এই গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলো স্মরণ রাখুন

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, লেখকের আদর্শ স্বামী স্ত্রী ২ বইয়ের শেষ পর্যায়ের তিনটি আর্টিকেল আমরা এখানে একসাথে তুলে ধরেছি যাতে আপনি সহজেই তা পড়তে পারেন। আর্টিকেলগুলো হলো, ৩৭ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা, ৩৮ বৃদ্ধ স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও ৩৯ স্ত্রীর কাজকে তুচ্ছ মনে না করা। 

৩৭. এই গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলো স্মরণ রাখুন।

উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো ছাড়াও সুখময় দাম্পত্য জীবন গঠনের জন্য আপনাকে আরো কিছু কাজ করতে হবে। যথাঃ আপনার মনোরঞ্জনের জন্য আপনার স্ত্রী যেমন আপনার সামনে পরিপাটি হয়ে থাকবে, বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ সাজ গ্রহন করবে, ঠিক তদ্রূপ আপনিও স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ভালো ভালো কাপড়-চোপড় পরিধান করে থাকবেন। নিয়মিত নখ ও অবাঞ্ছিত পশম কাটবেন। চুল, দাড়ি আঁচড়িয়ে সুন্দর রাখবেন। সাবান, শ্যাম্পু, সুগন্ধ-, স্নো পাউডার ইত্যাদি প্রসাধনী ব্যবহার করবেন। যাতে আপনার প্রতি স্ত্রীর আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং আপনাকে কাছে পেতে অত্যধিক আগ্রহী হয়ে উঠে।

গুরুত্বপূর্ণ কথাস্ত্রীকে পর্দায় রাখা এবং তাকে বেপর্দায় চলাফেরা থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপনাকে সম্ভাব্য সবকিছু অবশ্যই করতে হবে। এব্যাপারে যে কোনো প্রকার অবহেলা আপনার দীন-দুনিয়া বিনষ্ট হওয়ার প্রধান কারন হতে পারে। পারিবারিক বিষয়ে খুব কঠোর যেমন হবেন না তেমনি একেবারে নরমও হবেন না। বরং মধ্যেপন্থা অবলম্বন করবেন।

স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা মাসিকে অনিয়মতান্ত্রিকতা থাকলে অবহেলা না করে দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যাপারে যত্নবান হবেন। মাঝে মধ্যে তাকে পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাবেন। যাতে তার একঘেঁইয়েমী ভাব চলে যায়। স্ত্রীর সাথে পরিবারের অন্য কারোর ঝগড়া বা মনোমালিন্য হলে আপনি কারোর পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ ভাবে উভয়ের হক ও অধিকারের প্রতি দৃষ্টি রেখে তা মিমাংসা করে দিবেন।

কখনো স্ত্রীর সাথে কোনো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হলে সাথে সাথে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলবেন।  একান্ত অপারগ না হলে বাইরের কাউকে অবশ্যই তা জানতে দিবেন না।

স্ত্রী যদি শিক্ষিতা হয় তবে তাকে ভালো ভালো লেখকের ভালো ভালো ধর্মীয় বই ও পত্রিকা কিনে এনে পড়তে দিবেন। এতে মোটেও পয়সার চিন্তা করবেন না। কেননা এসব বই ও পত্রিকা আপনার পরিবারের দ্বীনি পরিবেশকে সুন্দর, সতেজ ও উন্নত করবে। আপনার পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে ধর্মীয় মেজাজে গড়ে তুলতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করবে। কস্মিন কালেও অশ্লীল নভেল-নাটক, উপন্যাস বা চরিত্র-বিধ্বংসী বই-পুস্তুক ও পত্র-পত্রিকা বাসায় আনবেন না।

আপনার স্ত্রী যদি উত্তম কাপড়-চোপড় এবং অলাঙ্কারাদির ব্যাপারে আগ্রহী হয় তবে সাধ্যনুপাতে তার সেই আগ্রহ পূরণ করতে  চেষ্টা করবেন। কিন্তু সে যদি অতিরিক্ত বিলাস প্রবণ ও আয়েশী হয় তবে কঠোরতা ও কর্কশ ভাষা ব্যবহার করে তার মন খারাপ না করে যথেষ্ট হিকমত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে আল্লাহ ওয়ালাদের সাধাসিদে জিন্দেগীর চিত্র তার সামনে তুলে ধরবেন। সেই সাথে আখেরাতের জিন্দেগীর স্থায়িত্ব ও দুনিয়ার জিন্দেগীর অস্থায়িত্বের  কথা এবং পরকালীন ভাবনা জাগ্রত করে এমন কথা তার সামনে বেশি বেশি আলোচনা করবেন। যাতে অপ্রয়োজনীয় বস্তু এবং অতিরিক্ত আসবাবপত্রের প্রতি তার আগ্রহ কমে যেতে থাকে। মনে রাখবেন, আপনি যদি স্ত্রীর মাত্রাতিরিক্ত বিলাসী মনোভাব ও লাগামহীন সৌখিনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হন, তাহলে আল্লাহ না করুক, সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয় যেদিন তার এই মনোভাবের কারণে গোটা পরিবার বরবাদ হয়ে যাবে।

নিজের ছেলে-মেয়েদের সামনে স্ত্রীকে কখনোই শাসন বা গালমন্দ করবেন না। এমনটি করা হলে সংসারের অনাবিল শান্তিময় পরিবেশ নষ্ট হবে এবং সন্তানরা তাদের মায়ের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে পড়বে। তখন তারা তাদের মায়ের কথাকে তেমন মূল্যায়ন করতে চাইবে না।

স্ত্রীর সামনে অন্য কোনো বেগানা মহিলার প্রশংসা করবেন না। বিশেষ করে তার রুপ-সৌন্দর্যের আলোচনা মোটেই করবেন না। কেননা এতে স্ত্রীর মন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে এবং স্বামীর ব্যাপারে তার অহেতুক সন্দেহ সৃষ্টি হবে।

সর্বোপরি স্ত্রীর সারাদিনের খুঁটিনাটি কাজ এবং সংসার ও সন্তানদি সামলানো সহ তিক্ত হবার মতো ঝুট-ঝামেলার কথাটা মনে রেখে তাকে গভীর ভাবে ভালোবাসুন। সেই সাথে তার ভালো ও প্রশংসনীয় কাজের প্রশংসা করুণ। যাতে সে কাজ করতে আরো বেশি উদ্যোমী ও উৎসাহিত হয় এবং মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। অতএব, সুখময় দাম্পত্য জীবন গড়তে ও স্ত্রীর সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে অবশ্যই এই গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলি স্মরণে রাখুন। 

৩৮. বৃদ্ধ স্ত্রীর প্রতিও সদাচরণ করুণ

স্বামীদের প্রতি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এইযে,  অনেক স্বামীকে দেখা যায়, স্ত্রীর যৌবন কালে তার সাথে খুব মুহাব্বত পূর্ণ আচরণ করে, কিন্তু স্ত্রী যখন বুড়ো হয়ে যায়, চামড়া ঢিলা হয়ে পড়ে, দাঁত দু’একটা পড়তে শুরু করে, উপচেপড়া যৌবনে ভাটা পড়তে থাকে তখন আর স্ত্রীকে আগের মতো ভালোবাসে না, আগের মতো তার প্রতি সদাচরণ করে না, বরং সে তখন তার প্রতি ভীষন অমনোযোগী হয়ে পড়ে এবং কথায় কথায় তাকে কষ্ট দিতে থাকে। অথচ পবিত্র কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করো। এ আয়াতে একথা বলা হয়নি যে, স্ত্রী যখন যুবতী থাকে, যখন সে তোমার খুব কাজে আসে, যখন তার নযর কাড়া সৌন্দর্য তোমার চোখকে শীতল করে তখন তার সাথে সদ্ব্যবহার করো, ভালো ব্যবহার করো, আর সে বুড়ো হয়ে গেলে তার প্রতি বেখেয়াল হয়ে পড়ো, তাকে যেমন পারো কষ্ট দাও। বরং এ আয়াতে- স্ত্রী যুবতী হউক কিংবা বুড়ি হউক, চাই তার দাঁত থাকুক বা না-ই থাকুক-সর্বাবস্থায় তার প্রতি ভালো ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।

প্রকৃত পক্ষে বুড়ো হয়ে যাওয়ার পর দুটি কারণে স্ত্রীর প্রতি আরো বেশি খেয়াল রাখা উচিৎ। প্রথম কারন এই যে, বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রী বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় আক্রান্ত হয় বেশি। আর দুর্বলতার সময়ই মানুষ অন্যের সাহায্য ও সদাচরণের মুখাপেক্ষী হয় বেশি। দ্বিতীয় কারণ হলো, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সীমাহীন অনুগ্রহের বদলা হিসেবে। অর্থাৎ একথা মনে করে বৃদ্ধ স্ত্রীর প্রতি অধিক পরিমাণে সদাচরণ করা উচিৎ যে, আজকের এই বৃদ্ধ স্ত্রীই তো আমার উপর এহসানকারীনি ঐ নারী যার ওসিলায় আমি অসংখ্য খারাপ কাজ থেকে বাঁচতে পেরেছি, হৃদয় ও চোখকে পবিত্র রাখতে পেরেছি, সীমাহীন মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পেরেছি। সেই সাথে যুগ যুগ ধরে তার কাছ থেকে গ্রহন করেছি ভক্তিভরা খেদমত ও ভালোবাসা।

হযরত মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গোহী (রহঃ) বুখারী শরীফ পড়ানোর সময় তাঁর ছাত্রদেরকে প্রায়ই একটি ঘটনা শুনাতেন। ছাত্ররা যখন পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে যেত তখন তিনি বলতেন-আচ্ছা! এবার একটি কিচ্ছা শোন।

কিচ্ছাটি হলো, দিল্লীতে এক বুড়া-বুড়ি দম্পতি বাস করত। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। আশি বৎসরের বুড়া, আশি বৎসরের বুড়ি। এই বয়সেও ওরা নিয়মিত একই খাটে একই লেপের নীচে ঘুমাত। একজনকে ছাড়া আরেকজনের ঘুমই আসত না। ওদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা ও মুহাব্বতের জোয়ার এত বেশি ছিল যে, বুড়া মিয়া অন্য কাজ তো দূরের কথা বুড়িকে জিজ্ঞেস না করে পেশাব পর্যন্ত করতে যেত না। পেশাবের বেগ হলেই বুড়া বলত, বুড়ি গো! আমি পেশাব করব। বুড়ি তখন বলত-হ্যাঁ, হ্যাঁ, পেশাব  করে নাও। হযরত গঙ্গোহী (রহঃ) এতটুকু বলে একদম চুপ হয়ে যেতেন। চেহারায় একটু মুচকি হাসির রেখাও দেখা যেত না। ওদিকে ছাত্ররা হেসে খুন হয়ে যেত! আল্লাহ পাক অনুরূপ মুহাব্বত সকল দম্পতিকে নসীব করুণ। আমীন।  

৩৯. স্ত্রীর কাজকে কখনোই তুচ্ছ মনে করবেন না।

কোন কোন স্বামী মনে করে, আমি বাইরে কত পরিশ্রম করি। হাড়ভাঙা খাটুনী খেটে আয় রোজগার করি। তারপর তা দিয়ে সংসার চালায়। আর আমার স্ত্রী ঘরে বসে বসে কেবল রান্না করে আর মজা মজা করে খায়। তার তো তেমন কোনো পরিশ্রমই করতে হয়না।

আসলে এ ধরণের চিন্তাভাবনা মোটেও ঠিক নয়। কারন একজন পুরুষের সামর্থ্যনুযায়ী তার কাছে কাজগুলো যেমন কঠিন তেমনি কঠিন তদ্রুপ একজন মহিলার সামর্থ্যনুযায়ী তার কাজগুলোও তার কাছে তেমন কঠিন মনে হয়। তদুপরি পুরুষের কাজ যেমন নারীদের দ্বারা সুচারু রূপে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়, ঠিক অনুরূপ ভাবে নারীদের গৃহকর্মগুলোও পুরুষদের দ্বারা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। তাই স্বামী –স্ত্রী প্রত্যেকের উচিৎ পরস্পরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তার কাজকে তুচ্ছ মনে না করে যথার্থ মূল্যায়ন করা। অন্যথায় উভয়ের মাঝে কেবল দিন দিন দূরত্বই বৃদ্ধি পাবে।

গত কয়েক দিন একটি গল্প পড়েছিলাম। আমাদের এ আলোচ্য বিষয়ের সাথে গল্পটির বেশ মিল রয়েছে বিধায় এখানে তা উল্লেখ করলাম। আশা করি পাঠকবৃন্দ এ থেকে অনেক শিক্ষা গ্রহন করতে পারবেন। গল্পটি হলো-

এক এলাকায় বাস করত এক চাষী। তার ছিল সুন্দরী এক বউ। তবে, তাদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনিনই একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো। চাষী বলত, আমি একা খেটে মরি। রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। আর তুমি ঘরে বসে বসে খাও আর শুয়ে শুয়ে দিন কাটাও!

