আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ, অনুশোচনার ATM বুথ, ঈশ্বরের ড্রাফট ফোল্ডার — প্রযুক্তি ও আধুনিক জীবনের প্রতীকী ভাষায় অস্তিত্ব, স্মৃতি ও সম্পর্কহীনতার গভীর অনুভব তুলে ধরেছেন কবি কাজী অ্যাডাম। তাঁর নির্বাচিত ১০টি কবিতা নিয়ে এই সমকালীন কবিতার সংকলন।

আদালতের সিসিটিভি
এই আদালতে
বিচারকের আগে
ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
কারণ মানুষের সাক্ষ্য বদলায়,
ভিডিও বদলায় না—
অন্তত আমরা তাই বিশ্বাস করতে ভালোবাসি।
আজ আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো,
“অভিযুক্ত, ঘটনাস্থলে আপনি ছিলেন?”
আমি বললাম,
“শরীর ছিল।
আত্মা তখন অন্য কোথাও
ক্ষমা খুঁজছিল।”
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল—
আমি সত্যিই তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি,
কিন্তু আমার চোখ
একটি অনুপস্থিত মানুষের মতো।
আদালত এটাকে মিথ্যা বলল।
আমি এটাকে বললাম—
বেঁচে থাকা।
পরে জানা গেল,
সেদিন ক্যামেরাটিও
মাত্র সাত সেকেন্ডের জন্য
অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক সেই সাত সেকেন্ডেই
মানুষ প্রেমে পড়ে,
বিশ্বাসঘাতকতা করে,
অথবা
চিরদিনের মতো বদলে যায়।
রায় ঘোষণার আগে
বিচারক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“প্রমাণ যথেষ্ট নয়।”
আমি মনে মনে উত্তর দিলাম—
সবচেয়ে বড় অপরাধগুলোর
কোনো ফুটেজ থাকে না।
খসড়াধ্বনি: প্রমাণ কি সত্যকে ধরে, নাকি শুধু ঘটনাকে?
অনুশোচনার ATM বুথ
অনুশোচনা জমা দিতে গিয়েছিলাম—
মেশিনটি আমার মুখ চিনতে পারল না।
বারবার লিখল, “ইনভ্যালিড আইডেন্টিটি.”
আমি পুরোনো স্মৃতির পিন নম্বর দিলাম,
তবু কোনো দরজা খুলল না।
শেষে রসিদে শুধু একটি বাক্য ছাপা হলো—
“আপনার অপরাধের কোনো ব্যালেন্স নেই;
এটি এখনও চলমান।”
ফিরে এসে বুঝলাম,
সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঋণ মানুষের নিজের কাছেই থাকে।
খসড়াধ্বনি: এমন কোনো ঋণ কি আছে, যা শোধ করতে টাকা নয়—একটি স্বীকারোক্তি লাগে?
ঈশ্বরের ড্রাফট ফোল্ডার
প্রতিদিন একটি করে প্রার্থনা লিখি,
কোনোটাই পাঠানো হয় না।
হয়তো ঈশ্বরও
সব উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পড়েন না।
একদিন স্বর্গের ড্রাফট ফোল্ডারে
নিজের নামই খুঁজে পেলাম।
বুঝলাম, কিছু মানুষকে
ঈশ্বর প্রত্যাখ্যান করেন না—
শুধু অসমাপ্ত রেখে দেন।
খসড়াধ্বনি: সব প্রার্থনা কি উচ্চারণ করা হয়, নাকি কিছু প্রার্থনা শুধু মানুষ হয়ে বেঁচে থাকে?
ডিলিটেড কনভারসেশন
আমাদের সমস্ত কথোপকথন
একদিন মুছে দিয়েছিলে।
ভাবলে, স্মৃতিও বুঝি ডিলিট হয়ে যায়।
কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক
কোনো অ্যাপ নয়।
আজও নীরবতার ভেতর
তোমার শেষ টাইপ করা শব্দটি ঝলসে ওঠে।
ডিলিট হয়েছিল শুধু চ্যাট—
অপেক্ষা নয়।
খসড়াধ্বনি: কথোপকথন মুছে ফেলা যায়, কিন্তু নীরবতার ইতিহাস কোথায় ডিলিট করবে?
আত্মার স্ক্রিনশট
একদিন নিজের আত্মাকে
ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।
কোনো স্ক্রিনে তার মুখ উঠল না।
শুধু ভাঙা কয়েকটি আলো
চোখের ভেতর আটকে রইল।
তখন বুঝলাম,
যে জিনিস সবচেয়ে সত্য,
তার কোনো স্ক্রিনশট নেওয়া যায় না।
তাকে শুধু বহন করতে হয়।
খসড়াধ্বনি: যে সত্যকে সংরক্ষণ করা যায় না, সেটিই কি সবচেয়ে সত্য?
রাত দুইটার চলে যাওয়া
রাত ২টা ১৭ মিনিটে
তুমি শেষবার অনলাইনে ছিলে।
তারপর পৃথিবী অফলাইন হয়ে গেল।
আমি প্রতিদিন সেই সময়টুকু
ঘড়িতে নয়, মনে দেখি।
কিছু মানুষ চলে যায় না—
তারা শুধু
একটি সময় হয়ে বেঁচে থাকে।
খসড়াধ্বনি: মানুষ চলে যায়, নাকি সময়ের একটি মুহূর্ত হয়ে থেকে যায়?
একটি মৃত গুগল সার্চ
আজ সারাদিন খুঁজলাম—
“ফিরে না আসা মানুষের ঠিকানা।”
সার্চ ইঞ্জিন কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
“নো রেজাল্ট ফাউন্ড.”
পৃথিবীর সব তথ্য সংরক্ষিত,
শুধু অনুতাপের কোনো ডেটাবেস নেই।
তখন বুঝলাম,
কিছু প্রশ্নের উত্তর
ইন্টারনেট নয়, নীরবতা জানে।
খসড়াধ্বনি: সব প্রশ্নের উত্তর না থাকাই কি মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষা?
ক্ষুধার QR কোড
দেয়ালে ঝুলছে একটি QR কোড—
লেখা, “স্ক্যান করে সাহায্য করুন।”
অনেকে ক্যামেরা তুলল,
কেউ চোখ তুলল না।
পেট অপেক্ষা করছিল,
নেটওয়ার্ক ছিল পূর্ণ।
এই সময়ে ক্ষুধা
ভাতের অভাবে মরে না—
মানুষের দৃষ্টির অভাবে মরে।
খসড়াধ্বনি: আমরা কি সাহায্য করি, নাকি সাহায্য করার অনুভূতিটুকু সংরক্ষণ করি?
শহরের গোস্ট মুড
এই শহর এখন গোস্ট মুড-এ থাকে।
মানুষগুলো দেখা যায়,
তাদের উপস্থিতি নয়।
লিফট, ফুটপাত, ক্যাফে—সবখানেই
চলাফেরা করে অনুপস্থিত জীবন।
একদিন আয়নাও আমাকে চিনতে পারল না।
হয়তো শহর বদলায় না,
ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাই আমরা।
খসড়াধ্বনি: অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কি মৃত্যুর শুরু, নাকি ব্যস্ত জীবনের?
প্লাস্টিকের চাঁদ

এখনকার আকাশে যে চাঁদ ওঠে,
তাকে খুব নিখুঁত লাগে।
কোনো ক্ষত নেই, কোনো ক্লান্তি নেই—
যেন কারখানায় তৈরি একটি আলো।
মানুষও আজকাল তেমনই,
হাসে, কিন্তু জোয়ার তোলে না।
আমি আসল চাঁদ খুঁজতে গিয়ে
নিজের মুখই হারিয়ে ফেললাম।
প্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি টেকে—
তাই হয়তো সত্য এত দ্রুত নষ্ট হয়।
খসড়াধ্বনি: নিখুঁত হওয়ার চেয়ে সত্য হওয়া কি বেশি কঠিন?
আরও পড়ুন: কাজী অ্যাডাম’র নির্বাচিত কবিতা
শেষ কথা
কাজী অ্যাডামের এই কবিতাগুচ্ছ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রযুক্তির যুগেও মানুষের সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলো কোনো স্ক্রিন, কোনো ডেটাবেস, কোনো ফুটেজে ধরা পড়ে না। অনুশোচনা, প্রার্থনা, স্মৃতি আর নীরবতা—এসবই থেকে যায় মানুষের ভেতরে, অদৃশ্য অথচ অবিনশ্বর হয়ে। কাজী অ্যাডামের কলমে এভাবেই ধরা পড়ে আধুনিক জীবনের নীরব সংকট আর গভীর মানবিক জিজ্ঞাসা।—Amar Bangla Post team.