“আমার সন্তান এখনও ঠিকমতো কথা বলে না। কিছু শব্দও পরিষ্কার করে বলতে পারে না। এটা কি স্বাভাবিক?”
শিশুর কথা বলা ও উচ্চারণ নিয়ে এমন চিন্তা অনেক বাবা-মায়েরই থাকে। কেউ ভাবেন, বয়স বাড়লে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। আবার কেউ অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
প্রথমেই মনে রাখা দরকার, প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা। তাই একটি নির্দিষ্ট বয়সে কোনো শব্দ ঠিকভাবে বলতে না পারলেই শিশুর সমস্যা আছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর কথা বলা, কথা বোঝা এবং শব্দের উচ্চারণ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর কথা বলা ও উচ্চারণ সমস্যা: একটি নাকি দুটি ভিন্ন বিষয়?
না, দুটো বিষয় আলাদা হতে পারে। কথা বলার সমস্যা বলতে বোঝাতে পারে—শিশু বয়স অনুযায়ী খুব কম কথা বলছে, নতুন শব্দ শিখছে না, শব্দ মিলিয়ে বাক্য তৈরি করতে পারছে না অথবা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে।
অন্যদিকে উচ্চারণের সমস্যা হলো শিশু কথা বলছে, কিন্তু কিছু শব্দ বা ধ্বনি সঠিকভাবে বলতে পারছে না। ফলে তার কথা পরিবারের সদস্য বা অন্য মানুষের বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।
কখনও একটি শিশুর একই সঙ্গে কথা বলা ও উচ্চারণ—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা থাকতে পারে।
শিশুর কথা বলায় সমস্যা কীভাবে বুঝবেন?

শিশুর ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন—
বয়স অনুযায়ী খুব কম শব্দ ব্যবহার করছে
নতুন শব্দ শেখার গতি খুব কম
দুই বা তার বেশি শব্দ মিলিয়ে কথা বলতে পারছে না
সহজ কথা বা নির্দেশ বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে
নিজের প্রয়োজন বোঝাতে কথা বা ইশারা ব্যবহার করছে না
কথা বললেও বেশিরভাগ সময় বোঝা যাচ্ছে না
আগে শেখা শব্দ বা কথা পরে আর বলছে না
শিশুর ক্ষেত্রে শুধু কতগুলো শব্দ বলতে পারে তা নয়, সে কীভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর উচ্চারণ সমস্যা কীভাবে বুঝবেন?
শিশু কথা বলছে, কিন্তু কিছু শব্দ বারবার ভুলভাবে বলছে কি না লক্ষ্য করুন। যেমন, কোনো শব্দের একটি ধ্বনি বাদ দেওয়া, একটি ধ্বনির জায়গায় অন্য ধ্বনি ব্যবহার করা বা শব্দকে খুব বেশি পরিবর্তন করে বলা—এসব হতে পারে।
ছোট শিশুদের কিছু ধ্বনি পুরোপুরি পরিষ্কারভাবে বলতে সময় লাগতেই পারে। তাই অল্প বয়সে কিছু উচ্চারণ ভুল হলেই সেটিকে সমস্যা বলা যায় না।
তবে বয়স বাড়ার পরও যদি শিশুর কথা খুব অস্পষ্ট থাকে, একই ধরনের ভুল বারবার হয় অথবা পরিবারের বাইরের মানুষ তার কথা বুঝতে খুব কষ্ট পান, তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বয়স অনুযায়ী শিশুর কথা বলার বিকাশ: কোন বয়সে কী লক্ষ্য করবেন?
