আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪৪তম সূত্রটি পড়ুন।
সবাইকে একসাথে বোঝাতে গিয়ে কাজ হয়নি? কারণ আঁটির বাঁধন একসাথে ভাঙা যায় না — বাঁধন খুলে দিন, একটি একটি করে। হিশাম বিন আমর কীভাবে একে একে আরও চারজনকে রাজি করিয়ে বনু হাশিমের বছরের পর বছরের বয়কট ভেঙে দিয়েছিলেন—জানুন সেই অসাধারণ কৌশল।
দলগত উপদেশ কেন কাজ করে না?
ভুল যদি সমষ্টিগতভাবে কয়েকজন মিলে করে তখন তাদের সবাইকে একত্রে উপদেশ দেয়াই নিয়ম। কিন্তু কখনো কখনো আপনাকে আঁটির বাঁধন খুলে ফেলতে হবে। অর্থাৎ, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলতে হবে এবং প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবেই উপদেশ দিতে হবে।
তাহলে সঠিক পদ্ধতি কী? উত্তর হলো — আঁটির বাঁধন খুলে ফেলুন। প্রত্যেককে আলাদাভাবে বোঝান।
আঁটির বাঁধন খুলে ফেলুন — আলাদাভাবে বোঝান
সবাইকে একসাথে ডেকে উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু কার্যকর নয়। কারণ দলের মধ্যে মানুষ নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায় — সহজে মাথা নোয়ায় না। কিন্তু যখন একান্তে তার সাথে কথা বলবেন, তখন সে নিজেকে রক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে না। তখন আপনার কথা সরাসরি তার হৃদয়ে পৌঁছায়। দুটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা আরও স্পষ্ট করা যাক।
ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলানোর উদাহরণ

মনে করুন, বাড়িতে আপনি ছোট ভাইয়ের রুমের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। ভেতর থেকে ছোট ভাইয়ের কণ্ঠ শুনতে পেলেন। সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে। তারা সবাই মিলে কোনো একটি দেশে ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু যে দেশে যাওয়ার প্ল্যান তারা করছে সে দেশের পরিবেশ এতো অশ্লীল যে, সেখানে গিয়ে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন ব্যাপার।
আপনি চাচ্ছিেন তারা যেন ও দেশে না যায়। আপনি তাদেরকে এ ব্যাপারে উপদেশ দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু কিভাবে তাদেরকে এ উপদেশ দেবেন? কিভাবে উপদেশ দিলে তাদের মনে রেখাপাত করবে?
একটি পদ্ধতি তো হলো, আপনি তাদের কাছে গিয়ে কিছু নীতিকথা বলে ফিরে এলেন। কিন্তু আসল কথা হলো, সাধারণত এ পদ্ধতি কার্যকর ও সফল হয় না। এর পরিবর্তে আপনি যদি আঁটির বাঁধন খুলে প্রত্যেকটি লাঠি আলাদা আলাদাভাবে ভেঙ্গে ফেলেন তাহলে কেমন হয়? একটু চেষ্টা করে দেখুন।
পরামর্শ শেষে তারা সবাই যখন আলাদা হয়ে যাবে, তখন আপনার দৃষ্টিতে তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বিচক্ষণ তাকে ডেকে নিয়ে একান্তে বসুন। তাকে বলুন, ‘জানতে পারলাম তোমরা নাকি অতিসত্বর ভ্রমণে যাচ্ছ। কোনো, আমি মনে করি তুমি তোমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। তুমি নিশ্চয় জানো, তোমরা যে দেশে যেতে চাচ্ছ, সেখানে সফরে অধিকাংশ পর্যটক বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি ও অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। অনেকে সেখান থেকে বিভিন্ন জটিল রোগের ভাইরাস বহন করে নিয়ে আসে।
‘তুমি কি তাদের সৎকর্মের সাওয়াবের অংশীদার হতে চাও না? তুমি কি তাদেরকে গোনাহ থেকে বাঁচাতে চাও না? তাদের পরামর্শ দাও, তারা যেন অন্য কোনো দেশ ভ্রমণ করে, যেখানে তোমরা নদী ও সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে, বিনোদন ও আনন্দ করতে পারবে। কিন্তু কোনো প্রকার অন্যায় ও গোনাহের কাজ করতে হবে না।’
আপনি যখন এভাবে সুন্দরভাবে পরামর্শ দেবেন, নিঃসন্দেহে আলোচিত সে দেশটিতে ভ্রমণের প্রতি তার আগ্রহ অর্ধেক কমে যাবে।
এবার আপনি আরেকজনকে ডাকুন। ঠিক তাকেও এভাবে বলুন। এরপর তৃতীয়জনের কাছে যান, তাকেও একই কথা বলুন। তবে খেয়াল রাখবেন, তাদের কেউ যেন বুঝতে না পারে যে, আপনি অন্য কাউকে একই কথা বলেছেন।
পরবর্তীতে তারা যখন সমবেত হবে, তখন তাদের কেউ ভ্রমণের গন্তব্যস্থল পরিবর্তনের কথা উঠালে সঙ্গে সঙ্গে তার পক্ষে আরেকজনকে পেয়ে যাবে। এভাবে আপনি সূচনার আগেই একটি মন্দ কাজের কবর রচনা করতে পারেন।
আরও পড়ুন: ভুল স্বীকার করে নিন — সুখী জীবনের ৪২তম সূত্র
অশ্লীল ভিডিও দেখার অভ্যাস বদলানোর উদাহরণ
আরেকটি দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করুন। মনে করুন, একদিন আপনি জানতে পারলেন, আপনার সন্তানেরা তাদের একজনের কক্ষে একত্রিত হয়ে অশ্লীল ভিডিও বা অশ্লীল কোনো সিনেমা দেখে। এক্ষেত্রেও প্রত্যেককে আলাদা আলাদাভাবে বোঝানো উচিত। সবাইকে একসাথে বোঝাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে, তারা জেদ করে অন্যায়ের ওপর অটল হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ভুল সংশোধন করার সঠিক পদ্ধতি — সুখী জীবনের ৪৩তম সূত্র
ইসলামের ইতিহাসে এই কৌশলের অসাধারণ প্রয়োগ
ইসলামের ইতিহাসে এই কৌশলের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রয়োগ
ঘটেছিল বনু হাশিমের বয়কটের সময়। একজন সাহসী মানুষ
কীভাবে একে একে আরও চারজনকে রাজি করিয়ে বছরের পর বছরের
নির্মম বয়কট ভেঙে দিয়েছিলেন—সেই ঘটনা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।
বনু হাশিমের বয়কট ও হিশাম বিন আমরের কৌশল

আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, ইসলামের ইতিহাসে কি এমন আচরণের কোনো নিদর্শন আছে?
হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।
মহানবী (সা:) ও মুসলমানদের সাথে কোরাইশ কাফেরদের শত্রুতা, নিপীড়ন ও বিরোধ যখন চরমে পৌঁছল, তখন তারা সবাই মিলে মহানবী (সা:) ও বনু হাশিমের অন্তর্ভুক্ত মহানবী (সা:)-এর সকল নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বয়কট করলো । তাদের পক্ষ থেকে এ মর্মে একটি ঘোষণাপত্র লেখা হলো যে, ‘বনু হাশিমের কাছ থেকে কোনো কিছু কেনা যাবে না, তাদের কাছে কোনো কিছু বিক্রি করাও যাবে না। আমাদের কোনো নারীকে তাদের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হবে না এবং আমাদেরও কেউ তাদের কোনো নারীকে বিয়ে করতে পারবে না।’[১]
ফল-ফসলহীন দুর্গম একটি উপত্যাকায় মহানবী (সা:) ও তার সাহাবিদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হলো। খাদ্যের অভাব এমন চরমে পৌঁছল যে, সাহাবিরা একপর্যায়ে গাছের পাতা খেতে বাধ্য হলেন।
অবস্থা এত করুণ হলো যে, একদিন জনৈক সাহাবি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে বের হলে হঠাৎ পায়ের নীচে খসখস আওয়াজ শুনতে পেলেন। তাকিয়ে দেখেন, এক টুকরো উটের চামড়া। তিনি চামড়াটুকু তুলে নিলেন এবং ভালোভাবে ধুয়ে আগুনে পোড়ালেন ৷ এরপর তা টুকরো টুকরো করে পানিতে মেশালেন। তিনদিন তিনি এগুলো খেয়েই কাটিয়েছিলেন![৩]
এভাবে চরম কষ্টের মাঝে অবরুদ্ধ অবস্থায় বনু হাশিম ও মুসলমানদের প্রায় তিন বছর কেটে গেল। [২] একদিন মহানবী (সা:) তার চাচা আবূ তালিবকে বললেন, ‘চাচা! আল্লাহ তাআলা কোরাইশদের ঘোষণাপত্রে উইপোকা লাগিয়ে দিয়েছেন। তাতে আল্লাহর নাম ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই । জুলুম, সম্পর্কচ্ছেদ এবং মিথ্যা অপবাদ সব পোকায় খেয়ে ফেলেছে।’
উইপোকা কোরাইশদের সে চুক্তিনামাটি খেয়ে ফেলেছে। সেখানে ‘আপনার নামেই শুরু করছি হে আল্লাহ’ এ বাক্যটি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই! এ কথা শুনে আবূ তালিব অবাক হয়ে বললেন, ‘তোমার প্রতিপালক কি তোমাকে এ ব্যাপারে জানিয়েছেন?’
মহানবী (সা:)বললেন, ‘হ্যাঁ’ ।
আবূ তালিব বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমার কাছে কেউ আসার আগেই আমি কোরাইশদেরকে এ বিষয়ে জানাব।’
এরপর আবূ তালিব কোরাইশদের কাছে গিয়ে তাদের বললেন, ‘হে কোরাইশ সম্প্রদায়! আমার ভাতিজা তো আমাকে এ কথা বলেছে। সে যা বলেছে যদি তা সত্য হয়, তাহলে তোমরা আমাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ কর এবং আমাদেরকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দাও। আর যদি তার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে আমি আমার ভাতিজাকে তোমাদের হাতে সোপর্দ করব। তখন তোমরা যা খুশি তাই কর।’
কোরাইশ সম্প্রদায় বললো, ‘ঠিক আছে, তোমার কথায় আমরা রাজি আছি।’
সবাই মিলে যখন চুক্তিনামাটি দেখলো, তখন রাসূল (সা:)-এর কথা সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু কোরাইশরা অঙ্গীকার পূরণ তো করলই না; উপরন্তু তারা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার আরো বাড়িয়ে দিল। অবরুদ্ধ উপত্যাকায় দিন কাটতে লাগল বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব। ক্ষুধা- পিপাসায় তারা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপনীত হলো।
অবশ্য কোরাইশ কাফেরদের মধ্যে কিছু নরম দিলের মানুষও ছিল। তাদেরই একজন হলো হিশাম বিন আমর। গোত্রে তিনি একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাতের বেলা গোপনে বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের অবরুদ্ধ উপত্যকায় উটে করে খাবার নিয়ে যেতেন৷ [৪] উপত্যকার কাছাকাছি পৌঁছে তিনি উটের গলা থেকে রশি খুলে পেছন থেকে হাঁকাতে থাকতেন। একপর্যায়ে খাদ্যবাহী উট উপত্যকার ভেতরে চলে যেত।
এভাবে কেটে গেল বহুদিন। কিন্তু হিশাম আর কতদিন এভাবে এতো লোকের খাবারের ব্যবস্থা করবেন। তাই তিনি স্থির করলেন, যেভাবেই হোক এ নির্মম চুক্তিনামা ভঙ্গ করতে চেষ্টা শুরু করতেই হবে। কিন্তু পুরো কোরাইশ যেখানে একমত হয়ে আছে, সেখানে এমন কিছু করা তো সহজ কাজ নয়।
একে একে পাঁচজনকে রাজি করানোর ঘটনা
হিশাম কী করলেন? হিশাম আঁটির বাঁধন খুলে ফেলার পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। প্রথমে তিনি যুহাইর বিন আবি উমাইয়ার কাছে গেলেন। [৫] যুহাইর ছিল আবদুল মুত্তালিবের কন্যা আতিকার পুত্র। তিনি যুহাইরকে বললেন, ‘যুহাইর! তুমি যা খুশি তা পানাহার করছ, সুন্দর পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করছ, স্ত্রীর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাচ্ছ। অথচ তোমার মামাদের অবস্থা দেখ।
তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে। কেউ তাদের কাছে কোনো কিছু বিক্রি করছে না, তাদের কাছ থেকে কেউ কিছু কিনছে না। তাদের মেয়েদেরকে কেউ বিয়ে করছে না, আবার তাদের কাছে কেউ মেয়ে বিয়েও দিচ্ছে না। আমি তো শপথ করে বলতে পারি, তারা যদি আবূ জাহেলের মামাবংশীয় হতো, তাহলে আবূ জাহল তাদেরকে এভাবে বয়কট করে রাখত না। অথচ তুমি বনু হাশিমের ভাগ্নে। আমার বুঝে আসছে না তুমি এখনো কীভাবে বসে আছ?!’
যুহাইর বললো, “হিশাম! আমি একা কী করব? যদি আমার সঙ্গে আর কেউ থাকত, তাহলে চুক্তি প্রত্যাহারের ব্যাপারে আমি চেষ্টা করতাম।’
হিশাম: ‘তুমি তো একা নও । এ কাজে তোমার সঙ্গে আরেকজন আছে।’ যুহাইর : ‘কে সে?’
হিশাম: ‘আমি! আমি তোমার সঙ্গে আছি ।’
যুহাইর: ‘আচ্ছা দেখ তাহলে তৃতীয় কাউকে পাওয়া যায় কি-না?’
হিশাম: “ঠিক আছে। তবে এ মুহূর্তে আমার কথাটা গোপন রাখ ।’ এরপর হিশাম গেলেন মুতইম বিন আদীর কাছে । মুতইম ছিলেন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান লোক। হিশাম তাকে বললেন,‘মুতইম! বনু আবদে মানাফের দুটি শাখাগোত্র তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাবে, আর তুমি নীরবে তা দেখে যাবে?
মুতইম: ‘ভাই, আমি কী করতে পারব? আমি তো একা মানুষ।’
হিশাম: ‘তুমি একা কোথায়? এ কাজে তো তুমি আরেকজনকে তোমার সঙ্গে পাবে।’
মুতইম: ‘কে সে?’
হিশাম: ‘আমি, আছি তোমার সঙ্গে ।’
মুতইম: ‘তাহলে তৃতীয় কাউকে তালাশ কর ।’
হিশাম: ‘হ্যাঁ, তৃতীয়জনও আছে ।’
মুতইম: ‘কে সে?’
হিশাম: ‘যুহাইর বিন আবি উমাইয়া ।’
মুতইম: ‘আচ্ছা, তাহলে চতুর্থ আরেকজন খুঁজে বের কর ।’
হিশাম বললেন, “ঠিক আছে । তবে বিষয়টা একটু গোপন রাখ ।’
এরপর হিশাম গেলেন আবূল বুখতারী বিন হিশামের কাছে। হিশাম তার সাথে প্রথম দু’জনের মতো কথা বললো। একপর্যায়ে সে আগ্রহী হয়ে বললো, “আচ্ছা, আমাদেরকে সহযোগিতা করার মতো আর কেউ কি আছে?’
হিশাম বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে ৷’
‘কে সে ?’
হিশাম বললেন, ‘যুহাইর বিন আবি উমাইয়া, মুতইম বিন আদী। আর আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি।’
সে বললো, ‘আচ্ছা, তাহলে আরো কাউকে খুঁজে বের কর।’
এরপর হিশাম চলে গেলেন যামআহ বিন আসওয়াদের কাছে। তার সঙ্গে ও আগের মতো কথা বললেন এবং অবরুদ্ধদের সঙ্গে তার আত্মীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে এ পরিস্থিতিতে তার কর্তব্য পালনের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করলেন। যামআহ বললো, ‘তোমার এ আহ্বানের পক্ষে আর কেউ কি আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অমুক অমুক আছে।’
এভাবে সবাই এ বিষয়ে একমত হলেন এবং সবাই পরবর্তী কোনো এক রাতে মক্কার উপকণ্ঠে ‘হাতমুল হাজুন’ নামক স্থানে সমবেত হবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।
নির্ধারিত সময়ে সকলে সেখানে সমবেত হওয়ার পর এ মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন যে, উক্ত চুক্তিনামা ভঙ্গ করে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবকে মুক্ত না করা পর্যন্ত তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে যাবেন না।
যুহাইর বললো, “আমি প্রথমে এ চুক্তিনামার নির্মমতা নিয়ে কথা শুরু করব। তখন তোমরা সবাই একের পর এক আমাকে সমর্থন দিয়ে যাবে।
হিশামের কৌশলের মূলনীতি ছিল দুটি —
- প্রত্যেককে আত্মীয়তা বা দায়িত্ববোধ দিয়ে অনুপ্রাণিত করা
- প্রতিটি কথোপকথন গোপন রাখা — যেন কেউ না জানে অন্যকেও বলা হয়েছে
কাবা চত্বরে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ — বয়কট ভাঙলো

পরদিন খুব ভোরে তারা সবাই কাবা চত্বরে উপস্থিত হলেন। লোকজন অন্যান্য দিনের মতো লেনদেন ও অন্যান্য কাজকর্ম করতে লাগল। যুহাইর বিন আবি উমাইয়া একজোড়া নতুন পোশাক পরে সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ করলো। [৬] এরপর উপস্থিত লোকজনের কাছে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে বললো, ‘হে মক্কার অধিবাসীরা! আমরা কি পানাহার করছি না? পোশাক পরিধান করছি না? তাহলে বনু হাশেম আমাদের স্বগোত্রীয় হয়েও কেন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত? কেন তাদের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে? কেন তাদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে? আল্লাহর শপথ! আমি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, যতক্ষণ না ঐ নির্মম চুক্তিনামা ছিঁড়ে ফেলা হবে, ততক্ষণ আমি ক্ষান্ত হব না ৷’
আবূ জাহেল তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে কাছেই বসা ছিল। সে বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলে উঠল, ‘যুহাইর! তোমার কথা ঠিক নয়। এ চুক্তিনামা কিছুতেই ভঙ্গ হবে না।’
তৎক্ষণাৎ যামআহ বিন আসওয়াদ দাঁড়িয়ে আবূ জাহেলের প্রতিবাদ করে কঠোর ভাষায় বললো, ‘আবূ জাহেল! তোমার কথা ঠিক নয়। যখন ঐ চুক্তিনামা লেখা হয়েছিল তখনই আমরা তাতে রাজি ছিলাম না।’
আবূ জাহেল প্রতিবাদ করার জন্য যামআহ বিন আসওয়াদের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই আবূল বুখতারী দাঁড়িয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ, যামআহ ঠিকই বলেছে। আমরা এ চুক্তিনামায় রাজি ছিলাম না, আমরা এটাকে সমর্থনও করি না।’
আবূ জাহেল বুখতারীর দিকে তাকাল। ওদিক থেকে মুতইম বিন আদী বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমরা দু’জন ঠিকই বলেছ। এর বিপরীত যে বলছে, সে মিথ্যুক। আমরা এ চুক্তির দায় থেকে মুক্ত, এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
হিশাম বিন আমরও দাঁড়িয়ে একই কথা বললেন।
সবার ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে আবূ জাহেল থ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে থেকে সে স্বগতোক্তি করতে লাগল, ‘নিশ্চয় এটা পরিকল্পিত কাজ। রাতেই অন্য কোথাও এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করা হয়েছে।’
এরপর মুতইম বিন আদী চুক্তিনামাটা ছিঁড়ে ফেলতে [৭] কাবাঘরের কাছে গেল। কিন্তু আশ্চর্য! উইপোকা ‘তোমার নামেই হে আল্লাহ’ [৮] এ অংশটি ছাড়া সব খেয়ে শেষ করে ফেলেছে!
উপসংহার: মেধাবী হোন — কৌশলী হোন
অভিজ্ঞ ডাক্তার প্রথমেই ইঞ্জেকশন পুশ করেন না —
আগে সঠিক স্থান খোঁজেন। আপনিও তাই করুন।
সঠিক সময়ে, সঠিক মানুষের কাছে, সঠিক কথাটি বলুন।
কাউকে বোঝাতে চাইলে আগে পরিস্থিতি বুঝুন। আলাদাভাবে, কৌশলে, ভালোবাসার সাথে বোঝান। দলগত উপদেশে যা হয় না — একক কথোপকথনে তা হয়।
আপনার কাছের কেউ কি এমন কোনো ভুলে আটকে আছে যা দলগত উপদেশে বদলানো যাচ্ছে না? নিচে কমেন্টে জানান।
আপনার কাছের মানুষটিও কি এই কৌশল জানা দরকার? এই লেখাটি তার সাথে শেয়ার করুন।
এরপর পড়ুন: নিজেকে কষ্ট দেবেন না (coming soon)
আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে।
সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন — আমার বাংলা পোস্ট.কম।
অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪৪তম সূত্র হলো — বাঁধন খুলে দিন। 😊
তথ্যের উৎস ও আউটগোয়িং লিংক
[১] বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের বিবরণ। Seerah-এ বিস্তারিত দেখুন ↑
[২] বনু হাশিমের বয়কট প্রায় তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল; খাদ্যের সংকটে তারা গাছের পাতা ও পশুর চামড়া পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল। বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ দেখুন ↑
[৩] সীরাতের বর্ণনায় সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর দুর্ভিক্ষের সময় শুকনো উটের চামড়া ধুয়ে, পুড়িয়ে ও গুঁড়ো করে খাওয়ার ঘটনা উল্লেখ আছে। বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ দেখুন ↑
[৪] হিশাম বিন আমর গোপনে রাতের বেলা বনু হাশিমের কাছে খাবার পৌঁছে দিতেন। Seerah-এ ঘটনাটি দেখুন ↑
[৫] হিশাম বিন আমর প্রথমে যুহাইর বিন আবি উমাইয়্যার সঙ্গে কথা বলেন; এরপর মুতইম বিন আদী, আবুল-বখতারী ও জামআ বিন আল-আসওয়াদকে একে একে রাজি করান। এভাবে হিশামসহ মোট পাঁচজন বয়কট ভাঙার উদ্যোগ নেন। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ দেখুন ↑
[৬] বয়কট ভাঙার দিন যুহাইর বিন আবি উমাইয়্যা কাবা সাতবার তাওয়াফ করে প্রকাশ্যে বয়কটের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং দলিল ছিঁড়ে ফেলার দাবি জানান। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ দেখুন ↑
[৭] মুতইম বিন আদী দলিলটি ছিঁড়তে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, সেটি ইতিমধ্যে পোকায় খাওয়া; শুধু আল্লাহর নামের অংশটি অক্ষত ছিল। ঐতিহাসিক বিবরণ দেখুন ↑
[৮] সীরাতের বর্ণনায় বয়কটের দলিলটি উইপোকায় খেয়ে ফেলার ঘটনা এসেছে; আল্লাহর নামের অংশটি অক্ষত ছিল। সীরাতের বিস্তারিত বিবরণ দেখুন ↑