হিংসার ভয়াবহ পরিণাম (শিক্ষণীয় গল্প)

মানুষের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করবে না। কারণ হিংসার পরিণাম খুবই ভয়াবহ এবং আপনাকে কঠিন বিপদের সম্মুখে ফেলতে পারে। হিংসার ভয়ঙ্কর পরিণাম বুঝতে হৃদয় গলে সিরিজের এই শিক্ষণীয় গল্পটি পড়ুন এবং হিংসা থেকে বেঁচে থাকার উপায়গুলো অনুসরণ করে আপনার জীবনকে সুন্দর ও উপভোগ্যময় করে তুলুন। 

গল্প : হিংসার ভয়ঙ্কর পরিণাম!

সে অনেককাল আগের কথা।

বাদশাহ মুতাসিম বিল্লাহ তখন তায়েফের শাসক। অন্যান্য দিনের মতাে আজও তিনি সভাসদদের নিয়ে দরবারে উপবিষ্ট। উপস্থিত সকলেই বাদশাহের কথা মনযােগ সহকারে শুনছেন। কেউ কেউ প্রয়ােজন বােধে বাদশাহকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ বা বাদশাহের পক্ষ থেকে আসা বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সুচিন্তিত জবাব প্রদান করছেন।

আলােচনা প্রায় শেষের দিকে। একটু পরেই আজকের মতাে দরবারের যাবতীয় কার্যক্রম মুলতবি ঘােষণা করা হবে। বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। সকলেই নিজ নিজ আবাসে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ঠিক এমন সময় আরব কবিলার এক চাষা বাদশাহ মুতাসিম বিল্লাহের সাথে সাক্ষাত করতে এলাে। সবিনয় অনুমতি প্রার্থনা করল দরবারে প্রবেশের। বাদশাহ একবার লােকটির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরবে কি যেন ভাবলেন। তারপর কাছে ডেকে এনে নিজের কাছে বসালেন।

আগন্তুক লােকটি অত্যন্ত ধীসম্পন্ন ও উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী। তার মুখের ভাষা অত্যন্ত মিষ্ট। কথায় যেন মধু ঝরে। তার চরিত্র-মাধুর্যও ছিল অতি অনুপম। অল্প সময়ের মধ্যে প্রাণঘাতী শত্রুকে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত করার মতাে ক্ষমতাও ছিল তার। সেই সাথে অসীম সাহসীও ছিল সে।

এসব মহৎগুণের কারণে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সেখানে এক অভূতপূর্ব আন্তরিক পরিবেশের সৃষ্টি হলাে। শুরু হলাে, প্রানবন্ত আলােচনা পর্যালােচনা। তার প্রতিটি জ্ঞানগর্ভ কথায় বাদশাহ দারুণ পুলকিত হলেন। নিজের অজ্ঞাতসারেই লােকটির প্রতি অনুভব করলেন হৃদয়ের টান। মনে হলাে, লােকটি যেন তার বহু পুরাতন অন্তরঙ্গ বন্ধু । এভাবে ক্রমেই তাদের ঘনিষ্টতা চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে ধাবিত হতে লাগল ।।

ঘটনার পর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হলাে। লােকটির মহৎগুণাবলির কারণে অভিভূত হয়ে বাদশাহ অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে সত্যিই তাকে বরণ : করে নিলেন। ঠাই দিলেন অন্তরের অন্তঃস্থলে । ভালবাসলেন হৃদয় দিয়ে। তাই সে এখন বাদশাহের খুব কাছের লােকদের একজন। অনুপম আদর্শ ও বিভিন্ন দুর্লভ বৈশিষ্টের কারণে বাদশাহও তাকে সমীহ করে চলেন।

কিন্তু বাদশাহের অন্যান্য সভাসদদের কাছে তার এ সান্নিধ্য চরম পীড়াদায়ক হয়ে দেখা দিল। তারা কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারল না। হিংসার অনল তাদের ভেতরটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিল। তাদের নিকট লােকটিকে উড়ে এসে জুড়ে বসার মতােই মনে হলাে।

বাদশাহ মুতাসিমের এক মন্ত্রী ছিল মারাত্মক হিংসুটে। হিংসার ব্যাপারে সে ছিল সকলের অগ্রগামী। তাকে হিংসুকদলের সর্দার বললেও অত্যুক্তি হবে না। কারণ আগন্তুক লােকটি থেকে বাদশাহের সুদৃষ্টি ফিরানাের জন্য রাত-দিন সে চিন্তা করে। ফিকির করে। বিভিন্ন ফন্দি আটে। নানাবিধ কূট-কৌশলের আশ্রয় নেয়। মাঝে মাঝে সমমনা সাথীদের নিয়ে পরামর্শ করে। কিন্তু কিছুতেই সফল হতে পারে না। তার সকল ফন্দি-কৌশল একের পর এক মাঠে মারা যাচ্ছে। ভেস্তে যাচ্ছে সবকিছু।

আপন উদ্দেশ্য সফল করতে না পেরে মন্ত্রী এখন চরম হতাশায় ভুগছে। প্রতিহিংসার দাবানল যেন তাকে জীবন্ত দগ্ধ করে ছারখার করে দিচ্ছে। কিন্তু তবুও সে আশা ছাড়ছে না। তার বিশ্বাস, একদিন না একদিন সে জয়ী হবেই। আপন গন্তব্যে সে পৌছবেই। তাই আবারও সে নতুন করে ফন্দি আটার চিন্তা করতে বসল।

চিন্তার এক পর্যায়ে হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল। বলল, পেয়েছি, পেয়েছি। এবার আর বাছাধনের রক্ষে নেই। এখনকার এ সুচিন্তিত কৌশল কিছুতেই ব্যর্থ হতে পারে না।

এতটুকু বলে সে আবারও নতুন ফন্দিটির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে চিন্তা গবেষণা করল । যখন সে দেখল, এ ফন্দিতে কোনাে প্রকার ফাঁকফোকর নেই, কোনাে অবস্থাতেই তা বিফলে যেতে পারে না, তখন সে কালবিলম্ব না করে আগন্তুক লােকটির সাথে সাক্ষাত করে বলল জনাব! আজ কয়েকদিন যাবত মনে একটি আকাঙখা লালন করে আসছি। আশা করি আপনি আমার সে তামান্না পূর্ণ করবেন।

মন্ত্রীর মুখ থেকে এরূপ কথা শুনে লােকটি মনে মনে আশ্চর্য হলাে। মুখে বলল, আমার মতাে নাখান্দা যদি আপনার কোনাে খেদমতে আসে, তাহলে নিজকে বড় সৌভাগ্যবানই মনে করব। বলুন, কি খেদমত করতে পারি আপনার।

মন্ত্রী বলল, না কোনাে খেদমত করতে হবে না। চেয়েছিলাম আপনাকে নিয়ে আমার বাসায় এক বেলা খানা খেতে।

ও ও সেই কথা! এজন্য আমাকে ডেকে পাঠালেই পারতেন। এত কষ্ট করার কি প্রয়ােজন ছিল?

 ঃ না, কোনাে কষ্ট হয়নি আমার। আপনাদের মতাে মহৎ ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ থাকতে পারলেও মনে শান্তি আসে। পেরেশানী দূর হয়।

ও এটা আপনার নেক ধারণা। বাস্তবতা হয়ত এর চেয়ে অনেক দূরে।

মন্ত্রী মহােদয় নিমন্ত্রণের নির্ধারিত তারিখ উল্লেখ করে আরও কয়েকটি কথা বলে সেখান থেকে বিদায় নিল । ফেরার পথে তার চেহারা খুশিতে ঝলকিত হয়ে উঠল। কেননা তার ষড়যন্ত্রের প্রথম অংশটি সে সুন্দর ভাবেই সমাধা করতে পারল।

নির্দিষ্ট দিনে আগন্তুক লােকটি মন্ত্রীর বাড়িতে খানা খেতে বসল। দেখা গেল, রান্না করা সকল খাবারেই প্রচুর পরিমাণে রসুন দেওয়া। কিন্তু কি আর করা! নিমন্ত্রণে এসে তাে আর খানার দোষ ধরা যায় না। অগত্যা সে এক রকম বাধ্য হয়েই রসুন মিশ্রিত খাবার খেয়ে শেষ করল।

ইতিমধ্যে লােকটির সাথে মন্ত্রী মহাশয় বেশ সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই সখ্যতায় যে কুমতলব থাকতে পারে- একথা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি লােকটি। কারণ সে ছিল সরল ও নেহায়েত পবিত্র মনের মানুষ।

খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে মন্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, লােকটি বাসায় চলে গেল। | এদিকে হিংসুটে মন্ত্রী সাথে সাথে বাদশাহের দরবারে গিয়ে বলল, আপনি যাকে এত ভালবাসেন, যার প্রশংসায় আপনি পঞ্চমুখ, সে আপনার প্রতি বিদ্রুপ প্রকাশ করে। কিছুক্ষণ পূর্বে সে আমার নিকট বলেছে যে, মহারাজের মুখ থেকে অসহনীয় দুর্গন্ধ বের হয়। এজন্য তার কাছে যেতে আমার মােটেও ইচ্ছে করে না। তারপরেও শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে বাধ্য হয়ে তার কাছে যাই। আমাকে যদি তিনি মহব্বত না করতেন, কিংবা তার কাছে আমার কোনাে প্রয়ােজন না থাকত, তবে এ অসহ্য দূর্গন্ধের মারাত্মক আজাব ভােগ করার জন্য কোনােদিন তার দরবারে যেতাম না।

বিশ্বাসঘাতক উজিরের কথা শুনে রাজা রুদ্র রােষে ফেটে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গেই তলব করলেন লােকটিকে। কঠোর কণ্ঠে বললেন, এই হারামজাদাকে এখনই আমার দরবারে হাজির কর।

আদেশ পাওয়া মাত্রই লােকটি বাদশাহের দরবারে হাজির হলাে। কিন্তু এইমাত্র খেয়ে আসা রসুনের গন্ধে রাজার কষ্ট হবে ভেবে কাপড় দিয়ে ভালভাবে নাক মুখ ঢেকে রাখল। | বাদশাহ লােকটির প্রতি দৃষ্টি দিতেই যখন দেখলেন, তার নাক-মুখ উত্তমরূপে কাপড়ে ঢাকা, তখন তিনি মন্ত্রীর অভিযােগ সত্য বলে মেনে নিলেন। ভাবলেন, ঠিকই তাে! মন্ত্রীর কথা সত্য না হলে কেন সে আমার দরবারে নাক-মুখ ঢেকে আসবে। আজ পর্যন্ত কেউ তাে এমনটি করেনি। কেউ তাে এমন স্পর্ধা দেখানোের সাহস পায়নি। সুতরাং মন্ত্রীর কথা আসলেই সত্য। | বাদশাহ মনে মনে বললেন, বেটা যখন আমার সাথে এমন অসদাচরণ করল, আমিও তাকে জনমের স্বাদ বুঝিয়ে দিব।

বাদশাহ মুতাসিম তৎক্ষণাৎ তার এক গভর্নরের নামে একটি চিঠি লিখে চাষার হাতে দিয়ে বললেন, তুমি এ পত্রটা ইয়ামানের অমুক প্রতিনিধির কাছে পৌছে দিয়ে এসাে।

পত্রে লেখা ছিল ‘পত্র বাহককে যেন পত্র পাওয়া মাত্রই হত্যা করা হয়। এতে যেন কোনাে প্রকার ত্রুটি না করা হয়।

বাদশাহের নির্দেশক্রমে ঐ সরল প্রকৃতির চাষা লােকটি কাল বিলম্ব না করে সাথে সাথে ইয়ামানের পথে যাত্রা করল। পথিমধ্যে দেখা হলাে, হিংসুটে মন্ত্রীর সাথে। লােকটির হাতে মােহর বন্ধ চিঠি দেখে মন্ত্রী কৌতুহল ভরে জিজ্ঞেস করল, ভাই! কোথায় যাচ্ছ?

সে বলল, ইয়ামানের অমুক গভর্নরের নিকট এ চিঠিখানা পৌঁছে দিতে যাচ্ছি।

একথা শুনে মন্ত্রী মনে মনে ভাবল, হায়! কি করতে কি হয়ে গেল। চেয়েছিলাম কি, আর হলটা কি? যা হােক, এখন এসব ভাবার সুযোগ নাই। সে যখন বাদশাহের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছে তাহলে নিশ্চয় গভর্নরের পক্ষ থেকে বিরাট উপহার-উপঢৌকন নিয়ে ফিরবে। সুতরাং এ সুযােগ কিছুতেই হাত ছাড়া করা যায় না। তাই সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ভাই! তুমি বুড়াে মানুষ। তুমি এত কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করতে যাবে কেন? তার চেয়ে বরং আমিই যাই। তুমি বাসায় গিয়ে আরাম কর গে?

মন্ত্রীর কথায় লােকটি রাজি হয়ে গেল। বলল, আপনি যা ভাল মনে করেন, তাতেই আমি খুশি। আমার কোনাে আপত্তি নেই। একথা বলে সে চিঠিটা মন্ত্রীর হাতে চিঠি দিয়ে বাসায় ফিরে এল। চিঠি হাতে পেয়ে মন্ত্রী অত্যন্ত আনন্দিত। খুশিতে আটখানা হয়ে সে প্রফুল্ল চিত্তে ইয়ামানের পথ ধরে ছুটল। যখন সে ইয়ামানের সেই গভর্নরের নিকট পৌছল, তখন তার আনন্দের মাত্রা শতগুণে বৃদ্ধি পেল। কিন্তু সে জানে না যে, তার মৃত্যুর পরওয়না সে নিজেই বহন করে নিয়ে এসেছে।

সাথে নিয়ে আসা চিঠিখানা মন্ত্রী অত্যন্ত সম্মানের সাথে গভর্নরের হাতে দিল। বলল, আমাদের মহামান্য বাদশাহ মুতাসিম বিল্লাহ আপনার নিকট এ পত্র খানা প্রেরণ করেছেন। দীর্ঘ পথ সফর করে আমি তা বহন করে নিয়ে এসেছি।

গভর্নর ধীরে ধীরে চিঠিখানা খুললেন। তারপর তা পাঠ করে বক্র চোখে বাহকের দিকে একবার তাকিয়েই জল্লাদকে বললেন, এই মুহূর্তে লােকটির গর্দান উড়িয়ে দাও। জল্লাদ মন্ত্রীর মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলল । কাজটি এত দ্রুত ঘটল যে, মন্ত্রী মহােদয় মুখ খুলে কিছু বলারও সুযােগ পেল না। অনুরূপভাবে তিনি যে একজন সম্মানিত মন্ত্রী কারাে পক্ষে একথা জানারও সুযােগ হলাে না। এভাবেই হিংসুটে মন্ত্রী তার হিংসার নির্মম পরিণাম কড়ায়-গন্ডায় ভােগ করল।

এরপর বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত হলাে। কিন্তু মন্ত্রী মহােদয়ের কোনাে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাজা চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবলেন, দেশের একমাত্র মন্ত্রী নিখোঁজ। বিষয়টি মােটেও স্বাভাবিক নয়। তিনি উপস্থিত লােকদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, কেন, তিনি তাে বেশ কয়েকদিন আগে আপনার পত্র নিয়ে ইয়ামানে গিয়েছেন। | এতটুকু শুনতেই রাজা চমকে উঠে বললেন, বল কি তােমরা! সে আমার পত্র নিয়ে ইয়ামানে গিয়েছে। আমি তাে তার হাতে কোনাে পত্র দেইনি। পত্র দিয়েছিলাম ঐ চাষার হাতে। কিন্তু তা মন্ত্রীর হাতে পৌছল কি করে? | লােকজন বলল, ঐ চাষাতাে এখনও এ শহরেই আছে। আপনার কি তা জানা নেই?

বাদশাহ বলল-না, আমি তা জানি না। তােমরা এক্ষণি তাকে ডেকে নিয়ে এসাে।

কিছুক্ষণ পর ভীত বিহবল হয়ে লােকটি বাদশাহের দরবারে হাজির হলাে। বাদশাহ তাকে নির্জন কক্ষে নিয়ে দরদভরা কণ্ঠে বললেন, আচ্ছা, সত্য করে বলত, ঐ দিন কেন আমার সামনে কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে এসেছিলে?

উত্তরে সে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সবকিছু শুনে বাদশাহ ঐ বিশ্বাসঘাতক উজিরের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও কারসাজির কথা পরিস্কার করে বুঝতে পারলেন। মনে মনে ভাবলেন, হিংসুটে মন্ত্রীর উচিত সাজা হয়েছে। যারা অপরের ক্ষতি ও অকল্যাণের চিন্তা করে তাদের শাস্তি এমনই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এদিকে ঐ সরল লােকটির প্রতি বাদশাহরে যে ভুল ধারণার উদ্রেক হয়েছিল, তাও এখন চলে গেল। শুধু তাই নয়, ঐ দিনের পর থেকে বাদশাহ তাকে আরও বেশি আপন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে বরণ করে নিলেন।

প্রিয় পাঠক! কথায় বলে, অন্যের জন্য গর্ত খুদলে, সেই গর্তে নিজেরই পড়তে হয়। আলােচ্য ঘটনাটি এ কথার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নয় কি?

কারও সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ দেখে অন্তরে ব্যথা, জ্বলন ও পেরেশানী সৃষ্টি হওয়া এবং সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির সব নেয়ামত ধ্বংস ও বিনাশ হওয়ার কামনা করাকেই হাসাদ বা হিংসা বলে।

বস্তুতঃ হিংসা এমন এক মারাত্মক ব্যাধি যা মানুষের আত্মা ও দেহকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সুস্থ-সবল ও সুন্দর মানুষকে অল্প সময়ে দুর্বল, কুশ্রী ও ব্যাধিগ্রস্থ করে দেয়। বিনষ্ট করে দেয় মানুষের মন-মস্তিস্ক ও মানসিকতাকে। এজন্যেই পবিত্র কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য স্থানে মানবাত্মার এ মারাত্মক ব্যাধিটির অজস্র নিন্দাবাদ বর্ণিত হয়েছে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তােমরা হিংসাবিদ্বেষ থেকে আত্মরক্ষা কর। কেননা মানুষের পূণ্যগুলােকে উহা এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে। -(আবু দাউদ)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, প্রতি সপ্তাহে সােম ও বৃহস্পতিবার বান্দাদের আমলনামা আল্লাহর দরবারে হাজির করা হয়। তখন প্রত্যেক ক্ষমাপ্রার্থীকে ক্ষমা করা হয় কিন্তু হিংসুককে ক্ষমা করা হয় না।-(মিশকাত)

ইবনুল হাইসাম (র.) বলেন,

হিংসা সাপের বিষের চেয়েও মারাত্মক। কেননা সাপ কখনও নিজের বিষে মরে না। কিন্তু হিংসুককে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (র.) বলেন, হিংসুকের পাশে বাস করার চাইতে হিংস্র বাঘের প্রতিবেশী হওয়াও অনেক নিরাপদ। | হযরত লােকমান (আ.) বলেন, অন্তরে হিংসা পােষণ করে অন্যের ক্ষতি করা যায় না, নিজের সর্বনাশ করা হয় মাত্র। | আল্লামা ইবনে সিমাক (র.) বলেন, হিংসুকের চেয়ে হতভাগা আমি আর কাউকে দেখিনি। কেননা হিংসুক বেচারা মজলুমের মতােই। তার মন সর্বদা অস্বস্তিপূর্ণ, মস্তিষ্ক দুশ্চিন্তাযুক্ত এবং সদা সে মানসিক অশান্তিতে ভস্মীভূত হতে থাকে।

হিংসার চিকিৎসা

(১) হযরত আবু দারদা (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি অধিক হারে মৃত্যুকে স্মরণ করে, তার হিংসা কমে যায় এবং সে আনন্দে উৎফুল্ল হয় না।

২। ইমাম গাজালী (র.) বলেন, হিংসার একটি প্রতিকার হলাে, হিংসার চাহিদার বিপরীত কাজ করে চলা। যেমন-হিংসা যদি কারাে কুৎসা রটানাে ও দুর্নাম ছাড়ানাের প্রতি তাকে উদ্বুদ্ধ করে, তখন তার উচিত ঐ ব্যক্তির প্রশংসা ও গুণকীর্তনে লেগে যাওয়া। হিংসার চাহিদা যদি অহংকার হয়, তখন সে যেন বিনয় ও নম্রতাকে নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেয়। |

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (র.) কে এক ব্যক্তি হিংসার প্রতিকার চেয়ে প্রশ্ন করলে, উত্তরে তিনি বলেন, নিম্নোক্ত কাজগুলাে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত পালন করে চলুন। অতঃপর আমাকে অবহিত করুন।।

(ক) যার প্রতি আপনার হিংসা হয় তার জন্য দোয়া করুন। দেখা হলে সালাম দিন।

(খ) নিজের বৈঠক সমূহে তার প্রশংসা করুন।

(গ) সফরে যাওয়ার পূর্বে তার সাথে সাক্ষাত করে যান এবং আসার সময় তার জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসুন।

(ঘ) মাঝে মাঝে তাকে দাওয়াত করে খানা বা চা-নাস্তা করান।

(ঙ) সময় সময় তার জন্য হাদিয়া তােহফা প্রেরণ করুন। | লােকটি তিন সপ্তাহ পর হযরত থানভী (র.) এর বরাবর পত্র লিখে জানাল যে, আমার হিংসা অর্ধেক কমে গেছে। জবাবে হযরত থানভী বলেন, উপরােক্ত আমলগুলাে আপনি আরও তিন সপ্তাহ পালন করুন। লােকটি তিন সপ্তাহ পর আবারও পত্র লিখে জানাল যে, হযরত! এখন অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে অন্তরে আমার হিংসার স্থলে অকৃত্রিম ভালবাসা ও মুহাব্বত সৃষ্টি হয়েছে।

মুহতারাম পাঠক-পাঠিকা! আমরা কি পারি না আমাদের অন্তরগুলােকে হিংসা মুক্ত করতে পারি না শত্রু বন্ধু নির্বিশেষে সকলের নিকট মহত্ত্ব ও উদারতার উজ্জ্বল নজির পেশ করতে? যদি পারতাম, তবে কি ভাল হতাে? বয়ে চলত না, পৃথিবীর সর্বত্র সুখ-শান্তি ও আনন্দের বাধ ভাঙ্গা জোয়ার? হ্যাঁ, পারি। অবশ্যই আমরা পারব ইনশাআল্লাহ। এ জন্য আমাদের দৃঢ় ইচ্ছা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রয়ােজনে আমরা হযরত থানভী (র.) এর পরীক্ষামূলক আমলটি গ্রহণ করব। তবুও হিংসা নামক মানবাত্মার কালাে ব্যাধিটিকে অন্তরে থাকতে দিব না। | আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে হিংসা ও তার অনিষ্ট হতে বাঁচার তাওফীক দান করুন। আমীন। ]

১. রুহ কি বিমারিয়া আওর উনকি এলাজ। ২. নীল দরিয়ার নামেঃ পৃষ্ঠা : ৫৭। 

লেখক : মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। বই এমন যদি হতো!

লেখকের আরও শিক্ষণীয় গল্প সমূহ!

◊ প্রেমময় জীবনের মধুর অভিমান!

◊ বিশ্বস্ত ক্রীতদাস (এক কৃতদাসের সততার গল্প)

◊ চরম শাস্তি (শাতিমে রাসুলের শাস্তি)

◊ কে অধিক দানশীল (তিন ব্যক্তির দানশীলতার গল্প)

◊ অবৈধ প্রেম : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি (বাস্তব ঘটনার গল্প)

আমার বাংলা পোস্ট থেকে আরও..

◊ মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার ও পুষ্টি গুনাগুন

◊ আলাউদ্দিন খিলজির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

◊ ডিপ্রেশন টু সুইসাইড : আত্মহত্যাই সমাধান নয়!

◊ দশটি শিক্ষামূলক ইসলামিক হাসির গল্প

◊ ২৬০ টি শিশুদের ইসলামিক নাম অর্থসহ

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Leave a Comment

error: Content is protected !!