শয়তানের ধোঁকা – শিক্ষণীয় ইসলামিক গল্প

শয়তানের ধোঁকা কখনো সরাসরি আসে না। সে ধৈর্য ধরে, ধাপে ধাপে ফাঁদ পাতে — যতক্ষণ না মানুষ নিজেই বুঝতে পারে যে কখন সে সীমা পেরিয়ে গেছে। বনী ইসরাঈলের এই ঘটনা সেই ভয়ানক সত্যেরই জীবন্ত প্রমাণ। পড়ুন, এবং সতর্ক হন।

শয়তানের ধোঁকা — বনী ইসরাঈলের এক আবেদের হৃদয়গ্রাহী ইসলামিক গল্প

বনী ইসরাঈল। একটি প্রসিদ্ধ জাতি। এই জাতির কথা পবিত্র কুরআনে বারবার এসেছে। এসেছে এজন্য যে, যাতে করে আমরা সতর্ক হতে পারি। সাবধান হতে পারি। এবং তাদেরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তদানুযায়ী নিজের জীবনকে গঠন করতে পারি।

অন্ধকারের ফাঁদে শয়তানের ধোঁকা — আলোর পথে সতর্কতার আহ্বান
অন্ধকারের ফাঁদে শয়তানের ধোঁকা — আলোর পথে সতর্কতার আহ্বান. ছবিঃ Zulfugar Karimov

এখন অবশ্য আমি আপনাদের সামনে যে ঘটনাটি বর্ণনা করব তা কুরআনে বর্ণিত কোনো ঘটনা নয়। এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন হযরত ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহ.। আমি মনে করি যুবক-যুবতীসহ সর্বস্তরের লোকদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য এটি একটি উত্তম ঘটনা। তাই আসুন, এই ঘটনাটি আমরা গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করি এবং এর শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করি ।

বনী ইসরাঈলের সেই বিখ্যাত আবেদ!

এক বড় আবেদ। দরবেশ শ্রেণীর লোক। ইসরাঈল সম্প্রদায়ে তাঁর জন্ম। খ্যাতির কোনো অভাব নেই। সর্বত্র তাঁর আলোচনা। সবাই তার প্রশংসা করে। গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে। মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে।

তিনি ছিলেন সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার মূর্ত প্রতীক । এজন্য সবাই তাঁকে বিশ্বাস করে । দূরে কোথাও সফরে গেলে তার কাছে মূল্যবান জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা ইত্যাদি আমানত রাখে। অতঃপর সফর থেকে ফিরে এসে প্রত্যেকেই যার যার জিনিস হুবহু বুঝে নেয় ।

তিন ভাই ও তাদের সুন্দরী বোন — জিহাদে যাওয়ার দ্বিধা!

সে সময় এক পরিবারে ছিল তিন ভাই। তাদের ছিল অনিন্দ্য সুন্দরী একটি বোন। মাতা-পিতা না থাকায় অত্যন্ত আদর-যত্ন সহকারে বোনটিকে লালন-পালন করেছিল তারা। এরই মধ্যে একদিন জিহাদে যাওয়ার ডাক এল । তিন ভাই জিহাদে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহী হয়ে ওঠল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল বোনটিকে নিয়ে। তারা চিন্তা করল, আমরা সবাই যদি জিহাদে চলে যাই, তাহলে বোনটির কী অবস্থা হবে । ওকে একাকী বাড়িতে রেখে যাওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়, যুক্তিসঙ্গতও নয় । আমাদের এমন কোনো আত্মীয়-স্বজনও নেই, যার কাছে নিশ্চিন্তে তাকে রেখে যেতে পারি। এদিকে জিহাদে যাওয়াও জরুরী। সবাইকে যেতে হবে। না গিয়ে কোনো গত্যন্তর নেই ।

বোনটিকে কেন্দ্র করে তিন ভাইকে পেয়ে বসে গভীর দুশ্চিন্তা। এ মুহূর্তে কী করবে— কিছুই তারা বুঝে ওঠতে পারছে না। অত্যধিক সুন্দরী বোনটিকে তো যেখানে সেখানে রেখে যাওয়া যায় না!

শয়তানের প্রথম চাল — মানুষের বেশে আগমন!

ভাইদের পেরেশানীর কোনো শেষ নেই। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তাদের কাছে এল। তাদের দুঃখে সেও দুঃখিত- এমন একটা ভাব-সাবই অত্যন্ত নৈপুন্যের সাথে প্রকাশ করল সে। অবশেষে সহানুভূতির সুরে বলল, আপনারা ওকে অমুক আবেদের কাছে রেখে যেতে পারেন! তার সততা ও আমানতদারীর ব্যাপারে তো আমার চাইতে আপনারাই ভালো জানেন!!

লোকটির এ প্রস্তাব ভাইদের মনপুতঃ হলো। তারা এই প্রস্তাবকে সানন্দে গ্রহণ করল। কারণ তারাও উক্ত আবেদের গুণমুগ্ধ ছিল।

তিন ভাই মিলে আবেদের কাছে গেল। তার কাছে বোনকে আমানত হিসেবে রেখে যাওয়ার আবেদন পেশ করল। বলল, হুজুর! আপনার আমানতদারীর উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। আপনার তত্ত্বাবধানে আমাদের বোনটিকে রেখে আমাদের উপর এহ্সান করুন। চিন্তামুক্ত করুন। আল্লাহ পাক আপনাকে অশেষ জাযায়ে খায়ের দান করবেন।

আবেদ সাহেব তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বললেন, এ প্রস্তাব ছাড়া তোমরা আমাকে যে কোনো কাজ করতে বলবে তাই আমি করব। কিন্তু তোমাদের বোন— যে কিনা পূর্ণ যুবতী— এমন একটি মেয়েকে নিজের হেফাজ রাখার মতো দুঃসাহস আমি কোনো অবস্থাতেই দেখাতে পারি না।

ভাইয়েরা নাছোড়বান্দা। তারা নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বারবার অনুরোধ করতে লাগল। সেই সাথে উপস্থিত অন্যরাও সুপারিশ দিল। বলতে লাগল, হুজুর! এই মেয়েটির হেফাযতের জন্য আপনিই হলেন উপযুক্ত ব্যক্তি। মেয়েটি আপনার কাছে থাকলেই নিরাপদে থাকতে পারবে। আপনার ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।

মেয়েটিকে রাখার জন্য লোকজন যতবার বলল, ততবারই আবেদ তা ফিরিয়ে দিল। তার একটিই কথা, তোমরা যত কঠিন কাজই আমাকে দাও না কেন, জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও আমি তা পালন করতে সচেষ্ট হবো। কিন্তু তোমরা যে প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য আমাকে বারবার বলছ তা আমি পালন করতে সম্পূর্ণ অপারগ।

এবার তিন ভাই ও উপস্থিত লোকজন আরো বেশি চাপাচাপি করতে লাগল । অবশেষে আবেদ সাহেব তাদের কথা না মেনে পারলেন না। তিনি বললেন, ঠিক আছে। তোমাদের আবদার আমি মঞ্জুর করলাম। মেয়েটিকে তোমরা আমার ইবাদত খানার সামনে অন্য এক কামরায় রেখে যেয়ো।

তিন ভাই আদরের বোনটিকে নিয়ে এল। তারপর ওকে আবেদের কথামত একটি কক্ষে রেখে জিহাদে চলে গেল ।

মেয়েটি ছিল পূণ্যবতী। সে নিরাপদে থেকে ইবাদত-বন্দেগীতে সময় কাটাতে লাগল। খানাপিনার ব্যবস্থা এই ছিল যে, খাবারের সময় হলে আবেদ সাহেব নিজে খাওয়া দাওয়া করে অবশিষ্ট খাদ্য পাত্রসহ স্বীয় ইবাদতখানার বাইরে রেখে দিতেন। আর মেয়েটি পর্দার সাথে বাইরে এসে তা ভিতরে নিয়ে সময়মতো খেয়ে নিত।

যে লোকটি তিন ভাইকে আবেদের কাছে তাদের বোন রেখে যাওয়ার প্রস্তাব পেশ করেছিল সে মূলত কোনো মানুষ ছিল না। সে ছিল বিতাড়িত শয়তান। মানুষের পরম শত্রু। সে-ই মানুষের আকৃতি ধারণ করে ভাইদের কাছে এসেছিল। বড় মধুময় ভাষায় উপস্থাপন করেছিল মনের কথা। তার উদ্দেশ্য ছিল, এই যুবতী মেয়ের মাধ্যমে আবেদকে ধ্বংস করা। গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করা।

আজ অনেক দিন হলো একটি যুবতী মেয়ে আবেদের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু উভয়ে উভয়কে সযত্নে হেফাযত করে চলছে। একজনের প্রতি আরেক জনের বিন্দুমাত্র টান সৃষ্টি হয়নি। উভয়ের চরিত্র আগে যেমন পবিত্র ছিল এখনো তা-ই আছে ।

এটা শয়তানের সহ্য হলো না। কারণ সে তো মেয়েটিকে এখানে এনেছিল আবেদকে গোনাহের সাগরে ডুবানোর জন্য। পুতঃপবিত্র রাখার জন্য নয়। কিন্তু তার আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হচ্ছে না দেখে সে দারুণ অস্থির হয়ে পড়ল। চিন্তা করতে লাগল, এখন কী করা যায়!

শয়তানের ধাপে ধাপে ফাঁদ — কীভাবে আবেদ বিপথে গেলেন!

শয়তান বসে থাকার মতো কোনো চীজ নয়! তাছাড়া কাকে কীভাবে ধোঁকা দিতে হয়, তাও তার অজানা নয় । খানিক চিন্তা করার পর সে রাস্তা পেয়ে যায় । মনটা তার আনন্দে নেচে ওঠে।

খাবার কামরায় দিয়ে আসা!

এককালে শয়তান মানুষের বেশ ধারণ করতে পারত । পারত যখন যেমন ইচ্ছা তেমন রূপ ধারণ করতে । আজকের মিশন সফল করার জন্য সে বুযুর্গের বেশ ধারণ করল। তারপর আবেদের ইবাদতখানায় হাজির হয়ে বলল, আপনার এখানে যে মেয়েটি থাকছে, আমি শুনেছি, সে নাকি আপনার ইবাদতখানার সম্মুখ থেকে নিজে এসে খাবার নিয়ে যায় । আমার মনে হয়, কাজটি মোটেও ঠিক হচ্ছে না। কারণ এমতাবস্থায় সে যে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে পর-পুরুষের দৃষ্টিতে পড়ে যেতে পারে।

সুতরাং মেয়েটি আপনার ইবাদতখানার সম্মুখ থেকে খাবার নেওয়ার পরিবর্তে আপনি যদি খাবারটা তার কক্ষে রেখে আসেন তাহলে মনে হয় সবচেয়ে ভালো হবে। যদিও এতে আপনার কষ্ট একটু বেশি হবে, তদুপরি আপনার মতো ব্যক্তির জন্য তা কিছুটা লজ্জার কারণও বটে তথাপি তিনটি কারণে আপনাকে তা পালন করা উচিত বলে আমি মনে করি । কারণ তিনটির একটি হলো, মেয়েটির বেপর্দা হওয়ার সম্ভাবনা দূর হয়ে যাবে। দ্বিতীয়টি হলো, মানুষের খেদমত করার যে ফজীলত আছে তাও আপনি পূর্ণ মাত্রায় পেয়ে যাবেন। আর তৃতীয়টি হলো, অহঙ্কার নামক মহাব্যাধি কখনো আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না ।

আবেদ আবেদই । আলেম নয়। আলেমরা তাদের ইলমের নুর অনেক দূরের জিনিস দেখতে পারেন। বুঝাতে পারেন কোনটা শরীয়ে নির্দেশ আর কোনটা শয়তানের ধোকা । যা বুঝা আবেদের পক্ষে অ সময় সম্ভব হয় না। এ আবেদের বেলায়ও তা-ই হলো। তিনি শয়তানের ফাঁদে আটকে গেলেন। তার সুক্ষ্ম ধোকা তিনি মোটেও বুঝতে পারলেন না।

তাই শয়তানের কথা শেষ হওয়া মাত্রই তিনি বলে ওঠলেন- আপনি আমাকে অনেক সুন্দর প্রস্তাব দিয়েছেন। আসলে এতদিন আমি ব্যাপারটি খেয়াল করিনি। এই সুন্দর প্রস্তাবের জন্য আপনাকে জানাই অসংখ্য মুবারকবাদ। আগামীকাল থেকে আমিই তাকে খাবার দিয়ে আসব। খাবারের জন্য তাকে আর বাইরে আসতে হবে না।

পরদিন থেকে মেয়েটিকে আর বাইরে আসতে হয় না। আবেদ নিজেই তার কামরায় গিয়ে খাবার রেখে আসেন। মেয়েটি তার কাজকর্ম সেরে সুযোগ করে খাবার খেয়ে নেয়।

কথা বলার অনুমতি!

এভাবে বেশ কয়েক দিন চলল । এবার শয়তান অন্য এক দরবেশের আকৃতি ধারণ করে আবেদের খেদমতে হাজির হয়ে বলল, হযরত! মেয়েটি আজ দীর্ঘদিন যাবত একাকী আছে। কারো সাথে কথা বলতে পারছে না। আর কার সাথেই বা কথা বলবে! এখানে তো আর অন্য কোনো মেয়ে নেই যে, তার সাথে কথা বলে সময় কাটাবে।

আরও পড়ুনমানুষের সামনে কথা বলার কৌশল | স্মার্টলি কথা বলুন

জনাব! আপনিই বলুন, এভাবে কি কোনো মানুষ বাঁচতে পারে? পারে কি কোনো আদম সন্তান এভাবে নিজের জীবন অতিবাহিত করতে? আমার মনে হয়, আপনি যদি তার সাথে মাঝে মধ্যে দু’একটি কথা বলেন; যেমন ধরুন, কেমন আছ, কেমন লাগছে? ইত্যাদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে তার মনটা একটু ভালো লাগবে। সেই সাথে একাকিত্বের যে মানসিক যন্ত্রণা তাও অনেকটা লাঘব হবে।

এ যুক্তিটিও আবেদের কাছে বেশ ভালো লাগল। সেমতে সেদিন থেকে তিনি ইবাদত খানার ভিতরে থেকেই মাঝে মধ্যে দু’একটি কথা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন।

দরজায় দাঁড়িয়ে কথা!

সময় বয়ে চলল ৷ আর শয়তানও তার নীল নক্শা একটির পর একটি বাস্তবায়ন করে চলল। কয়েকদিন পর আবার সে বলল, আপনি ইবাদতখানার ভিতরে কথা বলবেন আর মেয়েটি তার কামরা থেকে উত্তর দিবে এটা সত্যিই অশোভন দেখায়। তাছাড়া দূরে হওয়ার কারণে আপনি হয়তো সবকথা ভালো করে বুঝতেও পারেন না। তাই আমার পরামর্শ হলো, মেয়েটি যে রুমে থাকে আপনি সেই রুমের দরজায় দাড়িয়ে কথা বলবেন আর মেয়েটি পর্দার আড়ালে থেকে ঘরের ভিতর থেকে কথা বলবে। আমার মনে হয় এতটুকু করায় কোনো অসুবিধা নেই। বরং মেয়েটি তাতে আরো খুশি হবে।

মেয়েটির কণ্ঠ ছিল বড়ই কোমল। বড়ই মনোহারিণী। তার কথা সারাদিন শুনলেও কেউ বিরক্তবোধ করবে না। তাই দরবেশবেশী শয়তানের এই প্রস্তাবকেও তিনি কবুল করে নেন এবং সেভাবেই কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকেন।

ঘরের ভেতরে প্রবেশ!

এক পর্যায়ে শয়তান নতুন এক বুযুর্গের বেশ ধারণ করে অনেক ভালো ভালো কথা বলল । অবশেষে মেয়েটির ব্যাপারে আলোচনা করতে করতে এক সময় বলল, দেখুন আপনি আবেদ মানুষ । আপনি তো আর মেয়েটির দিকে কুদৃষ্টিতে তাকাতে পারেন না । আপনার দ্বারা এটা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। একথা সত্য যে, শয়তান মানুষকে ধোকা দেয়। কিন্তু সবাইকে তো আর ধোকা দিতে পারে না! তাই আপনি এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা না বলে যদি রুমের ভিতরে গিয়ে বলেন তাহলে মেয়েটি আরো স্বাচ্ছন্দবোধ করবে। মনটা আরো ফ্রেশ হবে। পরিবার-পরিজনবিহীন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ জীবনের এ মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা হলেও কম হবে।

আবেদ বেচারা আনন্দের সাথেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন এবং দিনের বেলায় মাঝে মধ্যে মেয়েটির গৃহে গিয়ে পর্দা ছাড়াই সামনে বসিয়ে কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। আসল কথা হলো, মেয়েটির বিনম্র কথাবার্তা তার নিকট এতই ভালো লাগতে শুরু করল যে, তিনি শরীয়তের নির্দেশ একেবারে ভুলে গেলেন । নির্জনে কোনো বেগানা মেয়ের সাথে কথা বলা যে শরীয়ত সমর্থন করে না, বরং কঠোরভাবে নিষেধ করে- একথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন । এমনকি এভাবে চলতে চলতে একদিন তিনি মেয়েটির ঠোঁটের সাথে নিজের ঠোঁট লাগিয়ে ফেললেন। নাউযুবিল্লাহ ।

এদিকে মেয়েটিও আগের অবস্থানে নেই । সে-ও ধীরে ধীরে আবেদের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেছে। এজন্যই আবেদের উল্লেখিত আচরণটিকে সে খারাপভাবে গ্রহণ করার অবকাশ পায়নি। বরং তার অতৃপ্ত মন যেন এ ধরনের কিছু একটা পাওয়ার জন্যই গভীর প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। 

এভাবে মেয়েটির ঘরে গিয়ে তার সাথে কথা বলতে বলতে আবে লোকটি মেয়েটির প্রতি দারুণভাবে আসক্ত হয়ে পড়লেন। শয়তান তাদের উভয়কে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। এখন কথাবার্তা কেবল দিনেই হয় না, রাতেও হয়। যখন সমস্ত পৃথিবী ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে তখনও তাদের কথাবার্তা শেষ হয় না। এভাবে আর কতদিন চলা যায়? দু’জন লোক নিজেদের উপর আর কতদিন নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে!

হ্যা, এক রাতে তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যায়। ভুলে যায় আল্লাহ ও রাসূলের ফরমান। দৈহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়ে যায় উভয়ের মাঝে। যা ছিল নিয়ম বহির্ভূত পন্থায় একটি যুবতী মেয়ের সাথে দেখা- সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনার অনিবার্য ফল !!

শয়তান এবার আনন্দে আত্মহারা । তার যেন খুশির অন্ত নেই । একজন আল্লাহ ওয়ালা লোকের দ্বারা এমন গর্হিত কর্ম সম্পাদন করাতে পেরে সে নিজেকে ধন্য মনে করতে লাগল ।

ভয়াবহ পরিণতি — একের পর এক মহাপাপ!

কিছুদিন পর দেখা গেল মেয়েটির গর্ভে বাচ্চা এসে গেছে। শুধু তাই নয়, কয়েকমাস পর মেয়েটি একটি ফুটফুটে সন্তানও জন্ম দিয়েছে।

শয়তানের প্রতিকী ছবি।

দরবেশবেশী শয়তান দীর্ঘদিন পর্যন্ত আবেদের ধারে কাছেও আসেনি যখন মেয়েটি সন্তান প্রসব করল তখন সে হিতাকাঙ্ক্ষি সেজে আবেদের নিকট এলো । বলল, আমি শুনেছি- আপনার হেফাযতে যে মেয়েটি থাকত সে নাকি বাচ্চা প্রসব করেছে । অথচ সে অবিবাহিতা । আমি জানি, আপনি ছাড়া আর কেউ তার কাছে যাবে দূরের কথা; তার ঘরের আশেপাশেও যাওয়ার অনুমতি ছিল না। সুতরাং এ অবৈধ কর্মের মূল নায়ক যে আপনি তাতে অন্তত আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে হ্যাঁ, আপনি ভয় পাবেন না। আমি আপনার ক্ষতি করতে আসিনি। আপনার কোনো ক্ষতি হোক সেটা আমি কখনোই চাই না। আমি এসেছি আপনাকে বাঁচাতে । আপনার মান-সম্মান রক্ষা করতে ।

শয়তান একটু থেমে আবার বলতে থাকে- জনাব! আপনি জানেন যে, এই ঘটনা লোক সমাজে জানাজানি হয়ে গেলে আপনার ইজ্জত- সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি সব ধূলোয় মিশে যাবে। আপনার বিপক্ষে চলে যাবে গোটা সমাজ। তাছাড়া মেয়েটির ভাইয়েরা যখন জিহাদ থেকে ফিরে এসে এ দৃশ্য দেখবে, তখন আপনার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে তা একটু ভেবে দেখেছেন কি ?

আবেদ চিন্তা করে দেখলেন, এ লোকটি যা কিছু বলছে সবই সত্য। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। লোকজন জেনে গেলে আর রক্ষে নেই। তাই তিনি অসহায় কণ্ঠে বললেন, তাহলে এখন উপায় কি ? আপনি আমার মুরব্বী, আপনিই বলুন, এখন আমি কী করতে পারি। কী করলে আমি এই দুর্নাম ও মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি।

শয়তান তো এটিই চাচ্ছিল। সে বলতে লাগল, দেখুন মানুষ হত্যা মহাপাপ। কিন্তু সবসময় তা পাপ নয়। আমার মনে হয়, আপনি এখন যে বিপদে আছেন, এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কাউকে হত্যা করলেও তা পাপ হবে না। আর যদি পাপ কিছু হয়েই যায়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই । কারণ আল্লাহ পাক মহা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। তাঁর কাছে কেঁদে কেটে একটু ক্ষমা চাইলেই তিনি ক্ষমা করে দিবেন। মোটকথা, আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা নেওয়া তেমন কঠিন কিছু নয় । কঠিন হলো, মানুষের সামনে নিজের মান সম্মান হেফাযত করা। অতএব এর জন্য আপনাকে যা করা দরকার তাই করতে হবে!

বলুন আমাকে কী করতে হবে। আমি এখন সবকিছু করতে রাযী আছি । আবেদ বললেন ।

হ্যাঁ, সে কথাই বলছি । এখন আমার পরামর্শ হলো, আপনি শিশুটিকে হত্যা করে ফেলুন। তাতে সব কেচ্ছা খতম হয়ে যাবে। শিশুটি বেঁচে থাকলেই নানান প্রশ্নের জন্ম হবে, যেগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে আপনি নিশ্চিত ধরা খেয়ে যাবেন। তখন আপনার বুযুর্গী শেষ হয়ে যাবে। সমাজের মানুষের সামনে আপনি একটি চরিত্রহীন লম্পট হিসেবে লোকজন আখ্যায়িত হবেন। শুধু তাই নয়, লোকজন আপনাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করবে না ।

আবেদ লোকটি পরামর্শ মোতাবেক বাচ্চাটিকে সত্যি সত্যিই হত্যা করে ফেলল ।

শয়তান এবার আরেক চাল খেলতে লাগল। একদিন সে আবেদকে বলল, আপনি মেয়েটির সম্ভ্রম নষ্ট করেছেন, তার গর্ভজাত সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন- আপনি কি মনে করেন এসব কথা গোপন থাকবে? আর এসব অপকর্মের কথা যদি কোনোদিন প্রকাশ হয়েই যায় তাহলে এর পরিণতি কী হবে তা একটু ভেবে দেখেছেন কি?

একথা শুনে আবেদ বেচারা দারুণ বিচলিত হলেন। তার সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল । তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বললেন- আমার এখন করণীয় কী- আপনিই আমাকে বলে দিন । আমি এখন কিছুই বুঝতে পারছি না!

শয়তান বলল, আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করে আপনার মুক্তির জন্য একটি পথই খুঁজে পেয়েছি । আর এটা এমন এক পথ- যা গ্রহণ করা ছাড়া আপনার আর কোনো গত্যন্তর নেই ।

বলুন । কোন পথ আমাকে অবলম্বন করতে হবে?

শয়তান বলল, আপনি মেয়েটিকে হত্যা করে ফেলুন। এমনভাবে হত্যা করবেন যাতে সবাই মনে করে সে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে। ঘূর্ণাক্ষরেও যেন কারো সন্দেহ না হয় যে, তাকে হত্যা করা হয়েছে। ব্যাস, কিচ্ছা খতম! এরপর ভাইয়েরা যখন আসবে তখন তাদেরকে বলে দিলেই চলবে যে, সে মৃত্যুবরণ করেছে। এ সময় অন্যরাও যখন সাক্ষী দেবে তখন তারা বিশ্বাস না করে পারবে না। আপনার প্রতিও তাদের কোনো খারাপ ধারণা সৃষ্টি হবে না ।

আবেদ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তা-ই করলেন । মেয়েটিকে হত্যা করে ফেললেন । কিন্তু শয়তানের মনটা এখনো ভরেনি । এখনো পূর্ণ তৃপ্ত হয়নি । কেননা সে আবেদের আখেরাত বরবাদ করেই ক্ষ্যান্ত হতে চায় না। বরং তাকে দুনিয়াতেও ফাঁসাতে চায়। চায় তার দুনিয়া-আখেরাত উভয়টা বরবাদ করতে!

তিন ভাইয়ের প্রত্যাবর্তন ও স্বপ্নের সতর্কবার্তা!

অনেক দিন পর মেয়ের তিন ভাই বাড়িতে এল। প্রথমেই তারা বোনের খোঁজ নিতে আবেদের নিকট গেল । বলল, আমাদের বোনটি কোথায়? আবেদ বললেন- ভাই! বড় দুঃখের বিষয়, আপনাদের বোন মৃত্যুবরণ করেছে। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা- ফিকির করেছি। ঝাঁড়-ফুঁক দিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আসলে তার হায়াত নেই । হায়াত শেষ হয়ে গেলে কাউকে তো আর রাখা যায় না! এসব কথা বলে অবশেষে তিনিও মেয়েটির জন্য আফসোস করতে লাগলেন!

বোনের মৃত্যু সংবাদে ভাইয়েরা কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলল। এরপর আবেদ লোকটি তাদেরকে নিয়ে মেয়েটির কবরের কাছে গেল । বোনের কবর দেখে তাদের কান্নার মাত্রা আরো বেড়ে গেল। অবশেষে কিছুটা শান্ত হয়ে ব্যথা-ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে সকলেই তারা নিজ বাড়িতে  চলে গেল ।

দিন গড়িয়ে রাত হলো। তিন ভাই বিছানায় গিয়ে ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। তিনজন তিন কক্ষে ঘুমিয়েছিল। খানিক পর একজন স্বপ্নে দেখল, এক দরবেশ তাকে প্রশ্ন করছে— তোমার বোন কোথায়? সে বলল, আমার বোন মারা গেছে। আমরা তিন ভাই তাকে অমুক আবেদের কাছে রেখে জিহাদে গিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরে শুনলাম, সে মৃত্যুবরণ করেছে। আমরা তার কবরও দেখে এসেছি।

স্বপ্নে দেখা এ লোকটি আসলে দরবেশ নয়- শয়তান। সে বলল, তুমি যা শুনেছ সবই মিথ্যা। আসল কথা হলো, তোমার বোন এমনিতেই মরে যায়নি, বরং তাকে মারা হয়েছে। আবেদ লোকটি তোমার বোনের সাথে নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করত । একদিন তিনি নিজকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তোমার বোনের সাথে অবৈধ কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাতে তার পেটে বাচ্চা এসে যায় । কয়েকমাস পর তোমার বোন একটি সন্তান প্রসব করে। তখন লোকটি লোক-লজ্জার ভয়ে তোমার বোন ও সন্তানটিকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার ইবাদত খানার নিকটস্থ স্থানে দাফন করে রাখে । এতটুকু বলে দরবেশবেশী শয়তান প্রস্থান করে ।

সেখান থেকে বের হয়ে শয়তান বসে থাকেনি। বরং ঐ একই রাতে অপর দুই ভাইকেও স্বপ্নযোগে ঐসব কথাই বলে, যা প্রথমজনকে বলেছিল ।

সকাল বেলা প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বপ্ন অন্যদের কাছে বর্ণনা করতে লাগল। তখন বড় ভাই বলল- দেখ, এটা একটা ভিত্তিহীন স্বপ্ন। বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই । কারণ, আবেদ লোকটির ব্যাপারে এ ধরনের কোনো কথা কল্পনাও করা যায় না। সুতরাং আজে বাজে চিন্তা না করে বোনের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করো এবং আপন আপন কাজে যোগ দাও ।

মেঝো ভাই বড় ভাইকে সমর্থন করল। সে বলল, ভাইয়া ঠিক কথাই বলেছেন। এত বড় একজন ইবাদতকারীর ব্যাপারে আমাদের বদগুমান না রাখাই উচিত। প্রমাণ ছাড়া কারো উপর খারাপ ধারণা করা বড়ই পাপের কাজ ।

কিন্তু বাঁধ সাধল ছোট ভাই । সে কিছুতেই বড় ভাইকে সমর্থন করতে রাযী হয়। তার কথা হলো, যে কোনো মূল্যে বিষয়টির যথাযথ তদন্ত করতেই হবে । এরপর আবেদ সাহেব নির্দোষ প্রমাণিত হলে তার ব্যাপারে আমার কোনো কথা থাকবে না। কিন্তু তিন ভাই একই রাতে একই স্বপ্ন দেখার পরও আমি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে পারি না ।

ছোট ভাইয়ের বাড়াবাড়ির ফলে শেষ পর্যন্ত তিন ভাই আবেদের দরবারে পুনরায় হাজির হলো। অতঃপর বিস্তারিতভাবে স্বপ্নে দেখা ঘটনা বর্ণনা করল।

আবেদ বেচারা কোনো কিছু গোপন করলেন না । সবকিছু স্বীকার করে নিলেন। এতে ভাইয়েরা দারুণ ব্যথিত হলো। তারা কাজীর দরবারে মামলা দায়ের করল। বিচারে আবেদের ফাঁসির রায় হলো।

আরও পড়ুনঃ ব্যথিত হৃদয় (ইসলামিক উপন্যাস) 

শেষ পরিণতি — ফাঁসির মঞ্চে শয়তানের চূড়ান্ত ধোঁকা!

আবেদকে কিছুক্ষণ পর ফাঁসি দেওয়া হবে। ফাঁসির সকল আয়োজন সম্পন্ন । ঠিক এমন সময় শয়তান আবেদের কাছে গিয়ে বলল, দেখো আমি শয়তান। আমিই তোমার দ্বারা এসব অপকর্ম করিয়েছি। তবে যেহেতু আমার কারণেই তুমি এতবড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, আমার কারণেই তোমার জন্য আজ ফাঁসির রজ্জু ঝুলছে, তাই তোমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য একটি পরামর্শ দিতে চাই । তুমি যদি তা পালন কর, তাহলে যে কোনো উপায়ে তোমাকে আমি মুক্ত করব।
আবেদ বলল- বলো, আমাকে কী করতে হবে।

শয়তান বলল, কাজটি কঠিন কিছু নয়, আমাকে একটি সিজদা করতে হবে মাত্র । তখন এক মুহূর্তও দেরী না করে মুক্তি লাভের আশায় তিনি শয়তানকে একটি সিজদা দিয়ে দিলেন। সিজদা পাওয়ার পর শয়তান আর এক সেকেণ্ডও সেখানে থাকল না। দ্রুত সেখান থেকে পলায়ন করল। আর পূর্বেকার কৃত অপরাধের জন্য আবেদ লোকটিকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হলো ।

প্রিয় পাঠক পাঠিকা! শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষের ক্ষতি করতে চায়। চায় গোমরাহ করে জাহান্নামী বানাতে। তাই শয়তানের ধোকা থেকে বাচার জন্য সর্বদা আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। সেই সাথে মহান আল্লাহর দরবারে দোয়াও করতে হবে। মনে কোনো কথা উদয় হলে বা কোনো কাজ করার ইচ্ছা জাগলে –চাই যত ছোটই হোক না কেন- যদি তা শরীয়ত বহির্ভূত হয় তাহলে আমরা কিছুতেই তা করব না। মনে করব, এটা শয়তানের কারসাজি। আমি শয়তানের কথা শুনব না। আল্লাহর কথা শুনব। আল্লাহর রাসূলের কথা শুনব। তাদের কথামতোই জিন্দেগী গঠন করব। হে আল্লাহ তুমি আমাদের তাওফীক দাও। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমাদের রক্ষা করো। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন। সহায়তায় : গল্প পড়ি জীবন গড়ি। 

গল্প থেকে শিক্ষা — শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচুন

প্রিয় পাঠক! এই গল্পটি শুধু একটি ঘটনার বর্ণনা নয় — এটি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা। গল্পের আবেদ লোকটি মন্দ মানুষ ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন সমাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত, ইবাদতকারী ও সৎ ব্যক্তিদের একজন। তবুও তিনি ধ্বংস হয়ে গেলেন। কেন? কারণ একটাই — শয়তানের ধাপে ধাপে পাতা ফাঁদ তিনি চিনতে পারেননি।

🔴 শিক্ষা ১ — শয়তান কখনো সরাসরি পাপে ডাকে না

শয়তান জানে, “এসো পাপ করো” বললে কেউ রাজি হবে না। তাই সে সবসময় ছোট ছোট পদক্ষেপে শুরু করে। এই গল্পে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেয়েটির কামরায় খাবার দিয়ে আসা — যা শুনতে সম্পূর্ণ নির্দোষ মনে হয়েছিল। আমাদের জীবনেও শয়তান এভাবেই কাজ করে।

🔴 শিক্ষা ২ — শরীয়তের একটি সীমা লঙ্ঘনই যথেষ্ট

আবেদ যখন প্রথমবার শরীয়তের সীমা অতিক্রম করলেন — তখন থেকেই তাঁর পতন শুরু হলো। একটি ছোট ছাড় থেকে শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি হত্যা, মিথ্যা ও শিরক — তিনটি মহাপাপে জড়িয়ে পড়লেন। তাই শরীয়তের যেকোনো বিধান — ছোট মনে হলেও — লঙ্ঘন করা উচিত নয়।

🔴 শিক্ষা ৩ — আবেদ হলেই নিরাপদ নয়, আলেম হওয়া জরুরি

গল্পে স্পষ্ট বলা হয়েছে — “আবেদ আবেদই, আলেম নয়।” ইবাদত মানুষকে নেক বান্দা বানায়, কিন্তু শরীয়তের জ্ঞান ছাড়া শয়তানের সূক্ষ্ম ধোঁকা চেনা সম্ভব হয় না। তাই ইবাদতের পাশাপাশি দ্বীনি ইলম অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য।

🔴 শিক্ষা ৪ — পর্দার বিধান কোনো আপোষের বিষয় নয়

গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের একাকী সাক্ষাৎ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ — এর কারণ কিন্তু মানুষকে অপমান করা নয়। কারণ হলো, মানুষ দুর্বল এবং শয়তান চালাক। পর্দার বিধান আসলে মানুষকে রক্ষা করার জন্যই।

🔴 শিক্ষা ৫ — শয়তান শেষ পর্যন্ত ধোঁকাই দেয়, সাহায্য নয়

ফাঁসির মঞ্চে শয়তান এসেছিল “সাহায্য” করতে — কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আবেদকে শিরকের (সিজদার) মাধ্যমে চিরতরে ধ্বংস করে চলে গেল। শয়তান কখনো কারো বন্ধু নয়। সে কেবল ব্যবহার করে এবং পরিত্যাগ করে।

✅ আমাদের করণীয়

  • প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও আউযুবিল্লাহ পড়ার অভ্যাস করুন।
  • শরীয়তের যেকোনো বিধানে ছাড় দেওয়ার আগে আলেমের পরামর্শ নিন।
  • পর্দার বিধান কঠোরভাবে মেনে চলুন।
  • মনে কোনো “ভালো” পরামর্শ এলে যাচাই করুন — এটি কি শরীয়তসম্মত?
  • আল্লাহর কাছে সর্বদা দোয়া করুন: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

হে আল্লাহ! আমাদের শয়তানের কুমন্ত্রণা ও ধোঁকা থেকে হেফাযত করুন। আমাদের শরীয়তের উপর অবিচল রাখুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

এরপর পড়ুন: অগ্নিপূজক যুবতি। লেখক: মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, তার আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে। 

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading