অভিভূত জার্জিস কন্যা! ইসলামিক যুদ্ধের গল্প

জার্জিস কন্যা। ইসলামিক যুদ্ধের গল্পএকটি দারুন ইসলামিক যুদ্ধের গল্প পড়ুন,

যে যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করার জন্য আফ্রিকার রাজা জার্জিস ঘোষণা দেয়,

সাহসী বীরের সাথে তার রাজকন্যাকে বিবাহ দেওয়ার।

এরপর….

যুবক আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.। জিহাদের নাম শুনলেই যার সদাপ্রস্তুত তরবারী ঝলসে উঠে। যার বুকে সর্বদা শহীদ হওয়ার সমুজ্জ্বল স্বপ্নের পাঁপড়িগুলো সাফল্যের পতাকার মতো বাতাসে পতপত করে উড়ে। ঈমান আর ইসলাম যার অহঙ্কার। সেই অহঙ্কার হৃদয়ে লালন করে মুশরিকদের দাম্ভিকতার সামনে তিনি বুক টান করে এগিয়ে যান। অথচ সেই বুকে আত্মগর্বের লেশমাত্র থাকে না।

আফ্রিকার তারাবলুস নগরী। ভূমধ্যসাগরের তীর। সেখানকার রাজা জার্জিস। শোষণ আর উৎপীড়ন করে হাতির মতো ফুলে উঠেছেন তিনি। মানুষের অধিকার আর প্রাপ্য না দিয়ে লুটতরাজ করে গড়ে তুলেছেন ভোগের বালাখানা। তার লোভ-লালসার রঙিন ঘোড়াটা যখন-তখন অদম্য শক্তিতে দৌড়াতে থাকে ভর জনপদে। অহরহ তিনি উৎসবে মেনে ওঠেন অসহায় মানুষের কর্তিত মুণ্ডু নিয়ে। এই অত্যাচারী জুলুমবাজ মানুষটিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার কোনো মানুষ যেন জগতে নেই। এমুটি ভাবেন রাজা জার্জিস নিজেও।

হযরত উসমান রাযি. তখন মুসলিম জাহানের খলীফা। একদিন তিনি ভাবলেন, এই জালেমকে শাস্তি দিতে হবে। তার কবল থেকে মুক্ত করতে হবে নির্যাতিত জনপদকে। তারপর সেখানে ছড়িয়ে দিতে হবে ইসলামের আলো। পৌঁছে দিতে হবে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের মহান পয়গাম।

যেই ভাবনা সেই কাজ। তিনি ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ সৈনিকদের ডাকলেন। ডাকলেন অকুতোভয় মুসলিম মুজাহিদদের।

ডাকের সাথে সাথে চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল। ঝড়ের বেগে ছুটে এলেন বীর মুজাহিদগণ। যাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. ও ছিলেন।

আলোচনা পর্যালোচনা হলো। পরামর্শ হলো। নিযুক্ত করা হলো মুসলিম সেনাপতি।

কয়েক দিন পর। জিহাদের ময়দানে উপস্থিত মুজাহিদ বাহিনী। উপস্থিত কাফের বাহিনীও। মুজাহিদদের সেনাপতি হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাআদ রাযি.। আর কাফেরদের সেনাপতি স্বয়ং রাজা জার্জিস। মুজাহিদ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা মাত্র ত্রিশ হাজার। পক্ষান্তরে কাফের বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা একলক্ষ বিশ হাজার।

যুদ্ধের অদম্য স্পৃহা নিয়ে উভয় দল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আলো-অন্ধাকার পরস্পর মুখোমুখি।

একদিকে কাফের গোষ্ঠি। অন্যদিকে মুসলিম মুজাহিদ। একদিকে তাগুতের যুবকরা হৈ-হুল্লোড় করছে। আর অপরদিকে মুসলিম যুবকরা ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত। এক যৌবন যুদ্ধে এসেছে মিথ্যার কাদামাটি দিয়ে সত্যকে ঢেকে ফেলতে। আরেক যৌবন অস্ত্রসজ্জিত হয়েছে অন্ধকার ভেদ করে সত্যের সূর্যকে উদ্ভাসিত করতে। এক যৌবন দাঁড়িয়ে গেছে মানুষের উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। আরেক যৌবন প্রস্তুত হয়েছে মানুষের গোলামী থেকে মানুষকে মুক্ত করে মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কায়েম করে দিতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হবে। মুসলিম সেনাপতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাআদ রাযি. দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে মুজাহিদদের সম্মুখ দিয়ে কয়েকবার চক্কর দিলেন। সেই সাথে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন—

হে ইসলামের বীর সিংহদল! তোমরা খৃষ্টানদের সংখ্যাধিকের মোটেও পরোয়া করো না। তারা প্রমোদ বিলাসী, কাপুরুষ ও ভীরু জাতি। তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা এজন্য অসন্তুষ্ট যে, তারা হযরত ঈসা আ.কে খোদার পুত্র বলতে শুরু করেছে। ধর্মকে বানিয়েছে খেলনা ও হাস্যস্পদ বিষয়।

বাহাদুরানে ইসলাম। তোমাদের একমাত্র প্রভু আল্লাহ। বিলাস প্রমোদকে তোমরা ঘৃণা করো। তোমরা কষ্টসহিষ্ণু। আল্লাহর কাজে তোমরা মরো, তারই কাজেই জন্য বেঁচে থাকো। তিনি তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তিনিই তোমাদের সাহায্যকারী ও সহায়। তিনি অতীতে যেমন তোমাদের সাহায্য করেছেন, ইনশাআল্লাহ আজও তোমাদের সাহায্য করবেন।

হে মুজাহেদীন ইসলাম! বেহেশতের দরজা খুলে গেছে। হুর-পরীরা শহীদদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দরজার সামনে এসে দণ্ডায়মান হয়েছে। তোমরা স্বীয় শক্তি ও বীরত্বের পরিচয় দাও। জান্নাতুল ফিরদাউসে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করো।

হে ইসলামের গৌরবমণ্ডিত বীরসন্তানগণ! বীরত্বের খেলা দেখাবার সময় এসেছে। বিদ্যুৎবেগে তগরবারী চালাও। বাহিবলের প্রদর্শনী দেখাও। ঝড়ের মতো শত্রুদের উপর ঝাপিয়ে পড়ো। তাদেরকে বুঝিয়ে দাও যে, মুসলমানগণ কখনো মৃত্যুকে ভয় করে না; মুসলমানদের মোকাবেলা করার মানে—পাহাড়ের সাথে টক্কর খাওয়া।

সেনাপতির এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মুসলিম সেনাদের মন উৎসাহ ও জোশে উদ্বেলিত হয়ে ওঠল। প্রতিটি মুজাহিদের চেহারায় বীরত্বের ছাপ সুস্পষ্ট দেখা গেল।

খানিক বাদে শুরু হলো প্রচন্ড লড়াই। বজ্র-ঝিলিকের মতো বিদ্যুৎ খেলছে উন্মুক্ত তরবারী। জলোচ্ছাসের আওয়াজের মতো গোটা মাঠ প্রকম্পিত করে তুলছে ঘোড়ার হেষা। ঝাঁকে ঝাঁকে দল বেঁধে ছুটে চলছে তীরের ফলা। ঝকঝকে তলোয়ার উঠছে আর নামছে। বইতে শুরু করেছে রক্তের বন্যা। রক্তপান করা তলোয়ার গুলোকে মনে হচ্ছে যেন খুনের শাড়ি পড়া।

রাজা জার্জিসের একজন পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল। তার নাম ছিল হেলেন। তিনি ছিলেন সৌন্দর্যের রাণী। আল্লাহ পাক যেন নিজ হাতে এমন মনোলোভা করে গড়েছেন তাকে। একবার দেখলে চোখ ফেরানো দায়। আরো আশ্চর্যের কথা হলো, তিনি সাহসিনীও। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় বড় সাহসী বীরের সাহসও তার কাছে ম্লান হয়ে যায়। তাই প্রতিটি রাজপুত্র, কেল্লাদার এবং প্রত্যেক বিভাগের প্রধানগণের আন্তরিক অভিলাষ যে, বাদশাহের নৈকট্য লাভ করে, তার বিশ্বাসভাজন হয়ে, যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে হোক, সেই শাহজাদীকে লাভ করবে, তাকে পেয়ে জীবনে ধন্য হবে।  

ছোট কি বড়, যুবক কি বৃদ্ধ, মেয়ে কি পুরুষ সকলেরই ছিল হেলেনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। শুধু রাজধানীতে নয় বরং সমগ্র আফ্রিকার অধিবাসীরা তাকে যেমনি সাক্ষাতে, তেমনি অগোচরে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। আর এই ভালোবাসার মূলে ছিল, শাহজাদীর বিনয়-নম্র ব্যবহার, সকলের প্রতি সদয়-সদ্ভাব। তার সদা উদার হাসিমুখকে অনেক মূর্খও ভালোবাসা বলে মনে করত।

শাহজাদী হেলেনের রূপ-সৌন্দর্যকে ভিত্তি করে দেশময় কি হচ্ছে, এ খবর তার নেই। তিনি নিজেকে অপরাপর সুন্দরীর মতোই একজন বলে ভাবেন। কিন্তু তার সৌন্দর্য, তগার লাবণ্য, মাধুর্য, তদুপরি তার অমায়িক ব্যবহার, তার সাশ্রু নয়ন যুগল, দীর্ঘ আঁখি পল্লব দর্শকদের মর্মমূলে কি নিষ্ঠুর কোমল আঘাত হানে, তার বিন্দুমাত্র অনুভুতিও তার নেই।

বলদর্পী শাসক জার্জিসের এই অপরূপা কন্যা সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধে শরীক হয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে অশ্বপৃষ্ঠে বসে তিনিও মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন।

প্রথম দিন আছর পর্যন্ত যুদ্ধ চলে বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু জয়-পরাজয় সূচিত হলো না। হিসেব করে দেখা গেল, ঈসায়ীদের বিশ হাজার সৈন্য নিহত ও ছয় হাজার সৈন্য আহত হয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের দুইশ আহত ও একশ ষাট জন শহীদ হয়েছেন।

যুদ্ধের ফলাফল দেখে রাজা জার্জিস মহাভাবনায় পড়ে গেলেন। ঘাবড়েও গেলেন ভীষণভাবে। ফলে পরের দিন যুদ্ধে নামতে সাহস পেলেন না তিনি। এবং বর্তমানে পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, তা ঠিক করার জন্য আফ্রিকার শ্রেষ্ঠবীর সেনাপতি মারকিউস এবং রাজকীয় গির্জার প্রধান পুরোহিত থিওডোসসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সমরকুশলী নিয়ে পরামর্শে বসলেন।

পরামর্শ সভা চলাকালে একপর্যায়ে পুরোহিত থিওডোস বললেন, জাহাপনা! আমি একটি কথা বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, তা শুনে আপনার উদার ও প্রশান্ত মন বিরক্ত হয়ে পড়ে কি না।

জার্জিস বললেন, আপনার কোনো ভয় নেই। আপনি দ্বিধাহীনচিত্তে স্বীয় মতামত প্রকাশ করুন।

আশ্বাস পেয়ে সহাস্যে থিওডোস বলতে লাগলেন, হুজুর যদি একটু ত্যাগ স্বীকার করেন, তাহলে একদিকে যেমন গোটা পৃথিবীতে আপনার নাম-যশ ছড়িয়ে পড়বে, তেমনি অন্যদিকে সেনাপতি থেকে শুরু করে প্রতিটি সৈন্য মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপনে লড়বে। আমার বিশ্বাস, আপনার এই ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের সৈন্যদের মধ্যে এমন জোশ সৃষ্টি হবে যে, তারা প্রতিপক্ষকে চোখের পলকে ধ্বংস করে বিজয়ী বেশে ফিরতে পারবে।

কী সেই ত্যাগ যা আমাকে স্বীকার করতে হবে? রাজা জার্জিস জিজ্ঞেস করলেন।

জাহাপনা! আমি আপনার কাছে আশা করছিলাম যে, আপনি আজই সৈন্যদের মাঝে একটি ঘোষণা শুনিয়ে দিবেন। ঘোষণাটি হলো,

যে বীরপুরুষ মুসলিম সেনাপতি আব্দুল্লাহর ছিন্নমস্তক নিয়ে আসতে পারবে, অনিন্দ্য সুন্দরী শাহজাদী হেলেনকে তার সাথে বিয়ে দেওয়া হবে।

রাজা জার্জিস থিওডোসের এই পরামর্শকে উপেক্ষা করতে পারলেন না। তাই সেদিনই তিনি উপরোক্ত ঘোষণা সৈন্যদেরকে শুনিয়ে দিলেন।

ঘোষণা শুনার সাথে সাথে খৃষ্টান সৈন্যরা উম্মাতাল হয়ে ওঠল। তাদের মধ্যে বেড়ে গেল রক্তনেশা। হন্যে হয়ে হামলে পড়ল ইসলামী বাহিনীর উপর।

শুরু হলো হত্যার প্রতিযোগিতা। কেউ কারো থেকে পিছিয়ে থাকতে চায় না। রাজার ঘোষণা যাদুর মতো কাজ করল। প্রতিটি সৈন্য অসীম সাহস বুকে নিয়ে দৈত্যের মতো কাজ করল। প্রতিটি সৈন্য অসীম সাহস বুকে নিয়ে দৈত্যের মতো যুদ্ধ করতে লাগল।

এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে জার্জিস আত্মতৃপ্তি ও আনন্দবোধ করছিলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আজ তার বাহিনীর বজ্র-কঠোর হামলার সম্মুখে নগণ্য মুসলিম বাহিনী দশ মিনিটও টিকতে পারবে না। ঝড়ের মতো উচ্ছৃঙ্খল ও উন্মুক্ত খৃষ্টান বাহিনীর প্রথম ধাক্কাতেই তারা ধুলোর মতো উড়ে যাবে।

এদিকে মুসলিম বাহিনীও তখন পিছিয়ে নেই। ক্রমে ক্রমে তারাও হয়ে উঠতে লাগলেন আরও অপ্রতিরোধ্য। আরো অজেয়।

এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সেনাপতি আব্দুল্লাহ রাযি. মনে মনে ভাবছেন, মুসলিম বাহিনীকে আরো উদ্বুদ্ধ করা দরকার। প্রয়োজন আরও অনুপ্রাণিত করা কিন্তু কিভাবে?

তিনি চিন্তা করছিলেন। এমন সময় দেখা গেল তার দিকে এগিয়ে আসছেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.।

তিনি সেনাপতি আব্দুল্লাহ রাযি.কে পরামর্শ দিলেন, আপনিও পাল্টা ঘোষণা করুন। ঘোষণা করুন

যে বীর বাহাদুর রাজা জার্জিসের কর্তিত মুণ্ড আনতে পারবে, তাকে জার্জিসের সুন্দরী কন্যাসহ একলক্ষ দিনার বখশিশ দেওয়া হবে।

আব্দুল্লাহ রাযি. দেরী করলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা শুনিয়ে দিলেন।

এই ঘোষণায় নতুন করে ঝড় উঠল যুদ্ধের ময়দানে। উদ্বেল হয়ে উঠল মুসলিম বাহিনী। উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল প্রতিটি সৈনিক। ক্ষণিকের মাঝে তলোয়ার গুলো রাঙা হয়ে ওঠল দুশমনের খুনে। শুরু হলো শত্রুর মুণ্ডুপাত।

খৃষ্টান সৈন্যদলও সাধ্যতীত চেষ্টা করছে। কিন্তু মুসলমানদের সাথে কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলতে চলতে এক সময় ওদের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ল। যারা অগ্রভাগে জানবাজি রেখে লড়াই করছিল, তারাও এখন হিমশিম খেয়ে গেল। এমনকি আক্রমণ ছেড়ে প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে লাগল।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. খৃষ্টান বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে বজ্রপাতের মতো একাকী জার্জিসের রক্ষীবাহিনীর সম্মুখে গিয়ে উপনীত হলেন। চিৎকার দিয়ে বললেন, হে আফ্রিকার আত্মম্ভরী রাজা! সাহস থাকে তো বীরের মতো এসে যুদ্ধ করো।

জার্জিসও বাহাদুর ছিলেন। হযরত ইবনে যুবাইরের আহবানে তিনি তলোয়ার উঁচিয়ে এক লাফে ভীষণ বেগে আক্রমণ করে বসলেন। ইবনে যুবাইর রাযি. দক্ষতার সাথে সে হামলা রুখে দিয়ে পাল্টা হামলা চালালেন। তার রক্তাক্ত তরবারী দেখে জার্জিসের গা কাটা দিয়ে উঠল। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। পালাতে চাইলেন। কিন্তু ইবনে যুবাইর রাযি.-এর লৌহকঠিন বাহুর আঘাত চোখের পলকে গিয়ে রাজার কাঁধে আঘাত হানল। এই আঘাত এতটাই প্রচন্ড ছিল যে, সোনা-চান্দির কারুকার্যখচিত বর্ম চূর্ণবিচূর্ণ করে বিশাল দেহকে দ্বিখন্ডিত করে অনায়াসে বেরিয়ে এল। একটু আহ উহও করতে পারলেন না তিনি। শির ছিটকে পড়ল বহুদূরে। আর বিশাল-বপু দেহ ভূলুণ্ঠিত হয়ে নেচে নিল কতক্ষণ। অসংখ্য সৈন্য, অগণিত রক্ষী—সবাই ভীতি-বিহ্বল নেত্রে রইল হা করে। এভাবেই তৎকালীন বিশ্বের দাম্ভিক রাজা দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করলেন।

এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে হেলেন হায় হায় করে উঠলেন। পিতৃবিয়োগ বেদনায় জর্জরিত হয়ে কেঁদে উঠলেন হু হু করে। কলিজা তার বিদীর্ণ হয়ে গেল। ব্যথা-ভারাক্রান্ত হয়ে গেল হৃদয়-মন। দ্বিখন্ডিত পিতৃদেহের দিকে দ্বিতীয়বার চোখ তুলে তাকাবার সাহস তার হলো না। সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তরে প্রতিশোধ নেওয়ার আগুন দাউ দাউ করে করে জ্বলে উঠল। তিনি তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.-এর উপর। তার চোখ থেকে তখনও অবিরত অশ্রু ঝরছিল।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. হেলেনের আঘাত প্রতিহত করে পাল্টা আঘাত হানতে গিয়ে দেখলেন, এ যে নারী! রণসাজে সজ্জিত ছিলেন বিধায় এ যাবত তিনি তাকে চিনতে পারেন নি। পার্থক্য করতে পারেন নি—তিনি পুরুষ না নারী। কিন্তু যখন পার্থক্য করতে পারলেন, সঙ্গে সঙ্গে তরবারী নামিয়ে নিলেন। বললেন—ইবনে যুবাইরের তলোয়ার কোনো নারীর গায়ে উঠতে পারে না।

হেলেন অপলক আঁখি মেলে চেয়ে দেখলেন তার পিতার হত্যাকারীকে। কিন্তু পুনরায় আক্রমণ করতে পারলেন না। শুধু মুখে বললেন—রে পাষাণ! তুমি আমাকে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করলে। চির নিরাশ্রয় করলে আমাকে।

এ বলে হেলেন তার তলোয়ার নামিয়ে নিলেন। কিন্তু চোখ দুটো তার অপলক তাকিয়ে থাকল। বলিষ্ঠ সুঠামদেহী সুন্দর আরবী যুবককে দেখে তার সাধ মিটছে না। রক্তের হোলি খেলার মাঝে অন্তর রাজ্যে এ আবার কোন নতুন খেলা খেলে গেল, কে জানে?

রাজা জার্জিস নিহত হওয়ার সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খানিক বাদে প্রধান সেনাপতি মারাকিউস নিহত হন। সেই সাথে রাজার সুন্দরী কন্যা হেলেনও বন্দী হন মুসলমানদের হাতে।

দু’দিনের যুদ্ধে কাফের বাহিনীর পঞ্চাশ হাজার নিহত ও চৌদ্দ আজার আহত হয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলমানদের তিনশত তিপ্পান্ন জন শহীদ ও চারশত জন আহত হয়েছে।

যুদ্ধ শেষ হলো। মুসলিম শিবিরে আনা হলো রাজা জার্জিসের কর্তিত মস্কক ও তার কন্যা হেলেনকে।

সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে সাআদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর সকল সদস্যকে ডাকলেন। সবার উপস্থিতিতে তিনি ঘোষণা করলেন—আপনাদের মধ্যে যিনি জার্জিসকে হত্যা করেছেন, তিনি আসুন। পুরস্কার  গ্রহণ করুন।

গোটা মজলিশ নীরব। কেউ কোনো সাড়া দিলেন না। পুরস্কার গ্রহণের জন্য এগিয়ে এলেন না একজন মুজাহিদও।

নিস্তদ্ধ চারিদিক। সবাই অবাক; বিস্মিত। কী অদ্ভুত ব্যাপার! কী অত্যাশ্চর্য পরিস্থিতি। নিজের প্রাপ্য পুরুস্কার গ্রহণ করতে আগ্রহী নন যে মানুষ তিনি কত মহান! কত পবিত্র তার হৃদয়!!

সেনাপতি এবার বিপাকে পড়লেন। এখন তিনি কী করবেন! অবশেষে অনেক ভেবে-চিনতে খলীফা বরাবর একটি চিঠি লিখলেন। তারপর সেই চিঠিখানা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি.কে দিয়ে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। সেই সাথে পাঠিয়ে দিলেন মেয়েদেরকেও । যাদের মধ্যে জার্জিস কন্যা হেলেন এবং তার সখীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পত্রটি ছিল পাতলা চামড়ার লেখা। চিঠি হস্তগত হওয়ার পর হযরত খলীফাতুল মুসলেমীন হযরত উসমান রাযি. তা খুলে পড়তে শুরু করলেন। তাতে লেখা ছিল—

“আব্দুল্লাহ ইবনে সা’আদের পক্ষ থেকে আমীরুল মুমেনীন, খলীফাতুল মুসলেমীন হযরত উসমান ইবনে আফফান রাযি. এর খেদমতে।

হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ পাক মেহেরবানী করে মুসলমানদের বিরাট সফলতা দান করেছেন। আফ্রিকার শাহানশাহ জার্জিস যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়েছেন। তার সুন্দরী কন্যা শাহজাদী হেলেনও বন্দী হয়েছেন। তাকে নিয়ে একটি ঘটনা এই ঘতেছে যে, তার পিতা জার্জিস ঘোষণা দিয়েছিলেন—যে বীরপুরুষ মুসলিম সেনাপতির মাথা কেটে আনতে পারবে, শাহজাদীকে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। অতঃপর ইবনে যুবাইরের পরামর্শে আমি মুজাহিদদের মাঝে এই ঘোষণা করে দেই যে, যে বীর-বাহাদুর রাজা জার্জিসকে কতল করে তার ছিন্ন মস্তক আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে, শাহজাদী হেলেনকে তার নিকট বিয়ে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে সে পাবে আরো একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা।

আমীরুল মুমেনীন! যুদ্ধেক্ষেত্রে কোনো এক মুজাহিদ রাজা জার্জিসকে হত্যা করেছে। আমরা তাকে খুঁজে বের করে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েছি। পুরুস্কার গ্রহণ করার জন্য কেউ আসেনি।

অবশেষে শাহজাদী ও তার সাথীদেরকে আপনার খেদমতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি যা ভাল মনে করেন তাই করবেন। ওয়াদা মুতাবেক একলক্ষ দিনারও গনীমতের মালের সঙ্গে দিয়ে দিলাম।”

চিঠির বক্তব্য শুনে উপস্থিত লোকজন অবাক। সত্যিই স্মন ঘটনা খুব কমই শোনা যায়। সবার মনে এখন একই জিজ্ঞাসা—কে সেই মহান  ব্যক্তি? যিনি নিজের কৃতিত্বকে এভাবে গোপন করেছেন। এত দামী পুরস্কারকেও তুচ্ছ ভেবেছেন। এতো বড় ত্যাগ…এতো বড় আত্মবলি কেন দিচ্ছেন তিনি?

হযরত উসমান রা. জিজ্ঞেস করলেন, শাহজাদী কোথায়? ইবনে উমর জবাব দিলেন, মুসলিম মহিলাদের সঙ্গেই আছেন।

তাকে ডেকে পাঠাও।

সাথে সাথে এক ঘোর ছাওয়ার পাঠিয়ে দিলেন তাকে আনার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই হেলেনকে নিয়ে সে উপস্থিত হলো।

সুন্দরী শ্রেষ্ঠা ল্যাবণ্যময়ী হেলেন আরবীয়দের মজলিসকে আলোকজ্জ্বল করে ওসমান রা. এর সামনে এসে নামলেন।

বসো মা! গভির মমতা ও স্নেহমাখা স্বরে হযরত উসমান রাযি. বললেন।

হেলেন বুঝতে পারলেন যে, বেদুইনবেশী এই আরবীয়ই বিশ্ববিশ্রুত মুসলিম খলিফা।

খলীফার নির্দেশে তিনি বসলেন। উপস্থিত মুসলিম জনতাও খলীফা কি করেন তা দেখার জন্যে আসন গ্রহণ করলেন।

হযরত উসমান রাযি. হেলেনের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন, বললেন—মা! রাস্তায় কোনো কষ্ট পাওনি তো?

জবাবে সুমিষ্ট স্বরে আনত কণ্ঠে তিনি বললেন—জ্বি না, আমি বরং মুসলমানদের প্রতি এজন্য কৃতজ্ঞ যে, তারা আমার যথেষ্ঠ যত্ন নিয়েছেন; আদর-আপ্যায়ন করেছেন, যার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই।

বেটি! তোমার অন্তরে বহু ব্যথা ও নানা দুর্ভাবনা গুমরে গুমরে উঠছে, তা আমরা অনুভব করতে পারছি। কিন্তু মা! এতে আমাদের কি দোষ বলো? আমরা তোমাদের দেশে আক্রমণ করতে চাইনি। তোমার পিতাই আমাদের যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছেন।

তা আমি জানি।

শাহজাদী! আমি তোমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তি দিয়ে দিতাম। কিন্তু এক মুশকিল দেখা দিয়েছে। মুসলিম সেনাবাহিনীর সিপাহসালার ঘোষণা করেছিলেন—যে ব্যক্তি আফ্রিকার রাজাধিরাজকে হত্যা করবে, তার নিকট আফ্রিকার শাহজাদীকে দুলহানস্বরূপ পুরস্কার প্রদান করা হবে। কাজেই মা! তুমি এখন সেই বীর পুরুষের, যিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। এতে আমাদের আর কিছু করার নেই।

কিন্তু তিনি কোথায়? সিপাহসালার বারবার ঘোষণা করার পরও আমার পিতাকে হত্যা করার দাবী যে তিনি পেশ করছেন না? কথাটি হেলেন বলে ওঠেন একেবারে নিঃসঙ্কোচে, যেন এতে তার কোন আপত্তি নেই। বরং তাঁকে এখনো না পাওয়ার জন্য তিনি দুঃখিত।

হযরত উসমান রাযি. বললেন—হ্যাঁ, মুসলমানদের স্বভাব-প্রকৃতি আমি জানি। আমার ধারণা হচ্ছে, তোমার পিতার হত্যাকারী এজন্য আত্মগোপন করেছেন যে, লোকজন তাঁর সীমাহীন প্রশংসা শুরু করবেন; যা তিনি পছন্দ করেন না।

এতটুকু বলে হেলেনকে উদ্দেশ্য করে খলীফা বললেন—আচ্ছা মা! তুমি কি আমাদের কিছুটা সাহায্য করতে পারবে?

হেলেন সোৎসাহে বললেন—বলুন, আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।

তুমি বোধহয় তোমার পিতার হত্যাকারীকে দেখেছ?

জি, ভালো করেই দেখেছি। এখনও লোকটি আমার চোখে ভাসছে।

দেখলে চিনতে পারবে?

খুব চিনতে পারব। দেখলেই চিনতে পারব।

তবে তুমি এক কাজ করো। এখানে যারা উপস্থিত আছে, এদের প্রথম দেখা নাও, পরে অন্যদের আনা হবে।

এতক্ষণ যাবত হেলেন মজলিসের অন্য কোনো দিকে চোখ ফিরে তাকাননি। একমাত্র উসমান রাযি. এর চেহারার দিকে চেয়েই কথা বলছিলেন। এখন দেখবার আদেশ পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিকে ঘাড় মুড়িয়ে এক এক করে মুখগুলো নিরীক্ষণ করে চললেন।

এতক্ষণে অন্যান্য মুজাহিদদের সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. ও মদীনায় ফিরে এসেছেন। এবং ইতোমধ্যেই অন্যান্যদের সাথে মিশে উপস্থিত হয়েছেন খলীফাতুল মুসলেমীনের দরবারে। হেলেন তাঁকে চিনে ফেলবে এই আশঙ্কায় তিনি হাঁটুতে মাথা গুজে নীচের দিকে চেয়ে বসেছিলেন।

শাহজাদী সবাইকে গভীরভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.-এর উপর। তাই সাথে সাথে তিনি বললেন—এই তো তিনি। তিনিই আমার পিতার হত্যাকারী।

এ কথা বলে শাহজাদী খলীফার দিকে তাকালেন।

সকলের দৃষ্টি এখন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের প্রতি নিবদ্ধ। হেলেনও আড় চোখে দেখতে লাগলেন তাঁকে। তাঁর মুখে স্মিত হাসি। চেহারায় ফুটে উঠেছে পুলক স্পন্দন।

উসমান রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, ইবনে যুবাইর! তুমিই কি শাহানশাহ জার্জিসকে হত্যা করেছ?

লজ্জায় ইবনে যুবাইরের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। এত চেষ্টা করেও তিনি আত্মগোপন করতে পারলেন না। মনে মনে ভাবছেন তিনি—কর্তব্য ছিল, সুযোগ পেয়েছি, তা সম্পাদন করেছি। ব্যস এখানেই শেষ। এই নিয়ে আবার হৈচৈ কেন? এসব তো ভাল লাগছে না। কিন্তু এখন কি করা যায়?

মুসলমান তো মিথ্যা বলতে পারে না। নইলে হয়তো অস্বীকার করে বসতেন। অগত্যা বললেন, জ্বি-হ্যাঁ।

ইবনে যুবাইর! কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, পুরস্কার গ্রহণের জন্য সেনাপতির আহবানে তুমি সাড়া দিলে না কেন? বললেন হযরত উসমান রাযি.।

ইবনে যুবাইর ধীর অথচ গম্ভীর স্বরে বললেন, আমীরুল মু’মিনীন! দু’টি কারণে আমি নিজকে প্রকাশ করি নি। প্রথমতঃ আমি কোনো পুরস্কারের আশায় বা লোভে পড়ে রাজা জার্জিসকে হত্যা করি নি। ইসলামের প্রত তাঁর শত্রুতা আমার তলোয়ারকে উদ্যত করেছিল। আল্লাহর শোকর, ইসলাম ও মুসলমানদের ক মস্তবড় দুশমনকে আমি হত্যা করতে পেরেছি। কিন্তু আমি যদি আত্মপ্রকাশ করতাম তবে সবাই বলতো যে, নিশ্চয়ই অপরূপ সুন্দরী শাহজাদীকে পাওয়ার আশায় কিংবা বিপুল অর্থ লাভের জন্যই আমি তাঁর পিতাকে হত্যা করেছি। অথচ আমি নিশ্চিত জানি, এখনও বুকে রেখে বলছি—আল্লাহর কসম আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশী ছিলাম—কোনো সুন্দরী যুবতীর নয়। নয় কোনো অর্থ-বিত্তের।

দ্বিতীয়তঃ যার পিতাকে আমি হত্যা করেছি সে আমার কাছে এসে দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে পারবে কি না সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। আমি ভেবেছিলাম, দেখামাত্রই শাহজাদী আমাকে ঘৃণা করবেন। সেই সাথে আমি এও ভেবেছিলাম যে, কোনোদিন তিনি আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে পারবেন না। তাই আমার মন চাইছিল না যে, এক অসহায় অবলা নারীকে এভাবে কষ্ট দেই।

সমবেত জনতা বিস্ময়ে বিভোর হয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. এর কথা গুলো শুনছিল। মনে মনে বলছিল, মানুষ কি এতো মহৎ হতে পারে? পারে কি পরের সামান্য ভালোর জন্য নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে? ইবনে যুবাইরের কথায় উপস্থিত জনতা যতটা না বিস্মিত হলো তাঁর চেয়ে বেশি বিস্মিত হলেন শাহজাদী। তিনি অবাক হয়ে অপলক নেত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. এর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আর ভাবতে লাগলেন, এ কি মানুষের কথা? তিনি কি কোনো মানুষ? না স্বর্গীয় ফেরেশতা? মানুষ কি এতো উদার হতে পারে?

সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল তাঁর এই ভেবে যে, কত শত রাজপুত্র কত কেল্লাদার কত নেতা সর্দার—এক কথায় গোটা খৃষ্টান জগৎ যেখানে তাঁর জন্য পাগল ছিল, আজ তাঁকে হাতের মুঠোয় পেয়েও একজন মুসলিম সিপাহী তাঁর প্রতি সামান্য আকর্ষণ বোধ করেছে না। তিনি ভাবাবেগ বলে উঠলেন, আমি যা কিছু শুনলাম যারপরনাই বিস্মিত ও আশ্চর্য হলাম।

আমার কাছে আরো আশ্চর্য লাগছে এই জন্য যে, হত্যাকারী না হয় আত্মগোপন করেছিল। কিন্তু এই হাজার হাজার মুসলিম সৈন্যদের থেকে একজন সৈন্যও মিথ্যাদাবী করতে এগিয়ে আসে নি। তাই আমি না বলে পারছি না যে, মুসলমানরা বাস্তবিকই ধর্মপরায়ণ ও মহৎ। এবং ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম। যার আদর্শ শিক্ষায় মানুষ ফেরেশতারও ঊর্ধ্বে উঠতে পারে।

তিনি আরো বললেন, জীবনে আমি কল্পনাও করিনি যে, ইসলামের প্রতি আমি আকৃষ্ট হবো। কিন্তু আজ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছেন। আমার অন্তরে ঢেকে দিয়েছেন ইসলামের আলো। আমার অনুরোধ, মেহেরবানী করে আপনারা আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন।

শাহজাদীর এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শুনে উপস্থিত সবাই আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলল। হযরত উসমান রাযি. সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কালেমা পাঠ করিয়ে যথারীতি ইসলামে দীক্ষিত করে নিলেন। অতঃপর বললেন, মা! তোমাকে আরো একটি কথা জিজ্ঞেস করছি—ঠিক ঠিক করে বলতো মা! যদি তোমাকে এই নওজোয়ান ইবনে যুবাইরের হাতে তুলে দেই, তবে কি তুমি রাজী আছো? তোমাকে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই তুমি যদি তাঁকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিতে না চাও তবে আমরা তোমাকে মোটেই চাপ দিব না। স্বাধীনভাবে যাকে ইচ্ছা তাকেই তুমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে।

হেলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি. দিকে সকৌতুহলে চেয়ে বললেন, আমি তাঁর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্পূর্ণ রাজী। এতটুকু বলেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন শাহজাদী। লজ্জায় তিনি সংকুচিত হয়ে পড়লেন। ভাবলেন, এত খোলাখুলি, এত নিঃসঙ্কুচে কি নিজের বিয়ের কথা আলোচনা করা যায়!

শাহজাদীর অনুমোদনক্রমে ইবনে যুবাইরের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করা হলো। লক্ষাধিক টাকা মূল্যের যা কিছু রাজকীয় বেশ-ভূষা ও গহনা-অলঙ্কার ছিল এগুলো শাহজাদীকেই দেওয়া হলো। আর ঘোষিত একলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হলো ইবনে যুবাইর রাযি.কে।

ইবনে যুবাইর তাঁর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে গৃহে ফিরলেন। তাঁর মা হযরত আসমা রাযি. সুন্দরী পুত্রবধূ পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। সেই সাথে আদায় করলেন মহান আল্লাহর দরবারে লাখো-কোটি শোকর। আজ যেন তাঁর ঘরে রূপ ও গুণের চাঁদ উদিত হলো।

সেদিন এই আফ্রিকী দুলাহানকে দেখবার জন্যে মদীনার সব বসয়ী ছেলে মেয়েরা ছুটে এলো এবং যেই তাঁকে দেখল, পঞ্চমুখী প্রশংসা না করে পারল না। সবার মুখে একই কথা, জীবনে এমন সুন্দরী আর দেখিনি। তিনি কি মানুষ, না বেহেশতের হুর!

সহায়তায়ঃ আফ্রিকী দুলহান।

ছবিঃ pixabay

আপনি পড়ছেনঃ আদর্শ যুবক যুবতি ১ থেকে। 

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Rubel

Creative writer, editor & founder at Amar Bangla Post. if you do like my write article, than share my post, and follow me at Facebook, Twitter, Youtube and another social profile.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!