গল্পটি দেবর ভাবির পরকীয়া প্রেমের ঘটনার। খালেদ জানতো রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশনা অমান্য করার পরিণতি কত ভয়ংকর হতে পারে ও তার জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা জানার সত্তেও পরিবার ও সামাজিক চাপের কারণে তার ভাইকে ঢাকার একই ফ্লাটে রাখতে হয়েছিলো। অতঃপর কি ঘটিলো? পড়ুন সেই দেবর ভাবির পরকীয়ার ভয়ংকর পরিণতির কাহিনী আমার বাংলা পোস্ট এ।
দেবরের উপস্থিতি কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
অফিসের চেয়ারে বিষণ্ন মনে বসে আছে খালেদ। তার এ অবস্থা দৃষ্টিগোচর হয় সহকর্মী সাজ্জাদের। সে গভীরভাবে লক্ষ্য করছে- আজ ক’দিন যাবত খালেদের মনটা ভালো নেই। ভেবেছিল, খালেদকে এর কারণ জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু নানান ব্যস্ততার কারণে আজও তা জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে আজ তা পাকা সিদ্ধান্ত, যত ব্যস্ততাই থাকুক, খালেদকে তার বিষণ্নতার কারণ জিজ্ঞেস করবেই।

সাজ্জাদ স্বীয় আসন ছেড়ে একটি চেয়ার টেনে খালেদের পাশে বসে। তারপর কাঁধে হাত রেখে গভীর মমতার সুরে বলে-
খালেদ! এখানে চাকুরী নেওয়ার আগ থেকেই আমাদের দু’জনের সম্পর্ক ছিল অতি নিবিড়। বন্ধু হলেও আপন ভাইয়ের মতোই সময় কাটিয়েছি আমরা।
আজ তিন-চারদিন যাবত আমি লক্ষ্য করছি, সর্বদা তুমি চিন্তাযুক্ত থাকো, তোমার চেহারায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ দৃশ্যমান। একজন বন্ধু ও সহকর্মী হিসেবে আমি কি জানতে পারি, তোমার চিন্তার কারণটা কি? মনে রেখো খালেদ! মানুষ মানুষের জন্য। যদি তুমি সুযোগ দাও তাহলে তোমার চিন্তা দূর করার জন্য, যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আমি!
ক্ষণকাল নীরব থেকে খালেদ উত্তর দেয়- সাজ্জাদ! তোমার এ ইচ্ছা ও সুন্দর অনুভুতির জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। স্বীকার করতে দোষ যে, সত্যিকার অর্থেই এ মুহূর্তে আমি এমন একজন নিঃস্বার্থ মানুষের সামনে উপবিষ্ট যার কাছে আমার দুঃখ-বেদনার কথা খুলে বলব, সমস্যার কথা তুলে ধরব; হয়তো সে আমাকে সমস্যা সমাধানের পথ দেখাবে, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবে।
খালেদ নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে । এক কাপ চা ঢেলে সাজ্জাদের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে- সাজ্জাদ! তুমি জান, আট মাসের মতো হলো আমি বিয়ে করেছি। বাসায় আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনই থাকি । কিন্তু সমস্যা হলো ছোট ভাই হাম্মাদকে নিয়ে। সে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশুনা শেষ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। দু’সপ্তাহ পর তার ক্লাস শুরু হবে ।
এদিকে আব্বা-আম্মা দু’জই খুব তাকিদ দিয়ে আমাকে বলছেন, হাম্মাদ যেন অবশ্যই আমার বাসায় থাকে। কারণ তারা আশঙ্কা করেন, সে যদি হোস্টেলে ব্যাচেলরদের সাথে থাকে তাহলে যে কোনো সময় বিপদগামী হতে পারে । কেননা হোস্টেলে ভালো-মন্দ, সৎ-অসৎ, ভদ্র-অভদ্র সবাই থাকে । আর প্রবাদ আছে-
পিতা-মাতার নির্দেশ পালন করা সন্তানের জন্য অপরিহার্য। সেকথা আমি জানি। কিন্তু তারপরেও আমি পিতা-মাতার এই নির্দেশকে মেনে নিতে পারিনি । বরং বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করছি। এতে আমার পিতা- মাতা হয়তো আমার উপর নারাজ হয়েছেন। কিন্তু তথাপি আমার করার কিছুই ছিল না। বলতে পারো, আমি শরীয়তের নির্দেশই পালন করেছি।
সাজ্জাদ! তুমি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তোমাকে বুঝিয়ে বললে বিষয়টি তুমি অবশ্যই বুঝবে। আমি হাম্মাদকে আমার বাসায় যেজন্য রাখতে সম্মত হতে পারিনি তাহলো- হাম্মাদ এখন তরুণ। দিনের অধিকাংশ আমাকে বাইরে থাকতে হয়। অনেক সময় অফিস কিংবা অন্য কোনো কাজে দূরে চলে যাওয়ার কারণে একাধারে পাঁচ-সাত দিন বাসায় আসতে পারি না। আমি যখন বাসায় থাকি না, তখন তোমার ভাবী বাসায় সম্পূর্ণ একা থাকে। এমতাবস্থায় তুমিই বলো, সেখানে একজন তরুণ-যুবকের উপস্থিতি কি বিপদজ্জনক নয়?
তাছাড়া সেদিন আমি একজন প্রখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে সবকিছু বলে এ বিষয়ে ফতুয়া জিজ্ঞেসা করেছিলাম । জবাবে তিনি আমাকে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে বললেন- আমাদের সঙ্গে যেন অবশ্যই দ্বিতীয় কোনো পুরুষকে থাকার সুযোগ না দেই। যদিও সে আমার ভা-ই হোক না কেন ।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: দেবর সম্পর্কে নবীজির সতর্কবার্তা!
তিনি তাঁর এই সতর্কীকরণের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একখানা হাদিস আমাকে শুনিয়েছেন। নবীজি বলেছেন— ‘দেবর মৃত্যুতুল্য।‘ অর্থাৎ দেবর তার ভাবীর জন্য সর্বাধিক ভয়ের কারণ। কেননা দেবর তার স্বামীর অতি নিকটতম আত্মীয় হওয়ার কারণে অবাধে ঘরে যাতায়াত করে এবং কেউ তার উপর সন্দেহও করে না। ফলে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সংঘটিত হয় যতসব অঘটন ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা !
আরেকটি কথা হলো, প্রতিটি মানুষ স্বীয় স্ত্রীকে নিয়ে একান্ত নিরিবিলিতে বসবাস করতে চায় । আর এতেই ষোলআনায় পূর্ণ হয় দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত সুখ। কিন্তু বাসায় হাম্মাদের উপস্থিতিতে আমাদের এই দাম্পত্য সুখ স্বাধীন ও স্বাচ্ছন্দের সাথে উপভোগ করা কতটুকু সম্ভব হবে তা তুমিই একটু চিন্তা করে বলো।
এটুকু বলে খালেদ একটু বিরতি নেয়। তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবার বলতে থাকে- সাজ্জাদ! আমি আমার পিতা-মাতাকে এসব কথা বলে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেছি। তাদেরকে কসম খেয়ে বলেছি, আমি হাম্মাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল ও সাফল্য কামনা করি। ব্যক্তি হিসেবে ওর প্রতি আমার ধারণা মোটেও খারাপ নয়। আমি যা বলেছি, শরীয়তের বিধান মতই বলেছি। আর বলেছি, যৌবনের বাধভাঙ্গা তাড়নার আশঙ্কার প্রতি লক্ষ্য রেখে!
কিন্তু পিতা-মাতা আমার কথায় মোটেও কর্ণপাত করেননি। তারা বরং আমার উপর চরম ক্রুদ্ধ হয়েছেন। এমনকি আত্মীয়-স্বজনের কাছেও আমার ব্যাপারে এটা সেটা বলেছেন। বলেছেন- আমি নাকি তাদের অবাধ্য। আমার হৃদয় নাকি অপরিচ্ছন্ন। যার কারণে আপন ভাইয়ের উপর আমি মন্দ ধারণা পোষণ করছি; অথচ সে আমার স্ত্রীকে বড় বোনের চোখে দেখে!
তারা আরোও বলেছেন- আমি হিংসুটে। ভাইয়ের কল্যাণ চাই না। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করুক সেটাও আমি চাইনা। সাজ্জাদ! সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হলো, আব্বাজান আমাকে এই বলে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে- তোর নিজের বাসায় বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তোর ভাই হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করবে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার। কসম খোদার! হাম্মাদ যদি তোর বাসায় থাকতে না পারে তাহলে আমি এবং তোর মা আজীবন তোর উপর নারাজ থাকব এবং তোর সঙ্গে আমাদের সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করব। শুধু তাই নয়, তোর পিতা-মাতা হিসাবে আমরা কোনোদিন পরিচয়ও দেব না !
সাজ্জাদ! এ কারণে আমি উভয় সংকটে আছি। একদিকে পিতা-মাতার মন খুশি করা এবং অন্যদিকে স্ত্রীর নিরাপত্তা ও পারিবারিক শান্তি অক্ষুন্ন রাখা। বর্তমানে আমার চিন্তা ও বিষণ্নতার কারণ এটিই। একজন কল্যাণকামী বন্ধু হিসেবে আমি তোমার কাছে এই সংকট নিরসনের ব্যাপারে সুন্দর ও সুচিন্তিত পরামর্শ চাই।
সাজ্জাদ সোজা হয়ে বসে বলে- সত্যিই যদি এ বিষয়ে তুমি আমার পরামর্শ চেয়ে থাক তবে কিছু মনে না করলে আমি বলব, তুমি একজন সংশয়ী মনের মানুষ! তাই যদি না হবে তাহলে কোন্ জিনিস তোমাকে বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টিতে বাধ্য করল? তোমার কি জানা নেই যে, আল্লাহর রেজামন্দি পিতা-মাতার রেজামন্দির ভেতর নিহিত? অর্থাৎ তারা খুশি হলে আল্লাহও খুশি, আর তারা নারাজ হলে আল্লাহও নারাজ? আমি তো মনে করি, তোমার ভাই তোমাদের সঙ্গে থাকলে সর্বক্ষেত্রে সে হবে তোমাদের একান্ত সহযোগী।
এতটুকু বলে সাজ্জাদ কথা বন্ধ করে খালেদের চেহারা পানে তাকায় । তারপর সে আবার বলতে থাকে- খালেদ! আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই-কেন তুমি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শুধু শুধু সহোদর ভাইয়ের প্রতি এরূপ খারাপ ধারণা পোষণ করছ? কেনই বা তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছ? তুমি কি ভুলে গেছ কুরআনের সেই অমর বাণী- হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ অনুমান করা থেকে দূরে থাকো । কেননা কোনো কোনো অনুমান পাপ ।
খালেদ! স্বীয় স্ত্রীর উপর কি তোমার কোনো আস্থা নেই? আপন ভাইকে কি তুমি বিশ্বাস করতে পারো না? কেন তুমি তাদের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করছ? অপরের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা কি অন্যায় নয়? জবাব দাও খালেদ, জবাব দাও!
খালেদ বলল, সাজ্জাদ! স্ত্রী এবং ভাই উভয়ের উপর পূর্ণ আস্থাশীল আমি । তাদের প্রতি আমার কোনো খারাপ ধারণাও নেই। কিন্তু… ।
খালেদ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। সাজ্জাদ তার কথায় বাধা দিয়ে বলল, তোমাকে আর কিছুই বলতে হবে না খালেদ। আমি তোমার সব কথাই বুঝতে পেরেছি। আত্মপ্রত্যয়ী হও খালেদ। বাজে ধারণা মন থেকে একদম বাদ দাও। আমি বিশ্বাস করি, হাম্মাদ যদি তোমাদের বাসায় থাকে তাহলে তোমার উপস্থিত-অনুপস্থিত সর্বাবস্থায় সে হবে বাসার বিশ্বস্ত কর্ণধার! ভগ্নীতুল্য ভাবীর সঙ্গে অসৎ কামনা পূর্ণ করার মতো অশুভ চিন্তা আদৌ তার মনে উঁকি দিবেনা ।
খালেদ! তুমি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো তো, হাম্মাদ যদি বিবাহিত হতো তবে কি তুমি কখনো তার স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণের চিন্তা করতে? নিশ্চয়ই করতে না। যদি তাই হয়, তবে কেন তুমি অহেতুক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বাবা, মা ও ভাই-বোনের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ও অশান্তির বীজ বপন করছ? কেন তুমি ব্যাহত করছ পারিবারিক শান্তি- শৃঙ্খলা? তাই আমার সর্বশেষ কথা হলো, বুদ্ধিমানের মতো মাথা থেকে সব রকমের সন্দেহ ও সংশয় ঝেড়ে ফেল। পিতা-মাতাকে খুশি করার চেষ্টা করো। হাম্মাদকে দু’তিন দিনের মধ্যেই তোমাদের বাসায় উঠতে বলো ।
খালেদ! তবে বন্ধু হিসাবে তোমাকে আমি ছোট একটা উপদেশ দেব। সেটা হলো, হাম্মাদের থাকার ব্যবস্থা বাসার সামনের দিকে করবে। তার যাবতীয় প্রয়োজন সারার ব্যবস্থা সেখানেই রাখবে। যাতে কোনো অবস্থাতেই তাকে অন্দর মহলে প্রবেশ করতে না হয়। আর হ্যাঁ, ভাবীকে বলে দিও তিনি যেন তোমার অনুপস্থিতিতে মাঝখানের দরজাটি অবশ্যই বন্ধ রাখেন । তাহলে সবদিক থেকে নিরাপদ।
সাজ্জাদের কথায় খালেদ আশ্বস্ত হয়। তার কথা সে মেনে নেয়। তিনদিন পর। খালেদ হাম্মাদকে খুশিমনে স্বাগত জানিয়ে বাসায় নিয়ে যায়। পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকাজ সম্পন্ন হয়। হাম্মাদ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যায় তার পড়াশুনা ।
দিন গড়িয়ে রাত। রাতের পর দিন। এভাবে দেখতে দেখতে পার হয়ে যায় চার চারটি বছর । খালেদ এখন ত্রিশ বছরের টগবগে যুবক। তিন সন্তানের জনক । অপরদিকে ছোট ভাই হাম্মাদ সফলতার সোনালী সিঁড়ি বেয়ে শিক্ষার শেষ বর্ষে উপনীত। এইতো মাত্র আর ক’টা দিন! মাষ্টার ডিগ্রি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাবে হাম্মাদ। শুরু হবে তার নতুন করে পথ চলা। খালেদ তাকে কথা দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়েই তাকে উপযুক্ত চাকুরীর ব্যবস্থা করবে এবং বিয়ে করার আগ পর্যন্ত তার বাসাতেই থাকবে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: বিশ্বাসের অপব্যবহার ও ষড়যন্ত্র
এক রাতের কথা। প্রচণ্ড গরম। সারাদিনের কর্ম-ব্যস্ততার পর বাসায় ফিরছে খালেদ। হঠাৎ গাড়ির কাঁচ গলিয়ে সহসা তার দৃষ্টি পড়ে রাস্তার অদূরে অস্পষ্ট দু’টি ছায়া-মূর্তির উপর। তাদের কাছাকাছি হওয়ার পর খালেদ দেখল, এক বৃদ্ধা ও তার এক যুবতী মেয়ে চিৎকার করে কাঁদছে । খালেদ জিজ্ঞেস করল, আপনাদের কী হয়েছে? কাঁদছেন কেন?
বৃদ্ধা অসহায় কণ্ঠে বলল, ভাই! এই যুবতী আমার মেয়ে । আমি তাকে নিয়ে এখন এক কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। তুমি দয়া করে আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো ।
কী বিপদ জানতে চাইলে বৃদ্ধা বলল, মাত্র তিনদিন হলো আমরা এই শহরে এসেছি। স্থানীয় কারো সাথে আমাদের এখনো কোনো পরিচয় হয়নি আমার মেয়ে গর্ভবতী। ডাক্তারের হিসেব অনুযায়ী আরো একমাস পর তার সন্তান জন্ম হওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানি নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ওর প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছে। ব্যথার প্রচণ্ডতায় ও এখন মরনোন্মুখ। ওর স্বামী বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গেছে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই। আর আমার মতো বৃদ্ধার পক্ষেও তা সম্ভব নয়। তাই মেহেরবানী করে তুমি যদি আমাদেরকে নিকটবর্তী কোনো হাসপাতালে পৌঁছে দাও তাহলে চিরজীবন আমরা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব ।
বৃদ্ধা ও তার মেয়ের করুণ অবস্থা দেখে খালেদের চোখেও পানি এসে যায়। হৃদয়ে বয়ে যায় বেদনার ঝড়। তাই সে কালক্ষেপণ না করে বৃদ্ধার সহযোগিতায় যুবতীকে গাড়িতে উঠিয়ে তীব্রগতিতে হাসপাতালের দিয়ে গাড়ি হাকায় । চলন্ত পথে বৃদ্ধা জননী সারাক্ষণই খালেদসহ তার পরিবারের সবার জন্য মঙ্গল ও বরকতের দোয়া করে। খানিক পরই তারা পৌঁছে যায় হাসপাতাল চত্বরে।
হাসপাতালের প্রয়োজনীয় কাজ শেষে যুবতীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় । স্বাভাবিক প্রসব অসম্ভব বিদায় সিজারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করার পূর্ব মুহূর্তে যুবতী মেয়েটি খালেদের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর কান্নাভেজা কণ্ঠে মিনতি জানায়- আপনি কিন্তু অপারেশনের সফলতা ও নবজাতকের সুস্থতার খবর না জেনে এই অসহায় বৃদ্ধা ও তার অবলা কন্যাকে ফেলে চলে যাবেন না !
জবাবে খালেদ বলে- না, তোমাদেরকে ফেলে অবশ্যই চলে যাব না । আমি পুরুষদের ওয়াটিং রুমে অপেক্ষা করব । নবজাতক ও তোমার সুস্থতার সুসংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ব বা। আমি তোমাদের জন্য দোয়া করছি। তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করো ।
মেয়েটি ভিতরে চলে গেল । এদিকে খালেদ তার স্ত্রীকে ফোন করে জানিয়ে দিল, আমার বাসায় ফিরতে একটু বিলম্ব হতে পারে। তুমি আমার জন্য কোনো রকম দুশ্চিন্তা করো না। ঘুম আসলে ঘুমিয়ে যেও। কেমন ?
ওয়াটিং রুমে ঢুকে দেয়ালে হেলান দিতেই খালেদের দু’চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। ঘুমের ঘোরে কতো সময় কেটে গেছে, তার কিছুই বলতে পারবে না খালেদ। কিন্তু ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যে দৃশ্য সে অবলোকন করল তা আমরণ তার স্মৃতিপটে অক্ষয় হয়ে থাকবে। সে দেখল- অপারেশনের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার ও নিরাপত্তা বিভাগের দু’জন অফিসার তার দিকে দ্রুতপদে এগিয়ে আসছে। সাথে আছে তরুণীর বৃদ্ধা জননী; যিনি হাতের ইশারায় খালেদকে দেখিয়ে বলছেন, এই সেই নরপিচাশ! এই সেই পাষণ্ড!!
ঘটনার আকস্মিকতায় খালেদ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে। কি করবে সে কিছুই বুঝতে পারে না । অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে আসন ছেড়ে ওঠে দাঁড়ায়। তারপর বৃদ্ধার দিকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে— অপারেশন সফল তো? বাচ্চা ও বাচ্চার মা সুস্থ আছে তো? বাচ্চা কি ছেলে না মেয়ে? খালেদের প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধা কিছুই বলল না। বলার সুযোগও পেল না । তার আগেই নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান আগে বেড়ে জিজ্ঞেস করলেন- আপনিই কী জনাব খালেদ?
: জি-হ্যাঁ । খালেদের সরল উত্তর ।
: তাহলে আসুন । পরিচালকের রুমে পাঁচ মিনিটের জন্য আপনাকে একটু দরকার!
: খালেদ কোনো কথা না বলে তাদের সাথে রওয়ানা দেয় ৷
সবাই পরিচালকের রুমে প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বৃদ্ধা সেখানে চিৎকার করতে করতে কপাল চাপড়াতে থাকে। সেই সাথে মাথার চুল টেনে টেনে ছিঁড়ে খালেদকে দেখিয়ে বলতে থাকে- পরিচালক সাহেব! এই সেই নিকৃষ্ট পাপী! এই সেই পশু!! যার পশুত্ব ও হিংস্রতা জগতের সকল পশুত্বকে হার মানিয়েছে!!! আপনাদের কাছে আমার করজোড় অনুরোধ, আপনারা কিছুতেই ওকে ছাড়বেন না। ওর উপযুক্ত বিচার করুন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন।
বৃদ্ধার কথা ও ভাবসাব দেখে খালেদ অবাক হয়। দারুণভাবে বিস্মিত হয়। তার এই বিস্ময়ের ঘোর তখনই কাটে যখন ইউনিফর্ম পরিহিত এক পুলিশ অফিসার তাকে সম্বোধন করে বলেন-
: জনাব খালেদ! এই বৃদ্ধা আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আরোপ করেছেন । তার অভিযোগ হলো, আপনি নাকি তার যুবতী মেয়ের সম্ভ্রমহানি করেছেন। ইজ্জত নষ্ট করেছেন। ফলে সে অবৈধভাবে গর্ভবতী হয়েছে। পরে যখন বৃদ্ধা এই ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে, তখন নাকি আপনি কসম খেয়ে অঙ্গীকার করে বলেছেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আমি ওকে এমন কোনো নিরাপদ স্থানে রেখে আসব যেখান থেকে কোনো শুভার্থী তাকে তুলে নিয়ে সরকারী অনাথাশ্রমে পাঠিয়ে দিবে। এরপর আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হব!
একথা শোনে খালেদের সামনে গোটা দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। মুখ ফোটে কোনো শব্দ বেরোয় না। সংজ্ঞাহীন হয়ে রুমের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে!
অনেকক্ষণ পর খালেদের হুঁশ ফিরে আসে। সে দেখতে পায়, তার সামনে সেই দু’জন পুলিশ অফিসার বসা। খালেদ কিছুটা স্বাভাবিক হলে পুলিশ অফিসারদের একজন এগিয়ে এসে বললেন- জনাব খালেদ! আপনার চেহারা-সূরত এবং লেবাস পোষাক দেখে মনে হচ্ছে— এই ধরনের অপরাধ আপনার দ্বারা হওয়া সম্ভব নয় । তাই আসল ঘটনাটা কি একটু খুলে বলুন তো?
মূল ঘটনা শুরু করার আগে রাগে-ক্ষোভে খালেদ বলতে থাকে— এই কি উপকারের প্রতিদান? এই কি ইহসানের বদলা? এই কি অসহায় আর বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করার পুরস্কার!
খালেদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না । বাধভাঙ্গা জোয়ারের মতোই তার দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় গড়িয়ে পড়ে অশ্রুমালা।
: এই অশ্রু বেদনার!
: এই অশ্রু দায়মুক্তির!!
: এই অশ্রু নিষ্কলুষতার!!!
দীর্ঘক্ষণ কেঁদে কিছুটা হালকা হওয়ার পর খালেদ বলে— জনাব! বৃদ্ধা মহিলা আমার উপর যে মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপন করেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমি একজন বিবাহিত চরিত্রবান সুপুরুষ। দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ তিন সন্তানের জন্মদাতা। প্রসিদ্ধ রেসিডেন্সিয়্যাল এলাকায় বসবাস করি । প্রয়োজনে আমার এলাকার যে কোনো লোক থেকে আমার চরিত্রের ব্যাপারে জানতে পারেন। জানতে পাবেন।
এরপর খালেদ বৃদ্ধা ও তার মেয়ের সঙ্গে নিজের ঘটনার পূর্ণ বৃত্তান্ত তুলে ধরে। খালেদ ঘটনা বলে শেষ করলে পুলিশ অফিসার তাকে প্রবোধ দিয়ে বলেন- জনাব! আমাদের কাছে যেহেতু অভিযোগ দায়ের হয়ে গেছে তাই আমাদেরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই সামনে এগুতে হবে। তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি পবিত্র, নির্দোষ । আপনার দ্বারা এ কাজ হয়নি। তবে একথাটি আমার মুখে বললে চলবে না।
ডাক্তারী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে যে, আপনি নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক । অবশ্য এটা কঠিন কিছু নয়। খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমি খুব তাড়াতাড়ি আপনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করছি । আর এতেই রহস্যোর পর্দা উন্মোচিত হয়ে বেরিয়ে আসবে- আসল সত্য। প্রকাশিত হবে- অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
সকাল বেলা খালেদের দেহ থেকে কিছুটা নমুনা নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার নিমিত্ত ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। এ সময় খালেদ অন্য রুমে বসে দরবারে এলাহিতে দু’আয় নিমগ্ন থাকে। বারবার কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে— হে দয়াময় প্রভু! তুমি তো জানো, আমি এই গর্হিত কর্মের ধারে কাছেও যায়নি । এমনকি এসব জঘন্য অপকর্মের কথা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। হে আল্লাহ! এ ব্যাপারে আমি পবিত্র। তুমি যে কোনো উপায়ে আমার এ পবিত্রতা প্রকাশ করে দাও ।
আসল সত্য উদঘাটন: করুণ পরিণতি!
দু’ঘণ্টা পর রিপোর্ট আসে। রিপোর্টে প্রমাণিত হয়- খালেদ নির্দোষ, নিরপরাধ, অপবাদমুক্ত। সুসংবাদ শুনে আনন্দাপুত হয়ে শুকরানা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে খালেদ ।
এদিকে নিরর্থকভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য পুলিশ অফিসারদ্বয় বারবার দুঃখ প্রকাশ করেন। সেই সাথে ষড়যন্ত্রকারিণী বৃদ্ধা ও তার নষ্টা মেয়েকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেন।
হাসপাতাল থেকে প্রস্থানের প্রাক্কালে খালেদ বিদায় নেওয়ার জন্য ডাক্তারের রুমে যায় । ডাক্তারকে বিদায়ের কথা বললে তিনি তাকে সম্বোধন করে বললেন-
: খালেদ সাহেব! আপনি অনুমতি দিলে আপনার সাথে দু’একটি জরুরি কথা বলতাম!
: খালেদ বিনয়ভরা কণ্ঠে বলল- অবশ্যই বলুন ।
: খালেদের সম্মতি পেয়ে ডাক্তার বললেন- জনাব! আপনি আমাকে গতকাল জানিয়েছেন, আপনি তিন সন্তানের জনক। অথচ…।
: ডাক্তার থেমে গেলেন। মনে হলো, তিনি কথাটা বলতে সংকোচবোধ করছেন ।
: খালেদ বলল— ‘অথচ’ কী। কথাটা শেষ করুন।
: ডাক্তার বললেন- ‘অথচ’ বলে আমি যা বলতে চাচ্ছিলাম তা একটি স্পর্শকাতর বিষয়! পুরোপুরো নিশ্চিত না হয়ে এসব কথা বলা যায় না। তাই আমি চাচ্ছি একশ ভাগ নিশ্চিত হয়েই কথাটা বলতে।
:সেজন্য আমাকে কী করতে হবে? খালেদের প্রশ্ন।
: সেজন্য চাই আপনার স্ত্রী ও বাচ্চাদের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যাতে আমি স্থির বিশ্বাসে উপনীত হতে পারি। ডাক্তার বললেন।
: কয়েক ঘন্টা পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে এসে হাজির হয় খালেদ। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে ওদেরকে একটি রুমে বসিয়ে খালেদ ডাক্তারের কাছে আসে। ইতোমধ্যে ওদের পরীক্ষার রিপোর্টও ডাক্তারের টেবিলে পেশ করা হয়।
ডাক্তার বললেন- খালেদ সাহেব! কিছু মনে না করলে আপনাকে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করি । আচ্ছা! আপনার বাসায় কি আপনি ছাড়া আর কোনো পুরুষ থাকে ।
: থাকে ।
: কে? সে আপনার কী হয়? কী-ই বা করে সে?
: ছোট ভাই হাম্মাদ । একই ফ্ল্যাটে আমার সঙ্গে থাকে । সে ভার্সিটিতে পড়ে। কত দিন ধরে সে আপনাদের সাথে থাকে?
: চার বছর । এই বছরই সে ডিগ্রী কমপ্লিট করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবে।
: ওকে একটু নিয়ে আসতে পারবেন কি? ওর-ও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া দরকার ।
: ডাক্তার সাহেব! দয়া করে আসল ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন! আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে!
: আরেকটু ধৈর্য ধরুন খালেদ সাহেব! আপনার ছোট ভাইয়ের পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজটা শেষ হওয়ার সপ্তাহ খানেক পরেই আশা করি, আসল ঘটনাটা আপনার সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।
: ঠিক আছে। আল্লাহ চাহে তো আগামী দিনই ওকে নিয়ে আপনার খেদমতে হাজির হব ।
পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খালেদ পরদিন ছোট ভাই হাম্মাদকে নিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হয়। আবশ্যকীয় পরীক্ষার পর ডাক্তার সাহেব খালেদকে জানিয়ে দেন, এক সপ্তাহ পর আসুন। সবকিছু নিশ্চিতরূপে অবহিত হতে পারবেন ।
দীর্ঘ এক সপ্তাহ খালেদ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ভেতর কাটায় । তার সমস্ত সত্তাজুড়ে বয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়। অতঃপর নির্ধারিত তারিখে ডাক্তারের কাছে আসে। ডাক্তার সাহেব তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান । ঠান্ডাপানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করেন। যাতে দুঃখজনক সংবাদ শুনে সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে ।
কিছু সময় পর ডাক্তার সাহেব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলতে শুরু করেন- খালেদ সাহেব! মানব জীবনের সঙ্গে সুখ-শান্তি, বিপদ-মুসীবত ওতোপ্রোতভাবে জড়িত । সুখ-শান্তি যেমন আল্লাহ পাক দেন তেমনি বিপদ-মুসীবতও তাঁর পক্ষ থেকেই আসে। অবশ্য একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, সুখের সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং দুঃখ-মুসীবতের সময় ধৈর্য…
ডাক্তার সাহেবের কথার মাঝখানে খালেদ বলে উঠল- ডাক্তার সাহেব! যন্ত্রণার অনলে আমার দেহ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। আর সইতে পারছি না আমি । দয়া করে আসল ঘটনাটি খুলে বলুন ।
ডাক্তার সাহেব ক্ষণিকের জন্য নীরব হয়ে যান । এরপর তার মুখ থেকে যে দু’টি বাক্য উচ্চারিত হলো, তা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তত ছিল না খালেদ। ডাক্তারের বলা বাক্য দু’টি ছিল-
জনাব খালেদ! আপনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম। যে তিনটি সন্তানকে আপনি স্বীয় ঔরসজাত সন্তান বলে দাবী করছেন এদের একজনও আপনার নয়; বরং সবই আপনার ভাই হাম্মাদের!
গুপ্তঘাতকের অতর্কিত হামলার ন্যায় এই আকস্মিক সংবাদ শ্রবণে খালেদ আর্তনাদ করে ওঠে। হাসপাতালময় ছড়িয়ে পড়ে সে আর্তনাদ ধ্বনি। সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে জমিনের উপর!!
দীর্ঘ দু’সপ্তাহ পর খালেদের জ্ঞান ফিরে আসে। কিন্তু জ্ঞান ফিরলে কী হবে, সাথে সাথে সে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। সেই সাথে হারিয়ে ফেলে স্মৃতিশক্তি। তাকে ভর্তি করা হয় মানসিক হাসপাতালে ।
গল্প থেকে জীবনের শিক্ষা!
১. “দেবর মৃত্যুতুল্য” — সতর্কতা উপেক্ষা করার পরিণতি ভয়াবহ
নবীজি (সাঃ) দেবরকে “মৃত্যুতুল্য” বলে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা স্রেফ আনুষ্ঠানিক উপদেশ নয়, বরং পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি বাস্তবসম্মত নির্দেশনা। গল্পে খালেদ প্রথমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সামাজিক চাপ ও সাময়িক বিশ্বাসের কাছে নতি স্বীকার করে সতর্কতা শিথিল করায় তার পরিবারে চিরস্থায়ী বিপর্যয় নেমে আসে।
২. সুধারণা রাখা আর সতর্কতা অবলম্বন করা — দুটো ভিন্ন বিষয়
ইসলাম আমাদের নিকটজনের প্রতি অমূলক সন্দেহ পোষণ করতে নিষেধ করেছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে শরীয়তসম্মত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা (পর্দা, একাকী অবস্থান এড়ানো) বর্জন করতে হবে। ভাইকে বিশ্বাস করা আর তাকে ভাবির সাথে নিরাপদ দূরত্বে রাখা — এ দুটো একসাথে চলতে পারে, বরং চলা উচিত।
৩. সামাজিক ও পরিবারিক চাপের কাছে দ্বীনি সিদ্ধান্ত বিসর্জন না দেওয়া
পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের রোষানল, লোকনিন্দার ভয় — এসব কারণে শরীয়তসম্মত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা বিপজ্জনক হতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, এমনকি নিকটজনের অসন্তুষ্টির ঝুঁকি থাকলেও।
৪. বিপদে মানুষকে সাহায্য করার পাশাপাশি বিচক্ষণতা বজায় রাখা
অসহায় মানুষকে সাহায্য করা মহৎ কাজ, তবে অপরিচিত পরিস্থিতিতে নিজের নিরাপত্তা ও সম্মানের ব্যাপারে সতর্ক থাকাও জরুরি। ভালো নিয়তের পরিণতি সবসময় ভালো হয় না — এ বাস্তবতা মাথায় রাখা প্রয়োজন।
৫. পরিবারে দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা পিতামাতার ও পরিবারের সবার দায়িত্ব
সন্তানের শিক্ষা বা ভবিষ্যতের জন্য আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত না নিয়ে, ইসলামি বিধান অনুযায়ী নিরাপদ ব্যবস্থা করাই পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের পথ।
এরপর পড়ুন: মোবাইলে প্রেমঃ করুণ পরিণতি। লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। লেখকের আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে।
প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: “দেবর মৃত্যুতুল্য” হাদিসের অর্থ কী?
এই হাদিসে নবীজি (সাঃ) সতর্ক করেছেন যে দেবর তার ভাবির জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পুরুষ, কারণ পারিবারিক সম্পর্কের কারণে তার অবাধ যাতায়াতে কেউ সন্দেহ করে না, যা শয়তানের ধোঁকায় ফিতনার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্ন ২: দেবর কেন ভাবির জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলা হয়েছে?
কারণ দেবর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অবাধে ঘরে আসা-যাওয়া করতে পারে এবং এতে কারো সন্দেহ হয় না, যা অন্য কোনো পুরুষের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এই সুযোগই অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম দেয়।
প্রশ্ন ৩: ইসলামে দেবর-ভাবির পর্দার বিধান কী?
ইসলামে দেবর-ভাবিকে পরস্পরের সাথে নির্জনে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে এবং পর্দার বিধান মেনে চলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেমন অন্য কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ-মহিলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রশ্ন ৪: ভাইকে বিশ্বাস করা এবং তার থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা — এটা কি পরস্পরবিরোধী নয়?
না, বরং এটাই ইসলামের শিক্ষা। বিশ্বাস রাখা মানসিক বিষয়, আর পর্দা-সতর্কতা মেনে চলা ব্যবহারিক বিধান। নবী-রাসূলগণও আল্লাহর নির্দেশিত সতর্কতা মেনে চলেছেন, যদিও তাদের চরিত্রে কোনো খুঁত ছিল না।
প্রশ্ন ৫: এই গল্প থেকে মূল শিক্ষা কী?
মূল শিক্ষা হলো— শরীয়তের নির্দেশিত সতর্কতামূলক বিধানগুলো সামাজিক চাপ বা আবেগের বশে শিথিল করা উচিত নয়, কারণ এর পরিণতি কখনো কখনো অপরিবর্তনীয় ও মর্মান্তিক হতে পারে।