সিক্ত শিশির — নীরব ভালোবাসার এক গভীর গল্প

সবাই তাকে ডাকতো “ইস্তিরি সাহেব” — হাসিখুশি, নিয়ন্ত্রিত এক মানুষ, যার স্ত্রীর নীরবতাই ছিল শাসনের অস্ত্র। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল মাদকমুক্তির সংগ্রাম, নিঃশর্ত ভালোবাসা আর এক গোপন, গভীর কষ্টের ইতিহাস। “সিক্ত শিশির” এমনই এক অন্তর্মুখী মানুষের গল্প। পড়ুন কবি কালাম আজাদের কলমে। 

সিক্ত শিশির — গল্পের সারসংক্ষেপ

📖 গল্পের ঝলক

নতুন অফিসে যোগ দিয়ে রহমত জানতে পারে তার বস হুদা সাহেবের ডাকনাম “ইস্তিরি সাহেব” — কারণ তার স্ত্রী শেফালির নীরব শাসনেই তিনি নিয়ন্ত্রিত থাকেন। ধীরে ধীরে জানা যায় গভীর এক অতীত — বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেমঘটিত ভাঙনে মাদকাসক্ত হয়ে পড়া হুদাকে শেফালিই পুনরুদ্ধার করে বিয়ে করে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। হাসিখুশি বাহ্যিক জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক গভীর, নীরব কষ্টের সাথে গল্পটি শেষ হয় — যেখানে ভালোবাসা আর ত্যাগের মূল্য অপরিসীম।

ছোটো শহরের বাণিজ্যিক অফিসে দ্বিতীয় অফিসার হিসেবে জয়েন করতে গেছি। জয়েন করেই বসের উপাধি শোনলাম ইস্তরিসাব। দুদিনেই জানলাম আমাদের ক্লায়েন্ট মহলে তিনি সুবিখ্যাত ইস্তরি সাহেবই ।

আমি খুব স্মার্ট মানুষ না। সর্বত্র ঊর্ধ্বতনকে ভীতিমিশ্রিত সম্মানে দেখি— তা তিনি যতই জটিল কুটিল বা দুর্নীতিগ্রস্ত হোন। কারণ, চাকরি শান্তিপূর্ণ করতে গেলে বসকে তুষ্ট-পুষ্ট রাখতে হয়। ৪/৫ দিনের মাথায় হুদা সাহেব আমাকে তার চেম্বারে ডাকলেন। উচ্ছ্বাসপূর্ণ সহৃদয়তায় বসতে বললেন । কী রহমত সাহেব, আমার প্রতি এতো বেরহম কেন আপনি? এক সপ্তাহ হতে চলল, আমার সঙ্গে বসেন না, ভালোমন্দ জানতে চান না, কী বিষয়? আমি বলি, স্যার, আপনি ব্যস্ত থাকেন— আমি উঁকিঝুঁকি দিলেই দেখি আপনি ব্যস্ত আছেন কারও না-কারও সঙ্গে। তাই আপনাকে বিরক্ত করি না ।

তিনি হা হা করে দিলখোলা হাসলেন। যেন আমি দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত রসিকতাটি করছি তার সঙ্গে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি ক্লায়েন্টদের থেকে, অফিস থেকে, আমার বিখ্যাত নামটি শোনেননি?

জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তার দৃষ্টি ।

আমি আমতা আমতা করছি—তিনি আবার অট্টহাস্য করলেন। ইস্তরি সাহেব নামটা আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন। তাহলে আপনার উচিত ছিল – না

-থাক।

তিনি বললেন, বিবাহিত তরুণ আপনি। আমার লাগোয়া বাংলোটি আপনার জন্য বরাদ্ধ । আপনার ইস্তিরিকে আনছেন না কেন?

আমি জানাই, বোরবারে আমার স্ত্রী তার সংসার সরঞ্জাম নিয়ে বাংলোয় উঠবেন।

তিনি খুব খুশি। বললেন, তা-ই করেন। আর হ্যা আমি আড্ডাবাজ মানুষ । অবসরে আমার সঙ্গে এখানে বসবেন। বাসায়ও যাবেন। আরে না। বাসায় যাবার দরকার নাই । ঠিক আছে ।

আমি উঠলাম ।

অফিসের ৯ জন কেরানি কর্মচারী জানায় ইস্তিরি সাহেব খুব ভালো মনের মানুষ। সকলের বিপদে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ান। আর কর্তব্য কাজে লৌহকঠিনও ।

আমার স্ত্রী এলো। বাসা গোছাতে আর অফিসের ছোটাছুটি কাজে আমার একসপ্তাহ কাটল । বড়ো সাহেব ডাকলেন। গেলাম তার চেম্বারে। বললেন, আপনার স্ত্রী এলো, সংসার পাড়লেন। কই আমার বাসায় তো তাকে নিয়ে গেলেন না । আমি আমার ইস্তিরির কাছে খুব লজ্জা পাচ্ছি।

আমি বললাম, স্যার ম্যাডামকে নিয়ে আমার বাসায় আপনি কি একবার আসতে পারেন না?

সর্বনাশ! একথা শুনলে তো উনি আমাকে পিষে ফেলবেন। প্যাচাল পাড়বেন না। আপনারা আসুন। আর অসুবিধা থাকলে কী দরকার। জাস্ট সামাজিকতা তো! বাদ দেন। বলুন আমাদের ডিলাররা কেমন? আপনার সঙ্গে কেমন করছে। আমার কথা কী বলছে?

আমি বললাম, স্যার সবাই তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর আমি তো ফিল্ড কাজে নতুন। তারা আমাকে নিয়ে কী ভাবছেন, তা আমি ঠিক বুঝিনি ।

তিনি হাসলেন—দিলখোলা হাসি। বললেন, ভাইরে আপনার প্রশংসার ঠেলায় আমার টেলিফোনের দফারফা হয়ে যাচ্ছে। আমার তো ভয় হচ্ছে, আমার চাকরি বুঝি নট হচ্ছে। মানে অবসরে পাঠাচ্ছে কোম্পানি। আর মিনিমাম পানিশম্যান্ট হতে পারে হেড অফিসে – মানে ঢাকার দোজখে বদলি ।

আমি বলি, কী যে বলেন স্যার!

: ঠিকই বলি । বিষয়টি আমি আমার ইস্তিরিকে বলেছি। উনি বলেছেন বদলি হলে চাকরিতে ইস্তফা দিতে হবে। আর হ্যাঁ আপনি তো নিশ্চয়ই জেনেছেন দজ্জাল মহিলা হুকুম দিলে হতভাগ্য আমাকে ৩৫ বছরের নকরিটা ছাড়তেই হবে। তা ছাড়বো — চলে যাবো স্টেটসে ছেলের কাছে।

আমি বলি, স্যার ঢাকাকে এত খারাপ ভাবেন কেন? ঢাকা তো রাজধানী আমাদের, সকলেই সেখানে পোস্টিং চায়। ওই যে আমার ইস্তিরি ঢাকারই মহিলা। তিনি কেন যে ঢাকায় যেতে রাজি না – তা তো জানি না ।

আমি রোমানাকে বলি মিসেস হুদার সঙ্গে দেখা করতে। মহিলা তো আমাদের মুরুব্বি। তাছাড়া এখন নিকটতম প্রতিবেশীও। দু-একদিন পরামর্শ করে দুজনই গেলাম। মিস্টার হুদা সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ। মনে হলো আমাদের বাসায় যাওয়াটাকে তিনি সহজভাবে নেননি। আমার স্ত্রীকে ভেতরে পাঠিয়ে তিনি পাশের সোফায় বসে রইলেন। চা-টা পেলাম আমি — অফিসের দু-একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে রোমানাকে রেখে চলে এলাম। বললাম, স্যার আমি আসি—রোমানা বোধ হয় একটু পরে যেতে চাচ্ছে।

তিনি বললেন – আসেন ।

আমার খারাপ লেগেছিল। কিন্তু রোমানা পরদিন থেকে প্রতিদিন-মিসেস হুদার কাছে যায়।

আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কেন যাও প্রতিদিন। সে জানাল, অসাধারণ এক মাতৃহৃদয় মহিলা মিসেস হুদা। তাকে স্নেহ করেন— অপরিসীম আদরও করেন। তার আদরের ধরন সে যেন এক কিশোরী আর তিনি তার মা। ভালোই যাচ্ছিল। হুদা সাহেব একদিন বিকেলে অফিসে একা – আমি বেরিয়ে আসছিলাম। পিয়ন বলল, বড়ো সাহেব ডাকছেন।

গেলাম তার রুমে। বড়ো ভাগ্যবান ছেলে আপনি। ভালো একটি মেয়ে পেয়ে গেছেন। আমি বললাম, স্যার আপনি মহাভাগ্যবান। ম্যাডামের মতো একজন মহিলাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছেন।

তিনি বললেন, হুঁ, তবে যোগ করলেন, এজন্যই তো আমি ইস্তিরি সাহেব। উনি আমাকে ইস্ত্রি দিয়ে পালিশ করে রেখেছেন তো।

আমি বলি, স্যার আপনি কি উনাকে নিয়ে সুখী নন?

তিনি হা হা করে হাসলেন – আমি ঠিক জানি না। কিন্তু ইনি যে এই উচ্ছৃঙ্খল উড়নচণ্ডী মানুষকে একজন সফল সংসারী মানুষ বানিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তা তো আমি জানি। আজ থাক রহমত সাহেব। আপনাকে সব কথা বলব একদিন।

প্রাইভেট লাইফ সম্পর্কে জানতে চাও না কেন?

আমি রোমানাকে বললাম, তুমি তো রোজ যাও ম্যাডামের কাছে। তাদের সে বলে, জানি। হুদা সহেব ভীষণ উচ্ছৃঙ্খল মানুষ ছিলেন। ম্যাডাম তাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এবং তার ভালোবাসার শাসন দিয়ে সফল মানুষে রূপান্তরিত করেছেন।

তুমি কি জানো কোন শক্তির বলে এটি সম্ভব করেছেন তিনি ।

সে হেসে জানায়, তার অস্ত্র একটিই—তিনি মৌনি হয়ে তার সেবা করেন। সকল দায়িত্ব পালন করে যান। কিন্তু কথা বলেন না। কোনও কথার জবাবও দেন না। ৫/৭ দিনে মধ্যেই সাহেব আত্মসমর্পণ করেন।

পরদিন আমি স্যারের চেম্বারে গেলাম ।

কী ব্যাপার, রহমত সাহেব?

আমি বলি, স্যার আমি আপনার কথা শুনতে চাই। আপনি বলেছিলেন একদিন সব বলবেন।

তিনি বললেন, হ্যাঁ বলেছিলাম। আমারও ইচ্ছা আপনাকে আমার কথা বলি। চলেন তাহলে।

আমরা শহরের ছোট্ট পার্কের নির্জন বেঞ্চে বসলাম।

তিনি বললেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেম করতাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রেমের স্মৃতি - সিক্ত শিশির গল্প
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই গভীর প্রেমের সূচনা, যা পরে রূপ নেয় জীবনের কঠিন পরীক্ষায়। Photo by : Jonathan Borba

কিন্তু প্রচণ্ড আবেগে ঝগড়াও হয়ে যেত আমাদের মধ্যে। শেফালি কথা বন্ধ করতো। কিন্তু দেখা করতো। শেষবার তার নীরবতায় আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো । আমি নেশা ধরলাম— মদ গাঁজা আরও যত নেশা ছিল। তার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার আমার আর কোনও পথ ছিল ভাবিনি। যখন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি, তখন পরিবার থেকে এডিক্টদের ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো।১ শেফা সেখানে আমাকে পুনরাবিষ্কার করে। সে-ই আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় আমাকে বিয়ে করে ক্লিনিক থেকে তার পৈতৃক বাসায় নিয়ে তোলে। সুস্থ হই—তার সেবা আর ভালোবাসায়। এরপরেই তার পিতার সাহায্যে এই চাকরি পেয়ে এখানে আসি।

আমার তরফে তার পছন্দ নয় এমন কোনও কাজ করলেই সে মৌনব্রত শুরু করে। আমাকে স্যারেন্ডার করতে হয়। এখানে এসে জানলাম ইস্ত্রিকে ইস্তরি বলে লোকে। আমি সবাইকে বলি আমার স্ত্রী-ই আমাকে ইস্তরি করে রেখেছেন। আমি তাস-পাশার আসরে নাই। আমি ইস্তরি করা তাই পানটানও সম্ভব না। এই যে সকল ‘না’-তে ইস্তরির দোহাই – সে-থেকেই ইস্তরি সাহেব। অসম্ভব ভালো মেয়ে শেফালি। আমাকে জীবনটা সে-ই ফিরিয়ে দিয়েছে।

আমি বলি, স্যার আপনি ঢাকায় যেতে চান না কেন?

ওই যে ঢাকায় গেলে যদি আমি আবার নেশার জগতে ঢুকে পড়ি – সেই ভয়ে— মৃত্যুর আগে আমার ঢাকায় যাওয়া বারণ। আমি তো গেন্ডারিয়ার ছেলে ২। আর হ্যাঁ, শেফালি নারিন্দার মেয়ে। স্ত্রীরা স্বামীর দুর্বলতা জানে তো!

আমি বলি, স্যার আমেরিকায় আপনার ছেলে ছাড়া আর কেউ…

শেষ করতে পারি না আমি। চিৎকার করে ওঠেন হুদা! বোগাস – রাবিশ, মিথ্যা; বন্ধ্যা নারী জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে— সন্তান জন্মাতে পারে না…।

শিশিরে ভেজা ঘাস - শিক্ত শিশুর গল্প
Photo by Johannes Plenio
বড়ো সিক্ত, শিশিরের এই জীবন!

গল্প থেকে শিক্ষা

“সিক্ত শিশির” আমাদের শেখায়, মানুষের বাহ্যিক হাসিখুশি রূপের আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে গভীর সংগ্রাম আর কষ্টের ইতিহাস। হুদা সাহেবের প্রাণবন্ত, রসিক ব্যক্তিত্বের পেছনে ছিল মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির এক কঠিন যুদ্ধ, যা কেউ সহজে অনুমান করতে পারত না।

গল্পটি আরও দেখায়, প্রকৃত ভালোবাসা মানুষকে বদলে দিতে পারে। শেফালির অবিচল ভালোবাসা আর ধৈর্য হুদাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনে একজন সফল, দায়িত্বশীল মানুষে পরিণত করেছিল — এটি প্রমাণ করে ভালোবাসার শক্তি কতটা রূপান্তরকারী হতে পারে।

নীরবতাও যে এক ধরনের শক্তিশালী ভাষা হতে পারে, তা এই গল্পে স্পষ্ট। শেফালির মৌনতা কোনো রাগ বা অবহেলা নয়, বরং তার ভালোবাসারই এক গভীর প্রকাশ — যা সম্পর্কের মধ্যে শ্রদ্ধা আর সীমারেখা বজায় রাখার একটি উপায়।

সবশেষে, “সিক্ত শিশির” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন কিছু গোপন কষ্ট থাকতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তাই অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আর না জেনে বিচার না করার শিক্ষা এই গল্প আমাদের দেয়।

শেষ কথা

“সিক্ত শিশির” আমাদের এক গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায় — জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো প্রায়ই নীরবে লড়া হয়, আর ভালোবাসাই সেই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি। এই গল্প পাঠকের হৃদয়ে গভীর এক অনুরণন রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও মর্মস্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।


তথ্যসূত্র

  1. মাদক ব্যবহারজনিত সমস্যার চিকিৎসায় প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আবাসিক/কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে পরিবারের অংশগ্রহণের গুরুত্ব রয়েছে — WHO ও UNODC-এর International Standards for the Treatment of Drug Use Disorders। WHO ↑
  2. গেন্ডারিয়া ও নারিন্দা ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে। — Banglapedia, Dhaka। Banglapedia ↑

Leave a Reply