মানুষ সাধারণত অন্যের কাছে সম্মান ও মূল্যায়ন আশা করে। এ জন্য আপনি দেখবেন, বিভিন্ন আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করে থাকে। এমনকি মানুষ অন্যের মনোযোগ আকর্ষণের কিংবা নিজেকে সফল হিসেবে প্রচার করার জন্য অনেক সময় নিজের বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে কাল্পনিক কাহিনীও তৈরি করতে দ্বিধা করে না।
চতুর্থ সন্তানের গল্প!
মনে করুন, একজন লোক তার চারজন সন্তান। তিনি সারাদিন বাইরে কাজ করে ক্লান্ত দেহে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন, সন্তানরা যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এগারো বছর বয়সের বড় সন্তানটি টিভি দেখছে। দ্বিতীয়জন তার সামনে বসেই খাবার খাচ্ছে। তৃতীয় জন খেলনা নিয়ে একমনে খেলছে। আর চতুর্থজন খাতায় কি যেন লেখছে ৷
ঘরে প্রবেশ করে তিনি একটু জোরেই সালাম দিলেন। কিন্তু কারো মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। বড় ছেলে টিভি দেখায় ব্যস্ত হয়ে থাকল। দ্বিতীয়জন খেলনা নিয়ে খেলায় লিপ্ত হয়ে রইল। তৃতীয়জনও খাবার খেতে থাকল। কিন্তু চতুর্থজন বাবাকে দেখে খাতা-কলম রেখে উঠে দাঁড়াল, হাসি মুখে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলো এবং বাবার হাতে চুমু খেল। এরপর গিয়ে আবার লেখায় মনোযোগ দিল।
চারজনের মধ্যে পিতা কাকে বেশি ভালবাসবেন?
আমার বিশ্বাস-আমাদের উত্তর ভিন্ন হবে না। আমরা সবাই বলব, ‘পিতা চতুর্থজনকেই বেশি ভালবাসবেন’। সে অন্যদের চেয়ে দেখতে সুন্দর কিংবা তার মেধা বেশি। এ কারণে তাকে বেশি ভালবাসবেন এটা কেউ বলবেন না; বরং এর কারণ হলো, সে তার পিতাকে বোঝাতে পেরেছে যে, তার পিতা তার কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’। আপনি অন্যকে যত বেশি গুরুত্ব দেবেন সেও আপনাকে তত বেশি সম্মান ও মূল্যায়ন করবে।
রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ আচরণ!
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এ বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। আপন আচরণে প্রত্যেককে তিনি এ কথা বোঝাতেন যে, তার সমস্যা রাসূলের নিজেরই সমস্যা, তার দুঃখ রাসূলের নিজেরই দুঃখ।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একদিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে বয়ান করছিলেন। জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে রাসূলের দিকে তাকিয়ে বললো, “হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি দ্বীন সম্পর্কে জানতে চায় দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো তার জানা নেই ৷
রাসূল (সাঃ) তাকিয়ে দেখলেন, সে এক আরব বেদুঈন। রাসূল বয়ান শেষ করে তার সঙ্গে কথা বলবেন, হয়তো সে এতটুকু অপেক্ষা করতেও প্রস্তুত নয়। এমনও হতে পারে এর আগেই সে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাবে এবং আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।
রাসূল বুঝলেন, বিষয়টি তার মতে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, সে রাসূলের বয়ান স্থগিত রেখে দ্বীনের আহকাম জানতে চাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেকোনো বিষয়কে কেবল নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চিন্তা করতেন না। তিনি সেটা দেখতেন অন্যদের দৃষ্টিতেও।
তিনি মিম্বর থেকে নেমে এলেন। এরপর লোকটির সামনে বসে তাকে দ্বীনের বিভিন্ন বিধি-বিধান শিক্ষা দিতে লাগলেন। লোকটি সবকিছু বুঝে নিল। এরপর তিনি মিম্বরে ফিরে বয়ান শেষ করলেন।
কত মহান, কত ধৈর্যশীল ছিলেন তিনি! সাহাবায়ে কিরাম তো নববী শিক্ষাঙ্গণেই শিক্ষা লাভ করেছেন ৷ তাই তারাও জানতেন অন্যদের প্রতি কেমন মনোযোগী হতে হয়। তাই তারা অন্যকে সম্মান করতেন, অভিবাদন জানাতেন, অন্যদের সুখে-দুঃখে শরিক হতেন। অন্যের সুখ দুঃখকে নিজের মতো করে দেখতেন। এ ক্ষেত্রে তারা ছিলেন একাত্মার মতো।
কা’ব বিন মালেক (রাঃ)-এর ঘটনা!
সাহাবায়ে কিরামের জীবনচরিত রোমন্থন করলে এর অসংখ্য নমুনা খুঁজে পাবেন। তারই একটি কা’ব (রা:) এর সঙ্গে তালহা (রা:) এর সে বিশেষ আচরণ।
কা’ব বিন মালেক তখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ দুর্বল হয়ে গেছে। অস্থি-মজ্জা সব শুকিয়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তিও রহিত হয়ে গেছে। তিনি নিজের যৌবনের স্মৃতিচারণ করছিলেন। তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পরিণামে রাসূল সাহায্যে তার সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন তা তিনি স্মরণ করছিলেন।
তাবুক যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবনের শেষ যুদ্ধ। তিনি এ যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সবাইকে প্রস্তুত হতে বললেন। যুদ্ধের ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য সবার কাছ থেকে অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করলেন। এ যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন প্রায় ত্রিশ হাজার সাহাবী।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের সাথে লু হাওয়া বয়ে চলছে। আর কিছুদিন পরেই পাকা ফল ‘ও ফসল ঘরে উঠবে। গাছে গাছে ঝুলছে পাকা- আধাপাকা ফল। প্রচণ্ড গরমের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। শত্রুবাহিনীও অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী। অবশ্য মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যাও কম ছিল না।
কা’ব বলেন, আমি তখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বচ্ছল ছিলাম। জিহাদে শরীক হওয়ার জন্য দু’টি উটও প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। জিহাদে যাওয়ার জন্য আমি মানসিকভাবেও প্রস্তুত ছিলাম।
বাগানের শীতল ছায়া আর পাকা ফলের বাহারি থোকা দেখে দেখে আমার সময় খুব ভালই কেটে যাচ্ছিল। একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবীদেরকে নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। মনে মনে ভাবলাম, আগামীকাল বাজারে গিয়ে আরো কিছু প্রয়েজনীয় রসদ ক্রয় করে কাফেলার সঙ্গে মিলিত হব।
আমি পরদিন বাজারে গেলাম। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে সেদিন ফিরে আসতে হলো। মনে মনে ভাবলাম, আগামীকাল রওয়ানা হয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হব। কিন্তু সেদিনও কোনো কারণে জিহাদের আসবাবপত্র কেনা হলো না।
সেদিনও মনে মনে ভাবলাম, আগামীকাল রওয়ানা হব। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু আমার আর যাওয়া হলো না। আমি বাজারে কিংবা মদিনার অলি-গলিতে গেলে কট্টর মুনাফিক অথবা যুদ্ধে যেতে অক্ষম ব্যক্তি ছাড়া আর কারো সাথে আমার দেখা হতো না।
রাসূলুল্লাহ ত্রিশ হাজার সাহাবীকে নিয়ে তাবুক প্রান্তরে পৌঁছলেন। গন্তব্যে পৌঁছে তিনি অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকালেন। কিন্তু বাইয়াতে আকাবায় অংশগ্রহণকারী একনি একজন সাহাবীকে তিনি খুঁজে পেলেন না।
তিনি বললেন, ‘কা’ব বিন মালেকের কী হয়েছে’?
একজন বলে উঠল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে সে জিহাদে শরিক হতে পারে নি।
এ কথা শুনে মুয়ায বিন জাবাল বললেন, ‘তুমি একটা বাজে মন্তব্য করলে! আল্লাহর কসম হে আল্লাহর রাসূল! তার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই পোষণ করি।’ রাসূল (সাঃ) কিছুই বললেন না।
কা’ব (রাঃ) বলেন, অভিযান শেষে রাসূল মদিনার উপকণ্ঠে এসে তাবু গাড়লেন। এ খবর শুনে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। রাসূলের কাছে কী জবাব দেব তা ভাবতে লাগলাম। কোনো অজুহাত পেশ করলে তিনি রাগ করবেন না। আমি পরিবারের বিচক্ষণ লোকদের সাথে পরামর্শ করলাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন মদিনায় পৌঁছলেন, আমার মধ্যে এ বোধ জাগ্রত হলো যে, কোনো ধরনের লুকোচুরি নয়; বরং সত্যের মধ্যেই আমার মুক্তি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদিনায় এসে প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত নামায পড়লেন। এরপর সাহাবীদের নিয়ে বসলেন। যুদ্ধে অনুপস্থিত মুনাফিকরা এসে বিভিন্ন ওজর-অজুহাত পেশ করে মিথ্যা কসম খেল। এদের সংখ্যা ছিল আশিরও বেশি। রাসূলুল্লাহ তাদের বাহ্যিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তাদের অজুহাত গ্রহণ করে নিলেন। তাদের জন্য ইস্তেগফার করলেন। আর তাদের অন্তর্গত অবস্থা আল্লাহর কাছে সঁপে দিলেন।
কা’ব বিন মালেক এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) – কে সালাম দিলেন। রাসূল তার দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সাথে একটু মুচকি হাসলেন। কা’ব রাসূলের সামনে এসে বসলেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-বললেন, হে কা’ব, তুমি কেন জিহাদে শরিক হলে না?
: তুমি কী বাহন কিন নি?
: হ্যাঁ, কিনেছি।
: তাহলে কেন জিহাদে শরিক হলে না?
উত্তরে কা’ব (রা:) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ, আপনি ছাড়া অন্য কারো সামনে হলে আমি অবশ্যই অজুহাত দেখিয়ে তাকে খুশি করে ফেলতে পারতাম। কেননা, আল্লাহ তায়ালা আমাকে বিতর্ক করার যোগ্যতা দিয়েছেন। তবে আমি নিশ্চিত, আজ মিথ্যা বলে আপনাকে খুশি করতে পারলেও আল্লাহ তায়ালা একসময় সত্য প্রকাশ করে আমার প্রতি আপনাকে অসন্তুষ্ট করে দেবেন। পক্ষান্তরে সত্য বললে আপনি আমার প্রতি এখন অসন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা করবেন বলে আশা রাখি। হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ, বাস্তবে আমার কোনো ওজর ছিল না। আর আমি ইতোপূর্বে কখনোও এত স্বচ্ছল ও সম্পদের অধিকারীও ছিলাম না। এ কথা বলে কা’ব (রা:) নীরব হয়ে গেলেন।
রাসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কিরামের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সে সত্য বলেছে।’ অতঃপর কা’ব (রা:)-কে সম্বোধন করে বললেন, তুমি অপেক্ষা করতে থাক। দেখি, আল্লাহ তাআলা তোমার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত দেন।’ কা’ব (রাঃ) ওঠে দাঁড়ালেন। পা দুটি আর টানতে পারছেন না। চিন্তিত ও ব্যথিত হৃদয় নিয়ে মসজিদ থেকে বের হলেন। তার সম্পর্কে আল্লাহ কী ফায়সালা করবেন তা তিনি অনুমান করতে চেষ্টা করলেন।
তার এ অবস্থা দেখে গোত্রের কয়েকজন লোক তাকে অনুসরণ করলো। তারা তাকে তিরস্কার করে বললো, আমাদের জানামতে এর আগে কখনও তুমি কোনো অন্যায় করনি। তুমি তো একজন কবি। তুমি চাইলে তো অন্যদের মতো রাসূলের কাছে অজুহাত পেশ করে পার পেয়ে যেতে পারতে। তিনি তো তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। আল্লাহও তোমাকে ক্ষমা করে দিতেন।
কা’ব (রাঃ) বলেন, তাদের এরূপ ভর্ৎসনার কারণে একপর্যায়ে আমার মনে হলো যে, আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে নতুন করে ওজর পেশ করি ৷
কা’ব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, আমার মতো কি আর কেউ আছে? লোকেরা বললো, ‘হ্যাঁ, দু’জন ব্যক্তি তোমার মতোই সত্য বলেছে। তাদেরকেও তোমার মতোই অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কা’ব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তারা দু’জন কে কে?
লোকেরা জানাল, মুরারা বিন রাবিয়া ও হেলাল বিন উমাইয়া।
কা’ব মনে মনে ভাবলেন, “তারা উভয়েই নেককার, উভয়েই বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তারা আমার আদর্শ। আমি তাদের মতো সত্যের ওপর অটল থাকব। আমি এ বিষয়ে আর রাসূলের কাছে যাব না এবং মিথ্যাও বলব না।’
এরপর কা’ব (রা:) বেদনাক্লিষ্ট হৃদয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরই রাসূলুল্লাহ (সা:) সাহাবায়ে কিরামকে কা’ব (রাঃ), মুরারা বিন রাবিয়া ও হেলাল বিন উমাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন।
কা’ব (রা:) বলেন, সবাই আমাদেরকে এড়িয়ে চলত। আমি বাজারে যেতাম, কেউ আমার সাথে কথা বলত না। এরা যেন আমার পরিচিত কেউ নয়। কেউ যেন আমাকে চেনে না। মদিনার বাগানগুলোও যেন বদলে গেছে। এ যেন আমার চিরচেনা সে বাগান নয়। আমার পৃথিবী ও আজ বদলে গেছে। আমি যেন এ পৃথিবীর অধিবাসী নই। অন্য কোনো গ্রহ থেকে এখানে এসেছি।
মুরারা বিন রাবিয়া ও হেলাল বিন উমাইয়া রাত-দিন ঘরে বসে বসে শুধু কাঁদত। তারা বাইরে বের হতো না। দুনিয়া বিরাগী পাদ্রী-সন্ন্যাসীর ন্যায় রাত-দিন শুধু ইবাদতে মগ্ন থাকত। তিনজনের মধ্যে আমি ছিলাম বয়সে নবীন ও অধিক শক্তিশালী। আমি বাইরে বের হতাম। মুসলমানদের সঙ্গে জামাতে নামায পড়তাম। হাটে-বাজারে ঘুরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না।
আমি মসজিদে গিয়ে রাসূল (সাঃ)-কে সালাম দিতাম আর খেয়াল করে দেখতাম যে, তিনি আমার সালামের উত্তর কিভাবে দিচ্ছেন। তার ঠোঁট নড়ছে কি না? আমি রাসূলের পেছনে নামায পড়তাম এবং আঁড়চোখে তাঁর দিকে তাকাতাম। আমি নামাযে মনোযোগী হলে তিনি আমার দিকে তাকাতেন। আর আমি তাঁর দিকে তাকালে তিনি চেহারা ফিরিয়ে নিতেন।
এ অবস্থায় কয়েকদিন কেটে গেল। দিনদিন তার মনোকষ্ট বাড়তে লাগল। প্রতীক্ষার এক একটি প্রহর তার কাছে এক এক বছরের মতো মনে হলো। তিনি ছিলেন নিজ বংশের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। বংশের সবচেয়ে বাগ্মী কবি। বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাগণ তাকে চেনেন এবং তারা তার কবিতারও ভক্ত ও গুণগ্রাহী। বিভিন্ন গোত্রের বড় বড় ব্যক্তিরা তার সাথে সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় থাকত।
কা’ব মদিনায় নিজ গোত্রেই অবস্থান করছেন। কিন্তু কেউ তার সাথে কথাও বলে না কিংবা তার দিকে ফিরেও তাকায় না। একাকীত্বের এ জীবন যখন তার জন্য অসহ্যকর হয়ে উঠল, এবং মানসিক যন্ত্ৰণা সীমা ছাড়িয়ে গেল ঠিক তখনই তার ওপর নেমে আসল আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। তিনি বাজারে ঘুরাফেরা করে মনটাকে একটু সতেজ করার চেষ্টা করছিলেন। শাম দেশের জনৈক খৃষ্টান ব্যক্তি এসে লোকদেরকে বললো, ‘আমাকে কা’ব বিন মালেককে একটু দেখিয়ে দেবেন?’
লোকেরা ইঙ্গিতে কা’ব (রা:)-কে দেখিয়ে দিল ৷ লোকটি কা’বের কাছে এসে তাকে গাসসানের রাজার পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি চিঠি দিল। কা’ব (রা:) মনে মনে বললেন, আশ্চর্য! গাসসানের রাজা! আমার বিষয়টি তাহলে শামদেশেও পৌঁছে গেছে! গাসসানের রাজার পক্ষ থেকে আমার কাছে চিঠি! সে আমার কাছে কী চায়?
কা’ব চিঠিটি খুললেন। তাতে লেখা আছে, হে কা’ব বিন মালেক! আমি জানতে পেরেছি যে, তোমার সঙ্গী তোমার সঙ্গে নির্দয় ও অমানবিক আচরণ করছে এবং তোমাকে একঘরে করে রেখেছে। তুমি চাইলে আমাদের এখানে চলে আসতে পার। আমরা তোমার সহমর্মী হব।
চিঠি পড়া শেষে করে কা’ব (রা:) বলে উঠলেন, ইন্না লিল্লাহ! কাফেররাও আমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে! এটাতো ভাল লক্ষণ নয়। এটা বড় কঠিন পরীক্ষা। এরপর তিনি চিঠি নিয়ে তৎক্ষণাৎ উনুনে নিক্ষেপ করলেন।
কা’ব (রা:) কাফের রাজার প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হন নি। রাজপ্রাসাদ ও রাজ দরবারের দরজা তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। পার্থিব সম্মান ও রাজ- সান্নিধ্য লাভের সুযোগ তার দোরগোড়ায় এসে তাকে আহ্বান করছিল। এদিকে মদিনা ও মদিনার জীবন তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। পরিচিত মুখগুলো সব অপরিচিত হয়ে পড়েছিল। কেউ সালামের উত্তর দেয় না। হাসিমুখে কেউ কথা বলে না। এমনকি কেউ কোনো প্রশ্নের জবাবও দেয় না। এ অবস্থায় রাজ দরবারের ডাক। কত কঠিন পরীক্ষা!
হ্যাঁ, বিরাট কঠিন পরীক্ষা। শয়তানের বিশাল বড় ফাঁদ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে রক্ষা করেছেন। তিনি কাফেরদের ফাঁদে পা দেন নি। শয়তানের প্রবঞ্চনার শিকার হন নি। রাজকীয় বার্তাটিকে তিনি জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে শয়তানের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
দিনের পর রাত এসেছে। আবার রাতের পর দিন। এভাবে কেটে গেছে তিরিশটি দিন, পূর্ণ একটি মাস। কাব (রাঃ) সে আগের অবস্থাতেই আছেন। কষ্টের পাল্লা দিনদিন ভারী হচ্ছে। প্রতীক্ষার প্রহরগুলো তার মাথার ওপর যেন জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসছে। রাসূল (সাঃ) নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। সিদ্ধান্তমূলক ওহীও ওপর থেকে অবতীর্ণ হচ্ছে না।
এভাবে কেটে গেল ব্যথা ও বেদনাঘেরা চল্লিশটি দিন। সুখের বার্তা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে ফুটে ওঠল নতুন সূর্য। রাসূলের পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহক এসে কাবের দরজায় করাঘাত করলো। বুকভরা আশা নিয়ে কা’ব শুনিগ্রহে বেরিয়ে এলেন, হয়তো ক্ষমা ও মুক্তির বার্তা এসে গেছে। কিন্তু না। যা ভেবেছিলেন তা নয়। বার্তাবাহক জানালেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আপনাকে স্ত্রী থেকেও আলাদা থাকতে বলেছেন!
কা’ব (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দেব? বার্তাবাহক বললেন, ‘না, আপনি কেবল তার কাছ থেকে আলাদা থাকবেন। তার সাথে স্ত্রীসুলভ কোনো আচরণ করবেন না ৷ ‘
কা’ব (রা:) তার স্ত্রীকে বললেন, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আমার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসার আগ পর্যন্ত ওখানেই থাকবে।
রাসূল (সা:) মুরারা বিন রাবিয়া ও হেলাল বিন উমাইয়ার কাছেও একই আদেশ পাঠালেন। হেলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! হেলাল বিন উমাইয়া অতিশয় বৃদ্ধ ও দুর্বল। আমি কি তার খেদমত করতে পারব? রাসূল (সাঃ) অনুমতি দিয়ে বললেন, তবে সাবধান! সে যেন তোমার সঙ্গে স্ত্রীসুলভ আচরণ না করে ৷
হেলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম তার মধ্যে তো যৌন কামনাই নেই। শুরু থেকে নিয়ে সে রাত-দিন শুধু কান্নাকাটি করছে।
এভাবে দিন কাটানো কা’বের জন্য দুর্বিষহ হয়ে ওঠল। দিন দিন তার মানসিক কষ্ট বেড়েই চলল। শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিচ্ছিল আর বারবার তিনি ঈমান নবায়ন করছিলেন। তিনি মুসলমানদের সাথে কথা বলতে চান, কিন্তু তারা কেউ তার সাথে কথা বলে না। তিনি রাসূলকে সালাম করেন, কিন্তু সালামের উত্তর শুনেন না। তিনি কার কাছে যাবেন? কার কাছে পরামর্শ চাইবেন? এখন তার করণীয় কী?
কা’ব (রা:) বলেন, কষ্ট ও যন্ত্রণা যখন চরম আকার ধারণ করলো তখন একদিন আমি আবূ কাতাদার কাছে গেলাম। সে আমার চাচাতো ভাই এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। সে তার বাগানে কাজ করছিল। বাগানের প্রাচীর ডিঙিয়ে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু সে আমার সালামের উত্তর দিল না।
আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি হে আবূ কাতাদা! আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি, এটা কি তুমি জান না? সে কোনো জবাব দিল না। আমি আবার একই প্রশ্ন করলাম। সে আগের মতোই চুপ রইল। আমি আবারও বললাম, আল্লাহর কসম হে আবূ কাতাদা! তুমি কী জান না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি? উত্তরে সে বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন।
চাচাত ভাই ও সবচেয়ে প্রিয়জনের কাছ থেকে এমন উত্তর শুনে তার হৃদয়টা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। নিজেকে নিয়ে তার সংশয় দেখা দিল। কা’বের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
ধীর কদমে তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। তার অস্থির দৃষ্টি কখনও এ দেয়ালে কখনও ঐ দেয়ালে ঘুরে ফিরছিল। জীবনসঙ্গী স্ত্রী তার পাশে নেই। সান্ত্বনা দেয়ার মতো কোনো আত্মীয় কাছে নেই। লোকজনকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করার পর পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে।
আজ তাদের জনবিচ্ছিন্নতার পঞ্চাশতম রাত। রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়েছে। রাসূল (সাঃ) তখন উম্মে সালামার ঘরে অবস্থান করছেন। রাসূল (সা:) এর ওপর ওহী অবতীর্ণ হলো। তাদের তওবা কবুল হয়েছে। তিনি এ সংক্রান্ত আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলেন। উম্মে সালামা (সাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কা’ব বিন মালেককে কি এ সংবাদ এখনি জানিয়ে দেব?
জবাবে রাসূল (সাঃ) বললেন, তাহলে তো মানুষ তোমার কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। সারারাত তুমি আর ঘুমাতে পারবে না।
ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে তাদের তওবা কবুল হওয়ার কথা শোনালেন। সাহাবীগণ তাদেরকে সুসংবাদ শোনাতে বের হয়ে গেলেন।
কা’ব (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি ঘরের ছাদে ফজরের নামায আদায় করে বসে ছিলাম। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যেমন বলেছেন, আমাদের অবস্থা তেমনি ছিল। ‘বিশাল পৃথিবী আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল’। আমার কাছে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল যে, ‘এ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু ঘটে, তাহলে তো রাসূলুল্লাহ (সা:) আমার জানাযাও পড়বেন না কিংবা এ অবস্থায় যদি রাসূল (সাঃ) ইন্তেকাল করেন তাহলে তো আমি এ অবস্থাতেই থেকে যাব। কেউ আমার সাথে কথা বলবে না। কেউ আমার জানাযাও পড়বে না’।
এমন সময় সালা’ পাহাড়ের ওপর থেকে জনৈক ব্যক্তির চিৎকার শুনতে পেলাম, ‘হে কা’ব বিন মালেক! তোমার জন্য সুসংবাদ !
আমি সেজদায় লুটিয়ে পড়লাম। বুঝতে পারলাম, আল্লাহর পক্ষ থেকে সমাধান এসে গেছে। একজন ঘোড়ায় চড়ে আমার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছেন। আর একজন পাহাড়ের ওপর হতে চিৎকার করে আমাকে সংবাদ জানিয়েছেন। তবে চিৎকারের আওয়াজ ছিল ঘোড়ার চেয়ে দ্রুতগামী।
সুসংবাদদাতা আমার কাছে এলে খুশিতে আমি আমার পরিধেয় বস্ত্ৰ তাকে দিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম, এ দু’টি কাপড় ছাড়া আমার কাছে তখন অন্য কোনো কাপড় ছিল না। এরপর অন্য একজনের কাছ থেকে দু’টি কাপড় ধার নিয়ে পরিধান করে রাসূলুল্লাহ সাপাহার-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলাম। লোকেরা দলে দলে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলো। তওবা কবুলের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে তারা আমাকে বলছিল, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমার তওবা কবুল করেছে, তোমাকে অভিনন্দন’।
তালহা (রাঃ)-এর চমৎকার আচরণ!
আমি মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবায়ে কিরামের মাঝে বসে আছেন। আমাকে দেখে সে মজলিস থেকে তালহা বিন উবাইদুল্লাহ দাঁড়ালেন। তিনি আমার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন এবং আমাকে অভিনন্দন জানালেন। আল্লাহর কসম, তালহার এ আচরণের কথা আমি কখনও ভুলব না।

আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে পৌঁছে তাকে সালাম দিলাম। খুশিতে তাঁর চেহারা চমকাচ্ছিল। আনন্দিত হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চেহারা চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করত। আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘তোমার জন্য সুসংবাদ। জন্মের পর থেকে আজকের দিনটি তোমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন ৷’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পক্ষ থেকে না-কি আল্লাহর পক্ষ থেকে? রাসূলুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে। এরপর তিনি আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার তওবার পূর্ণতার স্বার্থে আমি আমার সকল সম্পদ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সদকা করে দিতে চাই৷
রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, নিজের জন্য কিছু সম্পদ রেখে দাও। এটা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে।
উত্তরে আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা আমাকে সততার কারণে মুক্তি দিয়েছেন। তাই আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, জীবনে কখনও মিথ্যা বলব না, তাহলে আমার তওবা পূর্ণ হবে৷’
আল্লাহ তায়ালা বাস্তবেই কা’ব বিন মালেক ও তার সঙ্গীদ্বয়ের তওবা কবুল করেছেন। এ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে-
এ ঘটনার যে অংশটি এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় তা হলো, তালহা (রাঃ) কা’ব (রা:)-কে দেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং কোলাকুলি করেছেন। এর ফলে তার প্রতি কা’ব (রাঃ) এর আন্তরিকতা ও ভালবাসা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তো তালহা (রাঃ) এর মৃত্যুর কয়েক বছর পরও এ ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কা’ব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি তালহার কথা ভুলব না। তালহা (রাঃ) কিসের মাধ্যমে কা’ব (রাঃ) হৃদয়-মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন? তিনি চমৎকার আচরণকৌশল প্রয়োগ করেছেন। তিনি তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেছেন, তাকে মূল্যায়ন করেছেন, তার আনন্দে অংশীদার হয়েছেন। ফলে তিনি কা’বের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে এবং তাদের আবেগের সাথে একাত্ম হয়ে মানুষের অন্তর জয় করা যায়। পরীক্ষার ব্যস্ত দিনগুলোতে আপনার মোবাইল ফোনে যদি একটি বার্তা আসে আর তাতে লিখিত থাকে-
তোমার পরীক্ষাগুলো কেমন হচ্ছে ?
