একটি মিসকল গল্প—সালেহার জীবনের করুণ অধ্যায়। দরিদ্র পরিবারের আশা পূরণের পথে মোবাইল আসক্তি আর প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে সে। এই গল্পে উঠে এসেছে ভালোবাসার ভান, বিশ্বাসঘাতকতা এবং সতর্কতার শিক্ষণীয় বার্তা।
সালেহার পড়াশোনা ও সংগ্রাম
দরিদ্র পিতার রূপসী কন্যা- সালেহা। বয়স ষোল। পিতার নাম আলাউদ্দিন মজুমদার। তিনি অত্যন্ত গরীব মানুষ। অন্যের জমিতে চাষ-বাস করেন। এতে যা পান তা দিয়েই স্ত্রী ও মেয়ে সালেহাকে নিয়ে কোনোরকম খেয়ে-পড়ে জীবন কাটান।
গরীব হলেও আলাউদ্দিন মজুমদার বেশ সচেতন মানুষ। তাই এই টানাটানির সংসারেও সালেহাকে স্কুলে ভর্তি করেছেন তিনি। নিকটেই স্কুল।
সালেহা প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে পড়ালেখা করে। পড়ালেখার খরচ যোগাতে দিনমজুর পিতা আলাউদ্দীনকে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবু তিনি মেয়ের পড়া লেখা বন্ধ করতে একদম নারাজ। অনেক সময় স্ত্রী জুলাইখা স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন, সালেহার পড়াশুনার খরচ চালাতে যেহেতু আপনাকে সীমাহীন কষ্ট করতে হচ্ছে, তাই আমার মনে হয়, ওর পড়াশুনা বন্ধ করে দিলেই ভালো হবে। তাছাড়া মেয়ে মানুষের এত পড়াশুনা করার কী দরকারই বা আছে!
জবাবে আলাউদ্দিন মজুমদার বলেন, আরে! একি বলছ তুমি? আমার একটা মাত্র মেয়ে ৷ ওকে যদি আমি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে না পারি, তবে তো আমাদের মতো সেও মূর্খ থেকে যাবে। আর মূঅর্খতা হলো জীবনের জন্য বড় অভিশাপ! একথা তোমাকে একবার দু’বার নয়, বহুবার বলেছি।
আলাউদ্দিন মজুমদারের আশা, তার মেয়ে সালেহা একদিন উচ্চশিক্ষিতা হবে। বংশের সুনাম বৃদ্ধি করবে। পিতা-মাতার মুখ উজ্জ্বল করবে এবং তাদের মুখে হাসি ফুটাবে। এই আশা বুকে নিয়ে সীমাহীন কষ্ট করে হলেও সালেহার পড়াশুনার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর সালেহাও পিতার আশা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ।
মোবাইল আসক্তির ফাঁদ!
দিন যায়, মাস যায়। নির্দিষ্ট সময় পর বদল হয় সাল। বাড়তে থাকে সালেহার বয়স। ডিঙ্গাতে থাকে একের পর এক ক্লাস । এভাবে কেটে যায় বেশ কয়েকটি বছর ।

কালের আবর্তনে সালেহার হাতে আসে একটি ক্যামেরা সেট মোবাইল। ওর মামা ওকে অনেকটা সখ করেই কিনে দিয়েছিলেন এই মোবাইল সেট। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই জিনিসটি কিভাবে সালেহার পবিত্র জীবনকে অপবিত্র করবে? কীভাবে তার জীবনকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাবে। কীভাবে তার পিতা-মাতা ও নিজের স্বপ্নকে ধুলিস্যাত করে দিবে। আহা! যদি তিনি জানতেন!!
আরও পড়ুন: স্কুল কলেজে মোবাইল নিষিদ্ধ কি অত্যাবশ্যক?
মোবাইল হাতে আসার পর থেকেই পাল্টাতে শুরু করে সালেহার জীবনধারা। পরিবর্তন আসে তার চলাফেরায়। পরিবর্তন আসে তার জীবনধারায়। কীভাবে? হ্যাঁ, সে কথাই এবার পাঠক-পাঠিকাদের খেদমতে আরজ করছি।
প্রেম, প্রতারণা ও ধ্বংস!
মিসকলের মাধ্যমে একটি ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয় সালেহার । এরপর চলতে থাকে কথা আর কথা! খোশগল্প!! তারপর এ পথে বহুদূর এগিয়ে যায় ওরা। সেই সঙ্গে সাধারণ কথাবার্তা ও আলাপ রূপান্তরিত হয় প্রেমালাপে !! মোবাইলের মাধ্যমে বিনিময় করে পরস্পরের ছবি। ফলে সময় যতই গড়ায়, ওদের সম্পর্ক ততই গাঢ় হয়, ততই সুদৃঢ় হয়!!!
আরও পড়ুন: দেবর হতে সাবধান
একদিন সালেহা কলেজে যাওয়ার পথে ছেলেটির সঙ্গে দেখা করে। এতে দু’জনের সম্পর্ক আরো মজবুত হয়। সালেহা ছিল বেশ সুন্দরী । তাই সালেহাকে সরাসরি দেখার পর থেকেই ওকে পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে ছেলেটি। একান্তে সময় কাটানোর জন্য তার মনে জাগ্রত হয় তীব্র বাসনা। এই শুভ (?) ক্ষণটি কখন আসবে- এই ভাবনায় অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে সে!
এদিকে ইবলিশ শয়তান বেশ খুশি। দু’টি পবিত্র জীবনকে অপবিত্র করার জন্য এতটুকু পথ নিয়ে আসতে পারায় সে আনন্দিত । তবে ইবলিশের আনন্দ এখনো পূর্ণতা পায়নি। কারণ, সে চায়, তাদের জীবনকে একেবারে ধ্বংস করে দিতে। চায় তাদেরকে অন্যায়-অপকর্মের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিতে। তাই সে সর্বক্ষণ ওদের পিছু নেয়। শিখিয়ে দেয় সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার নানান কুবুদ্ধি!
প্রায় বছর খানেক পর একদিন সালেহা ছেলেটির প্ররোচনায় বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। কিন্তু তার গন্তব্য সেদিন বান্ধবীর বাসা ছিল না। বরং তার গন্তব্য ছিল, শহরের একটি অভিজাত হোটেল!
মিসকলের মাধ্যমে যে ছেলেটির সাথে সালেহার পরিচয় হয়েছিল সে ছেলেটির নাম, শামীম। শামীম সালেহাকে আগেই ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল, তুমি এতটা সময় অমুক হোটেলে এসো।
নির্ধারিত সময়ে হোটেলের একটি নির্জন কক্ষে দেখা হয় দু’জনের। ইবলিশ শয়তান তো ওদের পিছনে লেগেই আছে। ব্যস, আর যায় কোথায়! উভয়ে উভয়ের মনের বাসনা পূরণ করে বিকেলে ফিরে যায় যার যার বাসায় !!
সেদিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই সালেহা বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে এখানে সেখানে গিয়ে শামীমের সাথে সময় কাটায়। নিজকে সোপর্দ করে ওর হাতে। সেই সাথে পূর্ণ করে মনের একান্ত কামনা-বাসনা।
সালেহার এই অধঃপতনের কথা দরিদ্র পিতা-মাতা ঘুর্ণাক্ষরেও টের পেল না। তারা জানতেই পারল না, মোবাইল ফোন তাদের একমাত্র মেয়ে সালেহাকে নষ্টামীর কোন্ স্তরে নিয়ে নামিয়েছে! উপরন্তু সালেহার ব্যাপারে এমনটি তারা ভাবতেও পারেনি। ভাববেই বা কী করে? কোনো পিতা-মাতা কি তাদের মেয়ে সম্পর্কে এমন ধারণা করতে পারে?
যাহোক, মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে সালেহা পৌঁছে গেল গর্হিত কর্মের শীর্ষ চূড়ায়। বিয়ের পূর্বেই পর পুরুষকে বিলিয়ে দিল স্বীয় কোমল দেহ। হারিয়ে ফেলল নারীর মহামূল্যবান সম্পদ- সতীত্ব ।
সালেহাকে অনেকবার বিয়ের আশ্বাস দিয়েছে শামীম। বলেছে, তোমাকে আমি অবশ্যই বিয়ে করব সালেহা। এটা আমার ওয়াদা। যে কোনো মূল্যে আমি আমার ওয়াদাকে রক্ষা করব । অতএব এ ব্যাপারে তুমি কোনো চিন্তা করো না!
শামীমের এসব কথা ধোঁকা ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই ছিল না । কিন্তু এসব বুঝতে না পেরে শামীমকে নিয়ে সুখের সংসার রচনা করা স্বপ্ন দেখত সালেহা। আর ভাবত, একদিন তো আমি শামীমের স্ত্রী হবই। তাই তার সাথে একান্তে সময় কাটাতে অসুবিধা কোথায়। অথচ সে জানত না যে, একান্তে সময় কাটানো তো দূরের কথা, ইসলামী শরীয়তে খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কোনো পুরুষের সাথে কথা বলাও জায়েয নেই ।
একদিন শামীম সালেহাকে ফোন করে বলল, চলো আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করি। অন্য কোনো শহরে গিয়ে রচনা করি আমাদের সুখের সংসার। নির্মাণ করি- সুখ-সৌধ! তখন দেখবে আমাদের শান্তি-সুখের কোনো শেষ থাকবে না!!
পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার ব্যাপারে শামীম যখন বিভিন্ন উপায়ে সালেহাকে উদ্বুদ্ধ করল তখন সালেহার খুশি দেখে কে?! সে তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে কোনো কিছু চিন্তা-ভাবনা না করেই পালিয়ে যেতে রাজী হয়ে গেল!!
তিনদিন পর নানা বাড়ী যাওয়ার কথা বলে শামীমের সঙ্গে পালিয়ে গেল সালেহা। প্রথমে উঠল, চট্টগ্রামের একটি নামকরা হোটেলে। সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে বেশ কয়েকদিন থাকল।
অবিশ্বাস ও করুণ পরিণতি
অতঃপর একদিন সালেহা শামীমকে লক্ষ্য করে বলল, শামীম! তুমি না বলেছ, আমাকে বিয়ে করবে। কই, বিয়ের ব্যাপারে তো কোনো কথা বলছ না!
জবাবে শামীম আমতা আমতা করে বলল, এত চিন্তা করছ কেন? ওয়াদা যখন দিয়েছি বিয়েতো একদিন করবই!
এ পর্যায়ে এসে সালেহার চক্ষু খুলে গেল। সে বুঝতে পারল, শামীম আসলে একজন নারীলিপ্স পুরুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে সে কোনোদিন আমাকে বিয়ে করবে না!!
সালেহা যখন নিজের ভুল বুঝতে পারল তখন কীভাবে এই নারীখাদক শামীমের হাত থেকে বাঁচা যায় সেই কৌশল খুঁজতে লাগল। কিন্তু এই লম্পট শামীম সালেহাকে ছাড়বার পাত্র নয়! সালেহার দেহ ভোগ করাই যেন ওর প্রধান কাজ!!
একদিন সালেহা শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে শামীমের হাত থেকে নিজকে বাঁচাতে চায়। কিন্তু নারীলোভী শামীম তার কোনো কথাই শুনেনি। সকল বাধা উপেক্ষা করে হিংস্র বাঘের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সালেহার নরম-কোমল দেহের উপর। পূরণ করে স্বীয় জৈবিক চাহিদা এমতাবস্থায় কলাগাছের মতো বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া সালেহার আর কিছুই করার ছিল না !
