রাজনীতির উত্তাল সময়ে একটি ভুল বোঝাবুঝি, একটি পলায়ন, আর বিশ বছরের নীরবতা — নিয়তি কীভাবে এক সত্যকে চাপা রাখে, আবার কীভাবেই বা তা উন্মোচিত করে দেয় নিজের মতো করে?
জিনের ধর্ম — গল্পের সারসংক্ষেপ
স্বাধীনতা-উত্তর উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে ছাত্রনেতা সালমান হায়দার এক ভুল বোঝাবুঝির জেরে দলীয় কর্মী নীলাকে জোর করে নিজের কাছে নিয়ে আসে এবং নিজের ভালোবাসার কথা জানায়। সেই রাতেই ক্যাম্পাসে খুন হয়, আর সালমানকে বাঁচতে বিদেশে পালাতে হয়। এদিকে নীলা তার সহকর্মী দিদারকে বিয়ে করে জীবন শুরু করে, জন্ম নেয় কন্যা শান্তা। বিশ বছর পর সালমান ও দিদারের আকস্মিক সাক্ষাৎ এক গোপন সত্যকে সামনে নিয়ে আসে, যা তিনটি জীবনকেই চিরতরে বদলে দেয়।
মহাকালকে কালখণ্ডে বিভক্ত না-করলে কী এমন ক্ষতি। ক্ষুদ্র প্রাণী মানুষ, সনতারিখ না-দিলে আমাদের ক্ষুদ্রপ্রাণ অবিশ্বাসী হয়ে যায়। হোক। আমি অবিশ্বাসী এক কালপর্বের একটি কাহিনির বয়ানে প্রমাণের পরীক্ষায় যাবো না। কেননা, এ জন্য আমাকে জজ সাহেবের সামনে উকিল সাহেবের নাটকীয় জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে না তো।
স্বাধীনতার উত্তাল বেগ এবং আবেগের রেশ মেটেনি তখনও। ছাত্ররাজনীতিতে নৈরাশ্য আর তদজনিত নৈরাজ্য বিরল নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি বাম চেতনায় খুবই পোক্ত। সালমান হায়দার তেমনই একদলের নয় – এক গ্রুপের নেতা। পড়ুয়া, সুন্দর, ধনী মায়ের একমাত্র সন্তান। পাতিনেতা, বুর্জুয়া হলেও চিন্তায় বাম এবং ভাবুক ।
দলীয় কর্মী নীলার প্রতি দুর্বলতা আছে তার। দ্বিধান্বিত বিধায় কিছু বলা হয়নি। কিন্তু সহকর্মী দিদারের সঙ্গে নীলার ঘনিষ্ঠতা বড়ো কষ্ট দেয় তাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাপা উত্তেজনা, লাশ পড়তে পারে যে কোনও সময়। চিন্তাক্লিষ্ট সালমান সন্ধ্যার প্রদোষে নীলাকে আর দিদারকে আবিষ্কার করলেন উদ্যানের নির্জন ঝোপের কাছে ঘনিষ্ঠ আর খুশি অবস্থায়।

সইতে পারলেন না সালমান। কঠোর উচ্চারণে নীলাকে নির্দেশ করলেন, এসো এবং সজোরে হাত ধরে হাঁটা দিলেন।
নীলা বলে, সালমান ভাই কী করছেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? সালমানের অনিয়ন্ত্রিত কণ্ঠের ‘চুপ’ তাকে থামিয়ে দেয়।
আস্তানায় এসে দরজা বন্ধ করে উন্মত্ত সালমান নীলার পায়ের কাছে বসে জানালেন তার ভালোবাসার কথা। তিনি যে তার কাছে অসহায়, অন্যকে নীলার পাশে দেখা তার জন্য অসহনীয় সেই কথাগুলো ধরা গলায় বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালমান। নীলা এই অভূতপূর্ব ঝড়ের মুখে নুয়ে পড়ে। সে ভেবে নেয় দিদারের প্রতি তার ভাব আছে বটে ভালোবাসা কক্ষনো নয়। আর সে এ-ও বোঝে যে সালমান-ই তার পুরুষ তার প্রেমিক তার জীবন এবং মৃত্যুও।
ধীরে সে সালমানের হাত ধরে ওঠায়। তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে নিজের অজান্তে এবং অবচেতনে বিস্মরণের ভুবনে হারিয়ে যায় দুজনে।
সে রাতেই লাশ পড়লো ক্যামপাসে। প্রতিপক্ষ সালমানকে খতম করার আইনি আর বেআইনি প্রক্রিয়ায় মেতে ওঠে। সালমান হায়দারকে নেতারা জানায় তার বাঁচার দুটি পথ : জেলে যাওয়া অথবা বিদেশে পলায়ন। সালমান পলায়নকেই বেছে নেয়।
এক মাসের মাথায় বিস্রস্ত নীলা মুখোমুখি হলো দিদারের। সোজা প্রশ্ন, দিদার তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
দিদার বিহ্বল চিত্ত, অনিশ্চিত তবু জলজ্যান্ত এক কাম্য সুন্দরী যুবতীর প্রশ্নের হ্যাঁ বাচক জবাব দেয়। নীলা তার হাত ধরে টানে আর বলে এসো আমরা এক্ষুনি বিয়ে করব! রাজনীতি করা দুটি ছেলেমেয়ের নাটকীয় বিয়ের পক্ষে জোটে যায় কিছু বন্ধুও। শুরু হলো দুজনের এক দীর্ঘযাত্রা, কারণ দাম্পত্যের কোনও প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা এদের ছিল না। বাচ্চাদের স্কুলের শিক্ষিকা হয়ে গেল নীলা । দিদার পড়াশোনা চালালো টিউশন করে । ন’মাসের মুখে কন্যা সন্তান জন্ম নিল নীলার।
টেনে চালানো একটি সংসারে না রইল রাজনীতি না প্রেম, তবে একটি সুন্দর শিশু ঘরটিকে জিয়ল মাছের আধার করে রাখলো।
পাওয়ার বোর্ডে দিদারের চাকরি। ভালো বলা যেতো কিন্তু দিদারের তাস পাশা আর মদের নেশা সংসারকে জীবিত রাখলো, বাঁচিয়ে রাখলো না। মা তার আপ্রাণ চেষ্টা সাধনায় শান্তাকে স্কুলকলেজে পাঠালো – বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়ে বলল, এবার তুই নিজের পথ নিজেই কর মা। আমি আর পারি না।
কথাটা দিদারের কানে গিয়েছিল, সে মেয়েকে ডাকলো। শান্তার মনে হলো স্মরণকালে এই প্রথম বার তাকে দেখলো।
নীরব দাঁড়ানো শান্তা। দিদার মেয়েকে আদর করে কাছে বসালো। শোন শান্তা! আমি একটা অমানুষ – কেন, কীভাবে তা আমি তোকে বলব না। তোর মা তোকে নিজের ভার নিতে বলেছে? এতকাল সে তোকে দেখেছে। আজ থেকে তোর সকল ভার এই অধম বাবার। নারে, আমি তোর সকল ভার বইতে পারবো না। সে শক্তি-আদর্শ-চরিত্র আমার নেই। আমি তোর আর্থিক ভারটুকু বইবো। যত টাকা লাগে আমি দেবো মা। তুই বলিস, লজ্জা করিস না। বল, তুই আমাকে ক্ষমা করেছিস?
কাঁদো কাঁদো ক্ষীণ কণ্ঠে শান্তা বলে, বলব বাবা। ড্রয়ার টেনে এক তোড়া টাকার নোট দিদার তুলে দেন শান্তার হাতে।
কুড়ি বছর পর।
আমেরিকা প্রবাসী সালমান হায়দার পাওয়ার বোর্ডে গেছেন – তার নবনির্মিত বহুতল ভবনের ইলেকট্রিক সংযোগ জটিলতার নিরসনে। দিশা পান না ঠিক। টেবিল থেকে টেবিলে ছুটছেন। কার কাজ কে করবে সেটিও কোনও অফিসার ঠিকমতো বলছে না। ঠিকাদারটি সঙ্গে আছে সেও ঠিক জায়গাটি চিনে না। নাম-প্লেটহীন একটা রুমে ঢুকলেন শেষ অবধি। চোখাচোখি হতে সালমান আর দিদার পরস্পরের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। একসঙ্গে দুজনের নামে চিৎকার করলেন দুজনই। কাজের সুরাহা হলো। গল্প হলো অল্পস্বল্প। মুখ্য অংশ দাঁড়ালো সংসার। হ্যাঁ, দিদার তো নীলাকে বিয়ে করেছেন। এক মেয়ে শান্তা ।
সালমান জানালেন, না, সংসার হয়নি। ৪৫ বছর বয়সে আর হবেও না। প্রয়োজন বোধ করেন না। তবে নীলার নাম শুনে বুকে একটু কাঁপন হলো, ঠোঁট শুকালো। আর দিদার যখন বললেন, চলো দুপুরে আমার বাসায় ডালভাত খাও। নীলা তোমাকে দেখে খুব খুশি হবে। সালমান রাজি হয়ে গেলেন।
নীলার পুরোনো ঢাকার ভাড়া বাসাটি অতিসাধারণ। রুচি ছাড়া আর সবকিছুতে দৈন্য। শুকনো মুখে নীলা যখন খাবার পরিবেশন করছেন তখন ঝলমলে তরুণী শান্তা ঘরে ঢুকলো
পরিচয় করিয়ে দিলেন দিদার। আমাদের মেয়ে শান্তা। আর ইনি আমার আর তোর মা’র খুব প্রিয় বন্ধু সালমান। মিলিয়নিয়ারI
শান্তা সালমানের দিকে চেয়ে থাকে, অপলক, চোখ ফেরাতে পারে না। সে কি ওকেই খুঁজছিল!
সালমান ও মুগ্ধ চোখে মেয়েটিকে দেখেন, এত মায়াবী চেহারা বুঝি গোটা দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই।
সালমান উঠবেন। বললেন, আমি তো হোটেলে উঠেছি। তোমরা যদি আমার সঙ্গে ডিনার করো আমি খুব খুশি হবো। শান্তা, আমি তোমার মা- বাবার সঙ্গে একদিন খুব দুর্ব্যবহার করেছিলাম। তোমার বাবা মাফ করলেও মা মাফ করেনি। আমি ওর চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি। আমি গাড়ি পাঠাবো, তুমি অন্তত যেয়ো। দিদার নীলা আজ আসি। তোমরা হোটেলে না-গেলেও আমি আসবো। মনে হয় দেশে যতদিন আছি প্রতিদিনই আসবো। আসি ।
শান্তা ভেবে পায় না। একজন অচেনা মানুষকে এত সুন্দর আর ভালো লাগবে কেন? এটি কি প্রেম। Love at first sight! ধুর পাগলামি।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মেট্রো হোটেলের গাড়ি এলো। দিদার তার পানালয়ে বা তাসের আড্ডায় । নীলার মাথা ধরেছে। শান্তা যাই বলেই গেল।
হোটেলের স্যুট। এক সুসজ্জিত ছোটো বাসা যেন। মুগ্ধ শান্তা শুনে এক নাটকীয় জীবনের কাহিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক খুনের মামলার আসামি ছাত্রনেতার আমেরিকায় পলায়ন—বাঁচার লড়াই আর মিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠার আলাদিনি গল্প। কিন্তু না, এ মানুষের প্রতিটি শব্দই যে তার হৃদয়তন্ত্রীতে সংগীতের সুর মূর্ছনা ছড়াচ্ছে। কী খেলো, কী করল কিছুই যেন বোঝে না মুগ্ধ মেয়েটি।
একবার বলেই ফেললো, সংসার করেন না কেন আপনি? জবাবি হাসিটা দুনিয়ার তাবৎ রহস্যে, স্নিগ্ধতায় আর বেদনায় ভরা। কিছুই বোঝা যায় না| বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এই আধুনিকা তরুণী কোনও হদিশ পায় না—এই পুরুষের হাসির এমনকী তার নিজের মনেরও। সে কি প্রেমে পড়েছে?
রাত দশটায় যখন সে ঘরে ফেরে, বুকে তার অলৌকিক বেদনা। সে ঠিক করে ফেলে আগামী কাল যাবে এবং সে বলবে সালমানকে ভালোবাসে। শেষ রাতে তার মাতাল বাবা ফেরে। ঝগড়া করে মা-বাবা। সে শোনে, ঘুমাতে পারেনি একরত্তিও। সে হাসে – এ-ই তো ভালোবাসা – এ-ই তো সংসার! দ্বিধা… ।
পরদিনও সে হোটেলে যায়। দেশবিদেশের কত কথা শোনে কিন্তু কিছু বোঝে না। বিদায় নিতে যেয়ে সে সালমানের হাতে ধরে। তার ইচ্ছে করে
সালমানের বুকে মাথা রাখে গাঢ় একটা চুমু খাবে। কিন্তু খাওয়া হয় না। সালমান কপালে আলতো ঠোঁটে পবিত্র একটা আদর দিয়ে বলে এসো! ফিরতে ফিরতে সে ভাবে কালই সে তার ভালোবাসার কথা বলবে। গাঢ় এক চুমুতে জীবনের সকল তৃষ্ণা সে মেটাবেই।
আজও বাবা ফিরেনি। মা বলে, শান্তা আমি তোর কাছে আজ থাকি ।
থাকো, বলে সে।
মা-মেয়ে এক বিছানায় শুয়ে থাকে। ফুঁপিয়ে কাঁদছে নীলা। জড়িয়ে আছে মেয়েকে ।
শান্তা শুধায়, কী হয়েছে মা, বলো?
আমার একটা কথা আজ তোকে বলব মা। অনেকক্ষণ কাঁদে মা ।
তারপর স্থির-চুপি চুপি উচ্চারণে বলে, শান্তা, তুই সালমানের সন্তান। হ্যাঁ, তুই তার মেয়ে। না, সে জানে না, তুই যে তারই।
আর দিদারও না। আমি বিপন্ন হয়ে ঠকিয়েছি দিদারকে। মূল্য চুকিয়েছি গত একুশ বছর। অথচ জানিস, সালমান…! শান্তা মুখ চেপে ধরেছে মায়ের। আর না, একটি কথাও বলো না তুমি ।
গভীর রাতে দিদার এলো ঘরে। বিরল রকমের প্রশান্ত নীলা দরজা খুলে তাকে বিছানায় বসায়। কাপড়চোপড় বদলাতে সাহায্য করে। খাবার যাচে। না, ক্লাবের ক্যান্টিনে খেয়েছে দিদার ।
একটা ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা ছিল নীলার। তবু সে শান্ত গলায় জানায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই সন্ধ্যার পরের ঘটনা, তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার আশঙ্কা, সালমানের পলায়ন আর তার আত্মরক্ষার অসুর বিবাহের কাহিনি নীরব দিদারকে সে শুধায়, এখন আমার কী করণীয় বলো?
নির্বিকার দিদার বলে, দেখো নীলা তুমি কোনও ভুল বা দোষ করোনি। ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করার কবছর আগেই জানতাম আমি পুরুষত্বহীন একজন মানুষ। অন্তত বাবা হবার যোগ্যতা আমার ছিল না—এ ছিল নিশ্চিত বিষয়। তুমি ঝড়ের মতো এসে একটা সংসার জীবন আমাকে দিয়েছো – সেটা আমার জন্য নয় আমি জানি।
নীলা বলে, মিথ্যে সান্ত্বনা দিচ্ছো কেন? বিয়ের প্রথম দুবছর তুমি আমি দাম্পত্যে তো মগ্ন হয়েছি – তখন তো!
নীলা, এসব জানার কী দরকার তোমার। জেনেটিক মেডিকেশন ওই আশীর্বাদ আমাকে দিয়েছিল। কিন্তু শান্তা আমার মেয়ে না, এটা আমি জানতাম।
এখন ঘুমাও। আমার মনে হয় সালমান তোমার হয়ে এখনও আছে। কালই সব কথা তাকে বলো। ঘর বাঁধো তার সঙ্গে, মেয়েটিকে তার ভাগ্যের স্বর্ণতোরণে রাখো। ও, হ্যাঁ, আমার তো কেউ নাই। ও যেন আমারও উত্তরাধিকারী হয় – এই মিনতি তোমাকে।
শান্তা আজ রাতটা এক রত্তি ঘুমাতে পারেনি। নিয়তি তাকে এ কোন ঘাটে এনে পৌছালো।
পরদিন ভোরেই মেট্রোর স্যুটের সামনে বেল বাজাচ্ছে শান্তা। ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুললেন সালমান। ঝড়ের বেগে শান্তা ঢুকে পড়েছে তার ভেতরে, তার বুকের ভেতরে। বাবা, আমি তোমার মেয়ে, বাবা! আমি তোমাকে দেখা-অবধি জানতাম তুমি জীবনে আমার, মরণেও আমার— আমারই। গেল রাতে মা সত্যটা বলেছে আমাকে।
বুকে জড়িয়ে রেখেই তার বিছানায় শান্তাকে বসালেন সালমান! চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বললেন, আমি বুঝিনিরে। তবু আমার মায়ের যৌবনকালের অবিকল চেহারার মেয়েটিকে তারই পুনর্জন্ম মনে হয়েছিল আমার ।
আয়, আমরা নীলাকে সামলাই। তখনই খোলা স্যুটে আরেকজন দিদার এলেন। প্রশান্ত চেহারা।
কী হে সালমান, মেয়েকে পেয়ে খুব খুশি তাই তো? আমি কিন্তু মেয়ে হারিয়েও খুব খুশি। আফটার অল মেয়েকে চিরদিন কাছে রাখা যায় না রে ভাই।
দিদার একখানা কাগজ বাড়িয়ে ধরলো সালমানের দিকে – তালাকনামা। অক্ষম ও অধম পুরুষ আমি। একজন নারীকে ২১ বছর অন্যায়ভাবে দখলে রেখেছিলাম – মুক্তি দিলাম। তোমরা খুশি থেকো। তিন জনের চোখেই পানি।
গল্প থেকে শিক্ষা
“জিনের ধর্ম” গল্পটি আমাদের শেখায়, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলো প্রায়ই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চাপা থাকে — কিন্তু নিয়তি এক সময় নিজের নিয়মেই তা উন্মোচিত করে দেয়। সালমানের একটি মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত এবং তারপরের পলায়ন কীভাবে তিনটি জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল, তা এই গল্পের কেন্দ্রীয় বার্তা।
দিদার চরিত্রটি গল্পের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা বহন করে। নিজের অক্ষমতা জেনেও তিনি নীলা ও শান্তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, ভালোবেসেছিলেন নিঃস্বার্থভাবে। শেষ পর্যন্ত সত্য জানার পরও তিনি কাউকে দোষারোপ না করে বরং সবাইকে মুক্তি দেন — এটি ক্ষমা ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
গল্পটি আরও শেখায়, ভুল বোঝাবুঝি আর তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত জীবনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। সালমান যদি সেই মুহূর্তে ধৈর্য ধরতেন, হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো। তাই আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্তের আগে দুবার ভাবা জরুরি।
সবশেষে, “জিনের ধর্ম” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — রক্তের সম্পর্ক আর ভালোবাসার সম্পর্ক সবসময় এক নয়, কিন্তু যিনি প্রকৃত ভালোবাসা আর দায়িত্ব দিয়ে একটি জীবন গড়ে তোলেন, তিনিই আসল অভিভাবক। দিদার প্রমাণ করে দেন, পিতৃত্ব রক্তের বন্ধনে নয়, ভালোবাসা আর ত্যাগেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
শেষ কথা
“জিনের ধর্ম” আমাদের দেখায়, জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটা মূল্য থাকে, আর সত্য কখনো চিরকাল লুকিয়ে থাকে না। ভালোবাসা, ত্যাগ আর ক্ষমার এই গল্প পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও শিক্ষণীয় গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।