তোমার পরীক্ষা নিয়ে আমিও টেনশনে আছি।
দোয়া করছি পরীক্ষায় যাতে ভাল রেজাল্ট করতে পার।
—ইতি তোমার বন্ধু ইবরাহিম
বাস্তব জীবনের উদাহরণ
মনে করুন, আপনার পিতা অসুস্থ। আপনি তাকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। এমতাবস্থায় জনৈক বন্ধু আপনার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে আপনার পিতার খোঁজ-খবর নিল এবং আপনার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইল। আপনি বললেন, এখন সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আপনাকে ধন্যবাদ। সন্ধ্যায় সে আবার ফোন করে বললো, ‘আপনি তো এখন হাসপাতালে আপনার আব্বুকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। বাসার লোকদের বাজার সদাই বা অন্য কোনো কিছুর দরকার থাকলে বলুন, তাদেরকে তা কিনে দিয়ে আসি।’ আপনি তাকে আবারও ধন্যবাদ জানালেন এবং তার জন্য দোয়া করে বিদায় জানালেন। দেখুন, সে আপনার কোনো সাহায্য না করতে পারলেও তার প্রতি আপনার মনের টান ও আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়ে যাবে। আপনি একটু চিন্তা করলেই তা অনুভব করতে পারবেন।
একই সময়ে অন্য একজন বন্ধু আপনাকে ফোন করে বললো, বন্ধু! আমরা সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যাচ্ছি। তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে? আপনি তাকে জানালেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ, তাই আমার জন্য যাওয়া সম্ভব নয়।’ একথা শুনে সে আপনার পিতার জন্য দোয়া তো করলই না, এবং তার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয় নি বলে কোনো ওজুহাতও পেশ করলো না। বরং আপনাকে বললো, দোস্ত! বাবা অসুস্থ হয়েছেন, তো কী হয়েছে? তিনি তো হাসপাতালে আছেন, সেবার জন্য অনেক নার্স আছে। চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তোমার সেখানে থাকার তো বিশেষ কোনো ফায়দা নেই। আমাদের সাথে চল। আমরা দলবেধে আনন্দ করব, সমুদ্রে সাঁতার কাটব। সে হাসতে হাসতে এমনভাবে এসব কথা বলছিল যেন আপনার পিতার অসুস্থতা একটা মামুলি ব্যাপার। এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
একটু চিন্তা করে দেখুন, এমন বন্ধুর প্রতি আপনার মনোভাব কেমন হবে? নিশ্চয় তার প্রতি আপনার ভালবাসা ও আন্তরিকতা কমে যাবে। কেননা, সে আপনার দুঃখে দুঃখী হয় নি। তার কাছে আপনার আবেগ অনুভূতির কোনো মূল্যই নেই।
আমার জীবনেও এমন একটি বিব্রতকর ঘটনা ঘটেছিল। তখন আমি কয়েকদিনের সফরে জেদ্দায় ছিলাম। সেখানে আমি খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে একদিন আমার মোবাইলে আমার ভাই সাউদ একটি বার্তা পাঠাল। তাতে সে লিখেছে,
আমাদের চাচাতো ভাই অমুক জার্মানীতে মৃত্যুবরণ করেছে। আমি সে ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে জানতে পারলাম, ‘আমাদের এক চাচাতো ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য দু’দিন আগে জার্মানী গিয়েছিলেন। অপারেশন চলাকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। অবশ্য তার অনেক বয়স হয়েছিল। তার মরদেহ দু’দিন পরেই রিয়াদ বিমানবন্দরে পৌঁছবে। আমি মরহুমের জন্য দোয়া ও এস্তেগফার করে কথা শেষ করলাম।
এর দু’দিন পর আমার জেদ্দার কাজকর্ম শেষ হয়ে গেল। তাই আমি বিমানবন্দরে গিয়ে রিয়াদের ফ্লাইটের অপেক্ষা করছিলাম। এর মধ্যেই কয়েকজন যুবক আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলো। তারা আমাকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে সালাম-মোসাফাহা করলো। তারা কৈশোর পার করে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছে। তাদের মাথার চুল ছিল বিদেশি স্টাইলে কাটা। তা সত্ত্বেও আমি তাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা এবং স্নেহভরে মজা করছিলাম।
এরমধ্যে আমার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। আমি মোবাইলে কথা বলত লাগলাম। কথা শেষ করে দেখতে পেলাম শার্ট-প্যান্ট পরা এক যুবক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এগিয়ে এসে আমাকে সালাম দিল ও মোসাফাহা করলো।
আমি তাকে স্বাগত জানালাম এবং দুষ্টুমি করে বললাম- ফ্যাশনটা তো একদম নতুন! তোমাকে তো বিয়ের বরের মত মনে হচ্ছে। এ জাতীয় আরও কিছু কথা তাকে বললাম। যুবকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, আপনি সম্ভবত আমাকে চিনতে পারেন নি। আমি অমুক, বাবার লাশ নিয়ে এ মাত্র জার্মানী থেকে এসেছি। পরবর্তী ফ্লাইটে রিয়াদে যাব।
তার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। সে যেন আমার শরীরে এক গ্যালন ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিল। আমি একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। তার পিতা মারা গেছে, পিতার মরদেহও তার সাথে। আর আমি তার সাথে মজা করছি!
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাকে বললাম, ‘আমি খুবই দুঃখিত, আমি তোমাকে চিনতে পারি নি। আল্লাহ তোমাকে উত্তম ধৈর্যধারণের শক্তি দান করুন এবং তোমার পিতাকে ক্ষমা করে দিন।’
বস্তুত তাকে চিনতে না পারার ক্ষেত্রে আমার যুক্তিসঙ্গত ওজর রয়েছে। কারণ, আগে তার সঙ্গে আমার তেমন সাক্ষাত হয় নি। তাছাড়া যখন আমি তাকে দেখেছিলাম তখন সে আরবীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও মাথায় রুমাল পরিহিত ছিল। কিন্তু সে শার্ট-প্যান্ট পরে যখন জেদ্দার যুবকদের ভীড়ে আমার সামনে হঠাৎ উপস্থিত হয়েছে তখন আমি তাকে চিনতে পারি নি।
অপরকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হলে তার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা প্রভৃতি অনুভূতিতে আপনাকে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং এ কথা বোঝাতে হবে যে, তার ব্যথায় আপনি ব্যথিত, তার সমস্যা আপনারও সমস্যা। আপনি সব সময় তার কল্যাণ কামনা করেন। এ কারণেই আপনি দেখবেন, উন্নত ও বড় বড় কোম্পানীগুলোতে ক্রেতা ও সেবা গ্রহিতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার জন্য ‘পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট’ নামে স্বতন্ত্র বিভাগ থাকে। এ বিভাগের দায়িত্ব হলো বিভিন্ন উপলক্ষে ভোক্তাদেরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা ও উপহার পাঠানো এবং এ জাতীয় বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা।
মানুষকে যদি বোঝাতে পারেন যে, তারা আপনার কাছে সম্মানের পাত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ তাহলে আপনি তাদের মন জয় করে ফেলতে পারবেন এবং তারা আপনাকে ভালবাসতে শুরু করবে।
আমাদের বাস্তব জীবন থেকে এর কয়েকটি উদাহরণ নিন:
মনে করুন, আপনি একটি মজলিসে বসে আছেন। মজলিসটি এমন লোকে লোকারণ্য যে নতুন কারো বসার জায়গা নেই। এমন অবস্থায় একজন লোক এসে বসার জায়গা খোঁজ করছে। আপনি একটু সংকুচিত হয়ে বসে তাকে ডেকে এনে তার জন্য বসার মতো একটু জায়গা করে দিলেন। আপনার এ ব্যবহারের কারণে সে আপনাকে ভালবাসতে শুরু করবে।
মনে করুন, আপনি কোনো নৈশভোজে উপস্থিত হয়েছেন ৷ কোনো একজন ব্যক্তি খাবার নিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে খালি টেবিল খুঁজতে খুঁজতে সামনে এগিয়ে আসছে। আপনি তার জন্য একটি চেয়ার রেডি করে বললেন, ভাই! এখানে বসুন। সে অবশ্যই আপনার এ আচরণে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। এভাবে মানুষকে মূল্যায়ন করতে সচেষ্ট হোন দেখবেন আপনি তাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা:) এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। একবার জুমার দিন রাসূল মিম্বরে খুতবা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ এক বেদুঈন মসজিদে প্রবেশ করে কাতার ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। এরপর রাসূল (সাঃ) এর দিকে তাকিয়ে সজোরে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! এক লোক দ্বীন সম্পর্কে জানে না। আপনি তাকে দ্বীন শিক্ষা দিন। রাসূলুল্লাহ খুতবা বন্ধ করে মিম্বর থেকে নেমে এলেন। একটি চেয়ার আনিয়ে তাতে বসলেন। লোকটির সঙ্গে কথা বললেন এবং তাকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন। লোকটি যখন সবকিছু বুঝে নিল তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফিরে গেলেন।
একজন বেদুঈনকে তিনি কেমন গুরুত্ব দিলেন!। রাসূল যদি তাকে অবহেলা করতেন, হয়ত লোকটি চলে যেত এবং আজীবন দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকত। দ্বীন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়ত তার আর হতো না।
রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর জীবন চরিত পড়ে দেখুন। আপনি দেখতে পাবেন, কোনো ব্যক্তি রাসূলের সঙ্গে মোসাফাহা করলে তিনি ততক্ষণ পর্যস্ত নিজের হাত গুটিয়ে নিতেন না, যতক্ষণ না অপর ব্যক্তি প্রথমে নিজ হাত গুটিয়ে নিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কারো সঙ্গে কথা বলার সময় তার দিকে পুরো চেহারা ও শরীর ফিরিয়ে সরাসরি তাকাতেন। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তার কথা শেষ না হতে তিনি কথা বলতেন না; বরং মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনতেন।
অভিজ্ঞতা……
অন্যদের মধ্যে যদি আপনি এ অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারেন যে,
তারা আপনার কাছে সম্মানের পাত্র,
আপনার কাছে তাদের গুরুত্ব রয়েছে তাহলে তাদের হৃদয় আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে,
তারা আপনাকে ভালবাসতে শুরু করবে।
এরপর পড়ুন: আপনার ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করুন। আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে।