ভুল সংশোধন করার সঠিক পদ্ধতি — সুখী জীবনের ৪৩তম সূত্র

আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪৩তম সূত্রটি পড়ুন।

কাউকে ভুল ধরিয়ে দিতে গিয়ে উল্টো সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে? সমস্যা ভুলে নয় — সমস্যা ভুল সংশোধন করার পদ্ধতিতে। রাসূল (সাঃ) মুনাফিকের ফেতনা থামাতে যা করেছিলেন, বেদুঈনের ভুল সংশোধনে যে পদ্ধতি নিয়েছিলেন — জানুন সেই অসাধারণ কৌশল।

প্রতিটি হৃদয়ে প্রবেশের একটি পথ আছে

কেউ কোনো ভুল করলে তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হবে, সেটিও শিখতে হয় । মনে রাখবেন, প্রত্যেক বন্ধ দুয়ার খোলার যেমন একটি চাবি আছে, তেমনি প্রত্যেক মানুষের হৃদয়জগতে প্রবেশেরও একটি সুন্দর পথ রয়েছে।

যখন কেউ বড় ধরনের কোনো ভুল করে ফেলে এবং বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে সে আর কী ভুল করে এটা দেখার জন্য যখন সবাই উৎসুক হয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে তখন আপনি কী করবেন? আপনি তখন সবার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। এর ফলে আপনি বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং সমাধান করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন। এ সময়ের মধ্যে এমন ব্যবস্থা নিন যেন এ ধরনের কাজ ভবিষ্যতে কেউ না করে।

আরও পড়ুন: ভুল স্বীকার করে নিন — সুখী জীবনের ৪২তম সূত্র

জনসম্মুখে ভুল সংশোধনের নববী পদ্ধতি

কেউ সবার সামনে ভুল করলে সংশোধনের জন্য তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। রাসূল (সাঃ) এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেন। পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতেন — যেন সংশোধন কার্যকর হয়, কিন্তু নতুন কোনো ফেতনা না জন্মায়। বনুল মুসতালিকের যুদ্ধের ঘটনা এর সবচেয়ে চমৎকার দৃষ্টান্ত।

বনুল মুসতালিকের যুদ্ধ — মনোযোগ সরানোর কৌশল

বনুল মুসতালিকের যুদ্ধ — রাসূল (সাঃ)-এর দূরদর্শী কৌশল
রাসূল (সাঃ) প্রচণ্ড রোদে বিরামহীন চলে সবার মনোযোগ বিরোধ থেকে সরিয়ে দিলেন। Photo by Valr Studio

বনুল মুসতালিকের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথের ঘটনা।[১] রাসূল (সাঃ) বিশ্রামের জন্য একস্থানে যাত্রাবিরতি করলেন। এ সুযোগে জাহজাহ বিন মাসউদ নামক মুহাজিরদের এক কিশোরকে পানি সংগ্রহের জন্য পাঠানো হলো। আনসাররা পাঠাল সিনান ইবনে ওবার আল-জুহানীকে। পানির জন্যে কুপের কাছে গিয়ে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া হলো। একপর্যায়ে একজন অপরজনকে পেছন থেকে জোরে আঘাত করলো।

জুহানী চিৎকার করে উঠল, ‘হে আনসাররা! ও আমাকে মেরে ফেললো। সাহায্য কর।’

জাহজাহও চিৎকার করে উঠল, ‘হে মুহাজিররা! আমাকে বাঁচাও।’

আনসাররা ছুটে এলেন। মুহাজিররাও দৌড়ে এলেন। সবাই যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। সবার হাতে হাতে অস্ত্র। এক পর্যায়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করলো। যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলো।

এ পরিস্থিতিতে মহানবী (সাঃ) সেখানে হাজির হলেন। মহানবী (সাঃ) এর আগমনে পরিস্থিতি শান্ত হলো। বিরোধের আগুন নিভে গিয়ে সেখানে বইতে লাগল শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের সুবাতাস।

কিন্তু ফুঁসে উঠল বিষধর সাপ। মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সলূল ক্রোধে ফেটে পড়ল। তার সাথে ছিল আনসারদের একটি দল। সে বলতে লাগল, ‘তারা আমাদের সাথে এধরনের আচরণ কিভাবে করলো?! এতো বড় দুঃসাহস ওরা কোথায় পেল? আমাদের দেশে এসে আমাদের সাথে এমন ব্যবহার! তাদের ব্যাপারে এ প্রবাদ বাক্যটিই প্রযোজ্য, কুকুরকে ভালো খাইয়ে মোটাতাজা করলে শেষে তোমাকেই কামড়াবে, আর অভুক্ত রাখলে তোমার পেছনে ঘুরঘুর করবে।

অভিশপ্ত মুনাফিক আরো বললো, ‘মদিনায় ফিরে গিয়ে ভদ্র লোকেরা এসব অভদ্র লোকদেরকে মদিনা থেকে বের করে দেবে।’

এ অভিশপ্ত মুনাফিক এরপর নিজের গোত্রের কিছু লোকের কাছে গিয়ে বললো, ‘তোমরা নিজেদের জায়গা-জমি ওদেরকে দিয়ে দিলে আর এখন ওরাই তোমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। তোমাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করছে। তোমরা জায়গা না দিলে ওরা কি এমন আস্কারা পেত? তারা হয়তো অন্য কোথাও চলে যেত।’

এভাবে সে সবাইকে উত্তেজিত করতে লাগল। আনসারদের মধ্যে কিছু মুনাফিক ছিল। তারা তাকে সমর্থন দিয়ে সাহস জোগাতে লাগল।

ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত ছোট্ট একটি বালক সবকথা শুনল। বালকটির নাম যায়দ বিন আকরাম। সে রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল।[২] ওমর বিন খাত্তাব রাসূলের কাছে উপস্থিত ছিলেন। সব শুনে তিনি আর শান্ত থাকতে পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে বললেন: হতভাগার কী দুঃসাহস! রাসূলের শানে এমন চরম বেয়াদবি! এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

ওমর ভাবলেন, লেজে আঘাত করার চেয়ে বিষধর সাপটার মাথায় আঘাত করাই উত্তম। মুনাফিকটাকে হত্যা করতে পারলে এ ফেতনা আঁতুড় ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। তবে মুহাজিরদের পরিবর্তে আনসারদের কেউ ওকে হত্যা করলে নতুন কোনো ফেতনার আশঙ্কা নেই।

এ ভেবে ওমর মহানবী (সাঃ)-কে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! আনসার সাহাবি আব্বাদ বিন বিশরকে বলুন সে যেন এ মুনাফিকটাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়।

কিন্তু মহানবী (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। তিনি চিন্তা করলেন, সবাই এখন যুদ্ধ থেকে ফিরছে। সবার হাতে হাতে অস্ত্র। এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনাকর কিছু করা মোটেই সমীচীন নয়।

মহানবী (সা:) ওমরকে বোঝালেন,

‘ওমর! অন্যরা শুনলে কী বলবে? তারা বলবে, মুহাম্মদ এখন নিজের লোকদেরকে হত্যা করছে।

না ওমর! এটা হতে পারে না। তুমি বরং সবাইকে বলে দাও এই মুহূর্তে যাত্রা শুরু করতে।

প্রখর রোদে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য সবাই একটু যাত্রাবিরতি করেছিল। এর মধ্যে রাসূল (সাঃ) হঠাৎ যাত্রা শুরু করতে নির্দেশ দিলেন! তিনি তো কখনো প্রচণ্ড রোদে সফর করেন না। এটাতো তার স্বভাববিরুদ্ধ! তাহলে কী হলো? সবার মধ্যে চাপা গুঞ্জন।

কাফেলা চলতে শুরু করলো। আবদুল্লাহ বিন সালূল জানতে পারল, যায়েদ বিন আরকাম নামক এক কিশোর রাসূলকে সবকিছু বলে দিয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে সে রাসূলের কাছে এসে উপস্থিত হলো। সে বারবার শপথ করে বললো, ‘হুজুর, আমি এসবের কিছুই বলি নি, ছেলেটি আমার নামে মিথ্যা বলেছে।

আবদুল্লাহ ইবনে সালূল ছিল তার গোত্রের সরদার। একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাই আনসাররা মহানবী (সাঃ)-কে বললেন, ‘হুজুর, ছেলেটি হয়তো ভুল করেছে, সে হয়তো ভালো করে শুনেনি।

তারা আবদুল্লাহ বিন সালূলকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করতে লাগল।

মহানবী (সাঃ) কারো দিকে না তাকিয়ে পথ চলতে লাগলেন। এক পর্যায়ে আনসার সরদার উসাইদ বিন হুযাইর (রাঃ) রাসূলের কাছে এলেন। মহানবী (সাঃ)-কে সালাম দিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি এমন প্রখর রোদে সফর করছেন। এমন অবস্থায় তো কখনো আপনি সফর করেন না।

মহানবী (সাঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি শুনোনি, তোমাদের সঙ্গী কী বলেছে?

উসাইদ আরয করলেন, ‘কোনো সঙ্গী, হে আল্লাহর রাসূল?”

মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘আবদুল্লাহ বিন উবাই’।

‘সে কী বলেছে?’

“সে বলেছে, ‘মদিনায় ফিরে গিয়ে ভদ্র লোকেরা এসব অভদ্র লোকদেরকে মদিনা থেকে বের করে দেবে।’
একথা শুনে উসাইদ উত্তেজিত হয়ে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আপনি চাইলে তাকে বের করে দিন। আল্লাহর কসম আপনিই ভদ্র ও সম্মানিত, আর সে হলো নীচ, হীন ও অভদ্র।

কিছুক্ষণ পর উসাইদ একটু শান্ত হয়ে বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল! আমার মনে হয় আপনি তার সঙ্গে কোমল আচরণ করলে ভালো হয়। কারণ, যে মুহূর্তে তার গোত্র তার মাথায় নেতৃত্বের মুকুট পরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আল্লাহ আপনাকে আমাদের মাঝে পাঠিয়েছেন। তাই সবসময় সে মনে করে যে, আপনি তার নেতৃত্ব কেড়ে নিয়েছেন।

মহানবী (সাঃ) এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নীরবে পথ চলতে লাগলনে।

এদিকে কাফেলার লোকদের মধ্যে চাপা গুঞ্জন চলতে লাগল। সবাই এ বিষয়ে আলোচনা করছে।

‘এই প্রখর রোদে আমরা পথ চলছি কেন?’

‘সে কী বলেছে?’

আল্লাহর রাসূল তার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?

‘ইবনে সালূল তো সত্যই বলেছে।’

‘না, না, সে মিথ্যা বলেছে।’

এভাবে কানাঘুষা চলতে লাগল। কথার ডালপালা ছড়িয়ে পড়ল। এসব কথার কারণে মুসলিম বাহিনীতে বিশৃঙ্খল দেখা দিল। অথচ তারা এখনো শত্রুদের এলাকায় অবস্থান করছে। যে কোনো মুহূর্তে তারা হামলা করতে পারে।

মহানবী (সাঃ) অনুভব করলেন, মুজাহিদ বাহিনীতে ক্রমে বিভেদ ও বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। লোকজন সবাই উত্তেজিত। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যেকোনো মুহূর্তে লড়াই বেঁধে যেতে পারে। তারা শুধু অপেক্ষা করছে, কখন কাফেলা থামবে, কখন বিষয়টা নিয়ে একদল অন্যদলের মুখোমুখি হবে।

মহানবী (সাঃ) সবার অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি তাদের চিন্তা-ধারার গতিপথ পাল্টে দিতে চাইলেন। তিনি চাইলেন তাদের নজর ভিন্ন দিকে ফেরাতে। তাই তিনি সেদিনের প্রচণ্ড সূর্যতাপেও বিরামহীনভাবে চললেন। সূর্য অস্তমিত হলো। নামাযের জন্য একটু থামলেন। সবাই ভাবল, এই তো নামাযের পর মহানবী (সাঃ) যাত্রাবিরতির ঘোষণা করবেন। কিন্তু না, নামায আদায় করেই মহানবী (সাঃ) আবার যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। এভাবে রাত শেষ হলো। চারদিকে ভোরের আলো ফুটে উঠল। ফজরের নামায আদায়ের জন্য যাত্রাবিরতি হলো। সবাই ভাবল, মহানবী সাধারন। এবার বুঝি বিশ্রামের সুযোগ দেবেন। কিন্তু মহানবী (সাঃ) আবার সফরের নির্দেশ দিলেন।

একটানা দীর্ঘ সফরে সবাই ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে পড়ল। মাথার ওপর সূর্যের প্রচণ্ড তাপ। মহানবী (সাঃ) যখন অনুভব করলেন যে, কাফেলার সবাই সীমাহীন ক্লান্ত, তাদের পক্ষে এখন কোনো বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়া কিংবা ঘটে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা সম্ভব নয়, তখন তিনি বিশ্রাম করার সুযোগ দিলেন।
দীর্ঘ সফরের পর একটু বিরতি পেয়ে যে যেখানে জায়গা পেল সেখানেই শুয়ে পড়ল। ক্লান্তিতে সবাই গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল। মহানবী (সাঃ) এটাই চেয়েছিলেন। এভাবেই তিনি সবাইকে বিশৃঙ্খলার চিন্তা থেকে দূরে রেখেছিলেন।

দীর্ঘ বিশ্রামের পর সবাইকে তিনি ঘুম থেকে জাগিয়ে আবার দ্রুত সফরের নির্দেশ দিলেন। সফর শেষ হলো। মদিনায় পৌছে কাফেলার সবাই যার যার বাড়িতে চলে গেল।

এরপর আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করলেন-

هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنْفِقُوا عَلَىٰ مَنْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّىٰ يَنْفَضُّوا ۗ وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ ۝٧ يَقُولُونَ لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ ۚ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَٰكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ ۝٨
অর্থ : এরা তো তারা যারা বলে, ‘আল্লাহর রাসূলের সাহচর্যে যারা আছে তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর না। পরিণামে তারা আপনা-আপনিই চলে যাবে।’ অথচ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের ধনভাণ্ডার আল্লাহরই। কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না। তারা বলে, ‘আমরা যদি মদিনায় ফিরে যাই তাহলে সেখানে থেকে সম্মানিত লোকেরা ইতর লোকদের বহিষ্কৃত করবে।’ সম্মান তো আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনদেরই। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।
📖 সূরা আল-মুনাফিকূন — আয়াত ৭-৮[৩]

মহানবী (সাঃ) আয়াতগুলো তিলাওয়াত করলেন। এরপর ছোট্ট বালক যায়েদ বিন আরকামের কান ধরে বললেন, ‘এ তো সে বালক, যে আল্লাহর জন্য তার কান উৎসর্গ করেছে।’

এরপর সবাই ইবনে সালূলকে ধিক্কার দিতে লাগল। সবাই তাকে ভর্ৎসনা করলো। মহানবী (সাঃ) ওমরকে বললেন,

‘ওমর! তুমি যেদিন বলেছিলে, সেদিন তাকে হত্যা করলে অনেকে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু আজ নির্দেশ দিলে যে কেউ তাকে হত্যা করে ফেলবে।

এ কথা বলে মহানবী (সাঃ)  চুপ রইলেন। এরপর এ ব্যাপারে তিনি আর কিছু বলেন নি।

কেউ কেউ মানুষের সামনে ভুল করে ফেলে। তখন অন্যরা যেন এ ভুল না করে, এ উদ্দেশ্যে মানুষের সামনেই সংশোধন করে দিতে হয়। কিন্তু এর জন্য সঠিক ও সুন্দর পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

বেদুঈনের ভুল কথার সংশোধন

বেদুঈনের ভুল কথা সংশোধন — রাসূল (সাঃ)-এর কোমল পদ্ধতি
রাসূল (সাঃ) রাগ না করে শান্তভাবে বেদুঈনকে আল্লাহর মহত্ত্ব বুঝিয়ে দিলেন।

একদিন মহানবী (সাঃ) সাহাবিদের সঙ্গে বসা ছিলেন। তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল। গাছে ফল নেই। ক্ষেত ফসলশূন্য। আকাশে বৃষ্টি নেই। চারদিকে হাহাকার আর হতাশা।

এমন সময় জনৈক বেদুইন এসে আল্লাহর রাসূলকে বললো, ‘আল্লাহর রাসূল! মানুষ ক্লান্ত-শ্রান্ত, অনাহারে-অর্ধাহারে পরিবার-পরিজন মৃত্যুপথযাত্রী। সহায়-সম্পত্তি সব শেষ হয়ে গেছে। ভেড়া-বকরি-গবাদি পশু কিছুই নেই। আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে বৃষ্টি প্রার্থনা করুন। আমরা তো আল্লাহর মাধ্যমে আপনার কাছে সুপারিশ করি।

বেদুঈনের কথা শুনে রাগে মহানবী (সাঃ)-এর মোবারক চেহারা লাল হয়ে গেল। লোকটা কী বলছে? ‘আমরা আল্লাহর মাধ্যমে আপনার কাছে সুপারিশ করি’! সুপারিশ তো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে হয়। বড়র কাছে ছোটরা সুপারিশ করে। মহান আল্লাহ তো আমাদের সবার স্রষ্টা। তিনি কীভাবে বান্দার কাছে সুপারিশ করবেন!

মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, ‘আরে বোকা! তুমি কী বলছ তা কি চিন্তা করে দেখেছো?’

এরপর মহানবী (সাঃ) আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ঘোষণা করতে লাগলেন। বারবার বলতে লাগলেন, ‘সুবহানাল্লাহ!’ ‘সুবহানাল্লাহ!’ ‘আল্লাহ তাআলা পবিত্র ও সুমহান।’

সাহাবিরাও সমস্বরে মহান আল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলেন। মহানবী (সাঃ) এরপর লোকটিকে বললেন, ‘আরে বোকা! কোনো, আল্লাহর মাধ্যমে কোনো বান্দার কাছে সুপারিশ করা হয় না। তিনি তো সবকিছুর স্রষ্টা । তিনি অনেক বড় ও মহান। তুমি কি জানো আল্লাহ কেমন? নভোমণ্ডলে এভাবে রয়েছে তার সিংহাসন। এরপর মহানবী (সাঃ) হাতের আঙুল বৃত্তাকার করে গম্বুজের মতো বানিয়ে তাকে সিংহাসনের ধারণা দিলেন। এরপর বললেন, ‘আর কাঠের হাওদা আরোহীকে নিয়ে যেমন আওয়াজ করতে থাকে তাও তেমনি আওয়াজ করতে থাকে।’ (সুনানে আবূ দাউদ:৪১০১)[৪]

একান্তে ভুল সংশোধনের নববী পদ্ধতি

জনসম্মুখে ভুল করলে তা সংশোধনের নববী পদ্ধতির একটি চিত্র আপনারা দেখলেন। কিন্তু নির্জনে বা একাকি কেউ কোনো ভুল করে ফেললে তা কিভাবে তিনি সংশোধন করতেন। আসুন তাও একটু দেখে নিই।

একান্তে সংশোধনের ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)-এর পদ্ধতি ছিল আরও কোমল ও হৃদয়গ্রাহী। তিনি কখনো কাউকে সবার সামনে লজ্জিত করতেন না। বরং একান্তে ডেকে ভালোবাসার সঙ্গে বুঝিয়ে দিতেন — যেন সংশোধিত হওয়া মানুষটির মনে কোনো আঘাত না লাগে। আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এর সবচেয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত।

আয়েশা (রাঃ)-এর রাতের ঘটনা

আয়েশা (রাঃ)-এর রাতের ঘটনা — রাসূল (সাঃ)-এর কোমল সংশোধন
রাসূল (সাঃ) কাঁধে হালকা পরশ বুলিয়ে ভালোবাসার সাথে বুঝিয়ে দিলেন — এটাই একান্তে সংশোধনের আদর্শ পদ্ধতি।

একরাতে মহানবী (সাঃ) আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরে এলেন। এসে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ শুয়ে রইলেন। যখন তিনি ধারণা করলেন যে, আয়েশা ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তিনি খুব আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠলেন। এরপর গায়ে চাদর জড়িয়ে জুতো পরে নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হলেন। আস্তে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিলেন।

এদিকে আয়েশা জেগেই ছিলেন। তিনিও নিঃশব্দে সবকিছু দেখলেন। তাঁর মধ্যে নারীসুলভ আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন, মহানবী (সাঃ) হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে যাচ্ছেন। তাই তিনিও ওঠে বসলেন। ওড়না চাদর পরিধান করে তিনিও খুব সন্তর্পণে মহানবী (সাঃ) -কে অনুসরণ করতে লাগলেন।

নীরব নিস্তব্ধ রাতের আঁধার ভেদ করে মহানবী (সাঃ) সামনে এগিয়ে চলছেন। চলতে চলতে তিনি জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে পৌঁছলেন। তাঁর সাহাবিদের কবরগুলোর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাকিয়ে থাকলেন তার প্রিয় সাহাবিদের কবরগুলোর দিকে। এ কবরের অধিবাসীরা ছিল তাঁর এক সময়ের সঙ্গী। তাদের দিনরাত কেটেছে এক আল্লাহর ইবাদতে। মৃত্যু তাদের আলিঙ্গন করেছে জিহাদের ময়দানে। তারা এখন পাতালপুরিতে সমবেত। উর্দ্ধজগতে মহান প্রভুর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য।

মহানবী (সাঃ) তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ইসলামের জন্য তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতিগুলো মহানবী (সাঃ) -এর চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনি দু’হাত তুলে তাদের জন্য দোয়া করতে লাগলেন।

একবার তিনি কবরগুলোর দিকে তাকান, আবার তাকান আলো ঝলমল নীল আকাশের দিকে। আবার হাত তুলে কায়মনোবাক্যে মোনাজাত করেন। এভাবে দীর্ঘক্ষণ তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। এদিকে আয়েশা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখলেন।

এরপর মহানবী (সাঃ) ফিরে আসতে উদ্যত হলেন। তা দেখে আয়েশা (রা:) ও দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। মহানবী (সাঃ) -কে কাছে আসতে দেখে আয়েশা তার চলার গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। আয়েশা (রা:) মহানবী (সাঃ) -এর আগেই ঘরে ফিরে আসতে সক্ষম হলেন। ঘরে ঢুকে ওড়না চাদর খুলে যথাস্থানে রেখে তিনি শুয়ে পড়লেন। ঘুমের ভান করে তিনি শুয়ে পড়লেন ঠিকই, কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত চলাচল করছিল। মহানবী (সাঃ) তার শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আয়েশা! কী হয়েছে তোমার? ভয় পেয়েছ?’

আয়েশা বললেন, ‘না, কিছু হয় নি।’

মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘তুমি নিজেই বলবে। না হলে আল্লাহ আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন।

এ কথা শুনে আয়েশা (রা:) মহানবী (সাঃ)-কে সবকিছু খুলে বললেন। তিনি বললেন যে, ‘আসলে আমার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছিল। তাই আমি দেখতে গিয়েছিলাম, আপনি কোথায় যান?’

মহানবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিই কি আমার সামনে ছিলে?’
আয়েশা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’।
মহানবী (সাঃ) তখন আয়েশার কাঁধে হালকা পরশ বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

‘আয়েশা! তুমি কি মনে করেছ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার সাথে অবিচার করবেন?’

আয়েশা বললেন, ‘মানুষ কত কিছু গোপন রাখতে চায়! কিন্তু আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেন।
মহানবী (সাঃ) বললেন: অবশ্যই।

এরপর মহানবী (সাঃ) তাকে ঘর হতে বের হওয়ার কারণ বললেন। ‘রাতে যখন আমাকে দেখেছ তখন জিবরাঈল (আ) এসেছিলেন। কিন্তু তুমি রাতের পোশাকে ছিলে, এ কারণে তিনি ঘরে প্রবেশ করেন নি। আড়াল থেকেই আমাকে ডেকেছেন এবং জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করতে বলেছেন। তিনি আমাকে আড়াল থেকে ডাকাতে আমিও অতি নিঃশব্দে তার ডাকে সাড়া দিয়েছি। তুমি ঘুমিয়ে ছিলে মনে করে তোমাকে আর ডাকি নি। কেননা,, আমার মনে হয়েছে তোমাকে জাগ্ৰত অবস্থায় রেখে গেলে তুমি নিঃসঙ্গ বোধ করবে।’ (মুসলিম: ১৬১৯, সুনানে নাসায়ী: ৩৯০১)[৫]

হ্যাঁ, আমাদের প্রিয় মহানবী (সাঃ) ছিলেন এমনই কোমল মনের মানুষ। ফুলের মতো সুরভিত যার জীবন। কোনো ভুলকে তিনি বড় করে দেখতেন না, বড় করে তুলতেন না।

দোষ নয়, গুণ দেখুন

সাহাবায়ে কিরামকে বারবার বলতেন-

‘কোনো মুমিন ব্যক্তি যেন তার মুমিনা স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি চরিত্র তার অপছন্দ হলে আরেকটি ঠিকই মনোপূত হবে।’ (মুসলিম: ১৪৬৯)[৬]

কারো একটি আচরণ কিংবা ব্যবহারের ত্রুটির কারণে তার প্রতি পুরোপুরি অসন্তুষ্ট হওয়া ঠিক নয়। দোষ গুণ মানুষের থাকবেই। দোষ না দেখে আপনি বরং আপনি তার গুণটি দেখুন। গুণের কারণে তার দোষ ক্ষমা করে দিন।

কারো কোনো ত্রুটি আপনার নজরে পড়লেও আপনি তা ওভারলুক করুন। তার ভালো দিকগুলো স্মরণ করুন। তার যে কাজ আপনি পছন্দ করেন না, যে আচরণ আপনার মনোপুত নয়, সেগুলো হজম করুন কিংবা এড়িয়ে চলুন।

আরও পড়ুন: ভুল সম্পর্কে নিশ্চিত হলে উপদেশগ্রহণ সহজ — সুখী জীবনের ৩৭তম সূত্র

উপসংহার: সঠিক পদ্ধতিতেই উপদেশ কার্যকর হয়

তিরস্কারযোগ্য সে নয়, যে উপদেশ গ্রহণ করে না, বরং তিরস্কারযোগ্য সে, যে ভুল পন্থায় উপদেশ প্রদান করে।

আপনার কাছের মানুষটিও কি সঠিক পদ্ধতিতে ভুল সংশোধন করতে পারছে না? এই লেখাটি তার সাথে শেয়ার করুন।

আপনি কি কখনো ভুল পদ্ধতিতে কাউকে সংশোধন করতে গিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করেছেন? নিচে কমেন্টে জানান।

এরপর পড়ুন: বাঁধন খুলে দিন (coming soon)

আপনি পড়ছেন: “জীবনকে উপভোগ করুন” বই থেকে।

সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন — আমার বাংলা পোস্ট.কম।

অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪৩তম সূত্র হলো —ভুল সংশোধন করার সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন। 😊


সুত্র ও বহিঃগমণ সংযোগ

[১] সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯০৫; আল-বায়হাকি, দালাইলুন নবুওয়াহ, ৪/৫২–৫৪। Sunnah.com-এ বুখারি ৪৯০৫ দেখুন | দালাইলুন নবুওয়াহ-এর বর্ণনা দেখুন ↑

[২] সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯০০। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

[৩] পবিত্র কোরআন, সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত ৭–৮। Quran.com-এ আয়াত ৭–৮ দেখুন ↑

[৪] সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৭২৬। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

[৫] সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭৪b; সুনানে নাসাঈ, হাদিস ২০৩৭। মুসলিম ৯৭৪b দেখুন | নাসাঈ ২০৩৭ দেখুন ↑

[৬] সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৮b। Sunnah.com-এ হাদিসটি দেখুন ↑

Leave a Reply