রক্তের টান কি কখনো ভাষা বা সীমানার সীমাবদ্ধতা মানে? এক ইংরেজ যুবক, যার মুখে বাংলা নেই, মনে শুধু একটাই ঠিকানা — তার বাবার গ্রাম। শেকড়ের সন্ধানে এক অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প “শিকড়”।
শিকড় — গল্পের সারসংক্ষেপ
এক গভীর রাতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক গ্রামে এসে হাজির হয় ইংল্যান্ডের এক যুবক, জন এলি। তার বাবা মৃত্যুশয্যায় জানিয়েছিলেন, তার আসল বাড়ি এই গ্রামে, আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী “sorton”-কে খুঁজে বের করে তার জন্য জমানো টাকা দিতে বলেছিলেন। গ্রামের এক শিক্ষিত বাসিন্দার সহায়তায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় সত্য — জন আসলে বহু বছর আগে লন্ডনে পাড়ি জমানো রজব আলীর ছেলে, আর “sorton” তার সেই সময়ের স্ত্রী সুরতুন বিবি। শেষে ছবি আর প্রমাণের মাধ্যমে ঘটে এক আবেগঘন পুনর্মিলন, যেখানে ভাষা আর সংস্কৃতির ব্যবধান মুছে গিয়ে প্রকাশ পায় রক্তের গভীর বন্ধন।

কাকভোরে ঘুম ভাঙলো – হাসি মশকরার হল্লায়। দরজায় কড়া নাড়ছে পাড়ার যুব-কিশোরেরা। চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এলাম। তারা আমার কাছে এসেছে এক সাহেব ছোকরা নিয়ে – যার কোনও কথা তারা বুঝতে পারছে না ।
৬০ দশকের হিপ্পি মার্কা এক ইংরেজ যুবক আর আমার গাঁয়ের ছোকরাগুলো ঠাসাঠাসি করে বসল আমার ছোট্ট ড্রয়িংরুমে। অসময়ে ঘুম ভাঙায় আমি বিরক্ত। জানতে চাইলাম, কী বৃত্তান্ত ।
গাঁয়ের ছেলেরা বলল, গভীর রাতে এই ভবঘুরেটা গাঁয়ের ছোট্ট বাজারে এসেছে, তার কথা কেউ বোঝে না। মাই ভিল মাই ভিল করে। রাতে মসজিদের বারান্দায় ছিল। এখন আপনি বুঝুন। আপনিই তো আমাদের একমাত্র ইংরেজিওয়ালা ।
৮২ সালে গোঁফ, দাড়ি, ছিন্ন বস্ত্রধারী, ৬০ দশকে দেখা হিপ্পিদের মতো ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম? কী চাই এখানে?
নাম বুঝলাম, জন এলি । বাকিটুকু তার উচ্চারণ শুনে বোঝার কোনও উপায় নেই । কাগজ বাড়িয়ে দিলাম কলমসহ । লিখে তার কথা জানাতে বললাম। লিখলো, I am John Alley from UK. This is my father’s village, my village.
আমি তার বাপের নাম চাইতে জানালো Mr. Ralley. আমার তাড়া ছিল। ছেলেদেরকে বিষয়টা বোঝালাম – তারা বলল, রাল্লি বা রল্লি নামে এই গ্রামে কোনও কালে কেউ ছিল না। আমি তাদেরকে বিদায় দিলাম এই বলে যে ছেলেটি এখানে থাকুক রেস্ট করুক। আমি অফিস করে এসে রাতে গ্রামবাসীকে নিয়ে জিনিসটা বোঝার চেষ্টা করব। ও বলা বলা হয়নি– আমি ওই গ্রামের নতুন বাসিন্দা. চাকরি করতে এসে নিজের অসচ্ছলতার জন্য নিভৃত পল্লিগ্রামে বসতি গেড়েছিলাম।
সারাদিন অফিসে বসে ছটফট করলাম। বিষয়টা কী হতে পারে ভেবে। বিকেলে ছেলেটার সঙ্গে একান্তে আলাপ করলাম। Ralley, তাঁর বাবা ব্রিটেনে গিয়েছিলেন লেবার ভিসায়। সেখানে তিনি ক্লারাকে (তার মা) বিয়ে করেন। তার জন্মের পর ক্লারা বুঝতে পারে জনের বাবা পূর্বেই বিবাহিত এবং তার অজান্তে তিনি দেশের বউকে টাকা পাঠান। ঝগড়া হয় তাদের আর ক্লারা, জনকে নিয়ে বিদেয় হন। জন বহু বছর তার বাপকে জানতো না। মা-ও অন্য একজনকে বিয়ে করেছিল। কয়েক মাস আগে হাসপাতাল থেকে তার বাবা তার খোঁজ বের করে সেখানে ডেকে নেন। বস্তুত সেটি তার ডেথ বেড ছিলো.
সেখানেই তিনি ছেলেকে জানান বাংলাদেশে তার বাড়ি, গ্রাম শ্যামলি, এবং সিলেট। তার বউ sorton এবং আরও কিছু কথা যা মরণযাত্রী বোঝাতে পারেননি। জনকে তিনি বলেছেন— সে যেন মুসলমান থাকে আর সম্ভব হলে sorton কে দেখে যায়। তিনি তার স্থাবর কিছু সম্পদ মুখে মুখে ছেলেকে দেন আর জমানো টাকা sorton কে দেন ।
পক্ষে কোনও কাগজপত্র নেই। আমি বিষয়টি নিয়ে গুরুতর প্যাচের মধ্যে পড়ি। কারণ, কোনও বক্তব্যের রাতে গ্রামবাসীর বৈঠক বসে। বিতণ্ডা আর মশকরা, যা এসব বৈঠকের বৈশিষ্ট্য ছিল— চলছেই। গ্রামের প্রবীণতম মজমল আলী সে বৈঠকে ছিলেন। নিশ্চুপ শুনছিলেন আর ভ্যাবাচ্যাকা ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে দেখছিলেন বার বার। হঠাৎ করেই তিনি বললেন, এই গেরামের একজনই তো লন্ডন গেছিল রজব আলী। হে তো কত্তকাল আগে। তার বউ একটা তো কয় বছর তাগো ভিটায় থিক্যা দবির আলীর যন্ত্রণায় ভিটা ছাইড়া গেল । আর তো কোনও পুরান লন্ডনি জানি না।
আমি চমকে উঠলাম । Ralley-ই Rojob Ali নাতো!
জিজ্ঞেস কলাম। রজব আলীর বউকে পাওয়া যাবে কি না। দবির আলীর ছেলে কবির আলী বলল, চাচি পাশের গেরামে তার ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন। সকালবেলায় তানেরে আনন যাইবো।
রাত হয়েছিল। সভা ভাঙলো। ছেলেটিকে নিয়ে বাসায় এলাম । আলাপ করে জানলাম সে sorton এর জন্য ৩০,০০০ পাউন্ড নিয়ে এসেছে। তার বাপ নাকি বলেছিলেন, sorton কে না-পেলে টাকাটা গ্রামের মসজিদে দিয়ে দিতে। পরদিন আল্লাহর ফজরে রজব আলীর বউ এলেন। তাকে তার স্বামীর কথা বললে, তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, চোখ মুছলেন; তারপর যে বয়ান দিলেন এর সারমর্ম – রজব আলী লন্ডন গিয়ে ৩/৪ বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন। সেখানে তিনি বিয়ে করেছিলেন, তার একটা ছেলে হয়েছিল – নাম রেখেছিলেন জাহান আলী । তিনি তারে জান ডাকতেন। আমি মনে মনে আওড়াই ইউরেকা! আর তাকে তার নাম বলতে বলি – তিনি বুড়ো মানুষ আড়ষ্ট হন তবে বলেন আমার নাম সুরতুন বিবি।
আর কী চাই!
রজব আলী Ralley, জাহান আলী, John Alley হয়ে বাংলা আর কুকনির জট পাকিয়ে দিয়েছেন।
তবু সুরতুন বিবিকে বলি, আপনার কাছে কি আপনার স্বামীর কোনও ছবি বা চিঠি আছে? তিনি বলেন, ফটু তো আছে। পাসপুট করার সময় তোলা ফটু তো আমারে দিছিলেন। তিনি তার ভাইপোকে পাঠালেন তার বেতের ঝাঁপি আনতে।
ছেলেটি খুব দৌড়ালো আর এলো অনুমিত সময়ের আগে।
রজব আলীর যৌবনের ছবি পাসপোর্টের। ছবি আমি জনকে দিলাম। ড্যাড, মাই ড্যাড বলে সে কাঁদলো। মুখে বুকে চাপলো ।
আমি জনকে বললাম, তোমার মা, ক্লারা কী তোমার সঙ্গে থাকেন। সে বলল, No. She is no more। আর বেঁচে থাকলেও আমাদের দেশে বুড়ো মা-বাবারা আমাদের সঙ্গে থাকে না ।
আমি বলি, তোমার sorton কে পাওয়া গেছে। ইনিই sorton, তড়াক করে সে দাঁড়ালো, বুড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আমি সুরতুন বিবিকে বললাম, এইটা জান আলী আপনার স্বামীর ছেলে ।
কথা শেষ করতে পারিনি। দেখলাম, বাবারে, জানরে বলে বুড়ি জড়িয়ে আছেন জনকে। আর জন Mom, mom, my mother বলে বুড়ির বুকে মাথা খুঁড়ছে আনন্দ দেখলাম, মিলন দেখলাম। দেখলাম এক বাঙালির সাদা ছেলে স্নেহবশে আদি অকৃত্রিম বাঙালি হয়ে গেল মুহূর্তে।
গল্প থেকে শিক্ষা
“শিকড়” গল্পটি আমাদের শেখায়, মানুষের পরিচয় ও শেকড়ের টান কখনো মুছে যায় না, তা যত দূরেই থাকুক বা যত প্রজন্ম পেরিয়ে যাক না কেন। জন এলি ভাষা না বুঝেও, সংস্কৃতি না জেনেও, শুধু নিজের বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণের তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিল অচেনা এক দেশে — এটাই প্রমাণ করে শেকড়ের টান কতটা শক্তিশালী।
গল্পটি আরও দেখায়, প্রবাসজীবনে অনেক মানুষই দেশে ফেলে আসা সম্পর্ক ও দায়িত্বের কথা ভুলে যান না, বরং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেন। রজব আলীর শেষ ইচ্ছা তারই একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ।
এছাড়া, গল্পটি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে — গ্রামের প্রবীণ মানুষদের স্মৃতি ও জ্ঞান কতটা মূল্যবান হতে পারে। মজমল আলীর মতো একজন বৃদ্ধের স্মরণশক্তিই শেষ পর্যন্ত পুরো রহস্যের সমাধান করে দেয়, যা আমাদের প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।
সবশেষে, “শিকড়” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — রক্তের সম্পর্ক, ভাষা বা জাতীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্তর্নিহিত বন্ধন তৈরি করে, যা কখনো সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয় না।
শেষ কথা
“শিকড়” আমাদের এক অনন্য সত্যের সামনে দাঁড় করায় — মানুষ যতই দূরে ছড়িয়ে পড়ুক, তার শেকড়ের টান কখনো হারায় না। জন ও সুরতুন বিবির এই আবেগঘন পুনর্মিলন পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও হৃদয়স্পর্শী গল্প পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।