সালেহা যখন দেখল, এই লম্পট তাকে বিয়ে করবে না এবং নিজে নিজে তার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভেরও কোনো উপায় নেই, তখন সে ফোন করে তার এক আত্মীয়কে বলল, আমি অমুক জায়গায় আছি। আপনারা যেভাবে পারেন, আমাকে উদ্ধার করুন।
এই সংবাদ পেয়ে সালেহার আত্মীয়রা সেদিনই সালেহাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সেই সাথে পাকড়াও করে শামীমকেও। পরে তারা সালেহার কাছে সবকিছু শুনে বিয়ের ব্যাপারে শামীমকে চাপ দেয়। কিন্তু শামীম গড়িমসি শুরু করে। এখনই সে বিয়ে করতে রাজী হয় না। সে বরং কিছুদিন সময় চায়। এভাবে শামীম যখন বিয়ের ব্যাপারে গড়িমসি শুরু করে তখনই উত্তেজিত জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়।
পিটুনির তীব্রতায় শামীম তার আসল রহস্য ফাঁস করে দিতে বাধ্য হয়। সে বলে, আমি মুসলমান নই, হিন্দু। আমার নাম রামচন্দ্র পাল। আমি সালেহার সঙ্গে প্রেম করার জন্য মুসলমান হওয়ার ভান ধরেছি এবং আমার হিন্দু নাম গোপন করেছি।
একথা শুনে উপস্থিত লোকজন আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং রামচন্দ্রকে পুনরায় আচ্ছামত ধোলাই করে। এরপর থানায় খবর দিয়ে ওকে পুলিশের হাতে দিয়ে দেয়। পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে বন্দী করে রাখে । এদিকে সালেহার মা জুলাইখা বাদী হয়ে ওর নামে একটি ধর্ষণের মামলা দায়ের করে।
শিক্ষণীয় উপদেশ ও সতর্কতা!
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! একটু ভাবুন তো! সালেহার সতীত্ব নষ্ট করার দায়ে রামচন্দ্রকে মারধর করা হলো। সোপর্দ করা হলো পুলিশের হাতে। পাঁচ-দশ বছর পর হয়তো রামচন্দ্র ঠিকই জেল-হাজত থেকে বের হয়ে আসবে। পুনরায় ফিরে পারে তার মুক্ত জীবন। বাঁচতে শিখবে আবার নতুন করে। ফিরে পারে পূর্বের সেই স্বাধীনতা। কিন্তু সালেহা কি তার হারানো সতীত্ব কোনোদিন ফিরে পাবে? পাবে কি তার সেই পূর্বের কুমারীত্ব? পূর্বের সেই কলঙ্কহীন সুন্দর জীবন? না, কখনোই না। সালেহাকে এখন থেকে কলঙ্কের চাদর জড়িয়েই কাটাতে হবে অবশিষ্ট জীবন। আচ্ছা, বলুন তো কেন এমন হলো?
উত্তর খুব সোজা! আল্লাহর হুকুম অমান্য করে অবৈধ প্রেমে লিপ্ত হওয়ার কারণেই সালেহার আজ এই করুণ পরিণতি। তবে, প্রিয় পাঠক- পাঠিকা! আপনাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না, সালেহা আর রামচন্দ্রের অবৈধ প্রেমের সূত্রপাত কিন্তু মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই হয়েছিল।
আরও পড়ুন: উপদেশ মূলক হাসির গল্প – গল্প থেকে শিক্ষা
অতএব, আপনারাই এবার বলুন, মোবাইল ব্যবহারে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত কিনা? তাই আসুন, আজ থেকে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে, খুব বেশি দরকার না হলে আমরা মোবাইল ব্যবহার করব না এবং জীবনে কোনোদিন কোনো অপরিচিত নম্বরে কল বা মিসকল দিব না। সেই সাথে এই প্রতিজ্ঞাও আমরা করব যে, কোনো গাইরে মাহরাম পুরুষ বা নারীর সঙ্গে অতি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলব না ।
যদি আমরা এখন থেকে এই প্রতিজ্ঞাটি পালন করে যেতে পারি, তাহলে আমার বিশ্বাস, আমাদের পক্ষে মোবাইলের প্রধান অপকারিতা ও ক্ষতি থেকে বাঁচা সম্ভব হবে । আল্লাহ পাক আমাদের তাওফীক দান করুন । আমীন।
এরপর পড়ুন: লক্ষ টাকা জরিমানা (রাসেল ও বৃষ্টির প্রেমের গল্প)
লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, লেখকের আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে।