মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রাখুন | সুন্দর জীবনের গোপন রহস্য

মানুষের মানসিক অবস্থা একেক সময় একেক রকম থাকে। সুখ, দুখ, সুস্থতা, অসুস্থতা, সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা, স্থিরতা, অস্থিরতা ইত্যাদি বিভিন্ন অবস্থার কারণেও ব্যক্তির মানসিক অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে থাকে। আর মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে অন্যদের সাথে তার আচরণের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এ জন্য কেউ যখন ফুরফুরে মেজাজে থাকে তখন তার কাছে হাস্যরসিকতা ভাল লাগে। কিন্তু উদ্বেগ ও অস্থিরতার সময় হাস্যরসিকতা ভাল লাগে না।

মৃতের শোক সন্তপ্ত পরিবারের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করতে গিয়ে তাদের সঙ্গে রসিকতা করা অবশ্যই অনুপযোগী। কিন্তু বন্ধুদের সাথে প্রমোদ- ভ্রমণে গিয়ে আনন্দ-ফূর্তি ও রসিকতা করা যে উপযোগী তা বলাই বাহুল্য। কেননা, এটা সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। এখানে তা আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়।

আমি যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই তা হলো, কারো সঙ্গে কথা বলা ও আচার-আচরণের আগে অবশ্যই তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করা উচিত।

বাস্তব উদাহরণ: কখন কী বলবেন?

তালাকপ্রাপ্ত প্রতিবেশীর ঘটনা!

মনে করুন, কোনো মহিলাকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে । মহিলার মা- বাবা বেঁচে নেই । ভাই ভাবীর বাসা ছাড়া তার থাকার আর কোনো জায়গা নেই । সেখানে যাওয়ার জন্য সে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিচ্ছে । এমন সময় প্রতিবেশী জনৈক মহিলা তার সাথে দেখা করতে এলো । সে তাকে বসতে বলে চা-কফি নিয়ে এলো।

চা পান করতে করতে প্রতিবেশী মহিলাটি ভাবতে লাগল এ মুহূর্তে তার সাথে কী কথা বলা যায়? এরই মধ্যে তালাকপ্রাপ্তা মহিলাটি বললো, ‘আপা! গতকাল আপনাদেরকে বাসা থেকে বের হতে দেখলাম, কোথায় গিয়েছিলেন?’

প্রতিবেশী মহিলাটি বললো, ও আচ্ছা! ওর বাবা (মহিলার স্বামী) গতকাল আমাকে বাইরে কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার করার জন্য পীড়া-পীড়ি করছিল।’ অবশেষে বাধ্য হয়ে বের হতে হলো। ডিনার শেষে আমার বোনের বিয়েতে পরার জন্য মার্কেট থেকে একটা ড্রেস কিনল। এরপর বিয়ের অনুষ্ঠানে পরার জন্য একটি জুয়েলারি দোকান থেকে আমার জন্য চুড়ি কিনল।

বাড়িতে ফিরে দেখলাম বাচ্চাদের মন খারাপ। তখন ও তাদেরকে আগামী সপ্তাহে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সান্ত্বনা দিল । অসহায় তালাক প্রাপ্ত মহিলাটি তার প্রতিবেশীর এসব কথা শুনছিল আর একটু পরে ভাইয়ের বাড়িতে তার কী দুরবস্থা হবে তা ভাবছিল।

এখানে প্রশ্ন হলো, একটু আগে যে মহিলার স্বপ্নের সংসার ভেঙ্গে গেছে তার সঙ্গে এ ধরনের আলাপচারিতা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

আপনার কী মনে হয় এ ঘটনার পর ঐ প্রতিবেশী মহিলার প্রতি তার ভালবাসা আরো বাড়বে? তার সঙ্গে আলাপ করতে সে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে? তাকে দেখলে সে খুশী হবে? নিশ্চয় আমরা সবাই একবাক্যে বলব, ‘না’।

বরং প্রতিবেশী মহিলার কথায় তার মনের গহীনে হিংসা ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠবে ৷

তাহলে এর সমাধান কী? সে কি মিথ্যা কথা বলবে?

কখনো না। সে মিথ্যার আশ্রয় নেবে না; বরং আলোচনাকে সে দীর্ঘায়িত না করে সংক্ষেপে শেষ করবে। সে এমন বলতে পারে, ‘বাইরে জরুরি একটা কাজ ছিল। তাই একটু বের হয়েছিলাম।’ তারপর সে প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবে এবং তালাকপ্রাপ্ত অসহায় মহিলাটিকে সান্ত্বনামূলক কথা বলে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেবে।

মানসিক অবস্থা বিবেচনায় কথা বলা
অন্যের মানসিক অবস্থা না বুঝে কথা বললে সম্পর্ক নষ্ট হয়।ছবি: Photo by MART PRODUCTION.

পরীক্ষায় ফেল করা বন্ধুর ঘটনা!

আরেকটি উদাহরণ দেখুন। দুই বন্ধু একসঙ্গে নিম্নমাধ্যমিক স্তরের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। একজন খুব ভাল ফলাফল করেছে, কিন্তু অপরজন কয়েক বিষয়ে ফেল করেছে কিংবা এত কম নম্বর পেয়ে পাশ করেছে যে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ লাভ করা তার জন্য সম্ভব নয় । যে ভাল রেজাল্ট করেছে সে নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো । আর অপর বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে সাধারণ কোনো চাকরিতে যোগ দিল।

যে বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল সে যখন তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে, তখন সে কি তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনকাল, পড়াশোনা ও সেখানকার নানা সুযোগ সুবিধার কথা নিয়ে আলোচনা করবে?

এ প্রশ্নের জবাবেও নিশ্চয়ই সবাই বলবে, ‘না ৷’

তাহলে করণীয় কী ?

করণীয় হলো, সে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে, যাতে বন্ধুর মানসিক চাপ কিছুটা হলেও দূর হতে পারে। যেমন সে বলতে পারে, ‘এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে । ভাল ফলাফল করা অনেক ছাত্র পরীক্ষা দেয়ার পরও খুব অল্প সংখ্যক ছাত্র চান্স পেয়েছে । মাধ্যমিক স্তরে ভাল নম্বর নিয়ে পাশকরা বহুছাত্র হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।’

এ জাতীয় আলোচনায় বন্ধুর মানসিক চাপ কিছুটা হলেও দূর হবে এবং সে এ বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করে সান্ত্বনা পাবে । বন্ধুর প্রতি তার ভালবাসা আরো বেড়ে যাবে । সে তাকে তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গণ্য করবে।

অসচ্ছল বন্ধুর ঘটনা!

আরেকটি উদাহরণ দেখুন। দুই বন্ধুর সাক্ষাত হলো। একজনের পিতা বেশ উদার। ছেলেকে হাত খরচের জন্য যথেষ্ট টাকা দেন। অপরজনের বাবা খুব কৃপণ। সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ছেলের প্রয়োজন অনুপাতে টাকা দেন না। টাকা চাইলেই শুধু হিসাব চান।

এ পরিস্থিতিতে সচ্ছল বন্ধুর জন্য তার বাবার উদারতা নিয়ে গল্প করার অর্থ হলো তার বন্ধুর মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়া। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে তার মন খারাপ হয়ে যাবে এবং নিজের বাবার আচরণ মনে করে সে কষ্ট পাবে। এর ফলে এ বন্ধুর সঙ্গে তার চলাফেরা করা কঠিন হয়ে যাবে।

ইসলামে অন্যের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীলতা!

এজন্যই আমাদের নবী (সাঃ) অপরের আবেগ-অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখতে আদেশ করেছেন । তিনি বলেছেন-

হাদিস — আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৯২৮, সুনানে ইবনে মাযাহ: ৩৫৩৩, মুসনাদে আহমদ: ১৯৭১
لَا تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمُجَنَّ مِينَ
তোমরা কুষ্ঠরোগীর দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেক না।

কুষ্ঠরোগ এমন এক রোগ যা চামড়ার উপরিভাগকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে দেয় । দেখতে বিশ্রী লাগে । তাই কুষ্ঠরোগী কারো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে যদি তার দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে সে লজ্জা পায় এবং তার মানসিক কষ্ট হয় । এজন্য রাসূল (সাঃ) তার দিকে তাকিয়ে থাকতে নিষেধ করেছেন।

মক্কা বিজয়ে রাসূল (সাঃ)-এর অসাধারণ কৌশল!

এখানে আরো একটি ঘটনা আলোচনা করছি। এ ঘটনার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাব রাসূল (সাঃ) মানুষের মানসিক অবস্থা কত গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতেন । রাসূল (সাঃ) তার মুসলিম বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মক্কার উপকণ্ঠে এসে থামলেন ।

আবূ বকর (রাঃ)-এর পিতা আবূ কোহাফা ছিলেন অতিশয় বৃদ্ধ ও দৃষ্টিশক্তিহীন। তিনি তার এক নাতনিকে বললেন, ‘আমাকে একটু আবূ কুবাইস পাহাড়ের কাছে নিয়ে যাও ৷ লোকেরা যা বলাবলি করছে তা কতটুকু সত্য, তা একটু দেখে আসি।