চাষীর কথা শুনে বউ ক্ষিপ্ত হতো। রাগ করে বলত, আচ্ছা! আমি যদি খেয়ে-দেয়ে শুয়ে-বসে দিন কাটায় তবে ঘরের কাজ গুলো করে কে? কে খাবার রান্না করে? কে কাপড় ধোয়? কে ঘর-দুয়ার ঝাড়ু দেয়? কে নদী থেকে পানি আনে? কে বাচ্ছার দেখাশুনা করে? কে গুরু-ছাগলকে খৈল-ভূষি ও পানি খাওয়ায় এবং দুধ দোহায়? কে ক্ষেতের ফসল ঝাড়াই-মাড়াই করে ঘরে তোলে?

চাষী বলে, দূর! এসব আবার কাজ নাকি? এ তো আমি বিশ মিনিটে করে ফেলতে পারি! একদিন চাষীর বউ বলল, ঠিক আছে। আমার কাজ গুলো যখন আপনার কাছে খুব সহজ মনে হয়, তাহলে এক কাজ করুণ, আমার কাজগুলো আপনি করুণ আর আপনার কঠিন কাজ গুলো আমি করে দিই।

চাষী বলল, বেশ তাই হোক। পরদিন ভোরে চাষীর বউ পান্তা ভাত মরিচ দিয়ে পেটপুরে খেয়ে ক্ষেতে কাজ করতে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, আমি মাঠে চললাম। আপনি উঠে পড়ুন এবং কাজ শুরু করুণ। দুপুরের খানা যেন সময় মতো আমার কাছে পৌছে যায়! যেভাবে আমি পৌঁছে দিতাম।

বউ চলে যাওয়ার পর চাষী মনে মনে বলল, আমার কাজ খুব সামান্য! এগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে নেয়া যাবে। তাই আরেকটু ঘুমিয়ে নিই!!

এ বলে সে আবার ঘুমাল। ঘুম থেকে জাগার পর দেখা গেল, বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে প্রথমে পান্তা ভাত খেয়ে পেটটা ঠাণ্ডা করল। এবার কি করা যায়? ভাবতে লাগল চাষী। হ্যাঁ, সবার আগে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা তারপর অন্যকিছু।

চাষী ঝাড়ু হাতে নিয়ে ঘর-দুয়ার ঝাড়ু দিতে লাগল। এতে তার কোমর ব্যথা হয়ে গেল। তাই ঝাড়ু টাকে দূরে নিক্ষেপ করে বলল, আমার বউ তো রোজ রোজ ঝাড়ু দেয়-ই। একদিন ঝাড়ু না দিলে তেমন কী অসুবিধা হবে! অতএব এখন একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক!

বিশ্রামের জন্য চাষী যেই বসল, অমনি ঘর থেকে ভেসে এল কান্নার আওয়াজ। সে ছুটে গেল বাচ্ছার কাছে। বলল, কাঁদছিস কেন? ক্ষিদে পেয়েছে বুঝি? চাষী এবার দারুণ বিপাকে পড়ল। কারন তার বুকে তো আর দুধ নেই! তবে হ্যাঁ, বিকল্প একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে। সে তার বাচ্ছাকে বলল, একটু শান্ত হও বাবা! আমি গাভীর দুধটা দোহন করে নিয়ে আসছি। এক্ষুণি তোমাকে জ্বাল দিয়ে খেতে দিব।

দুধ দোহানের জন্য চাষী গোয়াল ঘরে হাজির হলো। কিন্তু এর আগে কোনো দিন সে দুধ দোহন করেনি। একাজটি নিয়মিত তার বউই করত। এখন বালতিটা কেন কানি নড়ছে। গাভী লাথী মারে কিনা সেই ভয়েই হয়তো এমনটি হয়ে থাকবে।

এদিকে বাচ্ছাটা কেঁদেই চলছে। বাচ্ছার কান্নাকাটি শুনে পাশের বাড়ির বউ দৌড়ে এল। চাষীর বউকে ডাকতে ডাকতে বলল, কি গো! তোমার বাচ্ছা কাঁদছে কেন? গোয়াল ঘর থেকে চাষী বের হয়ে বলল, বউ তো বাড়িতে নেই। একটু বাইরে গেছে। ফিরতে হয়তো বিকেল হতে পারে। মহিলাটি বলল, ঠিক আছে তাহলে আমি বাচ্ছাটিকে নিয়ে যাই। ওর মা এসে নিয়ে যাবে। এ বলে সে বাচ্ছাটিকে আদর করে কোলে নিয়ে চলে গেল।

চাষী মনে মনে বলল, যাক বাবা অন্তত আজকের জন্য বাঁচা গেল! গোয়াল ঘরে ফিরে গিয়ে চাষী দেখল, দুধের বালতিটা কাত হয়ে পড়ে আছে। সব দুধ মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে। সে বুঝতে পেরেছে, গুরুর পায়ের ধাক্কায় এমনটি হয়েছে। বালতিটা একপাশে সরিয়ে রাখা উচিৎ ছিল। যাক যা হবার হয়ে গেছে!।

এবার চাষীর ধান শুকানোর কথা মনে পড়ল। তাই সে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে ধান এনে উঠানে ছড়িয়ে দিল। ধান দেখে দুটো কাক উড়ে এল। এসেই ধান খেটে শুরু করল। চাষী ঢিল ছুড়ে দুটো তাড়াল। কিন্তু একটু পরেই আবার এসে হাজির হলো। সেই সাথে তিনটি চড়ুই ও চারটি মুরগী। চড়ুই গুলো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ে যায় আর ধান খায়। নাহ এদের সাথে পারা সাধ্য কার? ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে চাষীর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। 

এদিকে রান্নার সময় হয়ে এসেছে। সে রান্না ঘরে ঢুকে চুলায় চাল চড়িয়ে দিল। কিন্তু উঠানে কাক-চড়ুই ই আর মুরগীগুলো দলবেঁধে এসে হাজির হলো কিনা কে জানে? বাইরে গিয়ে একটু দেখা দরকার।

বাইরে আসতেই তার চোখ ছানা বড় হয়ে গেল। সে দেখল, কাক-চড়ুই আর মুরগী তো আছেই। সেই সাথে কোত্থেকে যেন দড়ি ছিড়ে এক গুরু এসে মনের আনন্দে ধান খেয়ে চলেছে। এ দৃশ্য দেখে চাষীর মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে ছোট একটি লাঠি নিয়ে গরুটিকে তাড়া করল।  গরুটা দিল এক লম্বা  দৌড়। চাষীর কথা হলো, যে কোনো উপায়ে গরুটির গায়ে  দু’চারটি ঘা লাগিয়ে ধান খাওয়ার প্রতিশোধ  সে নিবেই। তাই গরুটির পিছনে পিছনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ছুটল। কিন্তু গরুর নাগাল পেল না। তাই মেজাজ গরম করে ফিরে এল।

উঠানে পা দিতেই চাষীর নাকে পোড়া গন্ধ লাগল। সে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে ঢুকল। দেখল, ভাতের হাঁড়িতে একটু পানিও নেই। তাই ভাত পুড়ে চারিদিকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সে ভাতের হাঁড়িটি নামিয়ে রাখল। মনে মনে বলল, আগে তরকারী রান্না করে নিই। পড়ে আবার ভাত চড়াব।

তরকারী রাঁধতে গিয়ে বিপদ হলো। ঘরে জিয়ল মাছ ছিল। ছিল সবজিও। কিন্তু থাকলে কি হবে! সবজি কিংবা মাছ কোনোটাই সে কাটাকুটি করতে জানেনা। আরো বড় বিপদ হলো-লবণ, মরিচ, তেল, মশলা ইত্যাদি কোনটা কতটুকু দিতে হবে তার কোনোটাই তার জানা নেই। অবশেষে মনকে শান্ত্বনা দিলে বলল, আরে বাবা এতসব ভাবতে হবে না। একরকম হলেই চলবে। এ বলে সে তরকারী রান্নার কাজ শুরু করে দিল।

রান্নার পর তরকারীর রঙ দেখে চাষীর নিজেরই পছন্দ হলো না। অতঃপর ভয়ে ভয়ে একটু তরকারী মুখে দিল। সর্বনাশ! এ যে একেবারে লবণাক্ত হয়ে গেছে। ঝালও হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত। মোটেও খাওয়ার যোগ্য নয়। ফলে চাষীর মেজাজ পুরোপুরি বিগড়ে গেল।  সে রাগে ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লাথির পর লাথি মেরে রান্না ঘরের হাড়ি পাতিল সব ভাংতে লাগল। ফলে গোটা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল পোড়া ভাত, রান্না করা সাধের তরকারী ও ভাঙ্গা হাঁড়ির টুকরা সমূহে।

এদিকে বিকেল হতে আর দেরী নেই। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সেই যে সকালে ক’টা পান্তাভাত খাওয়া হয়েছিল তারপর এখনো কোনো দানাপানি পেটে পড়েনি! কিন্তু খাবেটা কি? রান্না তো হয়নি। অবশেষ কর্তব্য কর্ম ঠিক করতে না পেরে সব কিছু ফেলে বিছানায় গিয়ে কাঁথা জড়িয়ে টানটান করে শুয়ে পড়ল সে।

বিকেল মাঠের কাজ শেষ করে চাষীর বউ ফিরে এল। তবে কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে তা আল্লাহ মালুম!! দেহ-মন সবই  ক্লান্ত। ক্ষিধেটাও তীব্র। কিন্তু উঠানে পা দিতেই তার যেন কেমন লাগল! ব্যাপার কি? কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই। বাচ্ছাটা কোথায়? চাষীই বা কোন খানে? উঠান জুড়ে ধান ছড়িয়ে আছে। গরু-ছাগল কি বাধা আছে গোয়ালেই?

এ প্রথমে ঢুকল রান্না ঘরে। কী সর্বনাশ! রান্না ঘরের একি দশা। হাড়ি পাতিল সব ভাঙ্গা। ভাত তরকারী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মনে হচ্ছে কোনো বন্য প্রাণী এসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে গেছে। এসব দেখে চাষীর বউ বলল, তুমি কোথায় গো? চাষী বিছানা থেকে জবাব দিল-আমি এখানে আছি। বউ দ্রুত ঘরে এসে বলল, কী ব্যাপার? এই শেষ বিকেলে আপনি শুয়ে আছেন? দুপুরে আমার খাবার নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু কই? খাবার তো নিয়ে গেলেন না? চাষী বলল, আমি নিজেই খায়নি! তোমার খাবার নিয়ে যাব কোত্থেকে?

বউ বলল, আপনি কি রান্না করেন নি? চাষী বলল, আগে রান্না করে আমার পেট ঠাণ্ডা করো। পড়ে সব বলছি। চাষীর বউ তাড়াতাড়ি রান্না চড়াল। খাওয়া দাওয়ার পর চাষী তার বউয়ের কাছে সব কিছু খুলে বলল। বিস্তারিত শুনে বউ মিট মিট হাসল।তারপর বলল, আমার কী দোষ! আপনিই তো রোজ রোজ কাজের কথা বলে আমার সাথে ঝগড়া বাধান!

চাষী বলল, আমার খুব শিক্ষা হয়েছে! তোমার সাথে আর কোনো দিন ঝগড়া করবো না। আমি আজ খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছি যে, মহিলাদের কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করা মোটেও উচিৎ নয়।

চাষীর বউ বলল, মাঠে আমি যা করে এসেছি, তা দেখলেও আপনার চোখ কপালে উঠবে। আসলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। হবেই বা কী করে? পুরুষের কাজ কি মহিলারা ঠিকমত করতে পারে? কথায় বলে না- যার কাজ তারে সাজে!

চাষী বলল, হ্যাঁ, যার কাজ তারে সাজে- একথাটি আজ আমারও খুব বুঝে এসেছে। আমি তোমার সাথে আবারও বলছি এবং ওয়াদা করছি যে, তোমার কাজকে আর কোনোদিন ছোট ও তুচ্ছ বলে ভাববো না। অতএব, স্ত্রীর কাজকে কখনোই তুচ্ছ ভাববেন না। 

লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। আদর্শ স্বামী স্ত্রী ২ বইয়ের নসীহত ও শিক্ষণীয় উপদেশমূলক গল্পগুলি এখানেই সমাপ্ত হয়েছে।  

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, আশা করি দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে লেখকের গুরুত্বপূর্ণ কথা গুলি সহ বৃদ্ধ স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ ও স্ত্রীর কাজকে তুচ্ছ না ভাবার উপদেশগুলি পড়ে আপনার ভালো লেগেছে এবং সুখময় দাম্পত্য জীবন লাভে আপনাদের কাজে আসবে। লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।  

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Leave a Comment

error: Content is protected !!