মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার করুন | ইসলামের শিক্ষা

আপনি কাউকে উপহার দিয়েছেন — সে সমালোচনা করেছে। হাসিমুখে কথা বলেছেন — সে রেগে গেছে। এত কিছুর পরেও কি ভালো ব্যবহার করা সম্ভব? শুধু সম্ভব নয় — এটাই আসল শক্তি। কুরআন ও রাসূল (সাঃ)-এর জীবন থেকে জানুন মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার-এর অবিশ্বাস্য শক্তির কথা।

মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার — দুটি হাতের স্পর্শে সহমর্মিতা
Photo by Kateryna Hliznitsova on Unsplash

মানুষ সবসময় প্রতিদান দেয় না — এটাই বাস্তবতা

আপনি যখন মানুষের সঙ্গে চলা-ফেরা, আচার-আচরণ বা লেনদেন করবেন, তখন স্বভাবত তারা আপনার সাথে তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো আচরণ করবে। আপনি যেমন চান তেমন আচরণ তাদের কাছ থেকে পাবেন না। আপনি যাদের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করবেন, তাদের সবাই আপনার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলবে এমন আশা করবেন না। কেউ হয়তো উল্টো রেগে যাবে। খারাপ ধারণা করে বলবে, ‘ব্যাপার কী? হাসছেন কেন ?

আপনি যাদেরকে উপহার-উপঢৌকন দেবেন, তাদের সবাই বিপরীতে আপনাকে উপহার দেবে না; বরং কেউ কেউ তো আপনার সমালোচনা করে বলবে,‘লোকটা একদম বোকা, অনর্থক টাকা পয়সা নষ্ট করে।’

কথা বলার সময় আপনি যাদের সঙ্গে আবেগ দেখাবেন বা প্রশংসা করবেন কিংবা কোমল স্বরে কথা বলবেন, তাদের সবাই কিন্তু আপনার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবে না। কেননা,, মহান আল্লাহ তাআলা রিযিক বণ্টনের ক্ষেত্রে যেমন বৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তেমনি স্বভাব ও চরিত্রকেও বৈচিত্র্যময় করেছেন ।

এক্ষেত্রে আল্লাহর নীতি হলো-

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
অর্থ : ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না । মন্দ আচরণকে উত্তম আচরণ দিয়ে রোধ করুন । তখন দেখবেন আপনার এবং যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, যেন সে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু ।
📖 সূরা হা-মীম সেজদা (ফুসসিলাত) — আয়াত ৩৪

কঠিন মানুষের সাথে কী করবেন?

তবে কিছু কিছু মানুষের আচার-আচরণ খুবই সমস্যাপূর্ণ। এর না আছে কোনো সমাধান, না আছে সংশোধনের সম্ভাবনা। তাই হয়তো তার থেকে দূরে থাকুন নয়তো তার আচার ব্যবহার সহ্য করেই তার সঙ্গে চলাফেরা করুন। এছাড়া আর কোনো পথ নেই।

আশআবের ঘটনা: ধৈর্যের পরীক্ষা

কথিত আছে, ‘আশআব’ নামক এক ব্যক্তি জনৈক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সফরে বের হলো । সফরে বাহন থেকে মাল-পত্র ওঠানো-নামানো, বাহনকে পানি পান করানোসহ সব কাজ ব্যবসায়ী একাই করলো । এভাবে কাজ করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে গেল।

ফেরার পথে দুপুরের খাবারের জন্য তারা এক জায়গায় থামল। বাহন থেকে নেমেই আশআব মাটিতে শুয়ে পড়ল। অপরদিকে ব্যবসায়ী লোকটি একা একা বিছানাপত্র নামিয়ে রান্নার আয়োজন করলো। এরপর আশআবের দিকে ফিরে বললো, ‘ভাই! আমাদের তো খাবার তৈরি করতে হবে। আমি গোশত কাটব। তুমি কিছু জ্বালানি সংগ্রহ করে আন।’

আশআব উত্তর দিল, ‘আমাকে মাফ করুন, আমি দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’

বাধ্য হয়ে লোকটি নিজেই জ্বালানি সংগ্রহ করলো। এরপর সে আশআবকে বললো, ‘লাকড়িতে আগুন জ্বালাও।’ এটা শুনে আশআব বললো, ‘আমি আগুনের কাছে যেতে পারি না । আগুন থেকে যে ধোঁয়া হয় তাতে আমার বুকে প্রদাহ হয়।’

ব্যবসায়ী নিজেই আগুন জ্বালাল।

এরপর সে আশআবকে বললো, ‘গোশতের টুকরাটা একটু ধর । আমি যেন সহজে কাটতে পারি।’ আশআব অপারগতা জানিয়ে বললো: গোশত কাটতে গিয়ে ছুরিতে হাত লেগে যদি আমার হাত কেটে যায়’! ব্যবসায়ী নিজেই গোশত কাটল।

এরপর সে বললো, ‘গোশতের হাঁড়িটা চুলায় বসিয়ে এবার রান্নাটা শেষ করে ফেলো।’ আশআব বললো, ‘আমাকে মাফ করবেন, রান্নার আগে খাবারের দিকে বারবার তাকালে আমার সমস্যা হয়!

আশআবের কথা শুনে লোকটি আর দ্বিরুক্তি না করে নিজেই রান্নার কাজ শেষ করলো। সব কাজ একা করে লোকটি ক্লান্ত হয়ে বললো, ‘ভাই! আমি আর পারছি না, এবার দস্তরখান বিছিয়ে খাবারটা একটু পরিবেশন করার ব্যবস্থা কর।

আশআব বললো, “আমার শরীরটা খুব দুর্বল। কাজ করার কোনো শক্তি আমার দেহে নেই। কী আর করা! লোকটি বাধ্য হয়ে উঠে নিজেই দস্ত রখান বিছিয়ে খাবার প্রস্তুত করে আশআবকে ডেকে বললো, ‘এসো, খাবার খেতে এসো।’

আশআব এবার আর না করলো না । সে বললো, ‘ওজর আপত্তি করতে করতে এখন না করতে আমার খুব লজ্জা লাগছে । কতবার আর না করব! এবার আপনার আদেশ আর অমান্য করব না।’ এরপর সে বিছানা থেকে ওঠে নিঃসঙ্কোচে খাবার খেতে শুরু করলো।

জীবনে চলার পথে যদি কখনো এ ধরনের আশআবদের মুখোমুখি হন তাহলে দুঃখিত হবেন না। পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থাকবেন।

রাসূল (সাঃ)-এর জীবন থেকে শিক্ষা

রাসূলে করিম (সাঃ) মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে বিবেককে প্রাধান্য দিতেন। অন্যের ভুলভ্রান্তি সহ্য করে তাদের সঙ্গে অমায়িক আচরণ করতেন।

বেদুঈনের ঘটনা: রাগ নয়, কোমলতাই সমাধান

একবার রাসূল (সাঃ) সাহাবিদের নিয়ে একটি মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। ইতোমধ্যে একজন বেদুঈন সেখানে উপস্থিত হলো। সে নিজে অথবা অন্য কেউ কোনো এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে । সেই হত্যার রক্তপণ আদায়ে কিছু সাহায্য লাভের জন্য সে মহানবী (সাঃ) এর কাছে এসেছে । মহানবী (সাঃ) তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করলেন। এরপর নরমস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি তোমার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছি?”

বেদুঈন সাথে সাথে উত্তর দিল। সে বললো, “না, আপনি আমার সাথে সদ্ব্যবহার করেন নি।

এ কথা শুনে সাহাবিদের কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে তার দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন । কিন্তু মহানবী (সাঃ) ইঙ্গিতে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। এরপর মহানবী (সাঃ)  নিজের কামরায় গেলেন । বেদুঈনকেও সেখানে নিয়ে গেলেন। মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, ‘তুমি আমার কাছে এসে কিছু সাহায্য চেয়েছিলে, আমি তোমাকে সাধ্যমতো কিছু সাহায্য করেছিলাম। তখন তুমি যা বলার বলেছিলে।

এরপর মহানবী (সাঃ) তাকে আরো কিছু দিয়ে বললেন, ‘আমি কি তোমার সাথে সদ্ব্যবহার করেছি?

এবার বেদুঈন বললো, হ্যাঁ । আল্লাহ আপনাকে আমার পরিজন ও গোত্রের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

তাকে সন্তুষ্ট করতে পেরে রাসূল খুশি হলেন। কিন্তু নবী করিম (সাঃ) এর আশঙ্কা হলো যে, তার সাহাবিদের মনে লোকটির প্রতি এখনো হয়তো ক্ষোভ রয়ে গেছে । তাদের কারো সঙ্গে যদি পথে-ঘাটে লোকটির দেখা হয় তাহলে তারা তার সাথে কিরূপ আচরণ করতে পারে। তাই তিনি সাহাবিদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করতে চাইলেন।

মহানবী বেদুঈনকে বললেন, ‘তুমি আমাদের কাছে এসে সাহায্য চাওয়ার পর আমরা সাধ্যমত তোমাকে সাহায্য করেছি। এরপর তুমি যা বলার বলেছ। সেজন্য তোমার প্রতি আমার সাহাবিদের মনে ক্ষোভ থাকতে পারে। এ জন্য তুমি আমার সামনে একটু আগে যা বলেছ এখন তাদের সামনে গিয়ে তা বল। এতে তাদের মনের ক্ষোভ দূর হবে।

বেদুঈন কথা বলার জন্য সামনে আসার পর রাসূল (সা:) সাহাবিদের বললেন, “তোমাদের এই ভাই আমার কাছে এসে কিছু সাহায্য চেয়েছিল। আমি তাকে আমার সাধ্যমতো সাহায্য করেছি। সে তখন কিছু কথা বলে ফেলেছে। পরে আমি তাকে ডেকে নিয়ে আরো কিছু দিয়েছি । এখন সে খুশি হয়ে গেছে ।’

এরপর মহানবী (সাঃ) বেদুঈনের দিকে ফিরে বললেন, “বিষয়টা কি এমন নয়?’

সে বললো, ‘হ্যাঁ, এমনই । আল্লাহ আমার পরিজন ও গোত্রের পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন ।’

বেদুঈন যখন বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো, মহানবী (সাঃ) সাহাবিদেরকে হৃদয় জয় করার পদ্ধতি শিক্ষা দিলেন। মহানবী (সাঃ) বললেন, দেখ, আমার আর এই বেদুঈন লোকটির দৃষ্টান্ত হলো ঐ উটের মালিকের মতো যার উট পালিয়ে যাচ্ছে। লোকজন উটটাকে ধরার জন্য ধাওয়া করলে উটটি ভয়ে আরো দ্রুত বেগে পালাতে লাগল।

আরও পড়ুনহৃদয় জয়ের চাবি (Life hacking Tips 22)

উটের মালিক অবস্থা দেখে বললো, ‘এ যে তোমরা থাম । আমি দেখছি কী করা যায়। তাকে কিভাবে পোষ মানাতে হয়, সেটা আমি তোমাদের চেয়ে ভালো জানি।’

উটের মালিক উটের দিকে এগিয়ে গেল এবং হাতে কিছু পতিত খেজুর বা ঘাস নিয়ে উটটিকে ডাকতে লাগল। উটটি মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে ধীরে ধীরে তার কাছে চলে এলো। এরপর মালিক তার পিঠে হাওদা বেঁধে চড়ে বসল।

বেদুঈনটির কথা শোনার পর তোমরা তার সাথে যে আচরণ করতে যাচ্ছিলে, আমি যদি তাতে বাধা না দিতাম তাহলে সে জাহান্নামি হয়ে যেত।1

কুরআনের নির্দেশ

কোমলতা যেকোনো বিষয়ের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় আর কঠোরতা সৌন্দর্য কেড়ে নেয়।

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
অর্থঃ উত্তম ও অধম কখনো সমান হতে পারে না। আপনি মন্দ (আচরণকে) উত্তম (আচরণ) দ্বারা রোধ করুন। তখন দেখবেন আপনার মাঝে এবং যার মাঝে শত্রুতা রয়েছে, যেন সে আপনার সুহৃদ বন্ধু।
📖 সূরা হা-মীম সেজদা (ফুসসিলাত) — আয়াত ৩৪

ফোযালাহর ঘটনা: ভালোবাসায় হৃদয় জয়

বর্ণিত আছে, মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সাঃ) একদিন কাবাঘর তওয়াফ করছিলেন। তখন মক্কায় ফোযালাহ বিন ওমায়ের নামক এক ব্যক্তি ছিল। সে শুধু বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সে মহানবী (সাঃ)-কে দেখে এগিয়ে এলো। এরপর সে মহানবী (সাঃ) এর পিছু পিছু তওয়াফ করতে লাগল। তার মনে ছিল কুমতলব। মহানবী (সাঃ) -কে একটু অসতর্ক পেলেই হত্যা করে ফেলবে। সে যখন মহানবী (সাঃ)-এর একদম কাছে এসে গেল তখন মহানবী (সাঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আরে ফোযালাহ না-কি?’

সে বললো, ‘জ্বী! ফোযালাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।’

মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘তুমি মনে মনে কী বলছিলে?’

সে অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিল, ‘না, কিছু না। আমি তো আল্লাহর জিকির করছিলাম।

মহানবী (সা:) মৃদু হেসে বললেন, ‘ফোযালাহ! আল্লাহর কাছে এসতেগফার কর।

ফোযালাহ বর্ণনা করেন, ‘এরপর রাসূল (সা:) তার হাত মোবারক আমার বুকে রাখলেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমার হৃদয় প্রশান্ত হয়ে গেল। কসম আল্লাহর! তিনি আমার বুকের ওপর থেকে হাত ওঠানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো, আল্লাহ তাআলার সমগ্র সৃষ্টির মাঝে তার চেয়ে প্রিয় মানুষ আমার কাছে আর কেউ নেই।’

বাড়ি ফেরার পথে জাহেলি যুগের এক মহিলার সঙ্গে ফোযালাহর দেখা হলো। আগে দেখা হলে সে তার সঙ্গে খোশগল্প ও মেলামেশা করত । ফোযালাহকে দেখে মাহিলাটি বললো, “এই, এসো আমরা একটু গল্প করি।

ফোযালাহ স্পষ্ট ভাষায় তাকে প্রত্যাখ্যান করে বললো, ‘না’। এরপর সে স্বরচিত তিনটি শ্লোক আবৃত্তি করলো, (অনুবাদ)
‘সে (একজন নারী) বললো, চলো না গল্প করি, আমি বললাম, না। আল্লাহ ও ইসলাম তা সমর্থন করে না ৷

আরও পড়ুনদেবর মৃত্যুতুল্য: এক করুণ পরিণতির গল্প

যদি তুমি ইসলামের নবী ও তার বাহিনীকে মক্কা বিজয়ের দিন দেখতে, যে দিন দেব-দেবীদের অসার মূর্তিগুলো গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।

তাহলে অবশ্যই তুমি অনুভব করতে আল্লাহর দ্বীন চির ভাস্বর হবে। আর শিরকের অমানিশা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।’ এ ঘটনার পর ফোযালাহ রাদিয়াল্লাহ একজন খাঁটি ও একনিষ্ঠ মুসলমানে পরিণত হন।

এভাবে ক্ষমা সুন্দর আচরণের মাধ্যমে রাসূল (সা:) মানুষের হৃদয়রাজ্য জয় করে নিতেন। মানুষকে কাছে টেনে সত্য ও কল্যাণের পথ দেখাতে মহানবী (সাঃ) কত কষ্ট সহ্য করেছেন তার ইয়ত্তা নেই।

তায়েফের ঘটনা: ক্ষমার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত

চাচা আবূ তালিব যতদিন বেঁচে ছিলেন, মহানবীর প্রতি কোরাইশদের সকল অত্যাচার ও নিপীড়ন তিনি একাই প্রতিহত করতেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর কোরাইশরা রাসূলের জন্য পবিত্র মক্কাভূমি সংকীর্ণ করে দিল। কোরাইশদের পক্ষ থেকে এমন অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতাপূর্ণ আচরণ আসতে লাগল চাচার জীবদ্দশায় মহানবী (সাঃ)  কখনো এর মুখোমুখি হননি।

তখন রাসূল (সাঃ) নতুন কোনো আশ্রয়স্থল খুঁজতে লাগলেন।

রাসূল মনে করেছিলেন, সাকীফ গোত্র তাকে সাহায্য করবে। এ আশায় তিনি একাই তায়েফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যথাসময়ে তিনি তায়েফে পৌঁছলেন। সেখানকার সাকিফ গোত্রের বড় বড় তিনজন নেতার সাথে তিনি সাক্ষাৎ করলেন । তারা ছিল সহোদর ভাই । একজনের নাম আবদে ইয়ালীল, অন্যজনের নাম মাসুদ, আর তৃতীয়জনের নাম হাবীব।

রাসূল (সাঃ) তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন । ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালেন । মক্কার যেসব লোক তার বিরোধিতা করছে তাদের বিরুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তারা কঠোর ভাষায় রাসূল (সাঃ) -এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলো।

একজন বললো, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন তাহলে আমি কাবার গিলাফ ছিঁড়ে ফেলব।’

অন্যজন বললো, “আল্লাহ কি তোমাকে ছাড়া নবী বানানোর মতো আর কাউকেঁ পান নি?’

তৃতীয়জন দার্শনিকের ভঙ্গিতে বললো, ‘আমি তোমার সঙ্গে কথাই বলব না । কারণ তুমি যদি সত্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল হয়ে থাক তাহলে তোমার কথার জবাব দেয়া আমার জন্য বিপজ্জনক! আর যদি তুমি মিথ্যা বলে থাক তাহলে তো তোমার সঙ্গে আমার কথা বলার কোনো প্রয়োজনই নেই।’

তাদের এ অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তর শুনে রাসূল (সা:) তাদের কাছ থেকে চলে এলেন। তিনি সাকীফ গোত্রের কাছ থেকে কল্যাণকর কিছু পাওয়ার আশা ছেড়ে দিলেন। তবে তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, তায়েফবাসীর এ প্রত্যাখানের সংবাদ জানতে পারলে কোরাইশরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠবে। তারা আগের চেয়ে বেশি উৎপীড়ন করবে। তাই তিনি তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা আমার কথা না মান কিংবা আমার সহযোগিতা না কর তাতে আপাতত দুঃখ নেই, কিন্তু আমি যে তোমাদের কাছে এসেছিলাম তা কাউকে জানিয়ে দিয়ো না। এটা গোপন রেখ।’

কিন্তু তারা তা মানল না; বরং রাসূল (সা:)-কে নিপীড়ন করার জন্য তারা নিজেদের কিছু ক্রীতদাস ও নির্বোধ লোককে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল । তারা তাকে গালি দিতে লাগল, চিৎকার করে তাকে বিদ্রূপ করতে লাগল । তাদের এই চেঁচামেচিতে রাসূলের আশপাশে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেল।

এভাবে উপহাস করতে করতে তারা তাকে রাবীয়ার পুত্র ওতবা ও শায়বার একটি বাগান পর্যন্ত নিয়ে গেল। এরপর তারা চলে গেল। রাসূল (সা:) সে বাগানে প্রবেশ করে একটি আঙুর গাছের ছায়ায় হেলান দিয়ে বসে পড়লেন।

পুরো শরীর জুড়ে অসহ্য বেদনা। মনে মনে ভাবছেন কোরাইশদের পরবর্তী আচরণ কেমন হবে, তিনি কিভাবে মক্কায় প্রবেশ করবেন? মহানবী (সা:) আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করলেন-

اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي؟ إِلَى عَدُوٍّ يَتَجَهَّمُنِي؟ أَمْ إِلَى قَرِيبٍ مَلَّكْتَهُ أَمْرِي؟ إِنْ لَمْ تَكُنْ غَضْبَانًا عَلَيَّ فَلَا أُبَالِي، إِنَّ عَافِيَتَكَ أَوْسَعُ لِي، أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلَحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، أَنْ تُنْزِلَ بِي غَضَبَكَ، أَوْ تُحِلَّ عَلَيَّ سَخَطَكَ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ.
হে আল্লাহ! আপনার কাছেই আমি অভিযোগ করছি। আমি হীনবল, দুর্বল ও অসহায়। আমি কোনো কলাকৌশল জানি না। মানুষ আমার পরিচয় জানে না। হে দয়ার সাগর! আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক। আপনি আমারও প্রতিপালক। আপনি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছেন! এমন অচেনা কারো হাতে, যে আমার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করবে, না-কি এমন কোনো শত্রুর হাতে, যার হাতে আমার যাবতীয় বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ দিয়েছেন। আপনি যদি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন তাহলে এতেও আমি কোনো পরোয়া করি না। আপনার দয়া ও নিরাপত্তা তো অনেক প্রশস্ত ও প্রসারিত। আমাকে তাতে শামিল করে নিন। আমি আপনার সত্তার সে নূরের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যার মাধ্যমে সকল অন্ধকার দূরীভূত হয়ে চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে এবং যে আলোর ইশারায় দুনিয়া আখিরাতের সবকিছু পরিচালিত হয়। আমার ওপর যেন আপনার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি না নামে। আপনি খুশি না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার সন্তুষ্টি চাই। সকল ক্ষমতা ও শক্তি আপনারই। আপনার শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া কারো কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই।
📖 সূত্র: আল-মু‘জাম আল-কবীর — ইমাম তাবরানী (হাদিস নং ১৩৮৩৫)

এমন সময় একটি মেঘখণ্ড এসে মহানবী (সাঃ) এর ওপর ছায়া দিতে লাগল । মেঘ থেকে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মহানবী -কে ডেকে বললেন,’হে মুহাম্মদ! আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যা বলেছে এবং তারা আপনার সাথে যে আচরণ করেছে সবই আল্লাহ শুনেছেন এবং দেখেছেন । তিনি পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতাদেরকে প্রেরণ করেছেন। আপনি তাদেরকে যা ইচ্ছা নির্দেশ প্রদান করুন।

মহানবী (সাঃ) কিছু বলার আগেই পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা মহানবী (সাঃ)-কে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! হে মুহাম্মদ! আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যে জবাব দিয়েছে, আল্লাহ তাআলা তা শুনেছেন। আমি পর্বতের দায়িত্বশীল ফেরেশতা। আপনার রব আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনি আমাকে যা খুশি আদেশ দিন।

মহানবী কিছু বলার আগেই পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা নিজেই বললেন, ‘আপনি যদি চান তাহলে মক্কার এ পাহাড়দুটি একত্রিত করে তাদেরকে ধ্বংস করে দিই।’

পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু নবী করীম সালাতের মনের ব্যথা ভুলে এবং প্রতিশোধ স্পৃহাকে হজম করে উদারকণ্ঠে বললেন, ‘না! আমি বরং অপেক্ষা করব। আমি আশা করি, মহান আল্লাহ এদের ঔরশ থেকে এমন প্রজন্ম সৃষ্টি করবেন, যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, অন্য কাউকে তাঁর সাথে শরিক করবে না।’

সাহসী হোন …

আপনার সাথে আপনার সহোদর কিংবা চাচাতো ভাইদের কোনো দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। তারা যদি আপনার ক্ষতিসাধন করে আপনি তাদের উপকার করুন। তারা যদি আপনাকে অপমানিত করে আপনি তাদেরকে সম্মানিত করুন। তারা আপনার বিপদে এগিয়ে না আসলেও আপনি তাদের ডাকে কোমরবেঁধে ছুটে যান। তাদের প্রতি আপনি কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। কেননা, বিদ্বেষপ্রবণ ব্যক্তি কখনো নেতৃত্ব দিতে পারে না। ♦♦♦

উপসংহার

কোমলতা যেকোনো সম্পর্কের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়, আর কঠোরতা সেই সৌন্দর্য কেড়ে নেয়। তাই মন্দের জবাব সবসময় উত্তম আচরণ দিয়ে দিন — দেখবেন শত্রুও একদিন বন্ধু হয়ে যাবে।

অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৩৬তম সূত্র হলো — মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার করুন।

রেফারেন্স

  1. অর্থাৎ তোমাদের আচরণের কারণে সে চলে গেলে হয়তো সে মুরতাদ হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হয়ে যেত। (মুসনাদুল বাযযার)

উৎসজীবনকে উপভোগ করুন এরপর পড়ুন: ভুল সম্পর্ক নিশ্চিত হলে উপদেশগ্রহণ সহজ! coming!

Leave a ReplyCancel reply

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading