নিজেকে কষ্ট দেবেন না — সুখী জীবনের ৪৫তম সূত্র

আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪৫তম সূত্রটি পড়ুন।

কাপড়ে রং লেগেছে, গাড়ি কাদা ছিটিয়েছে, শিশু রুমাল ফেলে দিয়েছে — এসব নিয়ে চিৎকার করে নিজেকে কষ্ট দেবেন না । যা হওয়ার হয়ে গেছে — এটা মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মরুভূমিতে পেট্রোল-রান্নার মজার ঘটনা থেকে রাসূল (সাঃ)-এর ধৈর্যের শিক্ষা পর্যন্ত জানুন সুখী জীবনের অসাধারণ রহস্য।

ছোট ঘটনাকে বড় করবেন না

জীবনের পথে প্রতিদিন ছোট ছোট অনেক বিপত্তি আসে। কেউ অসাবধানে কিছু নষ্ট করে ফেলে, কেউ ভুল করে কষ্ট দেয়। এসব নিয়ে হইচই করলে সমস্যার সমাধান হয় না — বরং নিজের আনন্দই নষ্ট হয়। আমার নিজের জীবনের একটি মজার ঘটনা দিয়েই শুরু করি।

মরুভূমিতে পেট্রোল-রান্নার মজার ঘটনা

মরুভূমিতে বন্ধুদের সাথে ভ্রমণ — পেট্রোল রান্নার মজার ঘটনা
যা হয়ে গেছে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে আনন্দময় মুহূর্ত উপভোগ করুন। Photo by Deniz Özgür from Pexels.

আমার জীবনের স্মরণীয় একটি দিনের কথা। আমরা কয়েকজন বন্ধু একবার মরুভূমিতে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে আমার বন্ধু আবূ খালিদও ছিল। তার দৃষ্টিশক্তি ছিলো খুব দুর্বল। তাই বিভিন্ন কাজে আমরা তাকে সাহায্য করতাম। খাওয়ার সময় খেজুর, কফি ইত্যাদি তার হাতে তুলে দিতাম। সে বারবার নিষেধ করে বলতো, ‘আমিও তোমাদের সঙ্গে কাজ করবো। আমাকেও যে কোনো কাজ দিতে পারো।’ কিন্তু আমরা তাকে কোনো কাজ দিতাম না।

গন্তব্যস্থলে পৌঁছে আমরা একটি বকরি জবাই করলাম। গোশত কেটে টুকরো টুকরো করে একটি পাত্রে রাখলাম। এরপর আমরা তাঁবু টানানোসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল আপাতত অন্যান্য জরুরি কাজগুলো সেরে পরে পাক করবো। তাই গোশতগুলো ডেগচিতে ওভাবেই রেখে দেয়া হলো।

এদিকে আবূ খালিদ হঠাৎ খুব আগ্রহের সাথে পাতিলের কাছে গেলো। আহ, সে যদি না যেতো তাহলে ভালো হতো! সে পাতিলের কাছে গিয়ে দেখতে পেলো গোশতে এখনো পানিই দেয়া হয় নি। তাই গাড়িতে রাখা মালপত্রের কাছে এসে সে পানি খুঁজতে লাগলো। সেখানে জেনারেটর, বৈদ্যুতিক তার, টর্চ লাইট, পানি ও পেট্রোল ভর্তি চারটি বোতল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ছিলো। সে তার সবচেয়ে কাছের বোতলটি নিয়ে খুশিমনে গোশতের কাছে চলে এলো। তারপর বোতলের অর্ধেকটা পাত্রে ঢেলে দিলো।

তাকে একাণ্ড দেখে আমাদের একজন সাথি দূর থেকে চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘না! না! আবূ খালিদ! এটা ঢেলো না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আবূ খালিদ বোতল উজাড় তরে ঢালছিলো আর বলছিলো, ‘আমাকেও একটু কাজ করতে দাও! আমিও তোমাদের সাথে একটু কাজ করতে চাই।’

আমরা তাড়াতাড়ি তার হাত থেকে বোতলটি কেড়ে নিলাম৷ আবৃ খালেদের কাণ্ড দেখে কেউ হাসি থামাতে পারলো না। অনেকে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললো। কারণ বোতলটিতে পেট্রোল ছিল।

সেদিন আমরা দুপুরের খাবার শুধু রুটি আর চা দিয়েই শেষ করেছিলাম। এতো বড় একটি ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও আমাদের সেদিনের ভ্রমণটি কিন্তু খারাপ হয়নি; বরং আনন্দময় একটি ভ্রমণই হয়েছিল। অসতর্কতাবশত যা ঘটে গিয়েছিল তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে আমরা নিজেদের শান্তি ও আনন্দ নষ্ট করি নি। যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে।

তারিকের হাঁটুতে আঘাতের ঘটনা

আরেকটি ঘটনা। আমি তখন মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করি। আমরা সহপাঠীরা মিলে একবার ভ্রমণে বের হলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ আমাদের একটি গাড়ির ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে গেলো। ফলে গাড়িটির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তাই ইঞ্জিন স্টার্ট করার জন্য অন্য গাড়ি এনে নষ্ট গাড়িটির মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো। কারণ ভালো গাড়ির ব্যাটারি থেকে নষ্ট গাড়িটির ব্যাটারিতে তারের মাধ্যমে সংযোগ দিতে পারলে ইঞ্জিন চালু করা সম্ভব। আর একবার চালু হলে অনেকক্ষণ চলা যাবে।

তারিক এসে দুই গাড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে তার দিয়ে দুই গাড়ির ব্যাটারি সংযুক্ত করে একজনকে ইশারায় বললো, ‘ইঞ্জিন চালু করো।’ একজন ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। দুর্ভাগ্যবশত গাড়িটি তখন ফার্স্ট গিয়ারে ছিল। স্টার্ট দিতেই গাড়িটি লাফিয়ে উঠলো। বাম্পারের ধাক্কায় তারিক মাটিতে পড়ে হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা পেলো। তখন ড্রাইভিং সিটে বসা বন্ধু চিৎকার করে বললো, ‘আবার স্টার্ট দেবো?’

আমরা তাড়াতাড়ি গাড়ি দু’টিকে দুদিকে সরিয়ে রাখলাম। এরপর তারিককে দাঁড় করিয়ে হাঁটাতে চেষ্টা করলাম। হাঁটুতে খুব আঘাত লাগায় সে হাঁটতে পারছিলো না। তবে আশ্বর্যের বিষয় হলো, এতো ব্যথা পেয়েও সে চিৎকার তো দূরের কথা, কাউকে একটু বকাও দেয় নি। তিরস্কারমূলক কোনো শব্দও সে উচ্চারণ করেনি; বরং সে যে ক্ষুব্ধ নয়, তা বোঝাতে কিছুটা মুচকি হাসছিলো।

আরও পড়ুন: দুশ্চিন্তা ও ঝামেলা এড়িয়ে চলুন — সুখী জীবনের ৪১তম সূত্র

বস্তুত: এসব ক্ষেত্রে চিৎকার করে কী লাভ? যা হওয়ার, তা তো হয়েই গেছে। ড্রাইভিং সিটে বসা বন্ধুটি পরে অবশ্য তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তাই জীবনটাকে যদি আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ করতে চান, যদি জীবনকে উপভোগ্য হিসেবে গড়তে চান তাহলে সর্বক্ষেত্রে এই মূলনীতিটি মনে রাখবেন। ‘সাধারণ জিনিসকে কখনো বড় করে তুলবেন না।’

ভুল প্রতিক্রিয়া নিজেকেই ক্ষতি করে

অনেক সময় আমরা নিজেদেরকে কষ্ট দেই। সংকুচিত হই ও কষ্ট পাই। এভাবে কষ্ট পাওয়া সমস্যার কোনো সমাধান নয়। বরং আমরা যখন ভুল প্রতিক্রিয়া দেখাই, তখন সমস্যা কমে না — বরং আমরা নিজেরাই আরও বড় বিপদে পড়ি। তিনটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট করা যাক।

বিয়ের অনুষ্ঠানে শিশুর দুষ্টুমির ঘটনা

মনে করুন, আপনি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছেন। আপনার পোশাক- পরিচ্ছদ বেশ সুন্দর ও পরিপাটি। মাথার রুমাল ও ওপরের বন্ধনীটিও বেশ দর্শনীয়। দেখতে আপনাকে বরের চেয়েও সুন্দর লাগছে!

আপনি হাসিমুখে সবার সঙ্গে করমর্দন করছেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটি শিশু এসে আপনার রুমাল ধরে আচমকা টান দিলো। আপনার রুমাল, বন্ধনি ও টুপি সব মাটিতে পড়ে গেলো। উপস্থিত সবাই আপনার এ অবস্থা দেখে হাসাহাসি করতে লাগলো। এ অবস্থায় আপনি কী করবেন? অনেকেই এ জাতীয় পরিস্থিতিতে এমন কিছু করে বসেন, যা কখনোই সুন্দর সমাধান নয়। কেউ হয়তো বাচ্চাটির পেছনে পেছনে দৌড়াতে শুরু করে, চিৎকার করে ডাকতে থাকে। কেউ তিরস্কার করে শক্ত ভাষায় তাকে গালমন্দ করে। কিন্তু এর ফলাফল কী?

ছেলেটি তো চেয়েছিলো লোকজনের মনোযোগ আপনার প্রতি আকৃষ্ট করে একটা কোলাহল সৃষ্টি করতে অথবা সবার কাছে আপনাকে হাসির পাত্র বানাতে। আপনার আচরণের কারণে তার উদ্দেশ্য সফল হলো। এই পুরো দৃশ্যটা কেউ মোবাইলের ভিডিওতে ধারণ করে ব্লুটুথের মাধ্যমে সামাজিক সাইটগুলোতে আপলোড করবে। ফলে আপনি আরো হাসির পাত্র হবেন। তাই ভেবে দেখুন, ছেলেটিকে বকা দিয়ে আপনি নিজেকে আরো ব্রিতকর পরিস্থিতিতে ফেলছেন? তাকে শাসাতে গিয়ে বাস্তবে আপনি তাকে নয়, আপনি নিজেকেই অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি করছেন।

নতুন কাপড়ে রং লাগার ঘটনা

আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করুন, আপনি একটি নুতন কাপড় পরিধান করেছেন। হয়তো এখনো কাপড়টির মূল্যও শোধ করেন নি। চাকুরির ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য একটি কোম্পানিতে গেছেন। আপনি যে দরজা দিয়ে ঢুকছেন, তাতে একটু আগে রং দেয়া হয়েছিলো। দরজার পাশে এ বিষয়ে একটি নোটিশও লাগানো ছিলো। আপনি সেটা খেয়াল করেন নি। অসাবধানতাবশত কিছুটা রং আপনার কাপড়ে লেগে গেলো। এখন আপনি কী করবেন?

বেশিরভাগ সময়ই আমরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন কাজ করে বসি, যা আসলে এ সমস্যার কোনো সমাধান হতে পারে না। আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। রংমিস্ত্রীকে ধমক দিয়ে বলি, ‘এখানে দর্শনীয় জায়গায় নোটিশটি লাগাতে পারলে না?’

স্বাভাবিকভাবেই মিস্ত্রীও আপনার ওপর রেগে যাবে। সেও অশ্রাব্য কিছু বলে ফেলবে। এর ফল কী হবে? আগে তো আপনার কাপড়ে রং লেগেছিল। এখন আপনার মান সম্মান ধুলোয় মিশে গেলো।

বস্তুত: এ ধরনের আচরণ করে আপনি অন্যকে নয়; বরং নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছেন, নিজেকেই অপদস্থ করছেন।

বক্তৃতার দিন কাদা ছিটানোর ঘটনা

প্রিয় পাঠক, বিরক্ত হবেন না। আরো একটি উদাহরণ দিয়ে এ প্রসঙ্গের ইতি টানছি। মনে করুন, কোথাও আপনার বক্তৃতার প্রোগ্রাম আছে। এ জন্য আপনি সুন্দর পোশাক পরে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। রাস্তার পাশে কাদাপানি জমে ছিল। একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে এসে কাঁদা ছিটিয়ে আপনার পুরো কাপড় ময়লা করে দিয়ে গেলো। আপনি কি এখানেও চিৎকার দিয়ে গাড়ি ও ড্রাইভারকে গালমন্দ করে নিজেকে কষ্ট দেবেন?

একটু ভাবুন, গাড়ি তো চলেই গেছে। আপনার এই গালমন্দ আর চিৎকার কী কোনো ফল বয়ে আনবে? আপনি কি এর মাধ্যমে শান্তি পাবেন?

জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন অনেক কষ্টদায়ক ঘটনার সম্মুখীন আমরা হই। এগুলো নিয়ে চিৎকার করে নিজের কোনো লাভ হয় না। কষ্ট ও মনোপীড়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না।

রাসূল (সাঃ)-এর জীবনে কষ্ট ও ধৈর্যের শিক্ষা

রাসূল (সাঃ)-এর জীবনে কষ্ট ও ধৈর্যের অসাধারণ শিক্ষা
রাসূল (সাঃ) জীবনের সব কষ্ট ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেছেন — এটাই সুখী জীবনের রহস্য। প্রতিকী ছবি।

জীবনের ছোট ছোট বিপত্তিতে আমরা যখন অস্থির হয়ে পড়ি, তখন একবার রাসূল (সাঃ)-এর জীবনের দিকে তাকানো উচিত। তিনি যে কষ্ট সহ্য করেছেন তার কাছে আমাদের দৈনন্দিন বিপত্তিগুলো অতি নগণ্য। অথচ তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি — বরং প্রতিটি কষ্টকে ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেছেন এবং জীবন উপভোগ করেছেন। নীচের ঘটনাটি দেখুন:

নবী কারীম ﷺ সাহায্য ও পীড়াদায়ক এমন অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন।

একদিন তিনি প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) এর সঙ্গে একান্তে বসেছিলেন। আয়েশা (রাঃ) রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো মুহূর্ত কি আপনার জীবনে এসেছিল?’

রাসূল ﷺ -এর স্মৃতিপটে উহুদের যুদ্ধের বীভৎস দৃশ্যগুলো ভেসে উঠলো। আরো ভেসে উঠলো প্রিয়তম চাচার বিকৃত লাশের দৃশ্য। তাকে শুধু নির্মমভাবে হত্যাই করা হয় নি, নাক কান কেটে তার লাশ বিকৃত করা হয়েছিল। বুক ও পেট কেটে পুরো শরীর ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছিল। [৫]

সেদিন আঘাতে আঘাতে মহানবী ﷺ-এর পবিত্র দাঁত শহিদ করা হয়েছিল। নুরানি চেহারা জখম হয়েছিল। রক্ত ঝরেছিল মোবারক শরীর থেকে।[৩]

সেদিন তাঁর অনেক সঙ্গী তাঁরই চোখের সামনে এক এক করে শহিদ হয়েছিলেন।[৪] সত্তরজন সঙ্গীকে ওহুদ প্রান্তরে দাফন করে তিনি মদিনায় ফিরে এসেছিলেন। মদিনায় তখন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল বিধবা নারী ও এতিম শিশুরা।

আহ! কী কষ্টের ও বেদনার দিন ছিলো সেটি !

আয়েশা (রা:) জবাবের অপেক্ষায় ছিলেন। রাসূল ﷺ বললেন, ‘তোমার গোত্রের লোকজনের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম আকাবার দিন। সেদিন আমি তাদের সামনে আমার নবুয়তের সংবাদ দিয়েছিলাম।’[১]

এরপর মহানবী ﷺ দীনি কাজে তায়েফবাসীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা, তাদের প্রত্যাখ্যান এবং একদল নির্বোধ কর্তৃক তাকে পাথর মেরে পুরো শরীর রক্তাক্ত করে দেয়ার ঘটনা আয়েশা (রা:)-কে শোনালেন।

তার জীবনে এ ধরনের মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক অনেক ঘটনাই ঘটেছিল। কিন্তু এসব তার স্বাভাবিক পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। এই কষ্টগুলোকে তিনি ধরে রাখেন নি, বরং জীবনকে উপভোগ করেছেন। তাই দুঃখগুলো সব কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে তাঁর সুমহান আদর্শ ও উন্নত মানবতাবোধ।

আরও পড়ুন: ভুল স্বীকার করে নিন — সুখী জীবনের ৪২তম সূত্র

তাই শোক ও দুশ্চিন্তায় মজে গিয়ে নিজেকে ধ্বংস করবেন না। ভর্ৎসনা ও নিন্দার মাধ্যমে অন্যকেও ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবেন না। অনেক সময় আমরা সমস্যার সমাধান এমনভাবে করি, যা মূলত সে সমস্যার সমাধান নয়।

ভুল পদ্ধতিতে সমাধান করলে কষ্ট বাড়ে

রাসূল (সাঃ)-এর জীবনে যত কষ্টই এসেছে, তিনি ভুল প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কিন্তু আমরা অনেক সময় সমস্যার সমাধান এমনভাবে করি, যা মূলত সে সমস্যার সমাধান নয় — বরং নতুন বিপদ ডেকে আনে। আহনাফ বিন কায়েসের ঘটনাটি এর সবচেয়ে মজাদার দৃষ্টান্ত।

আহনাফ বিন কায়েসের চড়ের ঘটনা

আহনাফ বিন কায়েসের চড়ের ঘটনা — বুদ্ধিমত্তায় বিজয়
সেই তো বিজয়ী যার মুখে ফোটে শেষ হাসি। প্রতিকী ছবি।

আহনাফ বিন কায়েস বনু তামিমের সরদার ছিলেন।[২] তিনি বাহুবল, ঐশ্বর্য বা বংশীয় মর্যাদার কারণে নেতৃত্ব লাভ করেন নি, বরং সহনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমেই নেতৃত্বের আসনে তিনি আসীন হয়েছিলেন।

একবার হিংসার বশবর্তী হয়ে কিছু লোক জনৈক নির্বোধকে বললো, “এই নাও এক হাজার দিরহাম । তুমি গিয়ে বনু তামিমের সরদার আহনাফ বিন কায়েসের গালে জোরে একটা চড় মেরে আসবে।’

নির্বোধ লোকটি বিলম্ব না করে সাথে সাথে রওয়ানা হলো। সে এসে দেখলো, আহনাফ বিন কায়েস চাদর জড়িয়ে বসে আশেপাশের লোকদের সঙ্গে কথা বলছেন।

লোকটি ধীর পদক্ষেপে তার দিকে এগিয়ে গেলো। একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। কোনো সুসংবাদ নিয়ে এসেছে এই ভেবে আহনাফ বিন কায়েস তার দিকে মাথা উঠিয়ে তাকালেন, আর হতভাগা অমনি হাত উঁচিয়ে তার গালে কষে একটা চড় মারলো। আহনাফ ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হলেন না। নিজেকে সামলে নিলেন। শান্ত ভাবে লোকটাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আমাকে চড় মারলে কেন? লোকটা বললো, “কিছু লোক আমাকে এক হাজার দিরহাম দিয়ে বলেছে আমি যেন বনু তামীমের সরদারকে চড় মেরে আসি।’

তিনি বললেন, ‘হায়! হায়! তুমি কী করলে! আমি তো বনু তামিমের সরদার নই !’

‘তাহলে! বনু তামীমের সরদার কে?’

আহনাফ বললেন,‘ওই যে লোকটা। একা একা বসে আছে। তরবারিটা পাশে রাখা। সেই তো বনু তামিমের সরদার। আহনাফ বিন কায়েস হারিসা বিন কোদামাকে দেখিয়ে দিলেন। হারিসা তখন রাগে ও ক্ষোভে ফুসছিলো। মনে হচ্ছিলো, তার ক্রোধের একটা অংশ সবার মধ্যে ভাগ করে দিলেও সবাই রাগে ফেটে যাবে।

লোকটা বললো, ‘হ্যাঁ, দেখেছি। ওই তো বসে আছে।’

আহনাফ বললেন, ‘যাও, তাকে গিয়ে চড় মেরে এসো। সে-ই বনু তামিমের সরদার!

লোকটি হারিসার একেবারে কাছাকাছি চলে গেলো। তার চোখ থেকে তখন যেন আগুন বের হচ্ছিলো। লোকটি তার কাছে গিয়ে থামলো। হাত উঁচিয়ে জোরে একটা চড় মারতে যাবে অমনি হারিসা লোকটির হাত ধরে তরবারির আঘাতে তা দ্বিখণ্ডিত করে ফেললো ! প্রবাদ আছে,

‘সেই তো বিজয়ী যার মুখে ফোটে শেষ হাসি ।’

উপসংহার: সাধারণ জিনিসকে কখনো বড় করবেন না

ভুল পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে সমাধানের পথ কখনো খুঁজে পাবেন না; বরং তাতে আপনার কষ্টই বাড়বে ।

আপনার কাছের কেউ কি ছোট ঘটনায় বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়? এই লেখাটি তার সাথে শেয়ার করুন।

আপনি কি কখনো ছোট ঘটনায় রেগে পরে অনুতাপ করেছেন? নিচে কমেন্টে জানান।

এরপর পড়ুন: কিছু সমস্যা এমন যার কোনো সমাধান নেই (coming soon)

আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে। সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন — আমার বাংলা পোস্ট.কম।

অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪৫তম সূত্র হলো — নিজেকে কষ্ট দেবেন না । 😊


তথ্যসূত্র

[১] সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩১। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বক্তব্য। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

[২] আহনাফ বিন কায়েসের চড়ের কাহিনি আরবি সাহিত্যের একটি বর্ণনা হিসেবে পাওয়া যায়। এর সনদ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়; তাই এটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কাহিনিটির সূত্র ও সনদ-সংক্রান্ত আলোচনা দেখুন ↑

[৩] সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৭৫। উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দাঁত ভেঙে যাওয়া ও মুখমণ্ডল আহত হওয়ার বর্ণনা। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

[৪] সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৭৮। উহুদের যুদ্ধে আনসারদের ৭০ জন শহিদ হওয়ার বর্ণনা। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

[৫] উহুদের যুদ্ধে হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.)-এর শাহাদাত সম্পর্কে সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৭২-এ ওয়াহশি (রা.)-এর বর্ণনা রয়েছে। তাঁর দেহ বিকৃত করার বিস্তারিত বিবরণ হাদিসটির মূল বক্তব্য নয়; এ বিষয়ে ব্যাখ্যামূলক আলোচনা দেখুন। সহিহ বুখারি ৪০৭২ পড়ুন | হাদিসের ব্যাখ্যামূলক আলোচনা ↑

Leave a Reply