মকচৌ — এক প্রাণবন্ত মানুষের রম্য স্মৃতিকথা

এমন একজন মানুষ, যাঁকে একটি কবিতায় বেঁধে ফেলা অসম্ভব ছিল — শিকারি, শিক্ষক, প্রাক্তন বিমানসেনা, আর জীবনের সেরা গল্পবাজ। “মকচৌ” নামের এক প্রাণবন্ত মানুষের হাসি-কান্না মেশানো স্মৃতিকথা পড়ুন কবি কালাম আজাদের কলমে।

মকচৌ — কে ছিলেন এই মানুষটি ?

📖 এক নজরে

মাহবুবুল করিম চৌধুরী, যাকে সবাই “মিলিটারি স্যার” বা লেখকের কাছে “মকচৌ” নামে চিনতেন, ছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক অফিসার থেকে হয়ে ওঠা এক স্কুল শিক্ষক। শিকার, ধর্মনিষ্ঠা আর অসাধারণ গল্প বলার ক্ষমতায় তিনি ছিলেন অনন্য। এই লেখায় তাঁর জীবনের কয়েকটি স্মরণীয় ও হাস্যরসাত্মক কিস্সা তুলে ধরা হয়েছে — ছাত্রদের রাত জাগা পাহারা পরীক্ষা করতে নিজেই “সন্দেহভাজন” সেজে ধরা দেওয়া, এয়ার মার্শালের সামনে ভয়ে কাঁপা, আর তাঁর বিখ্যাত “আধা দুম্বা” খাওয়ার গল্প।

মকচৌ নামে আমার একটি অক্ষম কবিতা আছে। কিন্তু কবিতাটা কোনও পাঠকের মন কেড়েছে বলে মনে হয় না। কারণ, মকচৌ নামের যে মহান মানুষটি তাঁকে কিন্তু একটা ছোট্ট কবিতায় বেঁধে ফেলা সম্ভব ছিল না! মানুষটি ছিলেন গুণী, জ্ঞানী, ধার্মিক, শিকারি এবং মহান গল্পকার। আড্ডার গল্পে এমন তুখোড় অন্য কোনও গল্পবাজ আমার জীবনে পাইনি!

মকচৌ বিমানবাহিনীর অফিসার ছিলেন। চাকরির মেয়াদেই অব্যাহতি নিয়ে শিক্ষকতা নিয়েছিলেন। নিজের এলাকার কেন্দ্রীয় স্কুলের শিক্ষক। আর যায় কোথায়, তাঁর বিশ্ব বিস্তৃত নাম মিলিটারি স্যার। তাঁর আসল নামটি নিজের ছাত্রছাত্রীর নব্বই শতাংশ জানতো কি না আমার প্রবল সন্দেহ। স্যার তো স্যার, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার আর অনেক বছর হেডমাস্টার থাকলেও তিনি মিলিটারি স্যার হয়েই ছিলেন।

তাঁর শিকার যাত্রার সঙ্গী হয়ে দেখেছি যেভাবে গামছা পরে বন্দুক হাতে তিনি হাকালুকিতে[১] পাখি শিকারে নামতেন, তা দেখে তাঁকে শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ভাববার কোনও সুযোগ ছিল না। টিপিক্যাল মাছ ধরা শ্রমজীবীর চেহারা দাঁড়াতো তাঁর। অনেক শিকারের গল্প করলেও আমার দেখা তাঁর শিকারের পরিমাণ খুব অল্পই ছিল। ‘পাখিগুলো প্রচণ্ড বজ্জাত, এরা আমার মুখে বিষ্ঠা ছিটিয়ে উড়াল দিয়ে চলে গেছে!’—এই তাঁর ব্যাখ্যা। ক্ষতি কিছু ছিল না। অনেক পাখি তিনি কিনতেন আর আমার এবং সফর সঙ্গীদের বাসা-বাড়িতে পৌঁছেও দিতেন।

একবার মধ্যরাতে গ্রামপুলিশ এসে খবর দিলো একজন সন্দেহভাজন লোককে তারা আটকে রেখেছে। এক্ষুনি পাশের বাজারে যেতে হবে। লোকটি আমার কাছে তাঁর পরিচয় দেবে অন্য কাউকে নয়! রাত ৩ টায় ঘুম ভেঙে গেলাম । গামছা আর ছেড়া জ্যাকেট পরা লোকটি অদ্ভুত মাথাল, মুখোশ আর গলাবন্ধে বন্দি।

মানুষটি বললেন, এই ছোকরাগুলো আমার ছাত্র। আমার পরিচয় জানতে চেয়ে আটক করেছে। আমি বললাম, তোদের বড়ো মাস্টারকে আন। পরিচয় দেবো।

বললাম মিলিটারি স্যার, শেষ রাতে এই কাণ্ড করে আমাকে এনে যে অন্যায় শাস্তি দিচ্ছেন তার ক্ষতিপূরণ করবেন কেমনে?

বললেন, পাখি পাবেন আর কী!

আমি বলি, না, এক পাখিতে ক্ষতিপূরণ হবে না।

তিনি বললেন, মিয়া বিবি আর একটাই তো বাচ্চা। তিনটার বেশি কিছুতেই পাবেন না। কমও না, হ্যাঁ।

যুবকেরা ততোক্ষণে তাদের শিক্ষকের পায়ে ধরে সালাম করে এবং ক্ষমা প্রার্থনার জন্য জোড়হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।

মকচৌ বললেন, চুরি-ডাকাতি যে হারে বাড়ছে আর তোমরা যে ভাবে পাহারা দিচ্ছো তাতে খুশি হয়ে এই নাটক করলাম । আসলে একজন সাক্ষী রেখে তোমাদের ধন্যবাদ দেওয়াই উদ্দেশ্য। যাই রে বাচ্চারা। আর দেরি হলে সবপাখি পগারপার হয়ে যাবে।

একজন রস করে বলল, স্যার, পাখি শিকার তো নিষিদ্ধ। আপনি…

ধমক দিলেন তিনি। এই ব্যাটা কোন আইনে লেখা তোদের মিলিটারি স্যারও পাখি শিকার করতে পারবে না। আইয়ুব খানের জন্য, বিদেশি শিকার প্রিয় অতিথির জন্য, মন্ত্রীফন্ত্রীর জন্য নিষেধ নাই। আমার নামের উল্লেখ করেও কোনও আইন নাই। হাসলেন তিনি। যাইরে ব্যাটারা। অগোছালো একজন মানুষ, জীবনেও জুতসই কাপড় পরেননি। এয়ারফোর্সেও তাঁর খাসলত বদলায়নি। অফিসে বসে চিঠি লিখছেন বাড়িতে। বোতাম খোলা ইউনিফরম, মানে কোর্তা! এয়ার মার্শাল নূর খান[২] তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। চোখ তুলে দেখলেন – দাঁড়াতে পারছেন না, পা কাঁপছে।

এয়ার মার্শালের প্রশ্ন : What you are doing man!

: Letter Sir.

:O! You are writing a private letter in the office!

: Wha t is this?

মকচৌ মার্শালের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলেন, তাঁর রুমের কোণের সোরাহিটি কয়েক টুকরা হয়ে মেঝেময় পানি ছড়িয়ে দিয়েছে!

বললেন : Sir, I shall instruct the cleaner to clean it up.

O, god! you will instruct …not now okay.

মার্শাল তো গেলেন। মকচৌ নিশ্চিত তাঁর কোর্টমার্শাল হচ্ছে-ই। অফিসারস মেসে গিয়ে অগোছালো মানুষটি কাপড়চোপড় গুছিয়ে ভাবছেন :Then what!

বিকেলেই খবর পেলেন এয়ার মার্শাল তাঁর ভীতি বিহ্বলতা দেখে খুব মজা পেয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বলে গেছেন লোকটা যেন স্মার্ট থাকার চেষ্টা করে, যা হয়ত সম্ভব নয়! তবে সৈনিককে ভয় পেতে নেই এটা যেন সে মনে রাখে!

বিমানবাহিনীর পুরনো দিনের বিমান বহর - মকচৌ গল্প
বিমানবাহিনীর অফিসার হিসেবে মকচৌর কর্মজীবনের স্মৃতি। Photo by Peter Xie.

তাঁর অফিসের এক কেরানি ছিল মছদর খান নামে। সে কাপড়চোপড় আর জুতা পালিশে তার চেয়ে কয়েক কাঠি সরেশ ছিল। কেরানি হলেও সৈনিক এবং মিলিটারি আইন মানতে সে বাধ্য। কিন্তু সে ছিল অফিস কাজে অভ্যস্ত পটু আর শৃঙ্খলায় সেই পরিমাণে ড্যাম কেয়ারও।

মছদর খানও একদিন মহা বিপদে পড়েছিল।

বোতাম খোলা শার্ট, ফিতা না-বাঁধা জুতা আর খালি মাথায় রাস্তা ধরে হাঁটছিল সে। তার সেই ড্যাম কেয়ার হন্টন। তার পাশেই এক মেজর জেনারেল না-কি একজন নামলেন। মছদর খানকে কোনও কথার সুযোগ না-দিয়েই দশবার কান ধরে উঠবস করবার হুকুম দিলেন তিনি। First comply than complain আইনে মছদর খান দশবার কান ধরে উঠবস করল। আদেশ পালন করে জানতে চাইল কেন তার এই শাস্তি! জেনারেল বললেন, জাতীয় পতাকাওয়ালা জিপ দেখেও সে স্যালুট করেনি বলে এই দণ্ড। মছদর খান বলে, মাই জেনারেল ফ্ল্যাগ তো গাড়িতে লাগানো নেই। চকিতে জেনারেল জিপ দেখলেন, আর ফওরান আদেশ করলেন, তুমি আমাকে বিশ বার কান ধরে উঠবস করতে আদেশ করো । হতভম্ব মছদর জীবনে বুঝি প্রথমবার কেঁদে দিল।

বলল, ইয়ে তো মেরে লিয়ে মুনকিন নেহি, মাই জেনারেল জেনারেল হাসলেন ।

ড্রাইভারকে ডেকে সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন, ওকে একশবার কান ধরে উঠবসের নির্দেশ দাও মছদর।

যদি তা না-করো রিভলবার তাক করে দেখালেন, ‘তোমার বুকে ছয়টি বুলেট আমি ঢোকাবো।’

মছদর খান ত্বরিত নির্দেশটা দিল এবং ড্রাইভার তা পালন করল। ছোটোখাটো ভিড় জমেছিল কোয়েটার সেই রোডে। জেনারেল সাহেব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই উজবুক মছদর একটা ফৌজি হয়েও কেমন ড্রেস আর জুতো পরেছে দেখুন। আমার গাড়ির ফ্ল্যাগ দেখেও স্যালুট না-দেওয়ায় ওকে শাস্তি দিলাম বটে। কিন্তু পরে দেখি গাড়িতে ফ্ল্যাগ লাগায়নি ড্রাইভার। তাই আমার ভুলের জন্য আমাকে ন্যায্য শাস্তি দেবার নির্দেশ দিলাম – অগ্রাহ্য করল। যদি নির্দেশ দিতো তবে পাবলিক হোমিলিয়েশনগত কারণে আমাকে আজই এ তারকাগুলো খুলে ফেলে কোর্টমার্শালের মুখোমুখি হতে হতো। দেখুন, সমূহ বিপদের জন্য দায়ী কিন্তু এই হারামজাদা ড্রাইভার। ফ্ল্যাগ না-লাগিয়ে মছদর খানকে আর আমাকে বিপদে ফেলেছে সে-ই। তাকে একশ বার কানধরে উঠবস করানোটা অন্যায় হয়েছে কি বলুন?

জনতা ‘জার্নাল সাব জিন্দাবাদ’ দিল কয়েকবার। জেনারেল জনতা আর মছদর খানকে কয়েকবার স্যালুট দিয়ে জিপে চড়লেন।

সমন্দর খানের গল্পটি বলার আগে খোদ মিলিটারি স্যারের অর্ধেক দুম্বা ভক্ষণের গল্পটি বলার লোভ হচ্ছে আমার।

sick report মেরে ডিউটিমুক্ত মকচৌ কোনও এক স্বদেশি (বাঙালি) ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন কোয়েটার এক রেস্তোরাঁয়। স্বদেশিটার অপেক্ষায় বসে থাকা মকচৌ কিছুক্ষণ পর পর অর্ডার দিচ্ছেন দুম্বার মাংসের কাবাবের। বন্ধুটি আসতে দেরি করছেন আর তিনিও কাবাবের অর্ডার দিয়ে আস্তে-ধীরে গিলছেন সুস্বাদু কাবাব। শেষ অর্ডারটা যখন দিলেন রেস্তোরার বেয়ারা বললেন : বাঙালি বাবু, আপ নে তো আধা দুম্বা খা চুকা – আওর মাত খাইয়ে জি।

১৯৫৭ সালের পর মকচৌ তার আধা দুম্বা খাওয়ার গল্পটি বলেছেন হাজার বার! বলার চমৎকারিত্বে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়েছেন, কেউ এর সত্য-মিথ্যার ওপরে প্রশ্ন করেননি। বহুবার এই গল্প শুনে আমিই একদিন চ্যালেঞ্জ করলাম – এই বলে যে, আপনি এই মিথ্যে গল্পটি আর বলবেন না প্লিজ।

এতে আপনার গুনাহর পরিমাণ কমবে আর আমরা শ্রোতারাও শোনার গুনাহ থেকে রক্ষা পাবো।

তিনি কৃত্রিম কুপিত হয়ে বললেন, কেন একথা বলছেন আপনি?

আমি বললাম, দাদা আপনার যে শরীর, এতে আধা দুম্বা কোনওকালে ঢুকেছিল সেটা জ্বলজ্বলে মিথ্যাচার। আমি আপনার জ্যামিতি ভূগোল মেপেছি। আর আপনি যে স্বল্পাহারি, দুই আঙুলে পাখির আদার খাওয়া একটা তালপাতার সিপাহি, সে-ও তো দেখছি দুই যুগ থেকে। তিনি আমার যুক্তি শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর হাজিরানে মজলিশকে বললেন, এই সব প্রিন্সিপাল, কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবীর হাতে পড়েছে এই জাতি! এরাই আমাদের রসাতলে নিচ্ছেন। দেখুন, আমি কি কখনও দুম্বাটি আধামণ একমণ ওজনের ছিল বলেছি। আমি কি বলেছি এক বছর/দুই বছর বয়সের মোটাতাজা একটা দুম্বা ছিল। দেখুন, দুম্বা তিন মাস, চার মাস বয়সের হলে তার সাইজ কত বড়ো হয় সেই ধারণা কি এই বুদ্ধিজীবীর আছে? ইনি কি জানেন সীমান্তের পাঠানরা সদ্যোজাত দুম্বাকে আস্ত রোস্ট করে জামাইকে, মেহমানকে খেতে দেয়। আর ছোটো মাঝারি একটা মুরগির রোস্টের চেয়ে বড়ো হয় না সেটি আমাকে অর্ধেক দুম্বা যে বয়টি খাইয়েছিল সে তো বেশি নাস্তা করেছি— বেশি দাম হচ্ছে বোঝাতে বলেছিল। ওই গল্পটি করি, আমি একজন স্বাস্থ্যবান যুবক ছিলাম বোঝাতে।

অট্টহাস্য করে তিনি আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, থলের বিড়াল এতদিনে আপনি বের করে ফেললেন বুদ্ধিজীবী সাহেব!

হ্যাঁ, তাঁর বিখ্যাত সমন্দর খানের গল্পটা এবার বলি। আনপড় একজন সৈনিক ছিলেন সমন্দর খান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে[৩] তিনি যুদ্ধে ছিলেন। শত্রুপক্ষের তীব্র আক্রমণে তাঁদের পক্ষে হতাহত বেড়েই চলছিল একদিন অগ্রবর্তী ঘাঁটির কম্পাউন্ডার (মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট) আহত হলো। সমন্দর খানকে ডাকলেন ডাক্তার। তাকে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। তো, জো হুকুম। কিন্তু বিপদ হলো সমন্দর খান বকলম মানুষ – দস্তখত আর ১০ পর্যন্ত সংখ্যা পড়া এবং লেখাই তার বিদ্যা। ডাক্তার বললেন, কুচপরোয়া নেহি। আমি সব মিক্সচারে নম্বর আর প্রেসক্রিপশনেও নম্বর বসাবো। তুমি শুধু লাগিয়ে দেবো। প্রেসক্রিপশনের নম্বর অনুযায়ী বোতলগুলো থেকে মিক্সচারগুলো নিয়মিত

রোগীকে খাইয়ে দেবে। আর হ্যা, যে কোনও বোতল শেষ হবার আগেই আমাকে জানাবে যাতে আমি সেই মিক্সচার বানিয়ে রাখতে পারি। এক্ষেত্রে কোনও ব্যত্যয় হলে সমন্দর খান তোমাকে আমি কোর্টমার্শালে সোপর্দ করব। সমঝা তো খানজি!

জো হুকুম বলে স্যালুট করল সমন্দর খান। তীব্র যুদ্ধ – অনেক আহত। সমন্দর খান ৭ নম্বর বোতলের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে – এ জিনিসটি খেয়াল করেনি ডাক্তারকে রিপোর্টও করেনি।

অথচ ডাক্তার সাহেব ৭ নম্বর ওষুধের প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন সমন্দর খানের মাথায় বাজ পড়লো। তার চাকরি নট হচ্ছে হোক। কিন্তু কোর্টমার্শাল, বাপরে বাপ।

সমন্দর খানের সারা জীবনের সব গল্পের ভূমিকা সৃষ্টি হলো এখানেই। দেমাগ তেজ ছিল সমন্দরের। কাজে লাগাল সে। হিসাব করে দেখলো, ৪ আর ৩ মিলালে তো ৭ই হচ্ছে। ৪+৩=৭। এটি তো সহজ হিসাব। সমন্দর ৪ নম্বর শিশি থেকে আধা ডোজ আর ৩ নম্বর শিশি থেকে আধা ডোজ ওষুধ মিশিয়ে রোগীকে দিলো গিলিয়ে। রোগী মরেছিল না বেঁচেছিল জানি না । তেজ দিমাগের কল্যাণে সমন্দরের চাকরি নট হলো না, কোর্টমার্শালের প্রশ্নই ওঠে না। যুদ্ধও গেল থেমে। মেডেলও পেয়ে গেল একখানা সে এরপর বাকি জীবনে তার প্রতিটি গল্পের ভূমিকা ছিল – আনপড় হায় তো কেয়া হ্যায়। মেরে দিমাগ তেজ হ্যায়। মায়নে এয়সা তেয়সা ইয়ে কিয়া উ- ও কিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভিক্টোরিয়া ক্রস[৪] জয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন মাত্র ভারতীয় সিপাইয়ের গল্প বলতেন মকচৌ। আমরা যখন দমে যেতাম বা নিরাশ হতাম তখন গল্পটি তিনি বলতেন।

সরতাজ বা এই ধরনের নামের সৈনিকটি যে ব্যাটেলিয়নে যুদ্ধ করছিল সেটি অক্ষশক্তির হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সরতাজ খান নিহত বা আহত না- হয়েই মাঠের লাশের স্তূপে মরার মতো পড়ে থাকে। গভীর রাতে জার্মান বাহিনীর লাশ সুমার-শনাক্তকারী একটি গ্রুপ তীব্র আলো ফেলে লাশগুলোতে সিল মেরে মেরে অগ্রসর হচ্ছিল। তখন জুতসই সময় দেখে সে তার মেশিনগান নিয়ে সব কটি সৈন্যকে খতম করে অন্ধকারে পালাতে থাকে হাজার মাইলের শত্রুব্যূহ পার হয়ে সে শেষ পর্যন্ত মিত্র বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। আর এ সরতাজই ব্রিটিশ বাহিনীর ভিক্টোরিয়া পদকে ভূষিত হয়েছিল।

এই লোকের সারা জীবনের ‘জং কা কাহানি’ শুধু পলায়ন আর পলায়নের গল্প ছিল।

মকচৌ বলতেন আসুন, পলায়ন শিখি। টেবিল চাপড়ে বলতেন, ৬২-তে ইন্ডিয়ানরা পালাতে না-পারলে পূর্ব ভারত চীনের অধীনে যেতো।

ধার্মিক মানুষ ছিলেন। নামাজে দাঁড়ালে কাঁপতেন, মাঝে মাঝে আর্ত শব্দ করতেন, মানুষকে গোপনে সাহায্য করতেন। অনেক ভাষা জানতেন কিন্তু নিরহংকার ছিলেন।

মকচৌ মানে মাহবুবুল করিম চৌধুরী – এমন শত শত গল্প আমাদের শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন সকল গল্পের সারসংক্ষেপ আমাকে লিখে দেবেন। তা দেননি, চলে গেছেন মাওলার কাছে।

মিলিটারি স্যার প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শতাব্দী প্রাচীন এক হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। পোশাকে আশাকে সহকর্মীদের অর্থাৎ আমাদের লজ্জায় ফেলে দিতেন।

মজার কথা, তিনি যেদিন স্কুলটির হেডমাস্টার নির্বাচিত হোন সেদিন একটি অলিখিত শর্ত সাব্যস্ত হয়। তাকে যথাযথ ড্রেস পরে আসতে হবে। এই শর্ত নিয়ে যে টিম সন্ধ্যায় তার বাসভবনে গিয়েছিল তাতে আমি হতভাগা ও ছিলাম। ভাবিকে খুব জোর দিয়ে বলা হয়েছিল শার্টের বোতাম টোতাম যেন লাগানো থাকে । সেদিন প্রচুর পাখির গোশ্ত ও হাড্ডি চিবানো হয়েছিল কিন্তু পরদিন হেডমাস্টার সাহেবের ৩ নম্বর বোতামটি যথানিয়মে এক নম্বরে উঠেই ছিল!

শতাব্দী প্রাচীন হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে মিলিটারি স্যারের কর্মজীবন | Photo by Hasan şen

এই কিস্তি আর দীর্ঘ করা যাবে না, কারণ মকচৌকে পছন্দ করার যোগ্য পাঠক না-পেলে এই গল্পবাজ মানুষের আত্মা কষ্ট পাবে। তা হতে পারে না। তাই তাঁর রসিকতার একটি বোমা ফুটিয়েই থামবো আজ।

মাহবুবুল করিম চৌধুরী — রিটায়ার করলেন ৬৫ বছর বয়স পার করে। পাঁচ বছরের এক্সটেনশন নিয়েছিলেন। সগৌরবেই গেলেন। কদিন পরই খবর পাওয়া গেল ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারের একটা ষাঁড় গুঁতা দিয়েছে মিলিটারি স্যারকে। কেন মারলো, ক্যামনে মারলো জানতে এবং তাঁকে দেখতে গেলেন ভক্তরা।

অসুস্থ মানুষ, স্মিত হেসে জানালেন তিনি যে রিটায়ার করেছেন এবং দুর্বল হয়েছেন এটি এতদাঞ্চলের ষাঁড়কুলও জেনে গেছে। তা না-হলে এতকাল এই বাজারে গেলেন তাঁকে কোনও ষাঁড় গুঁতা দিলো না – এখন দিলো কেন?

গল্প থেকে শিক্ষা

“মকচৌ” আমাদের এক অনন্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখায়, জীবনে সত্যিকারের প্রভাব ফেলতে বড়ো পদ-পদবি নয়, বরং মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আন্তরিকতাই যথেষ্ট। মিলিটারি স্যার তাঁর ছাত্রদের রাত জেগে পাহারা দেওয়ার প্রশংসা করতে নিজেই এক নাটক সাজিয়েছিলেন — এটি দেখায় শিক্ষকতা শুধু পাঠদানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ছাত্রদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়াও তার অংশ।

গল্পগুলো আরও শেখায়, রসিকতা আর বিনয় একসাথে থাকতে পারে। মকচৌ নিজের অতিরঞ্জিত গল্পগুলো নিয়ে যখন ধরা পড়েন, তিনি রাগ না করে বরং হাসিমুখে স্বীকার করে নেন — এটি একটি বড় মনের পরিচয়।

জেনারেল ও মছদর খানের গল্পটি শেখায় ন্যায়বিচার আর বিনয়ের গুরুত্ব। নিজের ভুল বুঝতে পেরে জেনারেল যেভাবে প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করেছিলেন এবং প্রতিকার করেছিলেন, তা প্রকৃত নেতৃত্বের এক দৃষ্টান্ত।

সবশেষে, “মকচৌ” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — জীবনের কঠিন মুহূর্তেও হাস্যরস আর গল্প বলার ক্ষমতা মানুষকে সাহস আর প্রাণশক্তি জোগায়। মকচৌর মতো মানুষেরা কেবল বিনোদন দেন না, বরং জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার শিক্ষাও দিয়ে যান।

শেষ কথা

“মকচৌ” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ তাঁদের উপস্থিতি আর গল্প দিয়ে জীবনকে এতটাই রঙিন করে তোলেন যে তাঁদের স্মৃতি কখনো ফিকে হয় না। মাহবুবুল করিম চৌধুরীর মতো একজন প্রাণবন্ত মানুষের কথা পড়ে পাঠকের মনেও একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও প্রাণবন্ত স্মৃতিকথা পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।—সৈয়দ রুবেল। 

তথ্যসূত্র

  1. হাকালুকি হাওর: বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি এবং Ramsar Site। Ramsar Convention-এর তথ্য দেখুন
  2. এয়ার মার্শাল নূর খান: M. Nur Khan পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন এবং ১৯৬৫ সালের জুলাইয়ে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কমান্ড গ্রহণ করেন। Pakistan Air Force Museum-এর তথ্য দেখুন
  3. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্মা ফ্রন্ট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা অঞ্চলে ভারতীয় ও মিত্রবাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান সংঘটিত হয়। ভারত সরকারের প্রকাশিত সামরিক ইতিহাসে Burma Front-এর বিভিন্ন অভিযান নথিভুক্ত রয়েছে। ভারত সরকারের তথ্য দেখুন
  4. Victoria Cross: Victoria Cross ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ বীরত্ব পদক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের জন্য এই পদকের যোগ্যতা সম্প্রসারিত হয় এবং একাধিক ভারতীয় সৈনিক এই পদক লাভ করেন। The National Archives-এর তথ্য অনুযায়ী Naik Darwan Singh Negi এবং Sepoy Khudadad Khan ছিলেন প্রথম ভারতীয় Victoria Cross প্রাপকদের মধ্যে; Khudadad Khan-কে প্রথম ভারতীয় প্রাপক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। লেখায় বর্ণিত ‘সরতাজ’ নামের সৈনিকের ঘটনাটি নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রে নির্দিষ্ট কোনো Victoria Cross প্রাপকের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। The National Archives-এর তথ্য দেখুনNational Army Museum-এর Victoria Cross তথ্য দেখুনUK Government-এর Khudadad Khan সংক্রান্ত তথ্য দেখুন

Leave a ReplyCancel reply

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading