একজন রুশ তরুণী। খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম। ভ্রমণের নেশায় একদিন পা বাড়িয়েছিলেন অজানার পথে। কিন্তু সেই পথ তাকে নিয়ে গেল এক ভয়ংকর ফাঁদে — যেখানে হারিয়ে যায় অনেকেই। তবু সে হারায়নি। কারণ তার বুকে ছিল এক অদৃশ্য শক্তি — যা কোনো শেকল দিয়ে বাঁধা যায় না, কোনো নির্যাতনে ভাঙা যায় না। এটি সেই তরুণীর গল্প — যে দেহপসারিণী হওয়ার বদলে হয়েছিল ইসলামের আলোর বাহক।

প্রতারণার ফাঁদে এক রুশ তরুণী!
এক রুশ তরুণী। অনিন্দ্য সুন্দরী। রক্ষণশীল খৃস্টান পরিবারে তার জন্ম। দেশভ্রমণ তার অন্যতম হবি। তার ইচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটি অঙ্গ সফর করা। সেখানকার লোকদের সাথে পরিচিত হয়ে স্বীয় জ্ঞান-ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা ।
একবার এক রুশ-বণিক তরুণীর এই ইচ্ছের কথা জানতে পারে। তারপর তার ঠিকানা সংগ্রহ করে তার সাথে সাক্ষাৎ করে। দীর্ঘ আলাপ- আলোচনার পর সে তাকে উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দেশে বাণিজ্য সফরে তার সাথে যাওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয় । বলে- তুমি আমার সাথে ভ্রমণে চলো। তোমার মতো আরো কিছু রুশ-তরুণী আমার সাথে যাবে। অতএব তোমার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই! আমাদের এই সফরের উদ্দেশ্য হলো, দেশ ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করা! সেই সাথে সে দেশ থেকে কিছু বৈদ্যুতিক পণ্য সামগ্রী কিনে এনে রাশিয়ার বাজারে বিক্রি করা!
তরুণীটি চিন্তা করে দেখল, এই সফরে তো দেশ ভ্রমণের আনন্দ ছাড়া মন্দ কিছুই নেই । তাছাড়া অন্যান্য মেয়েরা যখন যাচ্ছে তখন তো আমার একার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয় । তাই সে বণিকের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয় এবং অন্যান্য তরুণীদের সাথে একদিন রওয়ানাও হয়ে যায়।
দীর্ঘপথ অতিক্রম করার পর কাফেলা আপন গন্তব্যে পৌঁছে। পথিমধ্যে রুশ-বণিক মেয়েদের সাথে ভালো আচরণই করে। কিন্তু আশ্চর্য! গন্তব্যে পৌঁছার পর পরই বণিকের আসল রূপ প্রকাশ পায়। সঙ্গে নিয়ে আসা তরুণীদেরকে সে দেহপসারিণী হওয়ার প্রস্তাব দেয়! বলে— তোমরা যদি আমার প্রস্তাবে রাজী হও তাহলে প্রত্যেকে একটি করে গাড়ি পাবে। বাড়ি পাবে। সেই সঙ্গে পাবে মোটা অঙ্কের অর্থ- সম্পদও। তাছাড়া গোটা পৃথিবী থাকবে তোমাদের হাতের মুঠোয়! যখন যে দেশে ইচ্ছে, সফর করতে পারবে। পারবে জীবনটাকে আচ্ছামত ভোগ করার সুন্দর সুযোগও!!
রুশ-বণিকের এ লোভনীয় প্রস্তাবে অধিকাংশ তরুণী রাজি হয়ে যায়। কিন্তু নিজ ধর্মের প্রতি অতিশয় আসক্ত রক্ষণশীল পরিবারের ঐ মেয়েটি ঘৃণাভরে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে!
লোকটি এই প্রত্যাখ্যানে রাগ করল না। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কঁচকালো। হাসল অশুভ হাসি! বিদ্রূপের হাসি! তারপর বলল- দেখো মেয়ে! এখানে তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই । কোনো মূল্য নেই। মনে রেখো, আমার প্রস্তাবে রাজি হওয়া ছাড়া তোমার জন্য এখানে অন্য কোনো পথও খোলা নেই!
এভাবে লোকটি তার প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য ভীষণ চাপ সৃষ্টি করল তরুণীটির উপর। একটা নির্জন ফ্ল্যাটে ওর থাকার ব্যবস্থা করল অন্যান্য তরুণীদের সাথেই । এক সময় সবার পাসপোর্টও ছিনিয়ে নিয়ে গেল ঐ ধূর্ত লোকটি!
দেখতে দেখতে সবাই দেহ-ব্যবসার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিল । ব্যতিক্রম শুধু ঐ তরুণীটি। নিজের মান-ইজ্জত ও সতীত্বকে নিরাপদ রাখার সংগ্রামে অনড় থাকল সে একাই।
রুশ তরুণীর সতীত্ব রক্ষার সংগ্রাম!
মেয়েটি তার পাসপোর্ট ফেরত চাইল । কিংবা ওকে রাশিয়া পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলল । কিন্তু লোকটা দু’টি প্রস্তাবের একটিতেও রাজি হলো না । সে বরং রাগতস্বরে বলল- তোমাকে এখানে থাকতে হবে এবং আমার শর্তও মানতে হবে!
তারপরও তরুণীটি নিরাশ হলো না। সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। একদিন সুযোগ এসেও গেল। অন্যসব মেয়েরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বাইরে চলে গেল । ও একা । সুযোগই বটে! পাসপোর্টটা উদ্ধারের জন্যে সারাটা ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজি করল। নিরাশ হতে হতে শেষে তা পেয়েও গেল। দেহ ও মনে শক্তি সঞ্চার করে তারপর সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল । ধরা পড়ার আশঙ্কা কম । এখন এখানে বিশেষ কেউ নেই । তাই কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল সংগোপনে, সন্তর্পণে । দ্রুতপদে ও রাস্তায় এসে উঠল। সাথে কিছুই নেই- পরনের কাপড়টুকু ছাড়া। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। কিছুক্ষণ ও নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল । বুঝতে পারছে না- কোথায় যাবে, কী করবে?
এখানে নেই তার পরিবার-পরিজন! নেই কোনো আত্মীয়-স্বজন! নেই কারো সাথে জানাশোনা! নেই টাকা-পয়সা! নেই খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা! নেই মাথা গুজার ঠাঁই! কিছুই নেই! শুধু নেই । নেই আর নেই!
এখন তার জীবনে কি ঝড় চলছে না? হ্যাঁ, চলছে! তবুও সে প্রশান্ত। কারণ কিছু মানুষ নামের জানোয়ার থেকে সে নিজের নারীত্বকে রক্ষা করতে পেরেছে। সামনেও হয়তো আরো ঝড় আছে। সে ঝড় পারবে কি ওকে কাবু করতে?
খালেদের পরিবারে আশ্রয় ও ইসলামের আলো!
তরুণীটি এদিকে-ওদিক দেখতে লাগল । হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ল এক যুবকের উপর। সাথে তিনজন মহিলা। কালো আবরণে আবৃত। সম্ভবতঃ এরা তার মা-বোন হবে। এদের সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাচ্ছে যুবকটি। তার মনে হলো- নির্ভর করার মতো মানুষ। তাই সে ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে গেল ।
কাছে গিয়ে তাদেরকে রাশিয়ান ভাষায় কিছু বলতে চাইলে যুবকটি জানাল যে, সে তার ভাষা বুঝতে পারছে না। তখন তরুণীটি বলল- আপনারা ইংরেজী জানেন?
হ্যাঁ, জানি! সবাই সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলল।
মেয়েটি তখন আনন্দে কেঁদে ফেলল! বলল- আমি এক অসহায় প্রবাসিনী। আমার বাড়ি রাশিয়া। তারপর সে কাঁদতে কাঁদতে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সবকিছু সংক্ষেপে তাদেরকে বলল । সবশেষে সে বিনয়মিশ্রিত কণ্ঠে মানবতার দোহাই দিয়ে বলল- আমি দেশে ফিরে যেতে চাই । কিন্তু আমি এখন নিঃস্ব! একটি পয়সাও আমার কাছে নেই । নেই একটু থাকার জায়গা। আমি আপনাদের কাছে কিছুই চাই না। আমাকে শুধু একটু আশ্রয় দিন! দু’দিন, ঊর্ধ্বে তিনদিন। এর মধ্যেই আমি আমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে একটা উপায় বের করে নেব ৷
তরুণীটি যে যুবকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করল তার নাম খালেদ। খালেদের সাথে ছিল ওর মা ও বোন। তরুণীর অশ্রুভরা মিনতি তার হৃদয় স্পর্শ করল। ওর চোখের পাতা ভিজে এল। ভাবল- ও এক রুশ ললনা না হয়ে যদি আমার বোন হতো, তাহলে আমি কী করতাম? আমি কি পারতাম ওকে এই বিপন্ন অবস্থায় ফেলে যেতে? পারতাম ওর আবদারকে উপেক্ষা করতে?
খালেদ তার মা ও বোনের সাথে পরামর্শ করল। তখন মেয়েটি তাকিয়েছিল মিনতিভরা চোখে খালেদের দিকে। চোখে বাঁধভাঙা অশ্রু। পরামর্শ শেষে মেয়েটিকে নিয়েই বাসার দিকে রওয়ানা দিল খালেদ।
বাসায় এসে তরুণীটি নিজের পরিবারের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করল। বারবার। অনেক বার। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, হয়তো টেলিফোন লাইন খারাপ। তারপরও সে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রাখল।
এরই মধ্যে খালেদের পরিবার জানতে পারল তরুণীটি খৃস্টান। অবশ্য এতে ব্যবহারে কোনো তারতম্য হলো না। বরং বিজাতীয় অতিথি হিসাবে ওর সাথে ওদের ব্যবহার ছিল আরো সুমধুর ও কোমল। খালেদের বোনেরা ওকে নিজেদের গল্প-সঙ্গিনী বানিয়ে নিল। তরুণীও সবাইকে পছন্দ করল। ভালোবাসল। সবার সাথে গড়ে তুলল নিবিড় সখ্যতা।
মুসলমানদের কাজ হলো ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকা। খালেদের পরিবারও তরুণীটিকে ইসলামের দিকে ডাকল। কিন্তু ও সাড়া দিল না। কিন্তু তবু খালেদের পরিবার আশা ছাড়ল না। খালেদ ছুটে গেল স্থানীয় “ইসলামী দাওয়াত সংস্থা’র অফিসে। সেখান থেকে নিয়ে এলো ইসলাম সম্পর্কে বেশ কিছু রুশ ভাষার বই-পুস্তক। এনে মেয়েটিকে পড়তে দিল। মেয়েটি পড়তে শুরু করল। পড়তে পড়তে দেখল- খারাপ লাগছে না। সে পড়া চালিয়ে গেল এবং ক্রমে ক্রমে ইসলামের দিকে ওর কৌতূহল বাড়তে লাগল।
এভাবে গড়াতে লাগল সময়। সাথে সাথে চলতে লাগল পরিবারের পক্ষ থেকে— চেষ্টা সাধনা, কৌশল। সর্বোপরি দোয়া। অবশেষে তরুণীর দিল্ পরিস্কার হয়ে গেল। ও ইসলাম কবুল করে ধন্য হলো! নাম রাখা হলো ফাতেমা।
ইসলাম এখন তার ভালোবাসা। ইসলামই তার এখন তার অনুরাগ। ইসলামেই এখন তার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। আমূল বদলে গেল তার জীবনধারা। বদলে গেল চিন্তাধারা। দীন শেখায় এখন সে আত্ম-নিবেদিতা। পুণ্যবতী নারী-সং-শ্রব এখন তার পরম কাম্য।
দেশে ফেরতে এখন একদম তার মন চায় না! দেশে গেলে ওর মা-বাবা আবার জোর করে ওকে খৃস্টান ধর্মে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারেন। কে চায় আলো থেকে আধাঁরে ফিরে যেতে?
কিন্তু এই অবস্থায় আরেকজনের বাসায়ই বা ক’দিন থাকা যায়? একথা ভাবতেই ফাতেমার চেহারায় দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠে। এ দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ কি তার সামনে খোলা আছে, এ প্রশ্নের উত্তর ফাতেমার কাছে নেই। ও কিছুই জানে না!
এদিকে খালেদের মা চিন্তা করল, খালেদ এখন বিয়ের বয়সে উপনীত হয়েছে। ওকে এখন বিয়ে করানো দরকার। এদিকে ফাতেমারও প্রয়োজন একজন ঘনিষ্ঠ অভিভাবকের। যদিও ফাতেমা এখানে খেয়ে-পড়ে ভালোই আছে, তথাপি যতক্ষণ না ওর সাথে আমাদের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক গড়ে না উঠবে ততক্ষণ সে এ বাড়ীকে পরের বাড়ি মনে করে মানসিক অস্বস্তি ভোগ করবে- এটাই স্বাভাবিক।
এ চিন্তা মাথায় আসার পর থেকেই খালেদ-ফাতেমার বিয়ে নিয়ে আলাপ- আলোচনা শুরু হলো। এবং খোদার মেহেরবানীতে কিছুদিন পর খালেদের সাথে ফাতেমার বিবাহও হয়ে গেল! সেই সাথে অবসান ঘটল সকল দুশ্চিন্তার।
ফাতেমার মতো সুন্দরী, শিক্ষিতা ও গুণবতী স্ত্রী পেয়ে খালেদ যেমন খুশি, অকূল দরিয়ার তীর পাওয়ার মতো এমন স্বামী পেয়ে ফাতেমা আরো বেশি খুশি । খুশি + খুশি = সৌভাগ্য ও আনন্দ! জীবনের অঙ্ক এত সহজে এত চমৎকারভাবে সাধারণত মিলতে দেখা যায় না। হ্যাঁ, মিলে তখনিই, যখন থাকে কুদরতের ইশারা! মিলে সেখানেই যেখানে থাকে কুদরতী ফয়সালা!! আসলে যেসব নারী স্বীয় সতীত্বকে সংরক্ষণ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়, কুদরতের সহযোগিতা তাদের ন্যায্য পাওনা। নইলে যে রুশ তরুণী হওয়ার কথা ছিল দেহপসারিণী, সে কেন হবে ‘ইসলাম প্রচারিণী’?
ফাতেমা একবার স্বামী খালেদের সাথে একটি বিপণী কেন্দ্রে গেল। সেখানে ও এক হিজাবপরা মহিলাকে দেখতে পেল যার চেহারা সম্পূর্ণ আবৃত। এই প্রথম সে কোনো পূর্ণ হিজাব পরা মহিলাকে দেখল। তাই এই অচেনা আকৃতি দেকে সে ভীষণ অবাক হলো। ও বলল- খালেদ! ভদ্র মহিলা এমন করে সারা শরীর ঢেকে রেখেছেন কেন? তার চেহারা কি খুব খারাপ? নাকি এসিডদগ্ধ? যা প্রকাশ করতে তিনি লজ্জা পাচ্ছে?
খালেদ বলল- না, ইনি আসলে হিজাব পরেছেন। এ হিজাব প্ৰকৃত হিজাব। এমন হিজাবেরই নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । এভাবে পর্দা করাই শরীয়তের বিধান।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফাতেমা বলল- হ্যাঁ, আমার কাছে পর্দার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। আমিও মনে করি সত্যিকারের পর্দা এমনই হওয়া উচিত। এভাবে পর্দা করাই আল্লাহ চান আমাদের কাছে। খালেদ বলল- তুমি ঠিকই বলেছ। তবে আমার প্রশ্ন হলো, তুমি এ বিষয়টি কিভাবে অনুধাবন করলে?
শোনো! আমি যখন এই বিপণী বিতানে প্রবেশ করেছি, তখন দেখেছি একদল মানুষ আমার চেহারার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি নামাচ্ছে না। যেন আমার চেহারাকে গোগ্রাসে গিলছে। টুকরো টুকরো করে খাচ্ছে। সুতরাং বুঝা গেল আমার চেহারা ঢেকে রাখতে হবে। স্বামী ও নিকটাত্মীয় ছাড়া আর কেউ আমার মুখাবয়ব দেখতে পারবেনা । আজ হতে আমি পূর্ণ ইসলামী হিজাব না পরে কোনো বিপণী কেন্দ্রে যাবো না। পর্দাহীন অবস্থায় বাইরেও বের হবো না। বলো তো খালেদ! কোথায় পাওয়া যায় এই হিজাব?
খালেদ পরীক্ষা করার জন্য বলল- তুমি বরং আমার মা-বোনের মতো মুখ-খোলা হিজাবই পরো! ফাতেমা বলল- না! তা হয় না! আমি মুসলমান! পূর্ণ মুসলমান । তাহলে আমার হিজাব কেন হবে অপূর্ণ? কেন হবে তা অসম্পূর্ণ? আমি সেই হিজাবেই পরতে চাই যে হিজাব পরতে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন।
এভাবেই সময় গড়িয়ে যায়। তরুণীর ঈমান-আমলও বাড়তে থাকে । খালেদের পক্ষ থেকে ওর প্রতি প্রেম-প্রীতির, দয়া ও দরদের এবং ভালোবাসা ও মহব্বতের কোনো কমতি ছিল না। ফাতেমাও আনুগত্য ও ভালোবাসার পাপড়ি ছড়িয়ে খালেদের হৃদয়ে গড়ে তোলে সুখ-শান্তির মহা মাসাদ! গড়ে তোলে অনাবিল সুখের নিরাপদ ঠিকানা ! স্বামী স্ত্রীর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও মিল-মহব্বত দেখে খালেদের পরিবার ভীষণ খুশি।
আরও পড়ুন: অভিভূত রাজকুমারী হেলেনের ইসলামিক যুদ্ধের গল্প
হিজাবের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা — পাসপোর্টের লড়াই!
বেশ কিছুদিন পরের কথা। ফাতেমা নিজের পাসপোর্ট বের করে দেখল- মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। অতিসত্তর নতুন পাসপোর্ট করতে হবে। শুধু তাই নয়, রাশিয়ায় গিয়ে তার নিজের শহর থেকে তা করে আনতে হবে। সুতরাং রাশিয়া যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। নইলে এখানে তার বসবাস অবৈধ বলে গণ্য হবে। খালেদও তার সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল । কেননা মাহরাম ব্যতীত মহিলাদের একাকী সফর করা বা দূরে কোথাও যাওয়া জায়েয নেই ।
রাশিয়ান এয়ার লাইন্সের একটি বিমানে তারা চেপে বসল । ফাতেমা পরিপূর্ণ ইসলামী হিজাবে আবৃত হয়েই বিমানে আরোহণ করল । স্বামীর পাশে বসে আছে সে গর্ব নিয়ে, অহঙ্কার নিয়ে। পর্দা তো এখন তার গর্বই!
চলন্তপথে বিমানবালারা খাবার পরিবেশন করল। খাবারের সাথে মদও দিল । মদ খেয়ে মদ্যপরা মাতলামি শুরু করে দিল। বিভিন্ন প্রকার কটূক্তি করতে লাগল ফাতেমাকে নিয়ে। কেউ কৌতুক করছিল । কেউ মুখ টিপে হাসছিল। কেউ ঠাট্টা-বিদ্রূপের আগুনে ফুঁ দিচ্ছিল। কেউ চলতে চলতে ফাতেমার পাশে এসে একটু থমকে দাঁড়াচ্ছিল । মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিল।
খালেদ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে সবই দেখছিল । কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিল না । সবই বলা হচ্ছিল রুশ ভাষায় । সে মনে মনে ক্ষুদ্ধ হচ্ছিল, ফুঁসছিল। পক্ষান্তরে ফাতেমা মৃদু মৃদু হাসছিল! ও ওদের কিছু কিছু কথা খালেদকে অনুবাদ করেও শুনাল। অনুবাদ শুনে খালেদের রক্তে আগুন জ্বলে উঠল। কিন্তু ফাতেমা তাকে শান্ত থাকতে বলল। সেই সাথে এও বলল- হযরত সাহাবায়ে কেরাম দীনের জন্য যে কুরবানী পেশ করেছেন, যে জুলুম-নিপীড়ন সয়েছেন, সে তুলনায় আমরা আর কী করছি, কী সইছি? ফাতেমার কথায় খালেদ ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করল । এক সময় বিমান তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেল ।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! এবার চলুন অবশিষ্ট ঘটনাবলী আমরা খালেদের কাছ থেকেই শুনি ।
খালেদ বলল- বিমানবন্দরে নামার পর আমার ইচ্ছে ছিল- সোজা ফাতেমাদের বাসায় চলে যাওয়া এবং সেখানে অবস্থান করে পাসপোর্ট নবায়নের কাজ সম্পন্ন করা । কিন্তু ফাতেমা ভাবছিল অন্যকিছু । ও আমাকে বলল- আমার পরিবার গোড়া খৃষ্টান । ধর্ম পালনে ভীষণ কট্টর তারা। তাই ওখানে আপাতত যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা বরং একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে থেকেই কাজ-কর্ম শেষ করব এবং ফিরে যাওয়ার আগে বাবা-মার সাথে দেখা করে যাব ৷ আমি দেখলাম- ওর চিন্তা যথার্থ ও সঠিক। সুতরাং আমরা একটি ছোট্ট বাসা ভাড়া করে সেখানেই উঠলাম।
পরদিন গেলাম পাসপোর্ট অফিসে। অফিসারের নিকট গিয়ে আমাদের আবেদন পেশ করলাম। তিনি পুরোনো পাসপোর্ট দিতে বললেন এবং সদ্য তোলা রঙিন ছবি চাইলেন । আমি তখন আমার স্ত্রীর কয়েকটি সাদাকালো ছবি বের করে দিলাম । সর্বাঙ্গ হিজাব-ঢাকা। শুধু চেহারাটুকু অনাবৃত। অফিসার বললেন— এ ছবি চলবে না । রঙিন ছবি দিতে হবে । চেহারা, চুল ও কাঁধ খোলা রাখতে হবে ।
কিন্তু আমার স্ত্রী এ সাদাকালো ছবি ছাড়া অন্য ছবি দিতে অস্বীকার করল । সে বলল- কোনো অবস্থাতেই আমি অনাবৃত রঙিন ছবি দেব না ৷
আমরা প্রথম অফিসারের কাছে ব্যর্থ হয়ে পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অফিসারের কাছে গেলাম । কিন্তু কোনো কাজ হলো না। সবাই অনাবৃত রঙিন ছবি চাইল । বলল, আমাদের নিয়মানুযায়ী ছবি না দিলে পাসপোর্ট নবায়ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় ।
এরপর আমরা শরণাপন্ন হলাম বিভাগীয় প্রধানের কাছে। তিনি ছিলেন একজন মহিলা । আমার স্ত্রী তাকে এ সাদাকালো ছবিগুলোই গ্রহণ করতে অনুরোধ করল । কিন্তু তিনিও মুখের উপর ‘না’ বলে দিলেন। তবু ফাতেমা হাল ছাড়ল না । সে ঐ মহিলাকে বুঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল । বলল- আপনি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না? যে ছবিগুলো আপনাকে দিলাম তার সাথে আমাকে একটু ভালো করে মিলিয়ে দেখুন না! চেহারাই তো আসল! চুল এক সময় বদলে যায়। দেহের গঠন অনেক সময় পরিবর্তন হয়ে যায়। সুতরাং আমি মনে করি, আমার এ ছবিগুলোই যথেষ্ট। অনাবৃত রঙিন ছবির কোনো প্রয়োজন নেই।
জবাবে মহিলা বললেন- আপনার যুক্তি তো ঠিক আছে। কিন্তু প্রশাসন এটা অনুমোদন করবে না। তাই এক্ষেত্রে আমার কিছুই করার নেই ।
আমি বললাম- আমার স্ত্রী সাদাকালো ছবি ছাড়া অন্য ছবি দেবে না। এখন বলুন সমাধান কী?
মহিলা বললেন- এ সমস্যার কোনো সমাধান আমার কাছে নেই । এর সমাধান দিতে পারবেন মস্কোর প্রধান পাসপোর্ট অফিসের মহা পরিচালক। আপনি ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়ে চেষ্টা করতে পারেন ।
আমরা পাসপোর্ট অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম । আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বলল- খালেদ! আমাদেরকে এখন মস্কো যেতে হবে!
আমি বললাম- মস্কো গিয়ে কাজ নেই । তুমি বরং হিজাববিহীন রঙিন ছবিই ওদেরকে দিয়ে দাও। আল্লাহ পাক মানুষের উপর সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেন না । তাছাড়া তোমার পাসপোর্ট তো আর সবাই দেখছে না । কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া । তাও প্রয়োজনের খাতিরে । তারপর তুমি নিজের পাসপোর্ট নিজের কাছেই রেখে দেবে। মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই আর তা দেখতে চাইবে না। সুতরাং তুমি ব্যাপারটাকে সহজভাবে নাও । তাহলে মস্কো যাওয়া ছাড়াই কাজ হয়ে যাবে ।
কিন্তু ফাতেমা নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে বলল- না! হিজাববিহীন ছবি দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয় । কারণ এখন আমি দীনের মর্যাদা বুঝি পর্দার মাহাত্ম বুঝি। পর্দা আল্লাহর হুকুম। একদল বেঈমান-কাফেরের জন্য আমি আমার প্রভু আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে পারি না । কখনো না! এতে ফল যা হয় হোক!
ফাতেমার অটল সিদ্ধান্তের কারণে অগত্যা আমিও মস্কো যেতে রাজি হলাম । প্রথম অভিযানে ব্যর্থ হয়ে আমার মনটা খুব খারাপ। জানি না, দ্বিতীয় অভিযানটা আরো শক্ত ও কঠিন হবে কি না। মস্কো পৌঁছে আমরা একটা ঘর ভাড়া নিলাম । সেখানেই রাতটা কাটালাম ।
পরদিন দুরুদুরু মনে গিয়ে হাজির হলাম মস্কো পাসপোর্ট অফিসে। কিন্তু এখানেও অবস্থা পূর্বের মতোই। প্রথম যে অফিসারের কাছে গেলাম, তিনি ‘না’ বলে দিলেন । এই ‘না’ শুনতে হলো দ্বিতীয় ও তৃতীয় অফিসারের কাছেও। অবশেষে এই না’, ‘না’ আর ‘না’ এর বুকভরা বেদনা নিয়ে বড়কর্তার দরবারে হাজির হলাম ।
বড়কর্তা ফাতেমার ছবিগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বললেন— প্রমাণ কী যে, আপনিই এ ছবির বাহক? একথার মাধ্যমে তিনি মূলতঃ ফাতেমার মুখ থেকে অবগুণ্ঠন সরাতে বললেন এবং তার চেহারা দেখতে চাইলেন। একথা বুঝতে পেরে
এ কথায় বড়কর্তা ভীষণ ক্ষুণ্ন হলেন। চটে গেলেন। পুরোনো পাসপোর্ট, ছবি এবং অন্যান্য কাগজ-পত্র এক সাথে জমা করে তার বিশেষ ড্রয়ারে রেখে দিলেন এবং বললেন- আমাদের শর্ত মুতাবেক ছবি না নিয়ে এলে নতুন-পুরাতন কোনো পাসপোর্টই দেওয়া হবে না!
ফাতেমা তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছিল। বিভিন্ন উপায়ে, বিভিন্ন যুক্তিতে। তারা কথা বলছিল আমার অজানা-রুশভাষায়। তাই নীরবে শোনা এবং দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার কিছুই করার ছিল না । তবে আমার রাগের মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মনে মনে বলছিলাম- কী দুষ্ট এই বেঈমান লাল রুশরা! এটা কি আইনের প্রতি নিষ্ঠা না ইসলাম বিদ্বেষ?
বড়কর্তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেও ফাতেমা সফল হতে পারল না । তার শুধু একটাই কথা- পার্সপোর্ট পেতে হলে অবশ্যই আমাদের শর্ত অনুযায়ী ছবি দিতে হবে!
আমি কাতর চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালাম। বললাম- দেখো, এখানে তুমি অসহায়। কিছুই করার নেই তোমার। পর্দা রক্ষার জন্যে অনেক চেষ্টাই তো তুমি এতক্ষণ করলে, কিন্তু কোনো ফল হলো না। সাধ্যানুযায়ী তুমি তোমার চেষ্টা করেছ। এখন বাকিটুকু আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দিবেন। ওদের শর্ত মেনে নাও। নইলে কত আর আমরা ছুটোছুটি করব?
ফাতেমা তখন বলল- খালেদ! তুমি কি জানো না? তুমি কি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি পড়নি?- যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য তিনি মুক্তির পথ বের করেই দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করেন যেখান থেকে রিজিক আসবে বলে সে কল্পনাও করতে পারেনি।
আরও পড়ুন : দুই রমনীর হৃদয়স্পর্শী কাহিনী (ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ঘটনা)
পরিবারের নির্যাতন ও ঈমানের পরীক্ষা
এভাবে আমার এবং তার মাঝে কথা হচ্ছিল। মাঝেমাঝে আমাদের এতে বড়কর্তা রাগ করে কথা বিতর্কের পর্যায়েও চলে যাচ্ছিল। আমাদেরকে তার অফিস থেকে তাড়িয়ে দিলেন!
আমরা তাড়া খেয়ে বের হয়ে এলাম। ফাতেমার জন্য আমার মায়া লাগছিল । আবার অধিক কঠোরতার কারণে ক্ষোভও সৃষ্টি হচ্ছিল। বাসায় ফিরে আমরা বিষষটা পর্যালোচনা করলাম। ফাতেমা তার নিজের মতের পক্ষে যুক্তি পেশ করছিল আর আমি আমার মতের পক্ষে যুক্তি পেশ করছিলাম। ও চাইল আমাকে বোঝাতে। আর আমি চাইলাম ওকে বোঝাতে । এভাবেই রাত নেমে এল। দু’জনে ইশা পড়লাম এবং কোনো রকম রাতের খাবারটা খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম ।
আমাকে অমন নিস্তেজ ভঙিতে শুয়ে থাকতে দেখে ফাতেমা বলল- খালেদ! তুমি ঘুমোচ্ছ?
আমি বললাম- হ্যাঁ। তুমিও ঘুমাও। তুমি কি ক্লান্তি অনুভব করছ না? নাত ও অবাক হয়ে বলল- হায় আল্লাহ! এ অবস্থায় ঘুম আসে কী করে? এখন ঘুমানোর সময় নয় খালেদ! আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য চাওয়ার সময়! উঠো! আল্লাহর সাহায্য চাও। দোয়া করো ।
আমার স্ত্রীর কণ্ঠে কী ছিলো জানি না। আমি আর শুয়ে থাকতে পারলাম না । দ্রুত উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম । অনেকক্ষণ আমি নামাজ পড়লাম। দোয়া করলাম। আল্লাহর নুসরাত ও সাহায্য চাইলাম । এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আবার আশ্রয় নিলাম বিছানায় । কিন্তু আমার স্ত্রী! ও একটুও ঘুমাল না। সারাটা রাত ইবাদত আর দোয়ায় কাটিয়ে দিল। যখনই আমার ঘুম ভেঙ্গেছে দেখেছি— কখনো ওকে সিজদায়, কখনো রুকুতে, কখনো মুনাজাতে, কখনো কান্না অবস্থায়- একেবারে ফজর পর্যন্ত!!
ফজরের সময় ও আমাকে ঘুম থেকে জাগাল । বলল- উঠো খালেদ! ফজরের সময় হয়ে গেছে। আমি উঠে ওজু করলাম। নামাজ পড়লাম। ফজরের পর ও একটু ঘুমাল। তারপর ঘুম থেকে জেগে আমাকে ইশরাক নামাজ পড়তে বলে নিজেও পড়ল। নামাজ শেষে বলল- খালেদ! আমার বিশ্বাস, আজ আমরা সফল হবো। আমি বললাম- কীভাবে বুঝলে?
রাতে তুমি আমি দু’জনই মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করেছি। তাছাড়া আমরা এখন ইশরাক পড়েছি। ইশরাক নামাজ পড়লে আল্লাহ পাক সারাদিনের কাজের জিম্মাদারী নিয়ে নেন; হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে সেকথা তো সেদিন তুমিই আমাকে শুনিয়েছিলে। আমি বললাম। হ্যাঁ । আল্লাহ পাক আমাদের সফল করুন।
ফাতেমা আমার দিকে চেয়ে একটু হাসল। তারপর বলল- চলো! আমাদেরকে তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। আমরা পাসপোর্ট অফিসে গেলাম।
আল্লাহর কী শান! আমরা অফিসে ঢুকতেই ফাতেমার আকার-আকৃতি দেখে এক অফিসার ডেকে উঠলেন- অমুক নামের মহিলা কোথায়? এই তো আমি এখানেই! ফাতেমা বলল।
লোকটি বলল- এই নিন আপনার পাসপোর্ট! হাত বাড়িয়ে আমিই পার্সপোর্টটি গ্রহণ করলাম। দেখলাম- নতুন । গতকালের তারিখ দেয়া! সদ্য সব কিছু পূরণ করা!! শুরুতেই শোভা পাচ্ছে- ফাতেমার হিজাব পরিহিত ছবি !
পাসপোর্স পেয়ে ফাতেমা ভীষণ খুশি! আমার দিকে তাকিয়ে বলল- আমি কি তোমাকে বলিনি- যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার মুক্তির পথ বের করেই দেন!?
হ্যাঁ, বলেছিলে। সত্যি বলতে কি তোমার মতো স্ত্রী পেয়ে সত্যি আমি ধন্য! আমরা বের হতে যাচ্ছিলাম। তখন অফিসারটি বললেন: আপনারা এবার যে শহর থেকে এসেছেন সেখানে চলে যান। সেখানকার স্থানীয় অফিসার থেকে সীল লাগিয়ে নিবেন।
পআমরা ফিরে এলাম প্রথম শহরে। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের এই অভিযানের প্রথম পর্ব। ফাতেমার পরিবার যেখানে বাস করে, সেই শহরে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম- কাজ তো প্রায় শেষ । এবার ফাতেমার বাবা-মার সাথে সাক্ষাতের পালা। আমরা আবার একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া করে সেখানে গিয়ে উঠলাম । পরদিন স্থানীয় অফিস থেকে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করলাম।
আলহামদুলিল্লাহ! এবার কোনো সমস্যা হয়নি। সবাই বেশ সমীহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে বাধ্য হলো। বাধ্য হবেই না কেন! ‘মস্কো অফিস’ জয় করে আসা অভিযাত্রীদের এটাই তো ন্যায্য পাওনা !
অফিসিয়াল যাবতীয় কাজ শেষ করে শ্বশুর বাড়িতে গেলাম। দরজায় আওয়াজ দিলাম। বাড়িটা ছিল বেশ পুরোনো। অতি সাধারণ। বাড়ির জীর্ণদশা বলে দিচ্ছিল এর অধিবাসীরা দরিদ্র।
ফাতেমার বড় ভাই দরজা খুলল। হাড্ডিসার এক যুবক। ফাতেমা ভাইকে পেয়ে খুশিতে আটখানা। নেকাব খুলে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল । তারপর ভাইয়ের হাত ধরে ভিতরে গেল।
এদিকে নিরাপদে বোনের ফিরে আসায় ভাই যেমন আনন্দিত, আবার কালো কাপড়ে সর্বাঙ্গ ঢাকা থাকায় ঠিক ততটাই সে বিস্মিত!
আমি ওর পিছনে পিছনে ভিতরে প্রবেশ করলাম। বৈঠকখানায় বসলাম। ভিতরে গিয়ে ও রুশভাষায় কথা বলছিল । আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার কানে ভেসে আসছিল— ধারাল কথার বাণ, হৈচৈ, চীৎকার। সবাই ওকে ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করছিল। ও সবাইকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল। রুশ ভাষা না জানার কারণে আমি প্রকৃত অবস্থা জানতে না পারলেও মোটামুটি এতটুকু আঁচ করতে পারছিলাম যে- ওরা ফাতেমার উপর সন্তুষ্ট নয়!
চিৎকার, চেঁচামেচি ক্রমেই বেড়ে চলছে। এক পর্যায়ে দেখলাম, এক বৃদ্ধ উত্তেজিত হয়ে তিন যুবককে নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসছেন। এবং আশ্চর্য! আমাকে কিছু বুঝে উঠার আগেই কিল-ঘুষির একটা প্রচণ্ড ঝড় আমার উপর দিয়ে বয়ে গেল!
আমি আরব রক্তের সন্তান। তাই প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার গোটা দেহকে কেন্দ্র করে ষোলটি হাত-পায়ের নিষ্ঠুর সঞ্চালন আমাকে কাবু করে ফেলল। যখন আমি দেখলাম, ওদের সাথে পেরে উঠা সম্ভব নয়, তখন আমি জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে কেবল দরজাটা খুঁজতে লাগলাম!
হঠাৎ দরজাটা নজরে পড়তেই শরীরের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে একটা দৌড় দিলাম । আমাকে পাকড়াও করার জন্য ওরাও আমার পেছনে পেছনে ছুটে আসছিল। আমি দ্রুত লোক-সমাগমের ভিতরে ঢুকে পড়লাম এবং তাদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেলাম ।
তারপর কোনো রকমে ঘরে এসে নিক্ষিপ্ত হলাম । ভাগ্যিস! ঘরটা বেশী দূরে ছিল না । গোসলখানায় ঢুকে নাকে-মুখে লেগে থাকা রক্ত পরিস্কার করলাম । মনে হচ্ছিল, আমি যুদ্ধ ফেরত এক আহত সৈনিক! তবুও হাজার শোকর আল্লাহর! তিনি আমাকে এই নরপশুদের হাত থেকে জানে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
খানিক পর ফাতেমার কথা স্মরণ হতেই মনটা আবার ব্যথায় কাতর হয়ে গেল । মনে মনে বলতে লাগলাম- আমি তো বেঁচে গেলাম । কিন্তু আমার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর কী অবস্থা? ওরা যদি ওকে মেরে ফেলে! আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল ওর হিজাব-ঢাকা ছবি ।
শয়তানের কাজ শয়তানী করা। শয়তান আমার মনে ঢুকিয়ে দিল নানান দুশ্চিন্তা। সে আমাকে বুঝাল- ফাতেমা মেয়ে মানুষ । নিষ্ঠুর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে এক সময় নিশ্চিত সে ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্মে ফিরে যাবে। অতএব ওর চিন্তা বাদ দিয়ে একাকী দেশে ফিরার চেষ্টা করো৷ আল্লাহর রহমতে আমি শয়তানের কথায় কান দিলাম না ।
অজানা-অচেনা দেশ। কিছুই চিনিনা আমি । কোথায় যাব, কী করব? কিছুই বুঝতে পারছি না। এ সময় হঠাৎ মনে হলো- পত্রিকায় দেখেছিলাম— এদেশে নাকি জীবনের বিশেষ কোনো মূল্য নেই! কাউকে মারতে হলে দশ ডলারেই ভাড়াটে খুনী পাওয়া যায়!
ওহ! কী অবস্থা হবে? যদি অত্যাচারের মুখে ফাতেমা ঈমান ছেড়ে কুফরীতে ফিরে যায় এবং আমার বর্তমান বাসার ঠিকানা ঐ পাষণ্ডদের বলে দেয়? তখন ওরা যদি ভাড়াটে খুনী পাঠিয়ে আমাকে ……? না! আর ভাবতে পারছি না!!
ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কোনোরকম রাতটা কাটল। কোনোভাবেই চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। সকালে ছদ্মাবেশ ধারণ করলাম। দূর থেকে ফাতেমার খবরাখবর জানার জন্য একজন গোয়েন্দার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলাম ।
সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। বেরুতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কর্তব্যের ডাকে সাড়া না দিয়ে কাপুরুষতার অপবাদ মাথায় নেওয়ার মত পুরুষ আমি নই । তাই ব্যথা-জর্জরিত দেহটা টেনে নিয়েই ওদের বাড়ির কাছে একটা সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান নিলাম। সেখান থেকে ওদের বাড়িটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলাম। সবকিছু নিরীক্ষণ করছিলাম। বাড়ির ফটক আটকানো। উত্তেজনাপূর্ণ প্রহর কাটাতে লাগলাম । হঠাৎ দেখলাম ফটক খুলে শ্বশুর মহাশয় বের হচ্ছেন। সাথে সেই তিন যুবক যারা গতকাল ওদের ভগ্নিপতিকে আচ্ছামত পিটিয়ে ছিল!
ওরা বের হওয়ার পর গেইট বন্ধ হয়ে গেল । গেইটে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো একটা বড় তালাও । আমি ওৎ পেতে বসেছিলাম । আমার স্ত্রীর মুখ দেখার জন্য আমার দৃষ্টি ছিল অত্যধিক ব্যাকুল! কিন্তু না! কোনো লাভ হলো না ।
ঘণ্টা খানেক কেটে গেল । এরেই মধ্যেই দেখলাম আমার শ্বশুর তার তিন জোয়ানকে নিয়ে ফিরে এসেছেন। আমি ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করলাম । দুশ্চিন্তার পাহাড় মাথায় করে ফিরে গেলাম ।
পরদিন আবার এসে আমার পূর্বের স্থানে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করলাম । অপেক্ষায় অপেক্ষায় কেটে গেল অনেক বেলা। আবার ফিরে এলাম ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে । ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ।
এলো তৃতীয় দিন । না! আজো কোনো লাভ হলো না। স্ত্রীর কোনো খবর পেলাম না। আমি ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়তে লাগলাম । চারিদিক থেকে হতাশা আমাকে চেপে ধরল। বারবার শুধু এ আশঙ্কাই আমার হৃদয়টাকে ক্ষতবিক্ষত করছে- ওরা আমার প্রিয়তম স্ত্রীকে মেরে ফেলেনি তো? নিষ্ঠুর নিপীড়নে ও মারা যায়নি তো?
কিন্তু এক সময় মন থেকে এ আশঙ্কাটা বের করে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করলাম। ভাবলাম- ও যদি মরে যেত তাহলে ওদের ঘরে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যেত। একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করত। কিন্তু এসব কিছুই আমার চোখে পড়ছে না । আমি মনকে প্রবোধ দিতে লাগলাম- অপেক্ষা করো! ও নিশ্চয়ই বেঁচে আছে। শীঘ্রই তার দেখা পাবে!! । চতুর্থ দিন আবার সেখানে ছুটে গেলাম। যথারীতি দেখলাম, বাপ- বেটারা কাজে বের হয়ে চলে গেল। আমি অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলাম জীর্ণ বাড়িটার দিকে ।
হঠাৎ দেখলাম ফটকটা খুলে গেছে! আরো দেখলাম, ফটকের মুখটায় গভীরভাবে ওর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম । দেখলাম- সীমাহীন নিপীড়নে ফাতেমার মুখটাও দেখা যাচ্ছে। ফাতেমা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আমি ওর অবস্থা কাহিল । ওর পরণের কাপড়টাও লালে লাল!
আমি ওর করুণ অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলাম। ছুটে গেলাম তার একেবারে নিকটে! মনটা হু হু করে কেঁদে উঠল । ওর মুখের ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত ঝরছিল। হাত-পা-ও রক্তাক্ত। পরিহিত কাপড় ছিন্নভিন্ন। কোনো রকমে সতরটা ঢাকা আছে। পায়ে শেকল। হাতও পেছন দিক থেকে বাঁধা । আমি আর সইতে পারলাম না । বিকট এক চিৎকার দিয়ে ওর নাম ধরে ডেকে উঠলাম- ফাতেমা!
ফাতেমা আমাকে দেখতে পেয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল- খালেদ! আমি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি! আমার জন্য মোটেই উদ্বিগ্ন হয়ো না। কসম আল্লাহর যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আমি এখন যে নির্যাতন ভোগ করছি, তা নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের জুলুম-নির্যাতনের তুলনায় কিছুই না। সাবধান! তুমি কিন্তু ভুলেও আমার পরিবারের কারো মুখামুখি হয়ো না। এক্ষুণি তুমি ফিরে যাও। ঘরে বসেই আমার জন্য অপেক্ষা করো। আমি আসবই আসব, ইনশাআল্লাহ। তুমি দোয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দাও। নফল নামাজ বাড়িয়ে দাও। শেষ রাতের কান্নাকাটিও বৃদ্ধি করো। কেননা বিপদ মুকাবিলায় নামাজ ও দোয়ার অস্ত্র- সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আমি ফিরে এলাম আমার ঘরে। বসে বসে অপেক্ষা করলাম পুরো দিন । রাতটাও শেষ হলো। কিন্তু না, সে এল না ।
এভাবে আরেকটি দিন কেটে গেল। সেদিনও সে এল না। তৃতীয় দিনও প্রায় শেষের পথে। দিন শেষে শুরু হয়েছে অন্ধকার রজনী। ক্রমেই গভীর হচ্ছে রাত। সেই সাথে বাড়ছে আমার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। এমন সময় হঠাৎ শুনলাম, দরজায় কে যেন আওয়াজ দিচ্ছে। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ভাবতে লাগলাম- এতো রাতে কে দরজায়? কে হতে পারে? ফাতেমা নয় তো ? নাকি ওর পরিবার আমার অবস্থান জেনে ফেলেছে? নাকি আমাকে শেষ করে দিতে ওরা ভাড়াটে খুনি পাঠিয়েছে?
মনটাকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলাম। হায়াত মওতের মালিক তো আল্লাহ! আমি এগিয়ে গেলাম। দরজায় কান লাগিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম- কে? তখন ভেসে এলো আমার স্ত্রীর কণ্ঠ! ও ধীরে ধীরে শান্ত কণ্ঠে বলছে- খালেদ, দরজা খুলো! তোমার ফাতেমা এসে গেছে। ভয়ের কিছু নেই ।
মুক্তি এবং নতুন জীবনের শুরু!
আমি আলো জ্বেলে দরজা খুলে দিলাম । ফাতেমা বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করল। সারা দেহ ক্ষত-বিক্ষত। ছোপ ছোপ রক্ত! ঘরে ঢুকেই ও আমাকে বলল- এক্ষুণি আমাদেরকে এখান থেকে বের হতে হবে!
: আমি বললাম- কিন্তু তোমার এই নাজুক অবস্থায় ?
: হ্যা, কোনো উপায় নেই । জলদি চলো! এখানে থাকা মোটেও নিরাপদ নয়।
পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলাম বিধায় আমি আর দ্বিমত করতে পারলাম না। কাপড়-চোপড় দ্রুত একটা ব্যাগে ভরলাম। ফাতেমা নিজেও ওর ব্যাগ গোছাতে লাগল এবং গায়ের পোষাকটা একটু বদলে নিল । হিজাবের উপর পরল একটা লম্বা ঢিলেঢালা আবা । সবকিছু নিয়ে আমরা নীচে নেমে এলাম । আল্লাহর মেহেরবানী, একটা ভাড়া-গাড়ি পেয়ে গেলাম ।
গাড়িতে উঠেই চালককে বললাম- বিমানবন্দর । কিন্তু ফাতেমা বলল- এখন বিমানবন্দরে যাওয়া নিরাপদ নয় । আমরা বরং সামনের গ্রামে যাব। আমি বললাম- কেন? আমরা তো এদেশ ছেড়ে পালাতে চাই তা ঠিক। কিন্তু এ বিমানবন্দর থেকে নয়। কেননা আমার খবরটা জানাজানি হয়ে গেলেই হুমড়ি খেয়ে ওরা এ বিমানবন্দরে এসে হাজির হবে। তাই কোনো গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেওয়াই আমাদের জন্য এখন নিরাপদ।
চালককে যে গ্রামের কথা বলা হয়েছিল আমরা ততোক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছি। নেমেই আরেকটি গাড়িতে করে অন্য আরেকটা গ্রামের দিকে ছুটলাম। তারপর আরেকটি গ্রামের দিকে। এভাবে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে উপনীত হলাম এমন একটা শহরে, যেখানে আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর রয়েছে।
বিমানবন্দরে পৌঁছেই আমরা দেশে ফেরার টিকেট বুক করলাম । কিন্তু যাত্রা ছিল বিলম্বিত । তাই শহরে কয়েকদিন থাকার প্রয়োজনে একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠে পড়লাম ।
ধরা পড়ার আশঙ্কা দূরীভূত হওয়ার পর ফাতেমা তার রাশিয়ান আবাটি খুলে ফেলল । তখন আমি ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম, নির্মম অত্যাচার থেকে তার শরীরের কোনো অংশই বাদ যায়নি। দেহের চামড়া ক্ষত-বিক্ষত। এখানে ওখানে ছোপ ছোপ জমাট রক্ত। কেশগুচ্ছের উপর দিয়েও বয়ে গেছে প্রলয়ংকরী ঝড়। ওষ্ঠদ্বয় বেদনায় নীল ।
কিন্তু চোখ দু’টি তার জ্বলছিল— স্বর্গীয় আভায়! ওর চোখ দেখে আমি ভাবতেই পারছিলাম না— ওর দেহটা বিধ্বস্ত ।
আমি জানতে চাইলাম- ওরা তোমাকে কীভাবে অমন করুণ দশা করল? সে বলল- আমি অন্দরে গিয়ে সবার মাঝখানে বসলাম। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করল- এ আবার কী ধরনের পোষাক পরে এসেছ?
: আমি বললাম- এ ইসলামের পোষাক ।
: ইসলামের পোষাক! সাথের লোকটা কে?
: আমার স্বামী! আমি ইসলাম কবুল করেছি । এ মুসলিম লোকটির সাথে আমার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।
: তারা তখন বলল— এ কিছুতেই হতে পারে না। এ কিছুতেই আমরা মেনে নিব না ।
: আমি বললাম- আগে আমার কাহিনী শোনো! তারপর যা বলার বলো!
এরপর আমি ঐ ভণ্ড-বণিকটির কাহিনী শুনালাম। অতঃপর কীভাবে তার কাছ থেকে পালিয়ে তোমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম তা বিস্তারিত বললাম।
এসব শুনে তারা ক্ষেপে গেল। কোনো সহানুভূতি ও সান্ত্বনা না দিয়ে উল্টো বলতে লাগল- মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসার চেয়ে পতিতাবৃত্তিই আমাদের কাছে ভালো ছিল! তারা আরো বলল- তুমি এক্ষুণি ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করো। নইলে এখান থেকে তোমার লাশ বেরুবে!
আমি ওদের কথা মানতে অস্বীকৃতি জানালে ওরা আমাকে বেঁধে ফেলে। তারপর ছুটে যায় তোমার দিকে। আমি বাধা অবস্থায় তোমার চিৎকার ও আর্তনাদ শুনছিলাম। তুমি পালিয়ে যাওয়ার পর ওরা আমার কাছে ফিরে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে দেয়।
খানিক পর ওরা বাজার থেকে শেকল এনে আমাকে আবারো শক্ত করে বাঁধে। তারপর শুরু হয় নিষ্ঠুর বেত্রাঘাত। প্রতিদিন নতুন নতুন ও অদ্ভুত অদ্ভুত বেত ব্যবহার করত ওরা। বেত্রাঘাত শুরু হত আসরের পর এবং একটানা গভীর রাত পর্যন্ত চলত- যতক্ষণ না আমি বেহুঁশ হতাম। সকালে আমাকে পিটানোর কেউ থাকত না। সবাই কাজে চলে যেত। মা আর পনের বছরের ছোট্ট বোনটি বাড়িতে থাকত। ওরাও আমাকে পুনরায় খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ বলত। কিন্তু মারধর কিছুই করত না। ফলে এ সময়টিতে আমি একটু নিস্কৃতি পেতাম।
আমার পরিবারের সবার দাবী একটাই- আমাকে ইসলাম ছাড়তে হবে। বাপ-দাদার ধর্মে ফিরে আসতে হবে। আমি বারবার তাদের দাবী মেনে নিতে অস্বীকার করছিলাম। আর দাঁত কামড়িয়ে ওদের নিষ্ঠুর নির্যাতন সয়ে যাচ্ছিলাম ।
একদিন আমার পাশে বসে ছোট্ট বোনটি জিজ্ঞেস করল- আচ্ছা আপু! বলো তো, কেন তুমি স্বধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম কবুল করলে? কেন তুমি খৃষ্টধর্মে ফিরে আসতে চাচ্ছ না? কেন চাচ্ছ না তোমার মা-বাবার ধর্মে ফিরে আসতে? তোমার পূর্ব-পুরুষের ধর্মে ফিরে আসতে?
আমি আমার বোনের এ কৌতূহলকে গণীমত মনে করলাম। কেননা তাকে বোঝানোর এবং তার সাথে কথা বলার একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম । আমি শুরু করলাম তাকে বোঝাতে । ইসলামের ইতিহাস ও দর্শন খুলে খুলে এবং বোধগম্য ভাষায় তার সামনে উপস্থাপন করতে লাগলাম । ব্যাখ্যা করতে লাগলাম তাওহীদ ও একত্ববাদের বাণী। ও ধীরে ধীরে প্রভাবিত হতে লাগল । ইসলামের শ্বাশত পয়গাম ও সত্যতা ওর মনের আকাশে রাঙা আলো ছড়াতে লাগল ।
কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি যে ওর কাছ থেকে ইসলামের পক্ষে সুস্পষ্ট বক্তব্য আসবে তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি । আমার কথা শেষ হতেই সে বলে উঠল- আপু! তুমি সত্যের উপর রয়েছে । ইসলামই সত্য ধর্ম। আমিও তোমার মতো ইসলাম কবুল করতে চাই !!
তারপর ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বিচক্ষণ মানুষের মতো আরো বলল- আপু! তুমি ভেঙে পড়ো না। একটু ধৈর্য ধরো। আমি তোমাকে সহযোগিতা করব।
আমি বললাম- বোন! সত্যি যদি তুই আমাকে কোনো প্রকার সহযোগিতা করতে চাস্ তাহলে আমাকে আমার স্বামীর সাথে একটু কথা বলার সুযোগ করে দে। এরপর থেকেই ও ছাদে বসে তোমাকে খুঁজে ফিরত।
একদিন ও ঠিকই তোমাকে আবিস্কার করে ফেলল এবং আমাকে এসে খবর দিল। আমি বললাম- তুই তোর দুলাভাইকে চিনতে পেরেছিস? বলতো তোর দুলাভাই কেমন? সে বলল: অবশ্যই চিনেছি । তারপর সে তোমার আকার আকৃতির বর্ণনা দিল আমি বললাম- তুই ঠিকই ধরেছিস। ইনিই তোর দুলাভাই। আবার যখন তোর চোখে পড়বে সাথে সাথে আমাকে খবর দিবি ।
সেদিন তোমাকে দেখে ও আমাকে খবর দিল এবং সত্যি সত্যি রুমের দরজাও খুলে দিল। এরপরের কাহিনী তো তোমার জানাই আছে। আমি বেরিয়ে এসে তোমার সাথে কথা বললাম । কিন্তু ফটকের বাইরে আসতে পারলাম না । আমার হাত-পা ছিল তিনটি শেকলে বাঁধা । দু’টোর চাবি ছিল আমার এক ভাইদের কাছে। তৃতীয়টির চাবি ছিল আমার বোনের কাছে। এই তৃতীয় চাবিটি দিয়ে ও আমাকে শেকলমুক্ত করে বাথরুমে নিয়ে যেত।
এরপর আমার বোন ইসলাম কবুল করে ধন্য হলো। আমাকে শেকলমুক্ত করে তোমার কাছে পাঠানোর জন্যে ও এক গোপন অভিযানে নেমে পড়ল । ও নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে আমার জীবন রক্ষা করার জন্যে রাতের ঘুম হারাম করে দিল ।
কীভাবে আমার ভাইয়ের কাছ থেকে চাবি দু’টো হস্তগত করা যায়, সেজন্য সে ফিকির শুরু করে দিল।
পরদিন রাতে সে ভাইদেরকে ঝাঁঝাল মদ অধিক পরিমাণে পরিবেশন করল। মদ পরিবেশনের দায়িত্বটা অবশ্য আগে থেকেই ও পালন করত। ওরা মাত্রাতিরিক্ত ঝাঁঝালো মদ খেয়ে পূর্ণমাতাল হয়ে বিছানায় পড়ে রইল। আমার বোন এ সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাল। আস্তে করে পকেট থেকে চাবি দু’টো বের করে সোজা আমার কাছে এসে বলল- এক্ষুণি প্রস্তুত হও! এ বলে সে আমাকে পূর্ণরূপে শেকলমুক্ত করে ফটক খুলে দিল। তারপর অশ্রুসজল নয়নে আমাকে বিদায় জানাল। আমি রাতের আঁধারকে আশ্রয় করে তোমার কাছে ফিরে এলাম!
আমি এতক্ষণ তন্ময়চিত্তে আমার স্ত্রীর মুখে তার মুক্তির কাহিনী শুনছিলাম । জিজ্ঞাসা করলাম- কিন্তু তোমার বোন? আমার প্রিয় শ্যালিকা? তার ভাগ্যে কী ঘটল? ফাতেমা হাসিমুখে বলল- শ্যালিকাকে নিয়ে অতো ভয় পেতে হবে না! ওকে আপাতত ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখতে বলেছি! যতদিন না ওর কোনো ব্যবস্থা আমরা করব! এরপর আমরা বাকি রাতটুকু ঘুমিয়ে কাটালাম।
আমরা নির্ধারিত সময়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। দেশে পৌঁছেই আমি ওকে একটা ভাল হাসপাতালে ভর্তি করলাম। সেখানে বেশ কিছুদিন ওর চিকিৎসা চলল। আলহামদুলিল্লাহ এক সময় সে পুরোপুরি সেরে উঠল। কিন্তু নির্যাতনের কিছু কিছু চিহ্ন তখনো তার কোমল দেহে বিদ্যমান ছিল।
এই গল্প থেকে আমাদের শিক্ষা!
- সতীত্ব ও ঈমান রক্ষায় অবিচলতা: সর্বোচ্চ চাপ ও লোভের মুখেও ফাতেমা নিজের মূল্যবোধ থেকে সরেননি — এটি প্রতিটি মুসলিমের জন্য অনুপ্রেরণা।
- দোয়া ও নামাজের শক্তি: পাসপোর্টের সংকটে সারারাত ইবাদতের পর আল্লাহ অলৌকিকভাবে পথ বের করে দিলেন।
- হিজাব — দায়িত্ব নয়, গর্বের পরিচয়: ফাতেমা হিজাবকে বোঝা মনে করেননি, বরং তা ছিল তার পরিচয় ও অহংকার।
- মানবতার সেবা ইসলামের দাওয়াহর পথ: খালেদের পরিবার ফাতেমাকে আশ্রয় দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করল।
- বিপদে আল্লাহর উপর ভরসা: “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য তিনি মুক্তির পথ বের করেই দেন।” — সূরা তালাক: ২–৩।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: ফাতেমার আসল পরিচয় কী ছিল?
ফাতেমা ছিলেন একজন রুশ খ্রিস্টান তরুণী, যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামী নাম ‘ফাতেমা’ ধারণ করেন।
প্রশ্ন: ইসলামে হিজাব পরা কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী পর্দা বা হিজাব মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। কুরআন ও হাদিসে এর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
প্রশ্ন: এই গল্পের উৎস কী?
এই গল্পটি আরবি গ্রন্থ “ইন্নাহা মালিকাহ” থেকে সংকলিত এবং মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলামের “আদর্শ যুবক যুবতি ২” বই থেকে নেওয়া।
প্রশ্ন: নও মুসলিমরা কি পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের শিকার হন?
ইতিহাস ও বাস্তব ঘটনায় দেখা যায়, অনেক নও মুসলিম পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে চাপ ও কষ্টের মুখোমুখি হন — তবুও ঈমানের শক্তিতে তাঁরা অবিচল থাকেন।
প্রশ্ন: গল্পে উল্লিখিত কুরআনের আয়াতটি কোথায় পাওয়া যায়?
ফাতেমা যে আয়াতটি উদ্ধৃত করেছেন — “যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য তিনি মুক্তির পথ বের করেই দেন” — এটি সূরা আত-তালাক (৬৫)-এর ২–৩ নম্বর আয়াত।
➡️ এরপর পড়ুন: একটি মিসকলড — অতঃপর? (প্রেম ও পরকীয়ার গল্প)
প্রিয় পাঠক পাঠিকা, রুশ তরুণীর ঈমানী চেতনার সত্য ঘটনার গল্পটি পড়ে ভালো লাগলে এটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আপনার মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।