দশ বছরে বাইচ্চা কাচ্চা পাইলাম না। তাবিজ কবজ, কবিরাজির কোনও বাকি রাখে নাইরে ভাই।
আমি তারে বিয়া দিবার চাইছিলাম। হুইন্যা যে মাইরটা দিলো আমারে তাঁর দাগ আইজও আমার শরীরে আছে! আমি এখনও দাগগুলি দেখি আর খুশি হই।
আমি বললাম, দাদায় তো তাহলে আপনারে খুব ভালোবাসতো?
হুঁ, খুব মায়া করতো। তাঁর দুনিয়ায় তো আমিই ছিলাম। আমারও দুনিয়ায় হে-ই ছিল।
বাচ্ছাকাচ্চা নাই। হইবো না দেখেই এই বাড়িটা করলো। সয়সম্পত্তি সব দিলো আমার নামে।
আমরা বড়ো সুখে ছিলাম ভাই।
ষণ্ডা মানুষটার জন্য আজও মন কাঁদে, তাহলে? আমি জিজ্ঞেস করি।
না ভাই এখন আর মন কান্দে না। প্রথম হজটা করছি নিজের। দ্বিতীয়টা করছিলাম তাঁর বদলা। দুই বছর আগে।

মদীনা শরীফে, নববী মসজিদে বসেছিলাম। তন্দ্রা এসে গেল। দেখলাম হে আইছে। বলল, নিসারে আমি খুব সুখে আছি। সুন্দর একখান ঘরও বানাইছি তোর-আমার লাগি। তাড়াহুড়া করিস না, ঘরটা মনের মতো করতে আমার আরও কয়েক বছর লাগবো।
আমি জোরে বললাম, জে আচ্ছা। আর চোখ খুইলা গেল।
আমি মানুষটারে এই রকম দেইখা আর তাঁর কথা শুইনা জীবনের জন্য শান্তি পাইয়া গেছিরে ভাই!
আল্লাহর কাছে চাইছি, আমি জান্নাতে যেন আমার স্বামীর বানানো ঘরে থাকতি পারি।
তোমারে কই, আমি মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি আমার স্বামী আমাদের ঘরখানা সাজাইতেছে।
গল্প থেকে শিক্ষা
“গল্প বুড়ি” আমাদের দেখায়, প্রকৃত ভালোবাসা কোনো মসৃণ পথ ধরে আসে না — এটি প্রায়ই কষ্ট, রুক্ষতা আর ধৈর্যের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। হাজী বুড়ির জীবনের প্রথম দিকের ভয় আর যন্ত্রণা তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং শাশুড়ির স্নেহ আর সময়ের সাথে সাথে গড়ে ওঠা বিশ্বাসই তাকে শক্তিশালী করে তুলেছিল।
গল্পটি আরও দেখায়, দাম্পত্য জীবনে ক্ষমা আর সহনশীলতার গুরুত্ব কতটা গভীর। স্বামীর কঠোরতা সত্ত্বেও তিনি যে ভালোবাসা আর বিশ্বাস ধরে রেখেছিলেন, তা প্রমাণ করে সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি আসে পারস্পরিক নির্ভরতা আর সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা থেকে।
সবশেষে, গল্পটি আমাদের শেখায় বিশ্বাস আর আধ্যাত্মিকতার শক্তি কতটা গভীর হতে পারে। মৃত্যুর পরও স্বপ্নে স্বামীর সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা হাজী বুড়িকে যে প্রশান্তি দিয়েছে, তা দেখায় বিশ্বাস কীভাবে মানুষকে শোক থেকে শান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
শেষ কথা
“গল্প বুড়ি” আমাদের শেখায়, ভালোবাসা সবসময় মসৃণ বা সহজ পথে আসে না — কষ্ট, ধৈর্য আর বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় সবচেয়ে গভীর বন্ধন। হাজী বুড়ির জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় আর সহনশীলতা একদিন সব তিক্ততাকে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করতে পারে। আশা করি এই গল্প আপনাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও হৃদয়স্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
একটি আহ্বান
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, কবি কালাম আজাদের জীবনঘনিষ্ঠ গল্প “গল্প বুড়ি” পড়ে ভালো লাগলে বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না। তাঁর আরও গল্প ও জীবনী পড়তে ঘুরে আসুন লেখক প্রোফাইল পেজ থেকে।__Amar Bangla Post.