: মোহাম্মদ কি এসে পড়েছে?’
: নাতনি দাদাকে নিয়ে পাহাড়ের ওপর দাঁড়াল ।
: দাদা বললো, ‘বেটি! কী দেখতে পাচ্ছো?’
: বিশাল এক দলকে এগিয়ে আসতে দেখছি ।
: এটাই তাহলে মোহাম্মদের বাহিনী ।
: মেয়েটি বললো, ‘একজনকে দলটির আগে ও পেছনে আসা যাওয়া করতে দেখছি ।’
: দাদা বললো, বেটি! সে এ বাহিনীর সেনাপতি হবে। সৈন্যদেরকে সে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।’
: মেয়েটি হঠাৎ শঙ্কিত স্বরে বললো, ‘দাদা! দলটি তো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ।

দাদা বললো, ‘তারা এখন মক্কার দিকে আসছে। অতি সত্বর তারা পৌঁছে যাবে। আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে চল। কারণ তারা বলেছে, যে নিজের ঘরে থাকবে, সে নিরাপদ।’

মেয়েটি দাদাকে নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে বাড়ি পৌঁছার আগেই মুসলিম বাহিনীর ঘোড় সওয়ারদের সামনে পড়ে গেল । আবূ বকর (রা:) বাবাকে দেখে এগিয়ে এলেন । তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তাকে অভিনন্দন জানালেন । তারপর তার হাত ধরে রাসূল (সাঃ) এর কাছে মসজিদে নিয়ে গেলেন।

নবী করিম (সাঃ) আবূ কোহাফার দিকে তাকালেন । অতি বার্ধক্যে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে । অস্থি মজ্জা শুকিয়ে গেছে। পরপারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আবূ বকর (রাঃ) অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন পিতার দিকে। কতদিন পিতাকে তিনি দেখেন না। দ্বীনের জন্য তিনি সব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মদিনায়।

রাসূল (সাঃ) আবূ বকর (রা:) কে খুশি করার জন্য এবং তার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বললেন, ‘আবূ বকর! মুরুব্বিকে বাড়িতে রেখে আসতে! আমি নিজে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম।’

আবূ বকর (রা:) জানতেন, তারা এখন যুদ্ধের ময়দানে । রাসূল (সাঃ) তাদের সেনাপতি । তিনি অনেক ব্যস্ত । এ মুহূর্তে বাড়িতে গিয়ে তার পিতাকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার মতো সময় বের করা রাসূলের জন্য অনেক কঠিন।

তাই তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! আপনি তার কাছে যাওয়ার চেয়ে তিনি আপনার কাছে আসবেন, এটাই তো যুক্তিযুক্ত।’

রাসূল আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে আবূ কোহাফাকে সামনে বসালেন । তার বক্ষে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি ইসলাম কবুল করে নিন ।’

আবূ কুহাফার চেহারায় আলোর ছটা খেলে গেল । তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন । পিতার ইসলাম গ্রহণে আবূ বকর (রাঃ) এতো খুশি হলেন যে, সারা পৃথিবী তার করায়ত্ব হলেও তিনি এতো খুশি হতেন না ।

রাসূল (সাঃ) তাকিয়ে দেখলেন, বৃদ্ধ আবূ কোহাফা (রাঃ) এর চুল দাঁড়ি শুভ্র হয়ে গেছে । তাই তিনি আবূ বকরকে বললেন, ‘এ শুভ্রতাকে খেযাব দিয়ে রাঙিয়ে দাও। তবে তা যেন কালো না হয়ে যায় ।’ (মুসনাদে আহমদ:২৫৭১৮)

এভাবেই রাসূল (সাঃ) মানুষের সঙ্গে আচরণ ও কথায় তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন।

মক্কায় প্রবেশের সময় তিনি সৈন্যবাহিনীকে কয়েকটি দলে ভাগ করেন। একটি দলের পতাকা দেন বিখ্যাত সাহাবী সাদ বিন উবাদা (রাঃ) এর হাতে । যুদ্ধক্ষেত্রে পতাকা বহন ছিল মর্যাদা ও সম্মানের বিষয় । এ সম্মান শুধু ব্যক্তির নয়; বরং পতাকাবাহীর পুরো গোত্রের সম্মান।

সাদ (রা:) মক্কার দিকে তাকালেন । তাকালেন মক্কার অধিবাসীদের দিকে । তিনি ভাবলেন, এরাই তো এতোদিন আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, নানাভাবে তাকে ও তার সহচরদেরেকে কষ্ট দিয়েছে । শান্তিপ্রিয় মানুষকে রাসূলের সংস্পর্শে আসতে বাধা দিয়েছে । এরাই সুমাইয়া (রাঃ) ও ইয়াসির (রা:)-কে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, বেলাল ও খাব্বাবের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে । আজ উপযুক্ত শাস্তি এদের পেতেই হবে। সাদ রাদিয়াল্লাহু পতাকা নাড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বললেন,

‘আজ লড়াইয়ের দিন, আজ হেরেমের সীমানায় রক্তপাতের দিন”

সাদ (রাঃ) এর এ হুমকি শুনে কোরাইশরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল । তারা ভাবল, আজ কারো নিস্তার নেই । মুসলমানরা সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। জনৈক মহিলা দ্রুত রাসূলের সঙ্গে দেখা করে সাদ (রাঃ) এর হুমকিতে কোরাইশদের ভীত হয়ে পড়ার বিষয়টি জানাল। সে স্বরচিত কবিতার ছন্দে বিষয়টিকে এভাবে ব্যক্ত করলো-

হে হেদায়েতের নবী ! এখন আপনি ছাড়া কোরাইশদের আর কোনো আশ্রয় নেই ৷
বিশাল পৃথিবী এখন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে এসেছে ।
তাদের কল্পিত প্রভু যখন তাদের সঙ্গে বৈরিতা প্রদর্শন করেছে তখন আপনিই তাদের একমাত্র আশা-ভরসার পাত্র ।
সা’দ তো হুজুন ও বাতহা এলাকার লোকদের হাড় ধুলায় মিশিয়ে দিতে চায়, এই খাজরাজী সরদার যদি সুযোগ পায় তাহলে,
সে আমাদের ওপর তীর-বর্শা নিক্ষেপ করতে কোনো দ্বিধা করবে না ।
এই কালো সিংহ ও রক্তপিপাসু বাঘ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন । সে যদি পতাকা হাতে অধীনস্থদের নির্দেশ দেয় তাহলে কোরাইশ জনপদ ধুলায় মিশে যাবে।
সে বধির সাপের ন্যায়, নাঙ্গা তরবারি নিয়ে কোরাইশকে নিঃশেষ করে দিতে বদ্ধপরিকর।

মহিলার কবিতা শুনে রাসূলের হৃদয়ে দয়া ও সহানুভূতির ঢেউ খেলে গেল। মহিলাটি যেহেতু অনেক বড় আশা নিয়ে রাসূলকে বিষয়টি জানিয়েছিল, তাই রাসূল তাকে নিরাশ করতে চাইলেন না। আবার সাদের হাতে নেতৃত্বের পতাকা দেয়ার পর তা ফিরিয়ে নিলে তার মনে আঘাত লাগবে এ বিষয়টিও তিনি ভাবলেন। তাই তিনি এমন কৌশল অবলম্বন করলেন যেন সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে।

রাসূল (সা:) সাদ (রা:) হাতের পতাকা তার পুত্র কায়েস বিন সাদ (রা:)-কে বহন করতে বললেন। কায়েস পতাকা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং তার পিতা সাদ তার পাশে হেঁটে হেঁটে অগ্রসর হতে লাগলেন। সাদের হাতে পতাকা না দেখে ওই মহিলা ও কোরাইশরা খুশি হলো।

এদিকে সাদও মনক্ষুণ্ণ হলেন না। কারণ, তিনি তো তখনো তার বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে বহাল আছেন। উপরন্তু পতাকাবাহনের কষ্টও তাকে করতে হচ্ছে না। পতাকা তার পক্ষে তার ছেলে বহন করে চলছে। এক ঢিলে কয়েক পাখি শিকারের এর চেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে?

সমাধান: মিথ্যা নয়, কৌশলী হোন!

অনেকে মনে করেন, অন্যের মন রক্ষা করতে হলে মিথ্যা বলতে হবে। এটি ভুল। আপনিও এমন আচরণ কৌশল রপ্ত করুন যেন কাউকে হারাতে না হয় । আপনার লক্ষ্যও অর্জন করুন, আবার সবার মনও জয় করে নিন। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে তাতে সমস্যা কী? সবাইকে আপন করে নিন।

সত্যিকারের কৌশল হলো —

  • কথাকে সংক্ষিপ্ত রাখুন
  • প্রসঙ্গ সরিয়ে নিন
  • সান্ত্বনামূলক কথায় ফিরে আসুন
  • সবার লক্ষ্য পূরণ হয় এমন পথ খুঁজুন

উপসংহার: হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের আচরণ

মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা মানে কেবল কাউকে খুশি রাখা নয়। এটি হলো মানুষকে সত্যিকার অর্থে বোঝা এবং তার পাশে থাকা। আমাদের আচরণ যেন হয় হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, কেবল বাহ্যিক কথার নয়।

সিদ্ধান্ত
আমাদের আচরণ যেন হয় হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নয়।

এরপর পড়ুন: অন্যকে গুরুত্ব দিতে শিখুন! আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে। 

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading