প্রশংসা করার নিয়ম

অন্যের প্রশংসা করা ভাল। তবে সীমাতিরিক্ত নয়।

অনেককে দেখা যায় সব সময় কেবল মন্তব্য ও প্রশংসা করতেই থাকে। মোসাহেব প্রকৃতির এ লোকদের মুখে সব সময় প্রশংসার এই খই ফুটতে থাকে। তাঁদের মুখ কখনো বিরত হয় না। অথচ একটি প্রসিদ্ধ আরবি প্রবাদ হলো—‘কোনো ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করা হলে হিতে বিপরীত হয়। আর নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো কিছু পেতে চাইলে বঞ্চিত হতে হয়।’

তাই কেবল সেই সুন্দরেরই প্রশংসা করুণ মানুষ যা দেখে আনন্দবোধ করে, যার জন্য অন্যের প্রশংসা কামনা করে কিংবা আনন্দদায়ক বিভিন্ন মন্তব্য শুনতে চায়। পক্ষান্তরে যেসব বিষয় অন্য কেউ জানলে মানুষ লজ্জাবোধ করে, অন্যের মন্তব্যে অপমান বোধ করে, আপনি সে ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে রাখুন। না দেখার ভান করুণ।

কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়ে আপনি ড্রইং রুমে পুরোনো চেয়ার দেখতে পেলেন। আপনি তখন অপদার্থের মতো না চাইতেই পরামর্শ দিতে যাবেন না। আপনি বলতে যাবেন  না, ‘এ চেয়ারগুলো বদলাচ্ছ না কেন? ঝাড়বাতির অর্ধেকই তো জ্বলছে না! নতুন ঝাড়বাতির কিনছ না কেন? আর দেয়ালের পেইন্ট তো অনেক পুরোনো হয়ে গেছে! নতুন পেইন্টিং করছ না কেন?’

ভাই! সে তো আপনার অভিযোগ ও পরামর্শ শুনতে চায় নি। আপনি তো ডেকোরেশন নন যার কাছে সে রুম ডেকোরেশনের জন্য পরামর্শ চেয়েছে। আপনি এ ব্যাপারে চুপ থাকুন। হতে পারে তাঁর পরিবর্তনের সামর্থ্য নেই। হতে পারে সে আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে কিংবা অন্য কোনো কারণ আছে। মানুষ লজ্জা পেতে পারে এমন বিষয়ে কথা বলা কিংবা মন্তব্য করার চেয়ে ভারী আর কিছু নেই।

মনে করুণ আপনার বন্ধুর পোশাক পুরোনো কিংবা তাঁর গাড়ির এসি নষ্ট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করবেন না। সম্ভব হলে ভাল কিছু বলুন নয়তো চুপ থাকুন।

প্রশংসা করার নিয়মঅতীতকালের একটি ঘটনা। জনৈক ব্যক্তি তাঁর এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেল। বন্ধু তাঁর সামনে রুটি ও খাওয়ার উপযোগী ভোজ্য তেল পরিবেশন করলো। অতিথি বন্ধু বললো, ‘রুটির সঙ্গে সবজি থাকলে বেশ ভাল হতো।’ ঘরে সবজি না থাকায় স্বাগতিক বন্ধু পাশের দোকানে গেল। কিন্তু তাঁর কাছে নগত টাকা ছিল না। দোকানির কাহচে সে বাকি চাইল। দোকানী বাকিতে বিক্রি করতে অস্বীকার করলো। ফলে সে বাড়ি ফিরে তাঁর অযু করার বদনাটি নিয়ে দোকানীর কাছে বন্ধক রেখে সবজি নিয়ে এলো। এভাবে সবজি এনে তা অতিথির সামনে পরিবেশন করলো। সবজি দিয়ে অতিথি বন্ধু মনভরে আহারের পর দোয়া পড়ল, ‘আল্লাহর শোকর যিনি আমাদেরকে আহার করিয়েছেন, পানীয় পান করিয়েছেন এবং আমাদেরকে যা দান করেছেন তাতে সন্তুষ্ট রেখেছেন!’

স্বাগতিক বন্ধু এ কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘হায়! আল্লাহ যা দান করেছেন তাতে যদি তুমি সন্তুষ্ট থাকতে, তাহলে আমার অযুর বদনাটি আর বন্ধক রাখতে হতো না!’

অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে আপনি বলবেন না, ‘হায়! হায়! আপনার চেহারা তো হলদে হয়ে গেছে! চোখ দু’টো কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে! শরীরের চামড়া শুকিয়ে গেছে!’ আশ্চর্য! আপনি তো আর তাঁর চিকিৎসক নন। আপনি সম্ভব হলে সান্ত্বনা দিন, নয়তো চুপ থাকুন।

কথিত আছে, জনৈক ব্যক্তি একজন রোগীর দেখতে গিয়ে তা পাশে কিছুক্ষণ বসল। এরপর তাঁর রোগ জিজ্ঞেস করলো। রোগী তাঁর রোগের কথা জানাল। রোগটি ছিল দুরারোগ্য। রোগটির কথা শোনা মাত্রই সাক্ষাৎকারী চিকিৎসা করে বলে উঠল, ‘হায়! হায়! কী বলেন! এ রোগ তো আমার অমুক বন্ধুর হয়েছিল সে মারা গেছে! আমার ভাইয়ে বন্ধু অমুক তো এ রোগে দীর্ঘদিন কর্মক্ষমতা হারিয়ে শেষ পর্যন্ত মারাই গেল! আমার ভগ্নিপতির প্রতিবেশী অমুকও তো এ রোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যবরণ করেছে!’ রোগী তো তাঁর কথা শুনে রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম।

সাক্ষাৎকারী কথা শেষ করে বিদায় নেয়ার আগে রোগী তাঁকে কিছু বলবে কি না জানতে চাইলে রোগী বললো,

‘হ্যাঁ, ভবিষ্যতে তুমি কখনও আমার কাছে আসবে না। আর কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তাঁর সামনে হতাশাব্যাঞ্জক কথা বলবে না।’

আরেকটি ঘটনা শুনুন। জনৈক বৃদ্ধ মহিলা জানতে পারল তাঁর এক বৃদ্ধ বান্ধবী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে তাঁর সন্তানদেরকে এক এক করে অনুরোধ করলো তাঁরা যেন তাঁকে ঐ অসুস্থ বান্ধবীর কাছে নিয়ে যায়। ছেলেরা প্রত্যেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেল। শেষে এক ছেলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো। সে মাকে তাঁর গাড়িতে করে রোগীর বাড়িতে নিয়ে গেল।

গন্তব্য পৌঁছে  তাঁর মা  গাড়ি থেকে রোগী দেখতে চলে গেল। ছেলে গাড়িতে অপেক্ষা করতে লাগল। মহিলা তাঁর অসুস্থ বান্ধবীর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম করলো তাঁর রোগ সম্পর্কে জানল এবং দোয়া করে বিদায় নিল। ফিরে আসার সময় সে দেখতে পেল অসুস্থ মহিলার মেয়েরা বাড়ির হলরূমে বসে কান্নাকাটি করছে। তখন সে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে নিঃসঙ্কোচে বললো, ‘আমি চাইলেও তোমাদের কাছে আসতে পারি না। তোমাদের মা তো মারাত্মক অসুস্থ। মনে হচ্ছে তিনি আর বাঁচবেন না, অতিসত্বর মারা যাবেন। আল্লাহ তায়ালা এখন থেকেই তোমাদের মায়ের মৃত্যুতে ধৈর্য ধরার তাওফিক দান করুণ!’

হে প্রাজ্ঞ পাঠক! কেবল আনন্দ ও খুশির বিষয়েই মন্তব্য করুণ, দুঃখ ও শোকের বিষয়ে মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন।

সমস্যা…..

পোশাকের অপরিচ্ছন্নতা কিংবা শরীরের দুর্গন্ধ এ জাতীয় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে যদি কথা বলতেই হয় তাহলে সুন্দরভাবে ও মায়াবি সুরে তাঁকে জানিয়ে দিন। এটা করতে গিয়ে মেধা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখুন।

By Rubel

Creative writer, editor & founder at Amar Bangla Post. if you do like my write article, than share my post, and follow me at Facebook, Twitter, Youtube and another social profile.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!