আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৩৭তম সূত্রটি পড়ুন। কাউকে উপদেশ দিতে গিয়ে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে? বারবার বলার পরেও কেউ শুনছে না? সমস্যা উপদেশে নয় — সমস্যা পদ্ধতিতে। ভুল সম্পর্কে নিশ্চিত হলে উপদেশগ্রহণ সহজ হয় — ওসামার ঘটনা থেকে যুবকের অবিশ্বাস্য রূপান্তর পর্যন্ত রাসূল (সাঃ)-এর অসাধারণ পদ্ধতি জানুন।
অযাচিত উপদেশ কেন বিরক্তিকর?
কিছু মানুষ এমন আছে, যারা অন্যের ব্যাপারে বেশি ব্যস্ত। অন্যদের ভুল ধরতে তারা খুব তৎপর। এ কারণে তাদের প্রতি লোকজন খুব বিরক্ত হয়। বিশেষ করে যখন তাদের মন্তব্য ও উপদেশ ব্যক্তিগত রুচি ও নিজস্ব ভাবনা নির্ভর হয়, তখন তো তা অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে যায়।
বৌভাতের আয়োজনে সমালোচনার উদাহরণ
মনে করুন, আপনি ও আপনার পরিবারের সদস্যরা অনেক পরিশ্রম করে এবং অনেক টাকা খরচ করে একটি বৌভাতের আয়োজন করলেন। অতিথিদের একজন আপনাকে বললো, ‘টাকা তো অনেক খরচ করলেন কিন্তু আয়োজনটা সুন্দর হলো না। আমার মনে হচ্ছে, আপনার পণ্ডশ্রম হয়েছে। চেষ্টা করলে আয়োজনটা আরো উন্নত করতে পারতেন।’
আপনি তার কাছে কারণ জানতে চাইলে সে বললো, ‘দেখুন! গোস্তের আইটেমগুলো অধিকাংশ ছিল ভুনা। কিন্তু আমি সেদ্ধ বা ঝলসানো গোস্ত পছন্দ করি। লেবু বেশি হওয়ার কারণে সালাদটা টক হয়ে গেছে। এটা আমার একদম পছন্দ নয়। এরপর দেখুন, মিষ্টান্নগুলোতে ক্ৰীম দেয়ায় স্বাদই পাল্টে গেছে!’
সে আরো বললো, ‘বেশির ভাগ লোকই এগুলো খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে নি। তারা কেবল সৌজন্য রক্ষার্থে কিংবা বাধ্য হয়ে খেয়েছে।
চিন্তা করে দেখুন, তাঁর এ জাতীয় মন্তব্যে আপনার মনের অবস্থাটা কেমন হবে? আপনি তার কথায় অবশ্যই বিরক্তিবোধ করবেন। তার কোনো পরামর্শই আপনি শুনবেন না। কেননা, তাঁর প্রত্যেকটা মন্তব্যের পেছনে কাজ করেছে তার নিজস্ব রুচি ও ভাবনা।
এমনই বিরক্তিকর আরেক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা নিজ পরিবারের সঙ্গে যেমন আচরণ করে, অন্যদের সঙ্গেও তেমন আচরণই কারতে চায়। সবাইকে উপদেশ দিতে যায়, সবখানে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। কেউ বাড়ি বানাবে বা গাড়ি কিনবে, সেখানেও সে নিজের ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।

সবসময় মনে রাখবেন, এ জাতীয় সমালোচনা ও উপদেশ ব্যক্তির নিজস্ব রুচির ওপর নির্ভরশীল। তবে কেউ যদি আপনার কাছে পরামর্শ চায় বা আপনার অভিমত জানতে চায়, সেক্ষেত্রে আপনি নিজের সঠিক অভিমত প্রকাশ করুন এবং তাকে একটি সুন্দর উপযোগী পরামর্শ দিন। অনেক সময় দেখা যায়, আপনি যাকে উপদেশ দিতে যাচ্ছেন সে তার নিজের ভুল উপলব্ধিই করতে পারে না। তাকে আপনি শান্তভাবে অকাট্য যুক্তি- প্রমাণের মাধ্যমে তার ভুলটা ধরিয়ে দিন। এতে সে নিজের ভুল অনুভব করতে পারবে।
বেদুঈনের মায়ের সাথে আচরণের উদাহরণ
কয়েকজন ভদ্রলোক একসঙ্গে সমবেত হয়ে বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করছিলেন। জনৈক রুক্ষ প্রকৃতির বেদুঈন পাশে বসে তাদের কথা শুনছিল। এরই মধ্যে এক ভদ্রলোক হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ কর?’
বেদুঈন উত্তর দিল, ‘আমি তো আমার মায়ের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করি।’
‘কেমন ভালো ব্যবহার কর?’
‘আমি তাকে কখনো চাবুক দিয়ে আঘাত করি নি!’
অর্থাৎ সে তার মাকে কখনো প্রহার করলে হাত দিয়ে কিংবা মাথার পাগড়ি দিয়ে আঘাত করে। মায়ের সাথে সদাচরণের স্বার্থে চাবুক দিয়ে তাকে আঘাত করে না! এ হলো সে বেদুঈনের ভালো ব্যবহার!
ভালো-মন্দের মাপকাঠি কিংবা ভুল-নির্ভুলের সঠিক মানদণ্ড কি তাঁর কাছে আছে?
সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও কোমল আচরণ করুন। কেউ ভুল করে ফেললে সুন্দরভাবে তাকে বুঝিয়ে দিন।[১]
রাসূল (সাঃ) যেভাবে ভুল ধরিয়ে দিতেন
রাসূল (সাঃ) সবসময় অকাট্য যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে ভুল ধরিয়ে দিতেন — যেন ব্যক্তি নিজেই তার ভুল অনুভব করতে পারে।
ওসামার সুপারিশের ঘটনা
নবীযুগে, ‘মাখযুম’ গোত্রের জনৈক মহিলা পড়শিদের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস ধার নিত। কিন্তু তা ফিরিয়ে দিত না। পরে তার কাছে জিনিসটি ফেরত চাওয়া হলে সে অস্বীকার করে বসত। সে বলত, ‘আমি তো কিছু ধার করি নি!’ তার এ আচরণ দিনদিন বেড়েই চলল। লোকজন অতিষ্ট হয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করলো। চুরির শাস্তিস্বরূপ রাসূল (সাঃ) তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত দিলেন।[২]
মাখযুম গোত্রের মহিলার ঘটনা
এ মহিলা ছিল কোরাইশ গোত্রের একটি সম্ভ্রান্ত শাখাভুক্ত। তাই কোরাইশ নেতারা হাত কাটার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিল না। তারা এ দণ্ড হালকা করার জন্য রাসূলের কাছে সুপারিশ করতে চাইল। হাত কাটার পরিবর্তে বেত্রাঘাত বা আর্থিক জরিমানার রায় হলে তা সম্ভ্রান্ত গোত্রের এ মহিলা ও তার গোত্রের মান রক্ষা পাবে।
কিন্তু কেউই এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাসূলের কাছে যেতে সাহস করছিল না। কেউ এক পা এগুলে দুই পা পিছিয়ে আসে। অবশেষে তারা ভাবল, এ বিষয়ে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে একমাত্র ওসামা বিন যায়েদই কথা বলতে পারবেন । তিনি এবং তার পিতা যায়দ নবী (সাঃ)-এর -এর ঘরেই লালিত-পালিত হয়েছেন। তারা উভয়ে রাসূলের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। ওসামা রাসূল (সাঃ)-এর নিজ সন্তানের মতোই।
কোরাইশের কিছু লোক বুঝিয়ে শুনিয়ে ওসামাকে এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি করাল।
ওসামা নবী (সা:)-এর কাছে গেলেন। মহানবী (সাঃ) তাকে স্বাগত জানিয়ে নিজের কাছে বসালেন। ওসামা রাসূল (সাঃ)-এর কাছে উক্ত মহিলার দণ্ডাদেশ পরিবর্তন করার ব্যাপারে আলোচনা তুললেন। তিনি বললেন, ‘মহিলাটি যেহেতু সম্ভ্রান্ত বংশীয় তাই একটু অনুগ্রহ করা যেতে পারে।’ ওসামা তার যুক্তি ও আবেদন পেশ করে যাচ্ছিলেন। মহানবী মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনছিলেন। ওসামা যুক্তির মাধ্যমে মহানবী (সাঃ)-এর সামনে তার মতটিকে সঠিক প্রমাণ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে মহানবী (সাঃ) ওসামার দিকে তাকালেন। ওসামা যুক্তি পেশ করছে। কিন্তু সে খেয়ালি করেনি যে, তার দাবিটি অন্যায় ও শরীয়তের নীতিবিরুদ্ধ!
এক পর্যায়ে রাগে মহানবী (সাঃ)-এর চেহারা মোবারক রক্তিম হয়ে গেল। মুখ খুলে প্রথম কথাতেই তিনি ওসামার ভুলটা ধরিয়ে দিলেন। মহানবী বললেন,‘ওসামা! তুমি আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ডবিধি শিথিল করার জন্য সুপারিশ করছ?’[৩]
এ কথা বলে মহানবী (সাঃ) একদিকে যেমন তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন, তেমনি অপরদিকে পরোক্ষভাবে ওসামার প্রতি অসন্তুষ্টির কারণও বলে দিলেন। কেননা, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বান্দার ওপর আরোপিত দণ্ডবিধি পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করা বৈধ নয়।
ওসামা (রাঃ) তার ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমি বুঝতে পারি নি। আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’
দিন গড়িয়ে রাত হলো। রাসূল (সা:) উপস্থিত সাহাবিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। প্রথমে মহান রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা করার পর মহানবী (সা:) বললেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের ধ্বংসের একটি কারণ এও ছিল যে, যখন তাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশীয় কেউ চুরি করত, তারা তার ওপর আল্লাহর বিধান প্রয়োগ করত না। তবে চোর যদি দুর্বল বা নিম্নবর্ণের হতো, তাহলে তার উপর দণ্ডবিধি প্রয়োগ করত। …তোমরা ভালো করে শুনে রেখ, আল্লাহর কসম! যদি আমার কন্যা ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদও চুরি করে, তাহলে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেব।’ এরপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সে মহিলার হাত কাটা হলো।[৪]
আয়েশা (রা:) বলেন, ‘এরপর মহিলাটি আন্তরিকভাবে তওবা করেছিল। কিছুদিন পর তার বিয়েও হয়েছিল। সে মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রয়োজনে আমার কাছে আসা-যাওয়া করত। আমি তার প্রয়োজনের কথা মহানবী (সাঃ)-কে জানাতাম। (সহিহ বুখারী:৩৯৬৫, সহিহ মুসলিম: ৩১৯৭)
ওসামার কালেমা পাঠকারীকে হত্যার ঘটনা
মহানবী (সাঃ)-এর সঙ্গে ওসামা বিন যায়েদের এমন অনেক ঘটনাই আছে। প্রতিটি ঘটনাতেই তার প্রতি মহানবী (সাঃ)-এর দয়া ও উন্নত আচরণের পরিচয় পাওয়া যায়৷ নীচে তেমনই আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
ওসামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে একবার জুহাইনা গোত্রের শাখা ‘আল ওরাকা’ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পাঠালেন। আমরা তাদেরকে পরাজিত করে পলায়নপর যোদ্ধাদের পিছু ধাওয়া করছিলাম। আমি ও জনৈক আনসারি সাহাবি শত্রুপক্ষের একজনের পশ্চাদ্ধাবন করলাম। লোকটি একটি গাছের পেছনে আত্মগোপন করলো। তাকে ধরার পর তরবারি উত্তোলন করতেই সে বলে উঠল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ… ।’
এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার আনসারি সঙ্গী আঘাত না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তরবারি নামিয়ে ফেললেন। আমি ধারণা করলাম, সে মৃত্যুর ভয়ে কৌশল অবলম্বন করছে মাত্র। তাই আমি লোকটিকে হত্যা করে ফেললাম। কালেমা পড়ার পর আমি তাকে হত্যা করেছি বিধায় বিষয়টি আমার মধ্যে শংকা সৃষ্টি করলো। তাই মহানবী সালাত-কে বিষয়টা জানালাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘লোকটি কালেমা পড়া সত্ত্বেও তুমি তাকে হত্যা করলে?
আমি বললাম, ‘আল্লাহর রাসূল! সে তো খাঁটি মনে কালেমা পড়ে নি। সে তা পড়েছিল আত্মরক্ষার্থে।’
রাসূল (সাঃ) আবার বললেন, ‘লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে? সে খাঁটি মনে কালেমা পড়েছে কি-না তা জানার জন্য তুমি কেন তার বুক ফেড়ে দেখলে না?
ওসামা চুপ করে থাকলেন। বাস্তবেই তো তিনি লোকটির বুক ফেড়ে দেখেন নি। তিনি ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে, আর লোকটা তার প্রতিপক্ষ এক যোদ্ধা!’
রাসূল (সা:) ওসামা (রাঃ)-এর দিকে তাকিয়ে বারবার বলছিলেন, ‘লোকটি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে?’ লোকটি কালেমা পড়া সত্ত্বেও তাকে মেরে ফেললে?! কিয়ামতের দিন যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবে তখন তুমি কী করবে? রাসূল (সাঃ) বারবার ওসামাকে একথা বলছিলেন। ওসামা বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাকে এতবার কথাটি বললেন যে, আমি মনে মনে অনুশোচনা করছিলাম, ‘হায়! যদি আমি আজই ইসলাম গ্রহণ করতাম!’ (সহিহ মুসলিমধ ১৪০ )[৫]
দেখুন, রাসূল (সাঃ) কী উদারভাবে তার ভুলটি তুলে ধরে তাকে উপদেশ দিলেন।
আপনি যাকে উপদেশ দিচ্ছেন, যথাসম্ভব তার চিন্তাধারা ও মন- মানসিকতার দিকে খেয়াল রেখে কথা বলবেন। যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন বিষয়টিকে তার দৃষ্টিতে দেখুন। তাহলে আপনি যাকে উপদেশ দিতে চাচ্ছেন সে আপনার কথা সহজে গ্রহণ করবে।
যুবকের জিনার অনুমতি চাওয়ার ঘটনা
মহানবী একদিন এক মজলিসে বসা ছিলেন। তাকে ঘিরে সাহাবিগণও বসে আছেন। হঠাৎ জনৈক যুবক এসে বারবার এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। সে যেন কাউকে খুঁজছে। আল্লাহর রাসূলের ওপর তার চোখ পড়তেই সে তাঁর দিকে অগ্রসর হলো। সে মজলিসে বসে নসিহত শুনবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সে তা করলো না। সে মহানবী (সাঃ) ও তার পাশে বসা সাহাবায়ে কিরামের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
এরপর হঠাৎ সে নির্ভীক কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে …. করার অনুমতি দিন ৷’
সে কিসের অনুমতি চেয়েছিল?
ইলমে দীন অর্জনের?
না, সে এর অনুমতি চায় নি। হায়! যদি সে এর অনুমতি চাইত ! তাহলে কি সে বলেছিল, ‘আমাকে জিহাদের অনুমতি দিন, আমি জিহাদে যেতে চাই।’
না, সে তাও বলেনি। হায়! যদি সে এটা বলত!
সে কী বলেছিল? সে বলেছিল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিনা করার অনুমতি দিন’![৬]
কী বলেন! এভাবে সরাসরি স্পষ্ট ভাষায় কেউ এ কথা বলে?!
হ্যাঁ, সে কোনো রাখঢাক না রেখে স্পষ্ট ভাষায়ই বললো, ‘আমাকে জিনার অনুমতি দিন।’
রাসূল যুবকটির দিকে তাকালেন। তিনি চাইলে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে যুবককে নসিহত করতে পারতেন। কিছু উপদেশ বাণী শুনিয়ে তার অন্তরে ঈমানী চেতনা জাগরিত করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। মহানবী (সাঃ) খুব নরমস্বরে তাকে বললেন, ‘আচ্ছা, তোমার মায়ের সঙ্গে কেউ এ কাজ করুক, এটা কি তুমি সহ্য করবে?’
যুবকটি হঠাৎ কেঁপে উঠল। সে কল্পনার চোখে দেখলো তার মা পরপুরুষের সাথে… । সে আর ভাবতে পারল না। সে দৃঢ় কণ্ঠে বললো “না, আমি কখনো তা সহ্য করব না।’
আল্লাহর রাসূল তাকে শান্ত স্বরে বললেন, ‘স্বভাবগতভাবে কোনো মানুষ তার মায়ের সঙ্গে এরূপ আচরণ সহ্য করতে পারে না।
এরপর মহানবী (সাঃ) তাকে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, তাহলে তোমার বোনের সঙ্গে কেউ এ কাজ করুক, এটা কি তুমি সহ্য করবে?’
যুবকটি আবারও শিউরে উঠলো। তার কল্পনায় ভেসে ওঠল তার বোন পরপুরুষের সাথে। সঙ্গে সঙ্গে সে দৃঢ় কণ্ঠে বললো :না, আমার বোনের ক্ষেত্রেও আমি তা কখনো মেনে নিতে পারবো না।’
তখন মহানবী (সাঃ) বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছো। একজন সুস্থ রুচির মানুষ কখনো তার বোনের সঙ্গে এরূপ আচরণ মেনে নিতে পারবে না।’ এরপর মহানবী (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, “আচ্ছা, তাহলে তোমার ফুফুর সঙ্গে কেউ এ কাজ করুক, এটা কি তুমি পছন্দ করবে? ‘আচ্ছা, তাহলে তোমার খালার সঙ্গে কেউ এ কাজ করুক, এটা কি তুমি পছন্দ করবে?’ যুবকটিও নেতিবাচক উত্তর দিতে লাগল।’
তখন মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, “তাহলে তুমি অন্যের জন্য তাই পছন্দ কর, যা নিজের জন্য পছন্দ করছ। অন্যের জন্য তা ঘৃণা কর, যা নিজের ক্ষেত্রে ঘৃণা করছ।
এতক্ষণে যুবকটি বুঝতে পারল যে, সে অনেক বড় ভুলের মধ্যে ছিল!
এবার সে কাতরস্বরে বললো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমার হৃদয়কে পবিত্র করে দেন।’
মহানবী শহরে তাকে কাছে ডাকলেন। যুবকটি ধীরে ধীরে মহানবী মহানবী তার এর কাছে এল। যখন সে একেবারে কাছে এসে বসল, বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! এর অন্তরকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিন। তার যাবতীয় অপরাধ ক্ষমা করে দিন। তাকে অন্যায় কাজ থেকে মুক্ত রাখুন।’ (শুআবূল ঈমান: ৫১৮১)[৭]
মহানবী (সাঃ) -এর দরবার থেকে বের হওয়ার সময় যুবকটির স্বগতোক্তি : ‘আল্লাহর শপথ! আমি যখন রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়েছিলাম, তখন আমার কাছে জিনার চেয়ে প্রিয় অন্য কিছু ছিল না। আর যখন নবী (সাঃ) এর কাছ থেকে বের হলাম তখন আমার কাছে জিনার চেয়ে নিকৃষ্ট আর কিছু মনে হয় নি।
দেখুন, কী অভিনব পদ্ধতিতে মহানবী (সাঃ) তার ভুল ধরিয়ে দিলেন! এরপর আবেগ ও মমতার কী চমৎকার প্রয়োগ করলেন! প্রথমে তার অন্তরে কাজটির জঘন্যতার দৃঢ়প্রত্যয় সৃষ্টি করলেন, যেন সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পরিহার করতে পারে। এরপর তাকে কাছে ডাকলেন। তার বুকে হাত রাখলেন, তার জন্য দোয়া করলেন। এককথায়, তাকে সংশোধন করতে যা যা দরকার সবই তিনি করলেন।
এর ফলে ভবিষ্যতে সে এ কাজ কখনো করবে না। জনসম্মুখেও না, কিংবা নির্জনেও না ৷
উপদেশ কার্যকর করার মূলনীতি
অপরাধী যদি অপরাধের নিকৃষ্টতা উপলব্ধি করতে পারে তাহলে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপদেশ ও নসিহতের প্রয়োজন অনুভব করে। তখন উপদেশ গ্রহণ করা তার জন্য সহজ হয়, উপদেশ হয় কার্যকর।
আরও পড়ুন: মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার করুন | ৩৬তম সূত্র
উপসংহার: ভুল বোঝালে উপদেশ গ্রহণ সহজ হয়
আরও পড়ুন: ভিন্ন মতকে সম্মান করুন — ৩৫তম সূত্র
অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৩৭তম সূত্র হলো — ভুল সম্পর্কে নিশ্চিত হলে উপদেশগ্রহণ সহজ।
এরপর পড়ুন: তিরস্কার করে আর কী লাভ, যা হওয়ার হয়ে গেছে – ৩৮তম সূত্র।
আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে।
উৎস ও আউটসোর্স লিংক
[১] কোমলতা ও সুন্দর আচরণের বিষয়ে হাদিস: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৫৫a। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[২] মাখযুম গোত্রের নারীর চুরির ঘটনা: সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭৫। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৩] ওসামা ইবন যায়েদ (রা.)-এর সুপারিশ এবং রাসূল ﷺ-এর অসন্তুষ্টির ঘটনা: সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৩০৪। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৪] ‘ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ চুরি করলে তাঁর হাত কেটে দিতাম’—সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৪৭৫। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৫] ওসামা (রা.)-এর কালেমা পাঠকারী ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৬a। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑
[৬] এক যুবকের রাসূল ﷺ-এর কাছে জিনা করার অনুমতি চাওয়ার ঘটনা: মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২২২১১। হাদিসের বর্ণনাটি দেখুন ↑
[৭] একই ঘটনায় রাসূল ﷺ যুবকের বুকে হাত রেখে তার জন্য দোয়া করেন। মুসনাদ আহমাদ, হাদিস ২২২১১। হাদিসের বর্ণনাটি দেখুন ↑