শেষের আলোয় — লোভ ও প্রায়শ্চিত্তের এক গল্প | কালাম আজাদ

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কি মানুষ তার সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারে? এক প্রতারক, লোভী বৃদ্ধ যেভাবে নিজের শেষ বয়সে এসে ফিরিয়ে দিলেন এক জীবনের সঞ্চিত অন্যায়ের হিসাব — এমনই এক বিস্ময়কর, মানবিক গল্প “শেষের আলোয়”।

শেষের আলোয় - লোভ ও প্রায়শ্চিত্তের এক গল্প - কালাম আজাদ
জীবনের শেষ প্রান্তে সোনালী আলোয় এক প্রায়শ্চিত্তের পথচলা। ছবিঃ প্রতিকী।

শেষের আলোয় — গল্পের সারসংক্ষেপ

📖 গল্পের ঝলক

যৌবনে কূটকৌশলে প্রতিবেশীর জমি দখল করা কৃপণ বৃদ্ধ মতছির মিয়ার নাতির বিয়ে হয় সেই জমির প্রকৃত মালিকের নাতনির সঙ্গে। গ্রামবাসীর কটাক্ষের মুখে বৃদ্ধ সবার সামনে নিজের অতীতের অন্যায় স্বীকার করে সমস্ত সম্পত্তি নববধূর নামে লিখে দেন — এক অভাবনীয় প্রায়শ্চিত্তের গল্প।

নওশিন শিক্ষিতা, সুন্দরী এবং পরিচিত মহলে গুণান্বিতা এক মেয়ে। তবু দুটি কারণে তার বিয়ে হচ্ছে না ৩০ বছর বয়স অবধি। সুন্দরনগরে উচ্চশিক্ষিত যুবক যে নেই তা নয়। কিন্তু গরিব স্কুল টিচারের মেয়েটির বিয়েতে যৌতুক দেবার সামর্থ্য নেই বিধবা মায়ের। বয়েসি অনূঢ়ার ৩০ বছরে বর একটা শেষ পর্যন্ত জুটল।

দারোগার চাকরি করে মতিন উদ্দিন। মতিন ৩৫ বছর বয়সি, দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা কৃষকের ছেলে। শৈশবে বাপ মারা গেলে দাদার সম্পত্তি পায়নি মতিন। অশীতিপর দাদা মতছির মিয়া আছেন। বড়ো একটা খামারের মালিক তিনি। খুব কৃপণ। যৌবনে 1প্রজা ছিলেন— কুচক্রী এক মামলাবাজ । শহরের এক প্রতাপশালী উকিলকে বাবা বানিয়ে জাত-বেজাত মামলা জিতে মিরাশদারের2 চল্লিশ বিঘা3 জমি আত্মসাৎ করেছিলেন। আরও বাড়িয়েছেন নানা ফিকির ফন্দি করে। একমাত্র ছেলেটির বউ যখন একটি ছেলে নিয়ে বিধবা হলো, তিনি খুব কষ্ট পেলেন বলে মনে হলো না। আরও ছেলে জন্মানোর আশায় নতুন বিয়ে করলেন। বিয়ের আগেই অবশ্য প্রৌঢ়া বউটিকে দিলেন তালাক

নতুন বউটি তাকে আনন্দ দিলেও ছেলে দিতে পারলেন না। কৃপণ স্বভাবের মতছির প্রথম পক্ষের দুটি মেয়ে আর দ্বিতীয় পক্ষের তিনটি মেয়েকে কৈশোরেই বিভিন্ন ঘরে বিয়ে দিয়ে যেন বেঁচে গেলেন।

নাতি বড়ো হলো তার চোখের সামনে লড়াই করে। তিনি তাকালেন না। বউটি বাঁচলো তার ভাইদের অনুদানে, শ্বশুরের করুণার দান ভিটেটি আশ্রয় করে।

৮৫ বছর বয়সে ছেলের বউ যখন মতিনের দারোগা হবার খবর দিলেন তিনি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। খুব খুশি হয়ে বললেন, এখন তো তাকে বিয়ে দিতে হবে। বউমা বললেন, কাজটা তো আপনাকেই করতে হবে আব্বা। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই।

বউ তিনি খুঁজলেন, খুঁজালেন। নওশিনের খবর পেয়ে চাঙ্গা হয়ে গেলেন। বললেন, আমার পরিচয় না-দিয়ে এই মেয়েকে আনার ব্যবস্থা করুন। অনুষ্ঠান করার কথা বলবেন। কোনও দাবিদাওয়া করবেন না। এমনকী দরকার হলে আমার খরচে সকল অনুষ্ঠান করতে বলবেন।

মতিন মুন্সিগঞ্জের দারোগা। দাদা বিয়ে ঠিক করেছেন শুনে খুশি। শেষ পর্যন্ত দাদাকে অনুষ্ঠানে পাওয়া যাচ্ছে সেটিই তার আনন্দ।

বিয়ে ঠিক হতে কষ্ট হলো না। নওশিনের মায়ের আত্মীয়স্বজন খুব কাছে ভিড়েন না। যদি সাহায্য করতে হয় এই ভয়ে। মা আইবুড়ো মেয়েটির একটি বিয়ে দেখতে চাচ্ছিলেন, তা হচ্ছে।

গ্রামে বিএ পাস করার অপরাধে দোষী মেয়েটিও খুশি। তার বিয়ে হলে তার যা দায়মুক্ত হবেন ভেবে। বিয়ে হলো। জীর্ণ এক ঘরে খাটপালঙ্ক ছাড়া বাসররাত কাটলো নওশিনের। সকাল থেকে কনে দেখার ভিড়। সবার মুখে ছিঃ ছিঃ, ফকিরের মেয়ে, একটা পালঙ্ক পর্যন্ত আনেনি মেয়েটি।

জামাইকে জামা জুতাও না। থুঃ এমন শিক্ষায়, থুঃ এমন সৌন্দর্যে…! সারাদিন এসব মন্তব্য শুনলেন বুড়ো মতছির। তার নিজের বউ আর মেয়েরা, নাতিনাতনিরা সকলেই এই ফকরানিকে ঘরে তোলার জন্য তাকে পরোক্ষে দোষী করলেন।

বিকালেই কয়েক ডেগ তোষা শিন্নি4 করালেন। সারাগ্রামে মিলাদের দাওয়াত পাঠালেন বাদ মাগরিব। মিলাদের জন্য প্যান্ডেলও হলো। সারা গ্রামবাসী আর নিজের পরিবারের সবাইকে বসালেন তিনি প্যান্ডেলে। কিন্তু কোনও মৌলবি মৌলানা এলেন না।

মঞ্চের মতো জায়গায় মতছির মিয়া লাঠি ভর দিয়ে উঠলেন। ভাইবোনেরা, বললেন মতছির। আমার নাতবউকে দোয়া করার জন্য আপনাদেরকে দাওয়াত করেছি। আপনারা শুনেছেন মেয়েটি এক ফকরানির মেয়ে। কিচ্ছু তার সঙ্গে দেয়নি তার মা। হাসির গমক উঠলো মজলিশে।

বুড়ো চিৎকার করলেন, থামেন। যৌবনের সেই লাঠিয়ালের5 আওয়াজ। নীরব হলো মজলিশ। মতছির বললেন, এ মেয়েটি যাকে আপনারা ফকরানির মেয়ে বলছেন, তার দাদার প্রজা ছিলাম আমি। তার চল্লিশ বিঘা জমি আমি হামলা মামলা আর কূটকৌশলে দখল করেছিলাম। দখল সম্পন্ন করে লোভ আমার আরও বেড়েছিল। আমি কৃপণ হয়েছিলাম, আরও জমির মালিক হয়েছিলাম। লোভে পড়ে ছেলেকে, বউমাকে, নাতিকেও ভুলে গিয়েছিলাম।

আজমত আলী চৌধুরীর ৪০ বিঘা দখলের পর তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, খুব খারাপ কাজ করলিরে মতছির। তোকে বিশ্বাস করেছিলাম, ভরসা করেছিলাম তোর ওপর। তুই সেটা ভঙ্গ করেছিস। তয় শুনে রাখ, একদিন তুই লাভে মূলে এই সম্পদ দিতে বাধ্য হবি। দিতে হবেই তোকে।

রেগেছিলাম – না, মিয়ার ব্যাটা, আপনি যেটা আশা করছেন তা কখনও দেখবেন না । তিনি হেসে বলেছিলেন, না, আমি দেখবো না ঠিকই। কিন্তু স্বপ্নে দেখেছি তুই সারাদেশের মানুষকে সাক্ষী করে আমার ওয়ারিশের কাছে এর চাইতে দশগুণ বেশি সম্পদ সমঝে দিচ্ছিস।

আমি বলেছিলাম, তাইলে আর কী, লাগান গিয়ে মামলা। মরে ভূত হলে কোর্টের রায়ে নিয়েন আপনার জমি। তিনি নীরবে চলে গিয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম তিনি মামলা করবেন, তা তিনি করেননি।

আজ আমি সুযোগ পেয়ে তাঁর নাতনিকে নাতবউ করে এনেছি। সকলে সাক্ষী থাকেন, আমার যা কিছু সম্পত্তি তা আজ থেকে মিরাশদার2 আজমত চৌধুরীর নাতনির। সে যদি খেতে দেয় তবেই আমি খাবো, না দিলে যে দিকে দুচোখ যায় চলে যাবো।

জীবনের ভুল স্বীকার করে সম্পত্তি লিখে দিচ্ছেন মতছির মিয়া। ছবিঃ প্রতিকী। Photo by Matthias Zomer.

মতিন, তোর বউকে নিয়ে আয়। মতিন নওশিনকে নিয়ে এলো বুড়োর সামনে। বুড়ো একটা দলিলের বাক্সো দিলেন নববধূর হাতে।

নাতবউ তোমাকে তোমারটাই দিচ্ছি। আর কটা দিন বাঁচবো, প্রজা করে যদি আমাকে রাখো বড়ো খুশি হবো আমি। গ্রামের লোকেরা হু হু করে কাঁদছে! কেন?

পুনশ্চ : গল্পটি আমি একজন পুলিশ অফিসারের কাছে শুনেছি। তিনি আমাকে তাঁর বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছিলেন। সেই অবসরে গল্পটি শুনিয়ে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ডেকে এনে বলেছিলেন, এ গল্পের নায়িকা ইনিই। আমি এক মহীয়সী প্রৌঢ়া সৌম্য সুন্দরীকে দেখেছি। দেখে মুগ্ধ হয়েছি। দশটি অভূতপূর্ব সন্তানের হীরকগর্ভা মা ছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, ভাই উনার কেচ্ছাটি আপনি বিশ্বাস করবেন না। আমি বিশ্বাস করেছি – কারণ শেষের আলোয় বিশ্বাস না-করে আমি যে পারি না!

গল্প থেকে শিক্ষা

“শেষের আলোয়” গল্পটি আমাদের এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় — অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ কখনো স্থায়ী শান্তি দেয় না, আর ন্যায়বিচার দেরিতে হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়। মতছির মিয়ার সারাজীবনের লোভ আর প্রতারণা শেষ পর্যন্ত তাকে অনুশোচনার পথে নিয়ে আসে, যা প্রমাণ করে বিবেকের কণ্ঠস্বর কখনো সম্পূর্ণভাবে নীরব থাকে না।

গল্পটি আরও শেখায়, প্রকৃত সম্মান কখনো সম্পদ বা ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। মতছির মিয়া যত সম্পদই করুন না কেন, তার পরিবার তাকে ভালোবাসেনি বরং ভয় পেয়েছে। শেষ বয়সে তার প্রকৃত মুক্তি এলো তখনই, যখন তিনি নিজের অন্যায় স্বীকার করলেন এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করলেন।

আজমত আলী চৌধুরীর ভবিষ্যদ্বাণী গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে — ধৈর্য ও বিশ্বাসের শক্তি। প্রতিশোধের পথে না গিয়ে তিনি নীরবে বিদায় নিয়েছিলেন, বিশ্বাস রেখেছিলেন যে ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই, যা শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হয়।

সবশেষে, “শেষের আলোয়” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — জীবনের যেকোনো পর্যায়ে থেকেই মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটতে পারে। এটি ক্ষমা প্রার্থনা, বিনয় আর মানবিকতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

শেষ কথা

“শেষের আলোয়” আমাদের এক গভীর উপলব্ধি দেয় — জীবনের শেষ মুহূর্তেও প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ থাকে, আর ন্যায়বিচার কখনো হারিয়ে যায় না। এই গল্প পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী এক অনুভূতি রেখে যাবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও মর্মস্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।


রেফারেন্স

  1. প্রজা: বাংলার ঐতিহাসিক জমিদারি ও ভূমি-ব্যবস্থায় “প্রজা” বলতে জমিদার বা উচ্চতর ভূমিস্বত্বভোগীর অধীনে জমি ভোগ বা চাষ করা কৃষক/ভূমি-ভোগকারীকে বোঝানো হতো। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জমিদারি ব্যবস্থায় রায়ত বা প্রজাদের জমি ভোগের অধিকার, খাজনা প্রদান এবং জমিদারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ভূমি-ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎস: বাংলাপিডিয়া
  2. মিরাশদার: সিলেটের ঐতিহাসিক ভূমি-ব্যবস্থায় “মিরাশদার” ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিস্বত্বভোগী বা মধ্যবর্তী ভূমি-অধিকারী শ্রেণি। ব্রিটিশ আমলের সিলেটের ভূমি-ব্যবস্থা সম্পর্কিত সরকারি নথিতে বড় অস্থায়ী বন্দোবস্তের জমি প্রকৃত চাষি বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে ইজারা দেওয়া হতো এবং সেই মধ্যস্বত্বভোগীকে “Mirasdar” বলা হতো। উৎস: Assam Directorate of Land Records
  3. বিঘা: “বিঘা” দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী ভূমি পরিমাপের একক। বাংলাদেশে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী ১ বিঘা = ২০ কাঠা = ৩৩ শতাংশ (শতক) = ১৪,৪০০ বর্গফুট। তবে অঞ্চলভেদে ঐতিহাসিকভাবে ভূমি পরিমাপের এককে পার্থক্য থাকতে পারে। উৎস: বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয়
  4. তোষা শিন্নি: তোষা শিন্নি সিলেট অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী ময়দার হালুয়া, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মিলাদ বা দোয়া-মাহফিলে তবারক হিসেবে পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত। উৎস: উইকিপিডিয়া
  5. লাঠিয়াল: “লাঠিয়াল” বলতে ঐতিহাসিক বাংলার গ্রামীণ সমাজে লাঠি ব্যবহারে দক্ষ এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হতো, যারা অনেক সময় জমিদার ও ভূস্বামীদের পক্ষে বিরোধ মীমাংসা, জমি রক্ষা বা প্রজাদের নিয়ন্ত্রণের কাজে নিযুক্ত থাকত। ব্রিটিশ-পূর্ব ও ব্রিটিশ আমলে লাঠিয়ালরা বাংলার গ্রামীণ সামাজিক কাঠামোর একটি পরিচিত গোষ্ঠী ছিল। উৎস: বাংলাপিডিয়া

Leave a ReplyCancel reply

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading