মিস্টার টমি — এক প্রাণবন্ত গল্পবাজ মানুষের স্মৃতিকথা

যে মানুষটি প্রতিটি গল্পেই বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যেতেন, তাঁর জীবনের শেষ কথাগুলো ছিল সবচেয়ে সত্য আর গভীর। “মিস্টার টমি” — এক অতিরঞ্জিত গল্পবাজ, অথচ হৃদয়ে মাতৃভক্তি আর বিশ্বাসে পরিপূর্ণ এক মানুষের স্মৃতিকথা।

মিস্টার টমি — কে ছিলেন এই মানুষটি

📖 এক নজরে

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আজহার সাহেব, পরিবারে যাকে সবাই আড়ালে “মিস্টার টমি” ডাকতেন, ছিলেন সংসারে অকর্মণ্য কিন্তু গল্প বলায় অসাধারণ এক মানুষ। তাঁর প্রতিটি গল্পই বাস্তবতার সীমানা ছাড়িয়ে যেত — মৃত মানুষ জীবিত হওয়া থেকে শুরু করে পরিচিত সবাইকে অতিমানবিক গুণের অধিকারী বানিয়ে ফেলা। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলোয় তাঁর কথায় ফুটে ওঠে গভীর মাতৃভক্তি আর বিশ্বাসের এক অন্যরকম দিক, যা তাঁকে চিরকালের জন্য স্মরণীয় করে রাখে।

এটি কোনও গল্প নয়। একজন শৌখিন মানুষের কথা। শিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় চাকরি করেছেন কিন্তু ঢাকার পোলা হিসেবে একটা গরিমা তার চলনে বলনে ছিল। ভীষণ গল্পবাজ মানুষ। অবলীলায় যে কোনও অঞ্চলের কেচ্ছাকাহিনি শুনিয়ে পাশের মানুষকে মুগ্ধ করতে ওস্তাদ।

তিন সন্তানের সংসার তার। পরিবারে আন্টির ষোলোআনা কর্তৃত্ব। টমি নামে পরিবারপ্রধান, কাজেকর্মে অচলমুদ্রা। এর কারণও আছে। টাকা গুনে নেওয়ার গুণও তার নেই। বাজার করতে দিলে সর্বনাশ। ১০ আইটেম আনতে দিলে বিশাল একটা ঝুড়িতে একটা আইটেমই আনবেন বাকিগুলোর টাকাও থাকবে না।

চুরুট ফুঁকা ছাড়া মানুষটি আর কিছু পারেন, তা বলা যাবে না। তার বড়ো ছেলে, যে আমার বন্ধু, সে এবং বাকি দুই ভাইবোন আড়ালে তাকে মিস্টার টমিই বলে। আন্টি তো টমি তু কাঁহা ছাড়া আর কিছু কখনও বলেছেন মনেই হয় না!

টমি মহাসুখী একজন মানুষ। ভাত, রুটি, চা তার খেতে হয় বলে খান বা খেতে বসেন। তার মূল খাদ্য কিন্তু সিগার। গাড়ি একটা আছে সেটি ছেলেরা না নিয়ে গিয়ে থাকলে তিনি কালেভদ্রে নিয়ে বের হন। চোখে অপারেশন ছিল— দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। দেখেন খুব কম। তিনি তা স্বীকার করেন না। তবে গাড়ি চালান প্রায় রিকশার গতিতে। এ থেকে বোঝা যায় তিনি তার দৃষ্টিশক্তির ব্যাপারে ভেতরে ভেতরে সজাগ আছেন।

শেরেবাংলা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনও নেতা বাংলায় কখনও জন্মাননি আর জন্মাবেন না এটি তার সিদ্ধান্ত – এটি এখন ধর্মবিশ্বাসের মতো।

সুতরাং চলমান রাজনীতি তাঁর কাছে ব্রাহ্মণের কাছে গো-মাংসের মতো বিষয়। অতএব টমির কাছে রাজনৈতিক আলাপ চার মাজহাবের হারামের মতো একটা বিষয়[২]। তবে হ্যাঁ, রাজনীতির আলাপ হতেই পারে যদি তা ৩০-এর দশকে যুক্তবাংলার নেতা এ কে ফজলুল হক সম্পৃক্ত হয়[১]

সাহিত্যে তিনি যাযাবর পর্যন্ত, ধর্মে পুরোনো ঢাকার পুরোনো পীর ওলি আর দুয়েক হিন্দু ব্রাহ্মণের মাহাত্ম বয়ানে অকুণ্ঠ।

টমির লিভিংরুমই মূলত তার জগৎ। গল্প করার মতো বন্ধুবান্ধব তার আছেন। না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। ছেলেদের বন্ধুগোষ্ঠী কিংবা তার বিশাল বাসার লন—যেখানে সারাদিন পাড়ার ছেলেমেয়েরা কোনও না- কোনও খেলার লোভে থাকেই – তাদের যে কারও সঙ্গে তিনি ঘণ্টা দুই গল্প করে কাটাতে পারেন। কোনও ছেলেমেয়েকে ডেকে টমি যদি দীর্ঘ গল্প জোড়েন—শিশু, কিশোর বা যুবকযুবতী তা সে যে-বা যারাই হোক না কেন অসন্তুষ্ট হবে না নিশ্চিত । কারণ তিনি জাদুকর, গল্পের জাদুকর। কী গল্প তিনি করেন?

মিস্টার টমি চাচার গল্প
সিগার হাতে জমিয়ে গল্প বলছেন টমি চাচা, মুগ্ধ শ্রোতাদের ঘিরে

ধরা যাক সিলেটের একজন মৌলবি বা ইমামের কেরামতের কেচ্ছা তিনি বলছেন। দেখা যাবে সেই ইমাম তার সামনেই বিভিন্ন সময়ে তিনজন মুর্দা যুবককে জিন্দা করে দিয়েছেন। একজনকে বাঁচালেন গোসল দেওয়ার আগে। লোকে বলতে লাগল, ছেলেটি জীবিতই ছিল—ইমাম সাহেবের উপস্থিতিতে তার হুঁশ ফিরেছে। কিন্তু না, দ্বিতীয়টি ঘটেছে কাফন পরানোর পরে জানাজায় নিয়ে যাবার পর। কারণ মৌলবি সাহেব জানাজা পড়ানোর আগে দেখলেন বিধবা মা, ‘বাবারে সোনারে আমি কেমনে বাঁচিরে’ বলে মাটিতে গড়াগড়ি করছে। তিনি আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, মাওলা রহম করো। এটিকে ফিরিয়ে দিলে তোমার ক্ষতি কী। দেখা গেল কাফনের ভেতর মুর্দা নড়ছে।

আর তৃতীয়টি এক্কেবারে কবর থেকে। এগুলি তার দেখা ঘটনা ।

খুলনায় হরিণ শিকারে গিয়ে যে বাঘটি মেরেছিলেন তার বিস্তারিত বয়ান দিয়ে তিনি যখন সেটির চামড়া যে জমিদার ভিক্ষার মতো চেয়ে নেন তার প্রাসাদে একদিন নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত জানাবেন; তখন শ্রোতার পক্ষে বাসায় যেয়ে কাপড়চোপড় গোছাবার তাগিদ না-জেগে উপায় থাকবে না কোনও।

চট্টগ্রামে তাঁর এক হিন্দু বন্ধু যে দশ হাজার হালের বলদ এলাকার গরিব চাষিদের মধ্যে বিতরণ করল সে তো গো দানের পুণ্যের জন্য। অবশ্য টমিই শাস্ত্রের এ দিকটির প্রতি বন্ধুটির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তবে এই গল্পের করুণ দিক হলো সেই বন্ধুর বুড়ো বাপটি ছেলের এই পাগলামি সহ্য করতে না-পেরে আত্মহত্যা করে বসে। এরপর তিনি আর কাউকে অপরিমিত দান করে পিতৃহন্তা যাতে না হোন সে পরামর্শই দিয়ে থাকেন । টমির হাজারো গল্পের আরেকটি হলো বরিশালের এক গির্জার ফাদার তার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষিতে মুসলমান হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। তা তিনি যখন দেখলেন লোকটা তো ভেতরে ভেতরে মুসলমান হয়েই গেছে তখন গির্জায় থাকলেও সে মুসলমানের একত্ববাদই প্রচার করবে। তো থাক না ব্যাটা ফাদার গর্ডন হয়ে । তত্ত্বটি গর্ডন বুঝে যায় আর খ্রিস্টান থেকেও যায় ।

টমি চাচা আমার খুব প্রিয় ছিলেন। কারণ তিনি তার পরিচিত মানুষকে অসম্ভব সম্মানের উচ্চতায় তুলে ধরতেন। তার পরিচিত সকল মানুষ, জমিদার, লাখপতি, প্রতিভায় প্রায় রবীন্দ্রনাথ, দানে হাজী মহসীন[৩], জ্ঞানে শহীদুল্লাহ, ক্রীড়ায় জাদুকর সমাদ আর যুবা কিশোর হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির প্রথম হওয়া বা হতে যাওয়া ছাত্র ।

টমি যাদেরকে ভালো বলেছেন, তারা সবাই ফিরিশতাতুল্য, মন্দরাও রবিনহুড এবং দুচারটা ডাকাত সকলেই হাজারটার বেশি খুনের গৌরবধারী ছিল!

অশীতিপর টমি, স্ত্রীকে ছেলেমেয়েকে ঘন ঘন বলতে লাগলেন যার যার বিষয়-আশয় সমঝে নাও। আমি আর তোমাদের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছি না।

আন্টি নিয়মমাফিক ঝাড়ি লাগালেন। এই সা মাত করো টমি ! টমি থেমে গেলেন কিন্তু পুরোনো ঢাকার পৈতৃক মহল্লায় গেলেন। কয়েকজনকে নিয়ে তার কবরের জায়গা দেখালেন। পারিবারিক ইমাম সাহেবের নাতি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলোসফি পড়ে তাকে ডেকে আনলেন— তার বাপ-দাদা যে বিভিন্ন বুজুর্গের ওয়াস্তে যুক্ত দোয়া করতেন সেটি জানে কি না জিজ্ঞেস করলেন। সে জানে না বললে তিনি খুব আফসোস করলেন এবং ইমাম সাহেবকে তার জানাজা পড়ানোর অনুরোধ করে ধানমণ্ডির বাসায় ফিরে এলেন।

শান্তিপূর্ণ কবরস্থানের দৃশ্য - মিস্টার টমি গল্প
পুরোনো ঢাকার মহল্লায় নিজের কবরের জায়গা নিজেই দেখিয়েছিলেন টমি চাচা। ছবি প্রতিকী। 

বড়ো ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, কী বার সেদিন। আঙুলে গুনে বললেন, এখনও চারদিন!

কী চারদিন আব্বু? ছেলের প্রশ্ন। শুক্রবারে জুমার আগে দাফন করলে কবর আজাব হয় না জানো?[৪]

না তো?

ঠিক আছে জানার দরকার নাই তোমার।

একটু বসো, বললেন ছেলেকে।

খুব স্থির ধীর কণ্ঠে বললেন, তোমার মাকে দেখো বাবা! জানো তো মার পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত![৫] আমার তো সংসার বুদ্ধি ছিল না কোনও কালে। তোমার মা-ই এই সংসার সম্পদ গড়েছেন, তোমাদের প্রতিপালন করেছেন। আমার কথাটা মনে রেখো। এখন তুমি যাও।

বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি অসুস্থ হলেন – শ্বাসকষ্ট। এশার আজান পড়ছে, তিনি আজান হচ্ছে বলে বিদায় নিলেন।

যুগের সর্বাপেক্ষা বড়ো মিথ্যাবাদীর জন্য সারা মহল্লায় যে দুঃখের মাতম শুরু হলো, তা কেউ কখনও দেখেনি। ছেলে বুড়া সকলের কথা, আজহার সাহেবের মতো ভালো মানুষ তারা আর পাবেন না। একজন বললেন,

ইনি মরেননিরে ভাই, আড়াল হয়েছেন মাত্র।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রাজিউন।

গল্প থেকে শিক্ষা

“মিস্টার টমি” আমাদের এক অনন্য শিক্ষা দেয় — মানুষের বাহ্যিক খামখেয়ালিপনা বা অতিরঞ্জিত স্বভাবের আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে গভীর মূল্যবোধ আর ভালোবাসা। টমি চাচা তাঁর জীবনভর গল্পে বাস্তবতাকে বাড়িয়ে বলতেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর সন্তানকে যে কথাটি বলেছিলেন — মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার কথা — তা ছিল সম্পূর্ণ আন্তরিক ও সত্য।

গল্পটি আরও শেখায়, মানুষকে তার সব ত্রুটিসহ ভালোবাসা যায়। টমি চাচার সাংসারিক অক্ষমতা নিয়ে পরিবার হয়তো হতাশ হতো, কিন্তু তাঁর গল্প বলার প্রতিভা আর মানুষকে সম্মান দেওয়ার স্বভাব তাঁকে সবার প্রিয় করে তুলেছিল।

মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর সচেতনতা — নিজের কবরের জায়গা দেখা, জানাজার ব্যবস্থা করা, সন্তানকে মায়ের মর্যাদার কথা মনে করিয়ে দেওয়া — আমাদের শেখায় জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেও একজন মানুষ কতটা স্পষ্টভাবে নিজের দায়িত্ব ও বিশ্বাস নিয়ে ভাবতে পারেন।

সবশেষে, “মিস্টার টমি” আমাদের মনে করিয়ে দেয় — একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় বোঝা যায় তার শেষ কথাগুলোতে, যেখানে সব অতিরঞ্জন সরে গিয়ে থেকে যায় শুধু সত্যিকারের ভালোবাসা আর বিশ্বাস।

শেষ কথা

“মিস্টার টমি” আমাদের শেখায়, জীবনের রঙিন গল্পগুলোর আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে এক গভীর, সত্যিকারের মানুষ। টমি চাচার স্মৃতি পাঠকের মনে হাসি আর একইসাথে গভীর এক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তুলবে বলে আশা করি। কালাম আজাদের কলমে লেখা এমন আরও হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিকথা পড়তে উপরের নেভিগেশন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

তথ্যসূত্র

  1. এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩–১৯৬২) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার Chief Minister; ১৯৩৭ সালে তিনি Bengal-এর Chief Minister হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। Banglapedia — Huq, AK Fazlul
  2. “চার মাজহাব” বলতে সুন্নি ইসলামের চার প্রধান ফিকহি মাযহাব—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—বোঝায়। UiTM Institutional Repository — Understanding the methodologies of the four Sunni mazhabs
  3. হাজী মুহম্মদ মহসীন (১৭৩২–১৮১২) ছিলেন একজন বিশিষ্ট জনহিতৈষী। ১৭৬৯–৭০ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি লঙ্গরখানা স্থাপন ও সরকারি সাহায্য তহবিলে অর্থ দান করেছিলেন; পরবর্তীতে তাঁর সম্পত্তির বড় অংশ দাতব্য ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য ওয়াক্‌ফ করেন। Banglapedia — মোহসীন, হাজী মুহম্মদ
  4. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির কবরের পরীক্ষার/শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়ে Jami‘ at-Tirmidhi 1074-এ একটি বর্ণনা রয়েছে। একই জায়গায় ইমাম তিরমিজি সনদটি সংযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাই গল্পের টমির বক্তব্যকে এখানে ধর্মীয়ভাবে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। Sunnah.com — Jami‘ at-Tirmidhi 1074
  5. মায়ের প্রতি সদাচরণ ও সেবার গুরুত্ব বোঝাতে Sunan an-Nasa’i 3104-এ নবী (সা.) এক ব্যক্তিকে তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “Paradise is beneath her feet.” Sunnah.com — Sunan an-Nasa’i 3104

Leave a Reply