প্রায় এক বছর বয়সে
শিশু বিভিন্ন ধরনের শব্দ করছে কি না, পরিচিত মানুষের কণ্ঠে সাড়া দিচ্ছে কি না এবং ইশারা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করছে কি না লক্ষ্য করুন।
এক থেকে দেড় বছর বয়সে
শিশু পরিচিত কিছু শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করতে পারে এবং সহজ কথা বুঝতে পারে। দেড় থেকে দুই বছর বয়সে এই সময়ে শিশুর শব্দভান্ডার বাড়তে থাকে। অনেক শিশু দুই বা তার বেশি শব্দ একসঙ্গে ব্যবহার করতে শুরু করে। যেমন—
“মা দাও।”
“পানি চাই।”
“বাবা আসো।”
দুই থেকে তিন বছর বয়সে
শিশু সাধারণত আরও বেশি শব্দ ব্যবহার করে এবং ছোট বাক্যে নিজের প্রয়োজন ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। পরিচিত মানুষ তার কথা অনেকটাই বুঝতে পারেন।
তিন থেকে চার বছর বয়সে
শিশু নিজের অভিজ্ঞতা বলতে, প্রশ্ন করতে এবং ছোট গল্প বলতে আরও দক্ষ হয়। তার কথা আগের তুলনায় পরিষ্কার হতে থাকে।
চার থেকে পাঁচ বছর বয়সে
শিশু আরও দীর্ঘ বাক্যে কথা বলতে পারে এবং কোনো ঘটনা নিজের মতো করে বলতে পারে। অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনও আরও সহজ হয়। মনে রাখবেন, এগুলো সাধারণ বিকাশের দিকনির্দেশনা। সব শিশু একই সময়ে একই দক্ষতা অর্জন করে না।
কখন বিশেষভাবে সতর্ক হবেন: ৮টি সতর্কীকরণ লক্ষণ
নিচের কোনো বিষয় থাকলে শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো—
১. বয়স বাড়লেও নতুন শব্দ শিখছে না।
২. কথা বলার দক্ষতার উন্নতি হচ্ছে না।
৩. আগে বলতে পারা শব্দ বা কথা হারিয়ে ফেলছে।
৪. সহজ নির্দেশ বুঝতে সমস্যা হচ্ছে।
৫. ডাকলে নিয়মিত সাড়া দিচ্ছে না।
৬. শিশুর কথা পরিবারের মানুষও বেশিরভাগ সময় বুঝতে পারছেন না।
৭. একই ধরনের উচ্চারণের ভুল দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাচ্ছে।
৮. নিজের প্রয়োজন বোঝাতে খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছে।
শ্রবণশক্তির সমস্যা কি কথা বলায় দেরির কারণ হতে পারে?
শিশু কথা বলতে দেরি করলে শুধু মুখের কথা বা উচ্চারণের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়। সে ঠিকভাবে শুনতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু যদি ডাকলে বারবার সাড়া না দেয়, শব্দের উৎসের দিকে না তাকায় অথবা কিছু শব্দ শুনতে পায় কিন্তু অন্য শব্দে সাড়া না দেয়—তাহলে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
কারণ শিশু অন্যের কথা শুনে এবং অনুকরণ করে ভাষা শেখে। তাই শ্রবণশক্তির সমস্যা থাকলে কথা শেখার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
শিশুর কথা বলা ও উচ্চারণ উন্নত করতে বাবা-মা বাড়িতে যা করতে পারেন
শিশুর সঙ্গে বেশি কথা বলুন
আপনি যা করছেন তা শিশুকে বলুন।
“এখন আমরা খাবার খাব।”
“তুমি লাল বলটা নিয়েছ।”
“চলো, বাইরে যাই।”
এতে শিশু দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক বুঝতে শেখে।
প্রতিদিন বই পড়ুন
ছবির বই নিয়ে শিশুর সঙ্গে গল্প করুন। তাকে প্রশ্ন করুন এবং উত্তর দেওয়ার জন্য সময় দিন।
শিশুকে কথা বলার সুযোগ দিন।
শিশু কিছু চাইলে সবসময় তার হয়ে কথা না বলে তাকে নিজের মতো করে বোঝানোর সুযোগ দিন।
সে ইশারা করলে সেই ইশারাকে শব্দে প্রকাশ করে দিন।
যেমন—
“তুমি পানি চাও? এই নাও পানি।”
খেলার সময় কথা বলুন
খেলতে খেলতে শিশুর সঙ্গে কথা বলা ভাষা শেখার একটি আনন্দময় উপায়। গাড়ি নিয়ে খেললে বলতে পারেন—
“গাড়ি যাচ্ছে।”
“গাড়ি থামল।”
“লাল গাড়ি।”
এভাবে ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করুন।
ভুল উচ্চারণ নিয়ে বকাঝকা করবেন না
শিশু কোনো শব্দ ভুল বললে তাকে বারবার “ভুল হয়েছে” বলার প্রয়োজন নেই। শিশু যদি কোনো শব্দ ভুলভাবে বলে, আপনি স্বাভাবিকভাবে সঠিক শব্দটি ব্যবহার করুন। এতে শিশু চাপ ছাড়াই সঠিক উচ্চারণ শুনতে ও অনুকরণ করতে পারে।
শিশুর কথা শেষ করতে দিন
শিশু ধীরে কথা বললে বা শব্দ খুঁজতে সময় নিলে তার হয়ে বাক্য শেষ করে দেবেন না। তাকে সময় দিন। শিশু যেন মনে না করে যে কথা বলার সময় তাকে তাড়াহুড়া করতে হবে।
মোবাইলের বদলে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ান
শিশুর ভাষা শেখার জন্য বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, খেলাধুলা করা, গল্প শোনা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিশুকে দীর্ঘ সময় একা পর্দার সামনে বসিয়ে রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন: স্কুল কলেজে মোবাইল নিষিদ্ধ কি অত্যাবশ্যক?
একাধিক ভাষায় কথা বললে কি শিশুর কথা বলায় সমস্যা হয়?
অনেক বাবা-মা মনে করেন, বাড়িতে দুই বা তার বেশি ভাষা ব্যবহার করলে শিশুর কথা বলতে দেরি হয়। শুধু একাধিক ভাষা শোনার কারণে শিশুর কথা বলার সমস্যা হয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। বাবা-মা যে ভাষায় সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ, সেই ভাষায় শিশুর সঙ্গে নিয়মিত ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলুন।
শিশু একাধিক ভাষা শিখলে তার শব্দ ব্যবহারের ধরন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তাই একটি ভাষায় সে কতগুলো শব্দ বলছে, শুধু সেটি দিয়ে তার ভাষার বিকাশ বিচার করা ঠিক নয়।
শিশুর কথা বলা ও উচ্চারণ সমস্যায় কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
আপনার মনে যদি বারবার হয় যে শিশুর কথা বলা বা উচ্চারণ বয়স অনুযায়ী এগোচ্ছে না, তাহলে অপেক্ষা না করে শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজনে শিশুর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা এবং কথা বলা ও ভাষার বিকাশ মূল্যায়ন করা যেতে পারে। কথা বলা ও উচ্চারণের সমস্যা থাকলে বাক্ ও ভাষা বিকাশের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া মানেই শিশুর বড় কোনো সমস্যা আছে—এমন নয়। বরং সময়মতো মূল্যায়ন করলে শিশুর কোথায় সাহায্য প্রয়োজন তা বোঝা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: সন্তানের সঙ্গে যা মনে রাখবেন
শিশুকে অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করবেন না। বরং তার নিজের পরিবর্তন লক্ষ্য করুন।
- সে কি নতুন শব্দ শিখছে?
- সে কি আপনার কথা বুঝতে পারছে?
- সে কি নিজের প্রয়োজন বোঝাতে পারছে?
- তার উচ্চারণ কি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে?
- সে কি অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে?
- সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন দক্ষতা যোগ হচ্ছে কি?
শিশুর কথা বলতে বা উচ্চারণ করতে দেরি হলে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন, তাকে মন দিয়ে শুনুন, কথা বলার জন্য সময় দিন এবং প্রয়োজন মনে হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সময়মতো সঠিক সহায়তা পেলে শিশুর যোগাযোগ ও ভাষার দক্ষতা উন্নত হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।
শিশুর কথা বলা ও উচ্চারণ সমস্যা: সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
শিশু কম কথা বললে কি এটা এমনিতেই সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে?
প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা, তাই একবারে চিন্তার কিছু নেই। তবে শুধু অপেক্ষা না করে, সময়ের সাথে সাথে শিশুর কথা বলা, বোঝা ও উচ্চারণ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে কি না—সেটা লক্ষ্য রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাসায় বসে কীভাবে বুঝব শিশুর অগ্রগতি সঠিক পথে আছে?
লক্ষ্য করুন—শিশু নতুন শব্দ শিখছে কি না, আপনার কথা বুঝতে পারছে কি না, নিজের প্রয়োজন বোঝাতে পারছে কি না এবং সময়ের সঙ্গে নতুন দক্ষতা যোগ হচ্ছে কি না।
অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করে বিচার করা কি ঠিক?
না, প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি ভিন্ন। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে নিজের সন্তানের নিজস্ব পরিবর্তন ও অগ্রগতির দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সতর্কীকরণ: এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। কোনো শিশুর ব্যক্তিগত সমস্যা নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।