আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪১তম সূত্রটি পড়ুন।
স্ত্রী প্লেট ভাঙলে রাগ, সন্তান পরীক্ষায় কম পেলে রাগ, বন্ধুর কথায় কষ্ট—এভাবে দুশ্চিন্তা ও ঝামেলা নিজেই তৈরি করছেন? রাসূল (সাঃ) কোলে পেশাব হলেও রাগ করেননি, ঘরে খাবার না থাকলেও অভিযোগ করেননি। জানুন মানসিক শান্তির অসাধারণ রহস্য।
সবকিছু নিজের দিকে টেনে আনবেন না
আমার মনে হয়, কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লোকটার পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হলে প্রাথমিকভাবে তার অন্তত দশ-বারোটা রোগ ধরা পড়বে। কমপক্ষে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস তো থাকবেই! কারণ, এ লোক সবসময় মানসিক কষ্টে ভোগে। আর মানসিক কষ্টে ভোগার কারণ হলো সে সবসময় অন্যদের কাছ থেকে সবকিছু পূর্ণ মাত্রায় কামনা করে। কোনো কিছু একটু কম বা নিম্নমাত্রার হলে তার উদ্বেগের আর সীমা থাকে না। এ লোক স্ত্রীর সাথে সারাক্ষণ লেগেই থাকে। তাঁর দোষগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে বলে-
‘নতুন প্লেটটা ভেঙ্গে ফেললে?’
“হলরুমটা এখনো ঝাড়ু দিলে না?
‘আমার নতুন জামাটা ইস্ত্রি করতে গিয়ে পুড়ে ফেললে?’
আবার সন্তানদের ব্যাপারে বিরক্তি প্রকাশ করে যাচ্ছে,
‘খালেদ ছেলেটা এখনো গুণের নামতাই শেখে নি!’
‘সা’দ পরীক্ষায় এ প্লাস পায় নি!’
সারাহ আর হিন্দ কী যে করে কে জানে…।
এ হলো তার ঘরের অবস্থা। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ!
‘আবূ আব্দুল্লাহ যে কৃপণের গল্পটা বলেছে তা আমাকে লক্ষ্য করেই বলেছে।’
‘গতরাতে আবূ আহমদ পুরোনো গাড়ি নিয়ে যে টিপ্পনি কাটল, তা তো আমার গাড়ি নিয়েই। কেননা, সে বলার সময় আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল।’
এভাবে সে সব নেতিবাচক বিষয় নিজের দিকেই টেনে আনে।
মানুষের ভুল-ত্রুটি মেনে নিন

প্রবাদ আছে,
আমার এক বেদুঈন বন্ধু তার দাদার কাছ থেকে শেখা একটি প্রবাদ বাক্য প্রায়ই আমাকে শোনাত। যখনই আমি তাকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কিছু বলতে যেতাম, সে বারবারই সে প্রবাদ বাক্যটি আমাকে শোনাত।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলত, “শা-য়-খ! আপনার বাঁকা হাত যদি সোজা করতে না পারেন, তাহলে বাঁকা রেখেই মোসাফাহা [ করমর্দন] করুন!’ গভীরভাবে চিন্তা করলে আপনি দেখবেন, কথাটি একদম যথাযথ। আমরা যদি কোনো কোনো ভুল-ত্রুটি মেনে নিতে অভ্যস্ত না হই, দেখেও না দেখার ভান না করতে পারি। কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ি তাহলে দেখা যাবে, একসময় আমরা মানসিক যন্ত্রণার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি।
কবি কত চমৎকার বলেছেন-
কিন্তু নেতাকে কখনো কখনো নির্বোধের ভান করতে হয়।
যুবকের স্ত্রী নির্বাচনের ঘটনা: জান্নাতেই পাবে নিখুঁত মানুষ
সৌম্য-শান্ত-কান্তিময় এক যুবক উপযুক্ত জীবন সঙ্গিনী নির্বাচন করতে তাঁর শায়খের শরণাপন্ন হলো। সে আশা করছে, তার স্ত্রী হবে তার জীবন সফরের আমৃত্যু সহযাত্রী।
শায়খ যুবককে জিজ্ঞেস করলেন,‘স্ত্রীর মধ্যে তুমি কী ধরনের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য তুমি কামনা কর?
যুবক বললো, ‘তাকে দীর্ঘদেহী ও সুন্দরী হতে হবে। তার চুলগুলো রেশমি ও কালো কুচকুচে হতে হবে। আরো হতে হবে সুগন্ধময় ও সুভাষিণী। তাকে দেখলে আমার মন জুড়িয়ে যাবে। আমি দূরে থাকলে সে তাঁর সতীত্ব রক্ষা করে চলবে। সে কোনো বিষয়ে আমার বিরোধিতা করবে না। তার ব্যাপারে আমি কোনো ভয়ের আশংকা করব না। ধর্মপরায়ণতার দিক থেকে সে হবে অনেক উচ্চ মানের। আর প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের দিক থেকে সে হবে উপকারী।…’
এভাবে নারী জাতির মধ্যে যে সব গুণ থাকতে পারে, সবই সে উল্লেখ করলো এবং তাঁর স্ত্রীর মধ্যে সবগুলোর সন্নিবেশ কামনা করলো।
একপর্যায়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে শায়খ বললেন,‘থাম, বাবা থাম! আর বলতে হবে না। আমি এ ধরনের নারীর সন্ধান তোমাকে দিতে পারব।
এ কথা শুনে যুবক খুশিতে আত্মহারা হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায়? কোথায় আছে এ ধরনের কনে?
শায়খ শান্তভাবে বললেন, ‘আল্লাহ চাহে তো কেবল জান্নাতেই তুমি এমন নারী পাবে! এ পৃথিবীতে মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অপূর্ণতা মেনে নিতে অভ্যস্ত হতে হবে৷’
দুনিয়ার জীবনে মানুষের ভুল-ত্রুটি মেনে নিতে নিজেকে প্রস্তুত রাখুন। সহনশীলতার মনোভাব পোষণ করুন। অন্যের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে ঘাটাঘাটি করে অনর্থক নিজেকে কষ্ট দেবেন না।
আপনার সহকর্মীকে বলে ফেলবেন না যে, ‘তুমি তো আমাকে উদ্দেশ্য করেই এসব কথা বলেছ ৷’
সন্তানকে লক্ষ করে বলবেন না, ‘অলসতা করে তুমি আমাকে কষ্ট দিতে চাও ।’
কখনো স্ত্রীকে বলবেন না যে, ‘তুমি তো এ সব করে আমার সাজানো সংসারটা ধ্বংস করতে চাচ্ছ।’
আরও পড়ুন: ভুল সম্পর্কে নিশ্চিত হলে উপদেশগ্রহণ সহজ — সুখী জীবনের ৩৭তম সূত্র
রাসূল (সাঃ)-এর সহনশীলতার দৃষ্টান্ত
মহানবী (সাঃ) মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি সহ্য করতেন। তাই তার জীবন ছিল উপভোগ্য ও সুখময়। নীচের উদাহরণটি দেখুন:
ঘরে খাবার নেই — রাসূলের প্রতিক্রিয়া
কখনো এমন হতো যে, দুপুর বেলা ক্ষুধার্ত অবস্থায় তিনি বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করতেন, ‘ঘরে কি খাওয়ার কিছু আছে?’
স্ত্রীগণ বলতেন, ‘না, কিছুই নেই ৷’
মহানবী (সাঃ) বলতেন, “ঠিক আছে। আমি তাহলে রোযা রাখছি।’ (সুনানে নাসাঈ : ২২৮৯)[১]
একে কেন্দ্র করে তিনি ঝগড়া করতেন না। চেঁচিয়ে বলতেন না, ‘আমাকে জানালে না কেন? জানালে তো কিছু কিনে আনতাম।’ তিনি কেবল বলতেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে! তাহলে আমি রোযা রাখছি।’ ব্যাস, এভাবেই সমস্যার সমাধান করতেন!
উম্মে হানীর ঘরে — অল্প খাবারেও রাসূলের সন্তুষ্টি
একদিন মহানবী (সাঃ) উম্মে হানীর ঘরে আসলেন। মহানবী (সাঃ) ক্ষুধার্ত ছিলেন। তাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘরে কি কোনো খাবার আছে?’
উম্মে হানী বললেন, ‘কয়েক টুকরা শুকনো রুটি ছাড়া কিছুই নেই ৷ আপনার সামনে তো পেশ করতে লজ্জা লাগছে।’
মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘তা-ই নিয়ে এসো।’
উম্মে হানী শুকনো রুটি নিয়ে এলেন। মহানবী (সাঃ) তা লবণমিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে খেতে লাগলেন। উম্মে হানীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তরকারি-ঝোল কিছুই কি নেই?’
উম্মে হানী বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! কিছু সিরকা আছে।
মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘নিয়ে এসো।’
উম্মে হানী সিরকা নিয়ে এলেন। মহানবী (সাঃ) সিরকা-রুটি দিয়েই আহার শেষ করলেন।
এরপর আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে বললেন, ‘সিরকা কত উত্তম ব্যঞ্জন!’ [৮] (আল মু’জামুল আওসাত, তাবরানীঃ ৭১৭২)
মহানবী (সাঃ) এমন সাদা-সিধা জীবন যাপন করতেন। যেকোনো বিষয়কে ব্যস্ততার নিরিখে বিচেনা করতেন।
উটের ধাক্কায় আঘাত — কুলসুমের ঘটনা
কুলসুম বিন হুসাইন ছিলেন উল্লেখযোগ্য সাহাবিদের একজন। তিনি বলেন, রাসূলের সঙ্গে আমি তাবুক যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেছি। তাবুকের সফরে কোনো একরাতে আমরা ‘আখদার’ উপত্যকার মধ্য দিয়ে চলছিলাম।
সেই রাতে আমাদের সফর অনেক দীর্ঘ হলো । ফলে আমরা অনেকেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। চলার পথে প্রায়ই আমার উট মহানবী (সাঃ)-এর উটের সঙ্গে ধাক্কা লাগার উপক্রম হতো। আমি হঠাৎ জেগে উঠে আমার উট দূরে সরিয়ে নিতাম, যেন আমার উটের হাওদা মহানবী (সাঃ)-এর পায়ে লেগে না যায় ৷
মাঝপথে একপর্যায়ে আমি চলতে চলতেই ঘুমিয়ে পড়লাম । মহানবী (সাঃ)-এর উটের সঙ্গে আমার উট লেগে গেল এবং এর ফলে মহানবী (সাঃ) জোরে আঘাত পেলেন। আঘাতের ব্যথায় মহানবী (সা:)-এর মুখ থেকে ‘উহ!’ শব্দ উচ্চারিত হতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলে। আমি অস্থির চিত্তে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ মহানবী উদারকণ্ঠে বললেন, ‘চল, সামনে চলতে থাক ৷’
ব্যাস, এতটুকুই বললেন। রাগ করে বললেন না, কেন এদিক চলে এলে? রাস্তা তো অনেক প্রশস্ত, কেন এদিকে এসে আমাকে কষ্ট দিলে?’
পায়ের আঘাত নীরবে সহ্য করেছেন, পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন। এটাই ছিল মহানবীর সাম্যের নীতি।
চাদরের ঘটনা
একদিন তিনি সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। এমন সময় জনৈক মহিলা একটি কাপড় নিয়ে এলো । সে বললো, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি নিজ হাতে এ কাপড়টি বুনেছি। আমার মনের আশা আপনি এটি পরিধান করবেন।’ মহানবী (সাঃ) এর তখন একটি কাপড়ের অনেক প্রয়োজন ছিল। তিনি খুশিমনে তা গ্রহণ করলেন এবং ঘরে গিয়ে লুঙ্গির মতো করে তা পরিধান করে বের হলেন।
উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে একজন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাপড়টি আমাকে দিয়ে দিন।’ মহানবী বললেন, ‘ঠিক আছে।’
তিনি আবার ঘরে প্রবেশ করলেন। পুরোনো লুঙ্গিটি পরিধান করে নতুন কাপড়টি খুলে তা সুন্দরভাবে ভাঁজ করে সে সাহাবিকে দিয়ে দিলেন।
উপস্থিত সকলেই তাকে বললেন, তুমি কাজটি ভালো করনি। মহানবী (সা;) কোনো প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দেন না, এটা জেনেই তো তুমি চাদরটি চেয়েছ।
সাহাবি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! রাসূলের বরকতময় চাদর মৃত্যুকালে আমার কাফন হবে- এ আশায়ই আমি চাদরটি চেয়েছি।'(বুখারী: ১১৯৮)[২]
অবশেষে তিনি যখন মারা গেলেন, প্রিয় মহানবী (সাঃ)-এর মোবারক সে চাদরটি গায়ে জড়িয়ে তাকে দাফন করা হলো। কত সুন্দর ছিল তার আচরণ ! এর মাধ্যমেই তিনি জয় করেছিলেন সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়।
হাসান-হোসাইনের পিঠে চড়ার ঘটনা

আরেকদিনের ঘটনা। মহানবী (সাঃ) সাহাবিদের নিয়ে এশার নামাযে দাঁড়ালেন। হঠাৎ ফাতেমা (রাঃ)-এর শিশুপুত্র হাসান ও হোসাইন মসজিদে প্রবেশ করলো। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা নানাজী রাসূল (সাঃ)-এর কাছে চলে গেল।
মহানবী (সাঃ) ইমামত করছিলেন। যখন তিনি সেজদায় গেলেন, হাসান ও হোসাইন তার পিঠে চড়ে বসল। সেজদা থেকে ওঠার সময় তিনি কোমলভাবে তাদের নামিয়ে পাশে বসিয়ে দিলেন। আবার যখন সেজদা করলেন, তখন আবার তারা পিঠে উঠে বসল। এভাবে তিনি নামায শেষ করলেন। এরপর আদর করে তাদের কোলে বসালেন।
এটা দেখে আবূ হোরায়রা (রাঃ) কাছে গিয়ে বললেন, আল্লাহর রাসূল! তাদেরকে তাদের মায়ের কাছে দিয়ে আসি?’ মহানবী (সাঃ) দিলেন না। তাদেরকে নিজের কোলে বসিয়ে আদর সোহাগ করলেন। কিছুক্ষণ পর যখন আকাশে বিজলি চমকে উঠল তখন মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘যাও, যাও, ঘরে মায়ের কাছে যাও।’ তারা উঠে তাদের মায়ের কাছে চলে গেল। (মুসনাদে আহমদ: ১০২৪৬)
আরেক দিনের কথা। মহানবী (সাঃ) হাসান বা হোসাইনকে কোলে নিয়ে জোহর আথবা আসরের সময় সাহাবিদের কাছে এলেন। এরপর নামাযের ওয়াক্ত হলে তাকে পাশে রেখে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। রুকু করলেন, সেজদা করলেন। কিন্তু সেজদা থেকে আর উঠলেন না। দীর্ঘ সময় রাসূল সেজদারত থাকায় সাহাবিগণ শঙ্কিত হলেন।
রাসূলের আবার কী হলো?
দীর্ঘ সেজদার পর মহানবী (সাঃ) মাথা তুললেন। সেজদা থেকে উঠলেন, নামায শেষ করলেন। পরে সাহাবিগণ বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! আপনি আজকের মতো এত দীর্ঘ সেজদা তো আর কখনো করেন নি। আপনার কী হয়েছিল? সেজদায় থাকাকালীন কি ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল?
মহানবী (সাঃ) বললেন, “তোমরা যা ভেবেছ এগুলোর কিছুই হয় নি। আমার এ নাতিটি ঘাড়ে চড়ে বসেছিল। আমি তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নামিয়ে দিতে চাই নি।’ (সুনানে নাসায়ী: ১১২৯, মুসতাদরাকে হাকীম : ৪৭৫৯)[৩]
ইমামের পিছনে দাঁড়ানোর পদ্ধতি
মহানবী (সাঃ) সাহাবিদের নিয়ে হজের সফরে বের হলেন। পথিমধ্যে এক স্থানে যাত্রাবিরতি হলো। মহানবী (সাঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে অযু করে নামাযে দাঁড়ালেন । কিছুক্ষণ পর জাবের বিন আবদুল্লাহ এলেন। নামাযের নিয়ত করে তিনি রাসূলের বামপাশে দাঁড়ালেন। মহানবী (সাঃ) কোমলভাবে তার হাত ধরে তাকে ডান পাশে নিয়ে এলেন এবং উভয়ে নামায পড়তে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর জাব্বার বিন সাখার অযু করে মহানবী (সাঃ)-এর বামপাশে এসে দাঁড়ালেন। মহানবী (সাঃ) এবার আলতোভাবে উভয়কে পেছনে সরিয়ে দিলেন। রাসূল সামনে থাকলেন । এভাবে নামায শেষ করলেন। (সহিহ মুসলিম: ৫৩২৮)[৪]
এভাবেই তিনি তাদেরকে নামাযে ইমামের পেছনে দাঁড়ানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন ।
কোলে পেশাব করল শিশু — রাসূলের ধৈর্য
একদিন মহানবী (সাঃ) কোথাও উপবিষ্ট ছিলেন। উম্মে কায়স বিনতে মিহসান তার নবজাতক সন্তানকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। সে আশা করছে মহানবী (সাঃ) শিশুটির মুখে বরকতস্বরূপ প্রথম খাবার তুলে দেবেন এবং তার কল্যাণের জন্য দোয়া করবেন।
মহানবী (সাঃ) শিশুটিকে কোলে নিলেন। একটু পর অবুঝ শিশুটি মহানবী (সাঃ) কোলে পেশাব করে দিল। রাসূল একটু পানি আনতে বললেন। পানি আনা হলে তিনি নিজ হাতে ধুয়ে নিলেন। (সহিহ বুখারী: ২১৬)[৫]
বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে গেল। তিনি রাগ করলেন না। কিংবা ভ্রুও কুঞ্চিত করলেন না।
রাসূলের এ আদর্শ থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা দরকার। আমরা তিলকে তাল বানিয়ে নিজেদেরকে কষ্ট দিতে যাব না। আমার চারপাশের সবকিছু পুরোপুরি আমার মন মতো হবে এটা ভাবব না।
কবি বলেছেন-
কারো দোষ পেলে, তা শুধরে দিন, কেননা, একমাত্র আল্লাহ তাআলা-ই দোষ থেকে মুক্ত।
অনেক মানুষ আছে, তুচ্ছ বিষয়কে বিশাল বানিয়ে ফেলে। অনেক পিতা-মাতাও মাঝে মাঝে এ ধরনের কাণ্ড ঘটায়। অনেক সময় কোনো কোনো শিক্ষক শিক্ষিকা এমন আচরণ করে।
ভুল-ত্রুটি গোপন দোষ মোটেও তালাশ করবে না। অন্যের ওজর আপত্তি উদারচিত্তে মেনে নিতে সবসময় প্রস্তুত থাকুন। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে যে আপনার কাছে ওজর পেশ করে, ক্ষমা চায় আপনি তার প্রতি সহানুভূতিশীল হোন, নিঃস্বার্থভাবে তাকে ক্ষমা করে দিন।
কবি বলেন-
যে ওজর নিয়ে এসেছে তার ওজর গ্রহণ করে তাকে ক্ষমা করে দিন।
সত্য বলুক, মিথ্যা বলুক; করুন তাকে প্রাণের আপন
সে আপনাকে মন্দ বলুক, বা ভালো বলুক
কাছে এসে তো আপনার আনুগত্য করছে।
আড়ালে সে যা খুশি তা করুক না কেন।
দোষ খুঁজবেন না — কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ

একদিন মহানবী (সাঃ) মিম্বরে উঠে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বয়ান করলেন। সে দিন তিনি এতো উচু আওয়াজে বয়ান করলেন যে, ঘরের বৃদ্ধ নারীরাও তা শুনতে পেল। তিনি কী বলেছিলেন তা কি কল্পনা করতে পারেন?
তিনি বলেছিলেন, “হে লোকজন! তোমরা যারা মুখে মুখে ঈমান এনেছ, কিন্তু এখনো অন্তর দিয়ে ইসলাম গ্রহণ কর নি, তাদেরকে বলছি, সাবধান! কোনো মুসলমানের গিবত কর না। দোষ তালাশ কর না। কারণ যে অন্যের দোষ খুঁজে ফেরে, আল্লাহ তাআলা তার দোষ প্রকাশ করে দেন। আর শুনে রেখ, আল্লাহ কারো দোষ প্রকাশ করলে সে যেখানেই থাকুক না কেন তার মুক্তি নেই। সে অবশ্যই লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে ৷’ (মুসনাদে আহমদ : ১৮৯৬৩)[৬]
কারো দোষ খুঁজে বেড়াবেন না। কারো গোপন বিষয় নিয়ে ঘাঁটা-ঘাঁটি করবেন না। মন্দ বিষয় এড়িয়ে চলুন।
নবী করীম (সাঃ) জটিলতা বাড়তে দিতেন না। একবার তিনি এক মজলিসে বসা ছিলেন। শান্ত ও ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ সে মজলিসে যে-ই বসে, নবি করিম (সাঃ)-এর প্রভাবে তার দেহ মন পবিত্র ও প্রশান্ত হয়। সাহাবিদের লক্ষ করে মহানবী (সাঃ) বললেন, “কোনো, তোমরা কেউ আমার কাছে আমার কোনো সাহাবির দোষ বলবে না। আমি পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাই ।’ (সুনানে আবূ দাউদ: ৪২১৮, সুনানে তিরমিযী: ৩৮৩১)[৭]
আরও পড়ুন: মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার করুন (৩৬তম সূত্র)
উপসংহার: জীবন ছোট — উপভোগ করুন
নিজেকে কষ্ট দেবেন না…
আপনার স্বচ্ছ হৃদয়টাকে ধুলা উড়িয়ে অস্বচ্ছ করবেন না। কেউ ধুলা উড়ালে জামার হাতা দিয়ে নাক ঢেকে নিন। জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত একে উপভোগ করুন।
অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪১তম সূত্র হলো — দুশ্চিন্তা ও ঝামেলা এড়িয়ে চলুন।
এরপর পড়ুন: ভুল স্বীকার করে নিন__সুখী জীবনের ৪২তম সূত্র
আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন (Enjoy your life in bangla) বই থেকে। সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন__আমার বাংলা পোস্ট.কম।
তথ্যসূত্র ও বহিঃগমণ সংযোগ
[১] সুনানে নাসাঈ, হাদিস ২৩২৭। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[২] সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৯৩। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৩] সুনানে নাসাঈ, হাদিস ১১৪১। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৪] সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস ৬৩৪। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৫] সহিহ বুখারি, হাদিস ২২৩। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৬] সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস ৪৮৮০। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৭] সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস ৪৮৬০। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৮] জামে তিরমিজি, হাদিস ১৮৪১। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
একটি আহ্বান!
আপনার কাছের মানুষটিও কি দুশ্চিন্তায় ভুগছেন? এই লেখাটি তার সাথে শেয়ার করুন — হয়তো একটি লাইনই তার জীবন বদলে দিতে পারে।
আপনি কি কখনো তিলকে তাল বানিয়ে নিজেকে কষ্ট দিয়েছেন? আপনার অভিজ্ঞতা নিচে কমেন্টে শেয়ার করুন।