মানুষের মন জয় করার শত পদ্ধতি

আপনার জীবনকে উপভোগ করতে মানুষের মন জয় করার উপায়গুলি শিখুন। আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের হৃদয় ও মন জয় করবেন তা জানতে ও শিখতে সম্মানিত লেখকের মানুষের মন জয়ের শত পদ্ধতি আর্টিকেলটি পড়ুন। 

১৫. মানুষের মন জয়ের শত পদ্ধতি

প্রত্যেকেই তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভের জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সম্পদের জন্য যে লালায়িত সে তা অর্জনের নিমিত্তে ও সমৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রকমের কলাকৌশল ব্যবহার করে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।

স্যাটেলাইট চ্যানেলগুল দর্শকদের মন জয় করার জন্য আধুনিক বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও নতুন নতুন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও সঞ্চালকদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে তাঁরা দর্শকদেরকে আকৃষ্ট করে তাদেরকে অনুষ্ঠান দেখতে আগ্রহী করতে পারেন। একই কথা প্রিন্টমিডিয়া ও বেতারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

অনুরূপভাবে পণ্য বা সেবার উৎপাদকরা (প্রোডাক্ট প্রোমোটরদের মাধ্যমে) ক্রেতাদের মন জয় করার জন্য কতরকম পদ্ধতি অবলম্বন করে। সেসব কলাকৌশলের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করা যায় সেসব কলাকৌশল জানতে এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতে সবার মধ্যেই কমবেশি আগ্রহ দেখা যায়।

মানুষের হৃদয় জয় করার অনেক পদ্ধতি ও কলাকৌশল রয়েছে।

মনে করুণ, আপনি একটি মজলিসে উপস্থিত হলেন। সেখানে প্রায় চল্লিশজন মানুষ রয়েছেন। আপনি তাঁদের সঙ্গে মোসাফাহা করতে লাগলেন। প্রথমে একজনকে সালাম করে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সে কোনো মতে হাতের অংশবিশেষ এগিয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বললো, ‘স্বাগতম! স্বাগতম!’

আপনি দ্বিতীয়জনের কাছে গেলেন। সে পাশের একজনের সঙ্গে কথা বলছিল। আপনার সালাম শুনে সে হতচকিত কণ্ঠে সালামের জবাব দিল এবং আপনার দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে দিল।

তৃতীয়জন তার মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। আপনি সালাম দেয়ার সে  হাত বাড়িয়ে দিল। কোনো মতে দায়সারা গোছের মোসাফাহ করলো বটে তবে সৌজন্যতাস্বরূপ কিছু বললো না, এমনকি আপনার প্রতি কোনো আগ্রহও দেখাল না। আর চতুর্থজন আপনাকে আসতে দেখেই সালাম দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। চোখে চোখ পড়তেই হাসিমুখে আপনার সঙ্গে কথা বললো। হৃদয়ের উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে আপনার সাথে মোসাফাহা করলো। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে সে বেশ আনন্দিত হয়েছে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে এটা প্রকাশ করলো। অথচ আপনিও তাঁকে চেনেন না, আর সেও আপনাকে চেনে না।

এভাবে আপনি সকলের সঙ্গে সালাম ও মুসাফাহা পর্ব শেষ করলেন। এখন বলুন তো, এ চারজন লোকের মধ্যে কার প্রতি আপনার আকর্ষণ সৃষ্টি হবে? নিশ্চয় চতুর্থ লোকটির প্রতি আপনি অন্য রকম আকর্ষণবোধ করবেন। অথচ আপনি তাঁকে চেনেন না। তার নামও জানেন না, সে কোথায় কাজ করে, কী তার পেশা কিছুই জানেন না। তা সত্ত্বেও সে আপনার হৃদয়রাজ্য জয় করে ফেলেছে। আর এটা সে কোনো টাকা পয়সা কিংবা বড় কেনো পদের ক্ষমতার দাপটে করে নি। করে নি বংশমর্যাদার বলে। সে আপনার হৃদয়রাজ্য জয় করেছে কেবল কৌশলী আচরণের মাধ্যমে।

এতে প্রতীয়মান হলো, শক্তি, সম্পদ, সৌন্দর্য ও পেশার বড়ত্ব দিয়ে মানুষের হৃদয় করা যায় না। বস্তুতঃ মানুষের হৃদয় এর চেয়েও অনেক সহজে জয় করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও খুব কম মানুষই অন্যের হৃদয় জয় করতে পারে।

আমার মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক ছাত্র মারাত্মক মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিল। তার পিতা একজন উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন এবং আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আমিও তার ছেলের চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেছি।

আমি মাঝে মাঝে তাঁদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। বাড়িটি দেখতে ছিল রাজপ্রাসাদের মতো। তার পিতার বৈঠকখানায় সবসময় মেহমানদের এর ভিড় থাকত যে, সামান্য ফাঁকা জায়গাও থাকত না। তার প্রতি মানুষের এতো ভালোবাসা ও আগ্রহ দেখে আমি খুব অবাক হতাম।

অনেক বছর পর। একদিন তার বাড়িতে গেলাম। তখন তিনি চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।

আমি তার সে বৈঠকখানায় প্রবেশ করলাম। কামরাটির দিকে তাকালাম। কামরাটির বর্তমান অবস্থা দেখে আমি আশ্চর্য হলাম। সেখানে পঞ্চাশটির অধিক চেয়ার পড়ে আছে। কিন্তু কামরায় কেউ নেই। বৃদ্ধ সেখানে একাকী বসে বসে টিভিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখছেন। একজন সেবক তাঁকে চা-কফি দিয়ে যাচ্ছে। আমি সেখানে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসলাম।

বের হওয়ার পর আমি ভাবতে লাগলাম, তিনি যখন চাকুরীতে ছিলেন তখন তার কেমন অবস্থা ছিল আর বর্তমানে তার অবস্থা কি? আগে কেন মানুষ তার কাছে আসত? কেন তাঁরা তাঁকে ভালোবাসতো? এখন তাঁকে কেন সেরূপ ভালোবাসে না? কেন তার বৈঠকখানায় আগের মতো ভিড় নেই?

আমি বুঝতে পারলাম, তিনি সদাচরণ এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়রাজ্যকে জয় করতে পারেন নি। মানুষ তার কাছে আসত তার পদমর্যাদার কারণে, তার চাকরির ক্ষমতা ও প্রভাবের কারণে, ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক গুণের কারণে নয়। আজ যেহেতু তার চাকরি নেই তাই আর সে ক্ষমতাও নেই। তাই আর আগের মতো উপচেপড়া সে ভিড়ও নেই।

আপনি মানুষের সঙ্গে এমন ব্যবহার করুণ যেন তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে ভালোবাসে। তাঁরা যেন আপনার কথা, আপনার হাসি, আপনারত বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হয়ে আপনাকে ভালোবাসে।

তাঁরা যেন আপনাকে ভালোবাসে অন্যের দোষ দেখেও তা পাশকেটে যাওয়ার মহৎ গুণের কারণে এবং অন্যের বিপদে স্বতঃস্ফুর্ত সাড়া দেয়ার মানসিকতার জন্য। তাঁদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা যেন আপনার পদমর্যাদা ও অর্থের কারণে না হয়; বরং তা যেন হয় আপনার প্রতি তাঁদের হৃদয়ের ভালোবাসার কারণে। যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানকে অর্থ-সম্পদ, খাবার-দাবারসহ সব চাহিদা পূরণ করে, সে হয়তো তাঁদের উদরতুষ্টি লাভ করতে পারে কিন্তু তাঁদের হৃদয়ের ভালোবাসা লাভ করতে পারে না। যে তার স্ত্রী-সন্তানকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ দেয়, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করে, সে তাদেরকে আর্থিকভাবে খুশি করতে পারলেও তাঁদের মনের রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে না।

যদি আপনি দেখেন, বিপদে পরে কোনো যুবক তার বন্ধু বা মসজিদের ইমাম কিংবা তার কোনো শিক্ষকের শরণাপন্ন হয়েছে কিন্তু নিজের বাবাকে জানায় নি তাহলে এতে আশ্চর্য হবেন না। কারণ, তার বাবা তার হৃদয়কে জয় করতে পারে নি, ভাঙতে পারেনি তার ও সন্তানের মাঝে বিদ্যমান অদৃশ্য দেয়াল। অথচ তার বন্ধু কিংবা কোনো শিক্ষক তার হৃদয়রাজ্য অবলীলায় জয় করে ফেলেছে। অনেক সময় মারাত্মক দুশমনও হৃদয় জয় করে ফেলতে পারে। তবে এর জন্য দরকার হৃদয়কাড়া আচরণগত দক্ষতা আর মানুষকে আপন করে নেয়ার সুন্দর কৌশল।

আরেকটি বিষয় ভেবে দেখুন। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, তাঁরা যখন কোনো মজলিসে উপস্থিত হয়ে বসার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে তখন উপস্থিত লোকদের মাঝে একধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। সবাই তাঁকে ডাকতে থাকে, সবাই তাঁকে নিজের পাশে বসতে অনুরোধ করে। বলুন তো এমনটি কেন হয়? কেন তার প্রতি সকলের এত আগ্রহ! কন সবাই তার পাশে বসতে চায়?

আপনাকে হয়তো নৈশভোজের জন্য কোনো ক্যাফেতে দাওয়াত দেয়া হলো। ক্যাফের নিয়ম হলো, প্রত্যেক নিজ চাহিদা মতো ডিশ থেকে নিজ নিজ প্লেটে খাবার নিয়ে নেবে। তারপর ডিম্বাকৃতির কোনো একটি টেবিলে বসে খাবে। সেখানে আপনি হয়তো দেখে থাকবেন যে, কেউ নিজের প্লেট পূর্ণ করার আগেই অনেকে তাঁকে ইশারা করে বলতে থাকে, ‘এ যে এখানে ফাঁকা জায়গা আছে, এখানে বসুন।’ প্রত্যেকেই চায়, সে তার সঙ্গে বসুক।

কিন্তু অন্য একজন তার প্লেট পূর্ণ করে এদিকে সেদিক তাকাচ্ছে অথচ কেউ তাকে ডাকছে না। কেউ তার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ করছে না। সে একাকী কোনো একটি টেবিলে গিয়ে বসে খেয়ে নিচ্ছে।

প্রথমজনের প্রতি মানুষের এত আগ্রহ, অথচ দ্বিতীয়জনের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। এর কারণ কি? কিছু মানুষ এমনও আছেন যে, তাঁরা যেখানেই থাকুক না কেন, তাঁদের প্রতি অন্যদের মনের টান অনুভূত হতে থাকে। যেন তাঁদের হাতে বিশেষ চুম্বক আছে, যেটি দিয়ে দূর থেকেও তাঁরা অন্যদের হৃদয়-মন আকর্ষণ করে থাকে।

এরা কিভাবে অন্যদের হৃদয় ও মন জয় করলেন?

বস্তুত এটা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক এমন সব কিছু কলাকৌশল যার মাধ্যমে একজন মানুষ অন্য মানুষের হৃদয়কে জয় করতে পারে। করতে পারে মানুষের ভালোবাসা অর্জন।

সিদ্ধান্ত    

অন্যের হৃদয় জয় করার এবং তাঁদের ভালোবাসা অর্জনের ক্ষমতা আমাদের জীবনকে করতে পারে আরো সুখময়, প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।

উৎস : জীবনকে উপভোগ করুন

এরপর পড়ুনসন্তুষ্টি অর্জনে বিশুদ্ধ নিয়তে কাজ করুন

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Leave a Comment

error: Content is protected !!