প্রেম কখনোই শুধু আবেগের খেলা নয়—কখনো তা হয়ে ওঠে জীবনের কঠিন শিক্ষা। “লক্ষ টাকা জরিমানা” গল্পে রাসেল ও বৃষ্টির সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতারণা আর অবৈধ প্রেমের ভয়াবহ পরিণতি ফুটে উঠেছে। পড়ুন এই শিক্ষণীয় প্রেমের গল্পটি।

মোবাইলে প্রেমের সূচনা : রাসেল ও বৃষ্টি
“ধ্যাৎ! আর ভালো লাগেনা । অসহ্য! সেই চারটার সময় আসার কথা । এখন প্রায় পাঁচটা বাজতে চলেছে। তবুও রাসেলের আসার কোনো নাম- গন্ধ নেই। আর মাত্র দশ মিনিট অপেক্ষা করব। তারপর না এলে সোজা বাসায় চলে যাব ।”
পার্কের বেঞ্চে বসে বিড়বিড় করে কথাগুলো বলল- বৃষ্টি। রাগে তার গা জ্বলে যাচ্ছে। চেহারাটা পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। বারবার কামড়ে ধরছে স্বীয় অধর!
খানিক পর । প্রচণ্ড রাগ নিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল বৃষ্টি। তারপর পূর্বের সেই কথাগুলো বারবার আওড়াতে আওড়াতে পার্ক-বেঞ্চের চারিপাশে যখন অস্থিরভাবে পায়চারী করছিল সে, ঠিক তখনই ধীরপদে আগমন করল রাসেল।
প্রথম সাক্ষাৎ ও বিয়ের প্রস্তাব !
এতদিন রাসেল তার পরম প্রিয়তমা- ‘বৃষ্টি’কে একটি ‘অতি সুন্দরী মেয়ে’ হিসেবেই কল্পনা করে আসছিল। কিন্তু আজ ওকে সরাসরি দেখে তার মেজাজটাই বিগড়ে গেল । তারপরও ভদ্রতার খাতিরে মুখে একখানা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল, আমার অনুমান মিথ্যে না হলে নিশ্চয়ই তুমি বৃষ্টি!
: হ্যাঁ, ঠিকই ধরতে পেরেছ তুমি!
: শিল্পী কেমন আছো?
: ভালো । তবে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছিলাম ।
: এখন অস্থিরতা কাটল তো?
: সে কি আর বলতে হয়! তোমাকে দেখার পর আমার যাবতীয় কষ্ট ও অস্থিরতা মুহূর্তের মধ্যে বিদায় হয়ে গেছে!
রাসেলের সঙ্গে বৃষ্টির পরিচয় প্রায় তিন বছর যাবত । মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল ওদের। এই দীর্ঘ সময় তারা ফোনের মাধ্যমেই প্রেম করে আসছে। কিন্তু নানাবিধ অসুবিধার কারণে এতদিন ওদের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি । শুধু কথা বলতে বলতেই একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছে। মন দেয়া-নেয়া করেছে। জীবনসঙ্গী বানানোর স্বপ্ন দেখেছে। একজন আরেকজনকে আত্মার আত্মীয় ভেবেছে। পরস্পর তাদের দেখা হবে, একান্তে কিছু কথা হবে, দু’জন দু’জনার দিকে তাকিয়ে প্রাণভরে হাসবে- সেই মধুর ক্ষণটির জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণত দু’জনই। তাদের সেই অপেক্ষার প্রহর আজ শেষ হলো। স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হলো! আজই ওদের প্রথম দেখা!
বৃষ্টির সাথে মোবাইলে কথা বলে রাসেল তৃপ্তি পেয়েছিল, ভালোবেসে ছিল: সঁপে দিয়েছিল হৃদয়-মন, আগ্রহ জেগেছিল ওকে কাছে পাওয়ার। কিন্তু ওকে দেখার পর এসবের কিছুই আর বাকি রইল না! মনে মনে ভাবল রাসেল- “আমি কি তাহলে কুতসিৎ চেহারার এই মেয়েটির সঙ্গেই এতদিন প্রেম করেছি! রাত জেগে কথা বলেছি! ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে একে নিয়েই কল্পনার সাগরে হাবুডুবু খেয়েছি! স্বপ্ন দেখেছি ঘর বাধার! মোবাইল বিল দিয়েছি কয়েক হাজার টাকা!! যাহোক, এখানে যখন এসেই পড়েছি তখন ওকে মনের কথাটা বুঝতে না দিয়ে দু’চারটা কথা বলে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ি!
সংঘাত: প্রত্যাখ্যান থেকে প্রতারণা
রাসেল বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলতে লাগল। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে রাসেল বলল- এবার তাহলে চল। বাসায় ফিরে যাই। সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায় ।
: বৃষ্টি বলল- বাসায় যাবে মানে? বাসায় যাবে কেন? এসো আমরা কাজী অফিসে যাই । আজই আমরা বিয়ে করে ফেলি!
: বৃষ্টির কথা শুনে রাসেল যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখে সরষে ফুল দেখতে লাগল । বলল, একি বলছ তুমি!! প্রথম সাক্ষাতেই বিয়ে!!
: প্রথম সাক্ষাৎ মানে! আমরা না আজ তিন বছর যাবত কথা বলছি!
: রাসেল বৃষ্টিকে বুঝানোর চেষ্টা করল। বলল- এতদিন তোমার-আমার প্রেম হয়েছে মোবাইলে। কথা হয়েছে দূর থেকে। আজই আমাদের প্রথম দেখা। সুতরাং এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আরো কিছুদিন যাক। তারপর না হয় বিয়ে করা যাবে !
: বৃষ্টির সোজা উত্তর, আমি এত কিছু বুঝিনা। আমাকে আজ এবং এখনই বিয়ে করতে হবে!
রাসেল মহা মুশকিলে পড়ল। উপায়ন্তর না পেয়ে অনেকটা জোর করেই বৃষ্টির কাছ থেকে চলে আসতে চাইল। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না।
কেননা বৃষ্টি যখন রাসেলের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারল, রাসেল তাকে পছন্দ করেনি এবং সে তাকে বিয়েও করবে না তখন স্বার্থানেষী বৃষ্টি হৈচৈ শুরু করে দিল । ওর চেঁচামেচিতে লোকজন জড়ো হলো । ওরা আটক করল রাসেলকে ।
আসলে বৃষ্টি একটি খারাপ মেয়ে । তার উদ্দেশ্য ভালো নয় । তার কামনা হলো, যদি মোবাইলে প্রেম করে কখনো কোনো পুরুষের ‘বউ’ হওয়া যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা! আর যদি এই চেহারা নিয়ে কারো ‘বউ’ হওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে কৌশলে তাকে ফাঁদে ফেলে যেভাবেই হোক ওর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করার চেষ্টা করতে হবে!!
যাহোক, লোকজন জড়ো হওয়ার পর আপন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ওদের কাছে ডাহা মিথ্যে কথা বলল বৃষ্টি । সে তাদের কাছে যা বলল তার সারকথা হলো— এতদিন এই ছেলেটি আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছে। বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে! কিন্তু এখন? এখান সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। আমাকে ফেলে চলে যেতে চাচ্ছে!!
লোকজনের চাপ ও জরিমানার ঘটনা
লোকেরা প্রথমে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে বৃষ্টির কথাই বিশ্বাস করল এবং রাসেলকে বিয়ের জন্য প্রথমে বুঝিয়ে এবং পরে চাপ সৃষ্টি করল।
রাসেল লোকদের হাতে পায়ে ধরে বলল- ভাইয়েরা! বিশ্বাস করুন। ও যা বলেছে মিথ্যা বলেছে। ওর সাথে আমার আজই প্রথম দেখা। ইতোপূর্বে কখনো ওর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং আমাদের দৈহিক সম্পর্ক কিভাবে হবে?
রাসেলের কথা শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, ছেলেটির কথাও তো ঠিক হতে পারে। তাই আমাদের উচিত হবে, ওদের অভিভাবককে খবর দেওয়া। তারপর ওদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া ।
উভয় পক্ষের অভিভাবক আসার পর আলোচনা পুনরায় শুরু হলো । রাসেল ও বৃষ্টির জবানবন্দী নেওয়া হলো । শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হলো— হয়তো রাসেল বৃষ্টিকে বিয়ে করবে, নয়তো একলক্ষ টাকা জরিমানা দিবে!
কি আর করা! শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে একলক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করেই রাসেলের অভিভাবক রাসেলকে মুক্ত করে আনলেন। তবে জরিমানার এ টাকা তিনি নিজের পকেট থেকে দিলেন না, বরং রাসেলের নিজস্ব ব্যাংক একাউন্ট থেকেই তুলে এনে আদায় করলেন ।
আরও পড়ুন: অবৈধ প্রেমের পরিণতি (প্রেমের গল্প)
অবৈধ প্রেমের পরিণতি: শিক্ষণীয় বার্তা!
প্রিয় পাঠক! এ হলো অবৈধ প্রেমের নগদ শাস্তি। মনে রাখবেন, এরূপ অন্যায়ের শাস্তি এমনই হয়!! যে মেয়েটির সঙ্গে রাসেল রাত জেগে ঘুম নষ্ট করে ফোনে কথা বলত, যাকে নিয়ে বুকে রঙ্গিন স্বপ্ন আঁকত সেই মেয়েটিই স্বীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য রাসেলকে ফাঁসিয়ে দিল । এতবড় একটি জঘন্য কাজ করতে বিন্দুমাত্রও সে দ্বিধাবোধ করল না।
প্রিয় যুবক ভাইয়েরা! এরপরও কি আপনারা মোবাইল ফোনে মেয়েদের সঙ্গে প্রেমালাপে লিপ্ত হবেন? নষ্ট করবেন স্বীয় সম্মান ও মূল্যবান জীবন? অমান্য করবেন শরয়ী বিধান? আপনারা কি পারবেন না জীবনের শ্রেষ্ঠ ও অমূল্য সময় যৌবন কালটাকে অবৈধ প্রেমের কবল থেকে বাঁচাতে? পারবেন না ইতোপূর্বে কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে থাকলে আজই তার ইতি টানতে?
মনে রাখবেন, আল্লাহর বিধান অমান্য করে কেউ কোনোদিন সুখি হতে পারেনি এবং পারবেও না। সুতরাং প্রেম মোবাইলে হোক বা সারাসরি হোক- সকল প্রেমকেই ‘না’ বলুন! যে কোনো মূল্যে এ অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ পাক সবাইকে তাওফীক দিন। আমীন।
ঘটনা থেকে আমরা যা শিখলাম!
- অবৈধ প্রেমের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে.
- মোবাইল ফোনে প্রেমালাপ থেকে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- ইসলামী শরীয়তের বিধান অমান্য করলে সুখ পাওয়া যায় না।
- লেখক যুবকদেরকে সতর্ক করেছেন অবৈধ প্রেম থেকে দূরে থাকার জন্য।
প্রিয় পাঠক পাঠিকা, গল্পটি পড়ে ভালো লাগলে এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না।
লেখক: মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, তার আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে। আদর্শ যুবক যুবতি ২ বইয়ের গল্প গুলো এখানেই সমাপ্ত হলো।