আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪০তম সূত্রটি পড়ুন। সন্তান ভুল করেছে, বন্ধু কথা শোনেনি, স্ত্রীর সাথে মতভেদ হয়েছে — এখন কী করবেন? রাগ করে শাসন করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়, চুপ থাকলে শৃঙ্খলা ভাঙে। সমাধান একটাই — কোমলভাবে শাসন করুন । হুনাইনের যুদ্ধ থেকে কবরের পাশের মহিলার ঘটনা — রাসূল (সাঃ)-এর জীবন থেকে জানুন এই অসাধারণ আদর্শ।
তিরস্কার করুন, তবে সুযোগ দিন
পূর্ববর্তী আলোচনার উদ্দেশ্য এই নয় যে, কাউকে কখনো তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করা যাবে না। মাঝে মধ্যেই নিজের সন্তান, স্ত্রী কিংবা বন্ধু- বান্ধবকে ভর্ৎসনা করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে তাদেরকে সুযোগ দেয়া বা সহজ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। অতএব, তাদেরকে সাথে সাথে কিছু না বলে নিজের মর্যাদা রক্ষা করার সুযোগ দিন।
হুনাইনের যুদ্ধ: রাসূল (সাঃ)-এর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত

মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা।[১] আরবদের মাঝে মহানবী (সাঃ)-এর মর্যাদা তখন সমুন্নত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। মক্কার অধিকাংশ মানুষ ততদিনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। সে মুহূর্তে রাসূল (সাঃ) হুনাইনের যুদ্ধে বের হলেন। মুশরিকরা সুশৃঙ্খল ও প্রশিক্ষিত বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত হলো। তাদের প্রথম সারিতে ছিল অশ্বারোহী দল। এরপর পদাতিক বাহিনী। এরপর নারীকে মোতায়েন করলো। সবশেষে ভেড়া ও বকরির পাল। অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীতেও সৈন্য সংখ্যা ছিল বারো হাজার।
মুশরিকরা হুনাইনের উপত্যকায় আগে এসে পৌঁছল। তাদের কয়েকটি দল এ উপত্যকার দুই পাশে বড় বড় পাথরের ফাঁকে ফাঁকে আত্মগোপন করে রইল।
যুদ্ধ শুরু হলো। মুসলিম বাহিনী হুনাইন উপত্যকায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কাফের বাহিনী তাদের ওপর চতুর্দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাহাড়ের আড়াল থেকে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল । মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল। ঘোড়াগুলো অস্থির হয়ে তাদের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিতে লাগল। মুসলিম বাহিনী বেশিক্ষণ মোকাবেলা করতে পারলো না। সবার আগে বেদুঈনরা পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুশরিকরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলো।
আল্লাহর রাসূল দেখতে পেলেন, মুসলমানরা পালাচ্ছে। চতুর্দিকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, পলায়নপর ঘোড়াগুলো দিগ্বিদিক ছুটছে।
রাসূল (সাঃ) আব্বাস (রা:) -কে মুহাজির ও আনসার বাহিনীর নাম ধরে আহ্বান করতে নির্দেশ দিলেন। তার আহ্বানে প্রায় সত্তর/আশিজন মুসলিম সৈন্য ঘুরে দাঁড়ালেন। এরপর আল্লাহ তাআলার সাহায্য এলো। মুসলিম বাহিনীর বিজয় তাকবীরে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটল।
আরও পড়ুন: মন্দের বিপরীতে উত্তম ব্যবহার করুন | ইসলামের শিক্ষা
পলায়নকারীরা গণীমত চাইলে রাসূল (সাঃ) কী বললেন?
এরপর মহানবী (সাঃ) এর সামনে গণীমতের মালপত্র একত্র করা হলো। দেখা গেল, যারা সবার আগে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়েছিল। যারা তীর তলোয়ারের ভয়ে পলায়ন করেছিল, তারাই গনীমত লাভের আশায় সবার আগে রাসূলের সামনে এসে হাজির হলো।
বেদুঈনরা রাসূলকে ঘিরে ধরে বললো, ‘আমাদেরকে গণীমতের অংশ দিন। আমাদের প্রাপ্য গনীমত আমাদের মাঝে বণ্টন করে দিন।’
মহানবী (সাঃ) তখন বলতে পারতেন, আশ্চর্য ! তোমরা বলছ ‘আমাদের গনীমতের অংশ’! অথচ তোমরা তো যুদ্ধই কর নি। তোমরা এখন গনীমতের অধিকার দাবি করছ অথচ রণাঙ্গনে যখন চিৎকার করে তোমাদেরকে আহ্বান করা হয়েছিল তখন তোমরা সাড়া না দিয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলে। আর এখন বলছ ‘আমাদেরকে গণীমতের অংশ দিন৷’
কিন্তু তিনি এধরনের কোনো কথা বলেন নি। কেননা, পার্থিব সম্পদের প্রতি তার মনে কোনো মোহ ছিল না৷
তারা রাসূল (সাঃ) কে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে ধরল। চারপাশে ভিড় করে চলার পথরুদ্ধ করে দিল । তারা বারবার বলতে লাগল, ‘আমাদের গনীমত বণ্টন করে দিন।’ প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে মহানবী (সাঃ) একটি গাছের পাশ ঘেঁষে অতিক্রম করলেন।[২] মহানবী (সাঃ) এর চাদর গাছটির ডালে আটকে গেল এবং চাদর কাঁধ থেকে পড়ে গেল। শরীরের উত্তমাঙ্গের কিছু অংশ প্রকাশ পেল। কিন্তু তখনও তিনি রাগ করলেন না। তিনি তাদের সবার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন এবং সম্পূর্ণ শান্ত ও কোমল স্বরে বললেন,
— (সহিহ বুখারি: ২৮২১)
মহানবী (সা:) সত্য বলেছেন। তিনি কৃপণ ছিলেন না। কৃপণ হলে তিনি সব সম্পদ নিজের কাছেই রেখে দিতেন। তিনি ভীরু কিংবা কাপুরুষও ছিলেন না। ভীরু হলে তো মৃত্যুর ভয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করতেন। তিনি মিথ্যুক বা প্রতারকও ছিলেন না। মিথ্যাবাদী হলে মহান আল্লাহ কিছুতেই তাকে সাহায্য করতেন না।
কবরের পাশে কাঁদতে থাকা মহিলার ঘটনা
নবী করিম (সাঃ) এর জীবনে এ ধরনের প্রচুর ঘটনা রয়েছে। একদিনের ঘটনা। মহানবী (সাঃ) একজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটছিলেন। পথিমধ্যে তিনি জনৈক মহিলাকে তার শিশু সন্তানের কবরের পাশে কাঁদতে দেখলেন।[৩] মহানবী (সাঃ) তাকে বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় কর এবং ধৈর্যধারণ কর।’
মহিলাটি মহানবী (সাঃ) কে চিনতে পারলো না। তাই সে বলে ফেললো, ‘যান এখান থেকে! আপনি আমার ব্যথা কী বুঝবেন?’

মহানবী (সাঃ) তাকে আর কিছু বললেন না। চুপচাপ চলে এলেন । তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি বুঝতে পারলেন, মহিলাটির এখন যে মানসিক অবস্থা, তাতে এ মুহূর্তে তাকে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা উচিত নয়। এদিকে সঙ্গী সাহাবি মহিলাকে বললো, ‘এ কী বললে তুমি? তিনি তো আল্লাহর রাসূল। মহিলাটি তখন অত্যন্ত লজ্জিত হলো। এরপর সে রাসূল (সাঃ) এর বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হলো। সে ভেবেছিল রাসূল (সাঃ) এর বাড়িতে গেট থাকবে। গেটে দারোয়ান থাকবে। দারোয়ানের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অনেক কষ্ট করে ভেতরে যেতে হবে। কিন্তু সে এমন কিছুই দেখলো না। তাই সে খুব অবাক হলো। যাই হোক সে রাসূল (সাঃ)-এর কাছে গিয়ে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললো; “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনাকে চিনতে পারি নি। আমি এখন ধৈর্যধারণ করব।’
মহানবী (সাঃ) বললেন,
— (সহিহ বুখারি: ১২৮৩, সহিহ মুসলিম: ১৫৩৫)
আরও পড়ুন: মানসিক অবস্থা বিবেচনায় রাখুন | সুন্দর জীবনের গোপন রহস্য
সব কাজে কোমলতা — হাদিসের আলোকে…
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক কাজের জন্য এহসান বা সুন্দরতম পন্থা আবশ্যক করে দিয়েছেন । তাই (যুদ্ধক্ষেত্রে) কাউকে হত্যা করতে হলে সেক্ষেত্রেও সুন্দরতম (অর্থাৎ তুলনামূলক কম কষ্টদায়ক) পন্থা অবলম্বন করবে। (চতুস্পদ জন্তুকে) জবাই করতে হলে সুন্দরভাবে (অর্থাৎ তুলনামূলক কম কষ্টদায়ক পন্থায়) জবাই করবে। জবাইয়ের আগেই ছুরি ধার দিয়ে নেবে, যেন জবাইয়ের সময় পশুর কষ্ট কম হয় । (সহিহ মুসলিম: ৩৬১৫)
যদি পশুর ক্ষেত্রেও কোমলতার নির্দেশ থাকে — তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কোমলতা কতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
উপসংহার: কোমলতাই শ্রেষ্ঠ শাসন পদ্ধতি
শাসন মানে কঠোরতা নয় — শাসন মানে সঠিক পথ দেখানো। রাসূল (সাঃ) যুদ্ধের ময়দানে, শোকার্ত মহিলার সামনে, গণীমত দাবিকারী বেদুঈনদের সামনে — সর্বত্র কোমলতা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।
আপনিও পরিবার ও বন্ধুদের শাসন করুন — তবে কোমলতায়। কারণ কঠোরতায় মানুষ দূরে সরে যায়, কোমলতায় কাছে আসে।
অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪০তম সূত্র হলো — শাসন করতে হলে কোমলভাবে করুন।
রেফারেন্স ও বর্হিঃগমণ সংযোগ
[১] হুনাইনের যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীর প্রাথমিক বিপর্যয় এবং পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৃঢ় অবস্থানের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারি-তে। দেখুন: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৩১৫। ↑
[২] হুনাইনের যুদ্ধের পর গণিমতের মাল বণ্টনের সময় লোকজন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ঘিরে ধরলে তাঁর চাদর একটি গাছের ডালে আটকে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ সময় তিনি বলেন, তাঁর কাছে তিহামার গাছপালা পরিমাণ পশু থাকলেও তিনি তা তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন এবং তাঁকে কৃপণ, মিথ্যাবাদী বা কাপুরুষ হিসেবে পাওয়া যাবে না। দেখুন: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৮২১। ↑
[৩] কবরের পাশে সন্তান হারিয়ে কান্নারত এক নারীকে রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহকে ভয় করতে এবং ধৈর্য ধারণ করতে বলেন। নারী তাঁকে চিনতে না পেরে কঠিন কথা বলার পর জানতে পারেন যে তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ। পরে তিনি ক্ষমা চাইলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “ধৈর্য তো প্রথম আঘাতের সময়ই।” দেখুন: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১২৮৩। ↑