কাজী অ্যাডাম’র নির্বাচিত কবিতা

“পৃথিবীর স্তন বেঁয়ে দুঃখ ঝরে”—যেখানে কবিতা শুধু অনুভূতির ভাষা নয়, বরং মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, শোক, স্মৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সাহসী উচ্চারণ। কবি কাজী অ্যাডামের এই কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কয়েকটি কবিতা তুলে ধরা হলো এখানে।

কাজী অ্যাডাম’র নির্বাচিত কবিতা ‘পৃথিবীর স্তন বেঁয়ে দুঃখ ঝরে’—বাংলা কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ; সমকালীন বাংলা কবিতা, মানবিক বেদনা, সমাজ, রাষ্ট্র, অস্তিত্বের সংকট, প্রতিবাদ, দুঃখ, স্মৃতি, শোক, ভালোবাসা ও সামাজিক অসঙ্গতির প্রতীকী উপস্থাপন।
“পৃথিবীর স্তন বেঁয়ে দুঃখ ঝরে”—যেখানে কবিতা শুধু অনুভূতির ভাষা নয়, বরং মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, শোক, স্মৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সাহসী উচ্চারণ।

অস্তিত্বের অবসান ফর্ম

সে একদিন অনুভব করল,
সে আর নেই।
তার কবিতা কেউ পড়ে না,
তার ভাবনা কেউ শোনে না,
তার উপস্থিতি কেউ টের পায় না।

তখনই সে নিজেই আবেদন করল
অস্তিত্বের অবসান ফর্ম–এ।
ফর্মটি ছিল সরল—
“আপনি কেন আর থাকতে চান না?”
সে লিখল, “কারণ আমি থাকলেও কেউ জানে না।”

“আপনার অনুপস্থিতি কি রাষ্ট্রের ক্ষতি করবে?”
“না।”
“তাহলে আবেদন গ্রহণযোগ্য।”

তার অস্তিত্বকে দেওয়া হলো
একটি সময়সীমা—
আগামী শুক্রবার, বিকেল ৩টা।
তারপর সে থাকবে না,
কিন্তু তার ফাইল থাকবে।

শেষে সে ভাবল,
এই অবসান কি
তার নিজের সিদ্ধান্ত,
নাকি রাষ্ট্রের অনুমোদিত অনুপস্থিতি?

খসড়াধ্বনি: তুমি কি এখনো আছো? না কি তোমার অস্তিত্বের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে?

চিন্তা এখন বিজ্ঞাপনের দাস

চিন্তা একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে—
তার মাথায় কেউ বসে আছে,
একটি স্লোগান,
যা সে নিজে লেখেনি,
তবু প্রতিদিন উচ্চারণ করে।

সে কথা বলতে চায়,
কিন্তু জিভে একটি লোগো—
“অ্যাপ্রুভ বাই সাইলেন্স অথোরটি”
তার কণ্ঠস্বর এখন
একটি সাবস্ক্রিপশন সেবা,
প্রতিমাসে দিতে হয়
নিজের মতামতের মূল্য।

সে দরজা খুলতে চায়,
কিন্তু দরজার হাতল এখন
একটি পণ্যের ব্র্যান্ড।
তার হাত ছুঁতেই বলে—
“আপনার স্পর্শ আমাদের গর্ব।”

সে প্রতিবাদ করতে চায়,
কিন্তু প্রতিবাদের ফর্মে লেখা—
“আপনার অভিযোগটি
বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহৃত হবে।”

চিন্তা আদালতে যায়,
অভিযোগ করে—
“আমি স্বাধীন ছিলাম।”
বিচারক হেসে বলেন—
“আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন
আপনার কোনো চিন্তা একেবারে অরিজিনাল?”

রাতে, চিন্তা আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
সে নিজের মুখ দেখতে চায়,
কিন্তু সেখানে শুধু একটি QR কোড।
সে স্ক্যান করে,
আর একটি নতুন চিন্তা আসে—
“আপনি যা ভাবছেন, সেটাই আমরা বিক্রি করছি।”

তার চোখে জল আসে,
জলটিও বোতলবন্দি,
লেবেলে লেখা—
“ইমোশন™ – ১০০% খাঁটি ব্যাথা”

শেষে, সে একটি বাক্য খুঁজে পায়,
একটি বাক্য যা সবকিছু বলে,
সবকিছু চেপে রাখে,
সবকিছু বিক্রি করে:
সাইলেন্স™ – মেইড ইন বাংলাদেশ।

খসড়াধ্বনি: তুমি কি কখনো নিজের চিন্তা নিজে লিখেছো, না কি কেউ লিখে দিয়েছে তোমার হয়ে? তুমি যা ভাবো, তা কি তোমার, না সমাজের ছাঁচে গড়া?

চোখের ভেতর মাছ

একটা মাছ সাঁতরে বেড়ায় আমার চোখের ভেতর,
সে শুধু জল খোঁজে না—
সে খোঁজে স্মৃতি,
যেগুলো আমি ডুবিয়ে রেখেছি
একটা অপরাধের অ্যাকুয়ারিয়ামে।

সে দেখে স্বপ্ন,
যেখানে মানুষ উড়ছে,
কিন্তু মাটিতে তাদের ছায়া নেই।
আর পাখিরা হাঁটে আদালতে,
তাদের ঠোঁটে আইন,
তাদের ডানায় রায়।

আমি কাঁদি না।
কারণ জল মানেই বিপদ।
জল মানেই ফাঁস হওয়া,
জল মানেই প্রমাণ।

আমার কান দিয়ে বেরিয়ে আসে
একটা পুরনো গান,
যার প্রতিটি সুর
একটা অতীত প্রতারণার আলিবি বহন করে—
যেন গানের ভেতর লুকিয়ে আছে
একটা মৃত ভালোবাসার নোট।

আমি জানি,
এই মাছটা শুধু সাঁতরে বেড়ায় না,
সে সাক্ষ্য দেয়।
সে আমার চোখে থেকে
আমার অপরাধের দৃশ্যপট আঁকে।

আর আমি তাকিয়ে থাকি,
নিজের চোখের ভেতর,
যেখানে জল নেই,
তবু ডুবে যাচ্ছি।

খসড়াধ্বনি: তোমার চোখে কি শুধু আলো পড়ে? নাকি সেখানে সাঁতরে বেড়ায় এক মাছ— যে জানে তুমি কী ভুলে থাকতে চাও?

আব্বার কবরের ঘ্রাণ

আব্বাকে রেখে এলাম
শুক্রবারে একটা নিঃশব্দ সন্ধ্যায়
চিরঘুমের মাটির ঘরে,
যেখানে ফেরেশতার পায়ের শব্দ
শোনা যায় ফজরের পূর্বে,
আর সূর্য নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে
একটা বিকেলের শেষে।

তারপর থেকে
আমার ঘুমের ভেতর ঢুকে পড়ে
একটা কাঁচা কবরের গন্ধ— যেন রুহের দেহে
মাটি ও আকাশের সন্ধি,
যেন পুরোনো জামার ভাঁজে
আব্বার কণ্ঠস্বর লুকিয়ে আছে।

রাতের গভীরে
আমি শুনি সেই কণ্ঠ—”চাচা মিয়া, মনে রাইখ্যো—
বেডার মতো বেডা অইলে সব কাপড়েই সুন্দর লাগে।”

আমি বলি—”আব্বা, মাটির নিচে
আপনার দিন কেমন কাটে?
আমারে ছাড়া কি আপনার সন্ধ্যা আসে?”

আব্বা হাসেন,
হাতে এক বাটি জয়তুন তেল,
এক টুকরো কেক, আর ঠোঁটে এক কাপ চায়ের ইশারা।

আর আমি জিজ্ঞেস করি—”ফজরের নামাজ কি এখনো
সকাল বেলা কাযা করেন?”

আব্বা হাসেন, আর সেই হাসির ভেতর
এক অজানা ফুলের সুবাস
আমার নাকে লাগে—যেন জান্নাতের বাগানে
একটি দরজা খুলে গেছে,
যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া বাগান
আমার বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছে।

আব্বা,
আপনি চলে গেছেন,
আর আমি শিখে গেছি
কিভাবে শোককে
একটা কবিতায় রূপ দিতে হয়
যা জেগে থাকে সব ঘুমের ভেতর।

আপনার মাটির পৃথিবী হ‌ওয়ার দামে
আমার পৃথিবী এখন
বড্ড ছোট,
বড্ড একা,
আর বড্ড বেশি আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।

খসড়াধ্বনি: তোমার আব্বার ছোট ছোট অভ্যাসগুলো কি এখনো জেগে থাকে? তোমার ঘুমেও কি কবরের ঘ্রাণ ঘোরে বেড়ায়— জয়তুন তেলের মতো, এক কাপ চায়ের মতো, একটা অজানা ফুলের সুবাস হয়ে?

পৃথিবীর স্তন বেঁয়ে দুঃখ ঝরে

পৃথিবীর স্তন বেয়ে ঝরে পড়ে দুঃখ—
এটা কোনো অমৃত নয়,
এটা সেই দুধ,
যা শিশুর মুখে পৌঁছায় না,
শুধু বিলিয়ে দেয়
একটা রাষ্ট্রের বিজ্ঞাপন।

আমি দেখেছি,
একজন জননী দাঁড়িয়ে আছে
একটি হাসপাতালের করিডরে,
তার বুক থেকে ঝরে পড়ছে
একটি কবিতা,
যা কেউ পড়ে না,
শুধু ফাইল করে রাখে
একটি প্রশাসনিক আলমারিতে।

এই স্তন একদিন ছিল
মাটির মতো উর্বর,
আজ তা হয়ে গেছে
একটি ভোটের বাক্স,
যেখানে দুঃখ জমা পড়ে
ব্যালটের মতো—
গোপন, অথচ গণনা-অযোগ্য।

আমি একদিন সেই স্তনের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম,
আর দেখেছি—
দুধ নয়,
ঝরে পড়ছে
একটি মৃত সন্তানের নাম,
একটি অসমাপ্ত সংবিধান,
একটি কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তি।

খসড়াধ্বনি: তুমি কি কখনো এমন কোনো স্তনের সামনে দাঁড়িয়েছো, যা অমৃত নয়, একটি রাষ্ট্রীয় দুঃখের উৎস? যেখানে মাতৃত্ব মানে একটি ব্যথার প্রবাহ, আর কবিতা মানে একটি রিপোর্ট, যা কেউ পড়ে না— শুধু সিল মারে?


বইটি সংগ্রহ করুন

কাজী অ্যাডামের সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ “পৃথিবীর স্তন বেঁয়ে দুঃখ ঝরে” (৯টি অধ্যায়ে ২০০+ কবিতা, প্রকাশনী: জেনজি পাবলিশার্স) সংগ্রহ করতে পারেন নিচের যেকোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে:

বইটি বর্তমানে সাময়িকভাবে স্টক আউট থাকতে পারে — চাহিদার কারণে দ্রুত রিস্টক হয়, তাই পেজে গিয়ে “নোটিফাই মি” বা পরে আবার চেক করার সুযোগ রয়েছে।

Leave a ReplyCancel reply

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading