প্রেমের করুণ পরিণতি কেমন হতে পারে, তা যদি জানতে চান, তাহলে রাসেল ও মুনীরার এই বাস্তবধর্মী গল্পটি আপনার জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। একজন মেধাবী ছেলে, যার ভবিষ্যৎ ছিল উজ্জ্বল, কীভাবে একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শুরু হওয়া অবৈধ সম্পর্কের কারণে নিজের জীবন ও পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিল— এই গল্পে তারই বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আসুন, জেনে নিই প্রেমের করুণ পরিণতির এই হৃদয়বিদারক কাহিনী।
মোবাইলে প্রেম-অবশেষে! রাসেল মুনিরার প্রেমের করুণ পরিণতি!
রাসেল। এক ধনীর দুলাল। দেখতে শুনতে ভালো। পড়াশুনায়ও ভালো। স্কুলের মেধা তালিকায় বরাবরই তার নাম থাকে। তাই রাসেলের পিতা-মাতা ওকে খুব আদর-স্নেহ করেন । ভীষণ ভালোবাসেন । তারা প্রায়ই রাসেলকে উৎসাহ দিয়ে বলেন- বাবা রাসেল! তুমি যদি মনোযোগ দিয়ে আরো ভালো করে লেখাপড়া করো তাহলে আমাদের বিশ্বাস, তোমার নাম মেধা তালিকার শীর্ষে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
পিতা-মাতার উৎসাহ পেয়ে নতুন উদ্যমে মরিয়া হয়ে পড়াশুনা শুরু করে রাসেল। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার পর দেখা গেল, ক্লাসের প্রথম স্থানটি সে-ই দখল করেছে। ফলে সবাই তাকে অভিনন্দন জানায়। দোয়াও করে।
কিন্তু এতে রাসেলের মন ভরেনি। সে তার মায়ের নিকট হাজির হয় এবং একটি মোবাইল ফোন কিনে দেয়ার জন্য জোর আবেদন জানায়।
রাসেলের মা আগ-পিছ না ভেবে নিজের জমানো টাকা দিয়ে ছেলেকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেন। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, এই মোবাইল ফোনই একদিন ছেলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
আরও পড়ুন: যুবতীর কবলে যুবক (রাহাত লাভলির প্রেমের গল্প)
মোবাইল ফোন কেনা এবং একটি রহস্যময় কল
কয়েক মাস পর। গভীর রাত। রাসেল তার শয়নকক্ষে একা ঘুমিয়ে আছে । হঠাৎ মোবাইলে রিং বেজে উঠে। রিংয়ের আওয়াজে রাসেলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সেই সাথে সে বেশ বিরক্তও হয়। মনে মনে বলে- এত রাতে কে ফোন দিল?
রাসেল মোবাইল রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে একটি মেয়েকণ্ঠ ভেসে আসে। ঘুমের ভাব রাসেলের চোখ থেকে তখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাই মেয়েটিকে সে কোনোকিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না ।
মেয়েটি পরিচয় জানতে চাইলে রাসেল ক্ষীণ কণ্ঠে তার পরিচয় দেয়। রাসেলের পরিচয় পেয়ে মেয়েটি খুব খুশি হয়। অতঃপর ‘আমার পরিচয় সকালে দিব’ বলে মেয়েটি নিজেই লাইন কেটে দেয়। অগত্যা রাসেল মোবাইল ফোন বালিশের নীচে রেখে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে যখন রাসেলের রাতের কথা স্মরণ হয়, তখন সে মেয়েটির পরিচয় জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে। ছটফট করতে থাকে তার হৃদয়-মন। উন্মুখ হয়ে প্রহর গুনতে থাকে- কখন সেই মেয়েটি আবার তাকে ফোন দিবে!
কিন্তু না! মেয়েটি আর ফোন দিল না। অবশেষে রাসেল নিজেই মেয়েটির মোবাইলে রিং দিল। নিজের মনের অবস্থা বর্ণনা করল। রাসেলের কথা শুনে মেয়েটি একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিল। সেই সাথে বলল- আমি জানতাম, তুমি রিং দিবে!
এরপর মেয়েটি তার পরিচয় দিল। নাম বলল- মুনীরা। এক বাপের এক মেয়ে দশম শ্রেণীর ছাত্রী । কিছুক্ষণের কথাবার্তায় ওদের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হলো। ওদের শেষের দিকের আলাপচারিতায় মনে হলো, ওরা যেন একে অপরের পরম বন্ধু! ওদের পরিচয় একদিন, দু’দিনের নয়, বহুদিনের!!
তারপর থেকে প্রতিদিনই রাসেল আর মুনীরা কথা বলতে লাগল। এক পর্যায়ে তারা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলল গভীরভাবে। যেন দুটি দেহ একটি প্রাণ। তারা কাণ্ডারীহীন নৌকার ন্যায় ভাসতে লাগল প্রেম-সাগরে।
আরও পড়ুন: অবৈধ প্রেমের পরিণতি (প্রেমের গল্প)
এভাবে চলতে চলতে রাসেলের পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এল। যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হলো পরীক্ষা। কিন্তু এবার অন্যবারের তুলনায় ব্যতিক্রম হলো। খুব খারাপ পরীক্ষা দিল রাসেল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো।
রাসেলের অকৃতকার্যতায় সবাই চিন্তিত। তবে রাসেলের মনে কোনো অনুভূতির সঞ্চার হলো না। সে মুনীরার সাথে ফোনে কী কী বলবে সেই চিন্তায় মগ্ন থাকল সারাক্ষণ। পড়াশুনার প্রতি বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই তার। এভাবে কেটে গেল আরো কিছুদিন।
বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও বিয়ের দাবি
একদিন রাসেল মুনীরাকে বলল- আমি কয়েক মাস পরে বিদেশ চলে যাব! তুমি বিদেশে চলে গেলে আমি থাকব কী করে?। তুমি তো জানো যে, তোমার সঙ্গে কথা না বলে আমি একটি দিনও থাকতে পারিনা। তুমি কীভাবে আমাকে ছেড়ে বিদেশে চলে যাবে? বলল মুনীরা।
আহা! এতো অস্থির হচ্ছ কেন? শোন। বিদেশে গিয়েও প্রতিদিন তোমার সাথে কথা বলব। এখন যেমন বলি তখনও তেমন বলব। তোমাকে ছাড়া কি আমার ভালো লাগে বলো? বলল রাসেল।
বিদেশে যাবে যাও। তবে যাওয়ার আগে আমাকে বিয়ে করে যেতে হবে। অনেকটা দাবীর সুরে বলল মুনীরা। রাসেল বলল- মুনীরা! পাগলামী করো না। বিয়ে আমি তোমাকেই করব। তবে এখন নয়। বিদেশে থেকে আসার পর।

কয়েকদিন পর। মুনীরা তার মায়ের কাছে নিজের প্রেমের কথা বলল। সেই সাথে এও বলল যে, রাসেল কয়েক মাস পর বিদেশ চলে যাবে। এই অবৈধ কর্মের জন্য যেখানে মেয়েকে শাসন করার দরকার ছিল, সেখানে মুনীরার মা মাতৃজাতির কলংকের পরিচয় দিয়ে বলল- তুই কোনো চিন্তা করিস না। আগামীকাল রাসেলকে আমাদের বাসায় আসতে বল। বাকী যা করার আমিই করব।
মায়ের কথায় প্রশ্রয় পেয়ে মুনীরা তার প্রেমিক রাসেলকে বাসায় আসার নিমন্ত্রণ জানাল। রাসেল যথাসময়ে উপস্থিত হলো মুনীরাদের বাসায়।
রাসেল আর মুনীরা এক রুমে বসে কথা বলছে। এমন সময় পূর্ব- পরিকল্পনা অনুযায়ী মুনীরার মা ও বাবা কয়েকজন লোক নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। রাসেল ভয়ে ভিজা বিড়ালের মতো হয়ে গেল। অপরদিকে মুনীরার ঠোঁটে শোভা পেল— বিদ্রূপের হাসি। রাসেল কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই তারা রাসেলকে আটক করে ফেলল।
আরও পড়ুন: সস্তা মেয়ে (প্রেমের গল্প) | Short love story
এক পর্যায়ে মুনীরার পিতা বলল- তুমি আমার সহজ-সরল মেয়েটাকে ফুসলিয়ে নষ্ট করেছ। তাকে গর্ভবতী বানিয়ে বিয়ে করার ভয়ে এখন বিদেশ চলে যাচ্ছ! তাই না? মনে রেখো, তোমাকে সে সুযোগ আর দেওয়া হবে না। আজই মুনীরাকে বিয়ে করতে হবে। অন্যথায় তোমার রেহাই নেই।
এরপর মুনীরার লোকজন রাসেলের মায়ের নিকট ফোন করে বলল- আপনার ছেলে এক মেয়ের সাথে অপকর্ম করে হাতে-নাতে ধরা পড়েছে। আমরা সেই মেয়ের সাথে আপনার ছেলের বিয়ে দিয়ে দিব। আপনারা জলদি আসেন। তারপর রাসেলের মাকে আসতে দেরি দেখে তারাই কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দিল।
পরিবারের প্রত্যাখ্যান ও অভাবের সংসার
প্রিয় পাঠক! এখানেই শেষ নয়। বিয়ে করার পর যখন রাসেল মুনীরাকে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে এল, তখন রাসেলের পিতা-মাতা এই বিয়ে মেনে নিলনা। তারা বলল- রাসেল! তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান। তোমাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা-ভরসা। সুতরাং তুমি মুনীরাকে তালাক দাও! আমরা তোমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে করাব। আর যদি তালাক না দাও তাহলে আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। আর কোনোদিন এ বাড়িতে আসতে পারবে না। রাসেল মুনীরাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে এল। অবশেষে দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালাতে লাগল।
একদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে মুনীরার সাথে রাসেলের কথা কাটাকাটি হলো। একপর্যায়ে রাসেল মুনীরাকে একটি থাপ্পর দিল। আর অমনি মুনীরা হিংস্র বাঘের ন্যায় রাসেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার সাথে শরীক হলো মুনীরার দুই ভাই ও বাবা।
সবার হাতে মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে গেল রাসেলের দেহ। অবশেষে দুঃখ- জ্বালা সহ্য না করতে পেরে বাড়ির পাশের একটি গাছের সাথে ফাঁস নিল রাসেল। সেই সাথে ইতি টানল প্রেমের!! ইতি টানল মূল্যবান জীবনের!!!
প্রেমের করুণ পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! এভাবেই অবৈধ প্রেম মানব জীবনে ধ্বংস ও ব্যর্থতা ডেকে আনে। রাসেল ও মুনীরার এই গল্প আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রেমের করুণ পরিণতির এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত। ক্ষণিকের আবেগ ও অবৈধ সম্পর্কের মোহে পড়ে কীভাবে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চিরতরে নিভে যেতে পারে, তা এই কাহিনী থেকে স্পষ্ট। আল্লাহ আমাদের সবাইকে অবৈধ সম্পর্কের ফাঁদ থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন। সহযোগিতায়: মুহাম্মদ অলিউল্লাহ, ভবানীপুর, বরুড়া, কুমিল্লা।
এরপর পড়ুন: শয়তানের ধোঁকা, লেখক: মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, তার আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে।