জীবনকে উপভোগ করুন” বইয়ের এই অধ্যায়—মুয়াবিয়ার সুতা—আমাদের শেখায় ধৈর্য ও সংযমের প্রকৃত মূল্য। রাগ নিয়ন্ত্রণে ইসলামী দৃষ্টান্ত ও মুয়াবিয়ার দর্শন পাঠককে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে শান্ত ও ইতিবাচক থাকতে অনুপ্রাণিত করে।

২১.মুয়াবিয়ার সুতা! (ধৈর্য ও সংযমের অনুপ্রেরণামূলক গল্প)
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন গণিত শিক্ষক দেখলেন, তার ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্র ক্লাসে অমনোযোগী । পড়াশোনায়ও দুর্বল। এদিকে এরা আবার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র । সামনে ফাইনাল পরীক্ষা । তাই তিনি তাদের সংশোধন করতে চাইলেন ।
হঠাৎ একদিন তিনি ক্লাসে এসে চেয়ারে বসতে না বসতেই বললেন, ‘সবাই বই বন্ধ করে পাশে রাখ, খাতা-কলম হাতে নাও।’
: ছাত্ররা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেন স্যার?’
: শিক্ষক বললেন, ‘আমি তোমাদের একটা সারপ্রাইজ পরীক্ষা নেব।’
ছাত্ররা বিড়বিড় করে অসন্তোষ প্রকাশ করা সত্ত্বেও এক পর্যায়ে শিক্ষকের কথা মেনে নিল । তবে তাদের মধ্যে বিশাল দেহের অধিকারী কিন্তু মোটা মাথার এক ছাত্র ছিল । অঘটন ঘটানোর ক্ষেত্রে সে ছিল খুব পটু।
সে চিৎকার করে বললো, ‘স্যার! আমরা পরীক্ষা দেব না। রিভিশন দিয়ে পরীক্ষা দিতেই আমাদের বারোটা বেজে যায় । কিন্তু এখন রিভিশন ছাড়া পরীক্ষা দেব কীভাবে?’
ছাত্রটি কথাগুলো এতো কঠিন স্বরে বললো যে, শিক্ষক রাগে ফেটে পড়লেন। শিক্ষক তাকে বললেন, ‘এখানে তোমার খেয়াল খুশিমতো কিছুই হবে না। আমি শিক্ষক আমার কথা তোমাকে মানতে হবে। না চাইলেও পরীক্ষা তোমাকে দিতেই হবে। বুঝতে পেরেছ? আর যদি পরীক্ষা দিতে ভাল না লাগে তাহলে ক্লাস থেকে বের হয়ে যাও।
ছাত্রটিও ক্রোধে পাগলের মতো বলে উঠল, ‘আমি যাব না; বরং আপনি ক্লাস হতে বের হয়ে যান।’
ছাত্রের মুখে এমন কথা শুনে শিক্ষক আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না । তিনি ‘বেয়াদব’, ‘অভদ্র’ ইত্যাদি গালি দিতে দিতে তিনি ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। এদিকে ছাত্রটিও রুখে দাঁড়াল। এরপর যা ঘটার, তাই ঘটল। শুধু এতটুকু বুঝে নিন যে, খুব খারাপ কিছু ঘটেছিল। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না।
এ ঘটনার খবর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছল। কর্তৃপক্ষ ছাত্রটিকে শাস্তি দিলেন। তার ফাইনাল পরীক্ষার মার্কশিটের গ্রেড দুই ধাপ নামিয়ে দেয়া হলো এবং শিষ্টাচার বজায় রেখে চলার অঙ্গীকার করে তাকে একটি দরখাস্ত লিখতে বাধ্য করা হলো।
এদিকে ঐ শিক্ষক ‘টক অভ দ্যা স্কুলে’ পরিণত হলেন । স্কুলের সর্বত্র তাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু হলো। যার পাশ দিয়েই তিনি যান, সে-ই তাকে নিয়ে ফিসফিস করে আলোচনা করে । অনেকে তাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য ছুড়ে দেয়। উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে তিনি অন্য বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে চলে যান।
অন্য এক শিক্ষক একই ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি খুব কৌশলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন । তিনি কিভাবে তা করেছিলেন? দেখুন, তিনিও একদিন ক্লাসে এসে ছাত্রদের বললেন, ‘সবাই কাগজ কলম হাতে নাও । তোমাদের আজ সারপ্রাইজ পরীক্ষা হবে।’
তাদের মধ্য থেকে এক ছাত্র দাঁড়িয়ে বললো, ‘আপনি যখন যা চাইবেন তা-ই হবে এমন মনে করবেন না । আপনার ইচ্ছামতো সব চলবে না ।’ এ শিক্ষক ছিলেন খুব বিচক্ষণ । তিনি মানুষের নাড়ি ও প্রকৃতি বুঝতেন । তিনি জানতেন গোঁয়ার্তুমি দিয়ে গোঁয়ারের মোকাবিলা করা যায় না ৷ তিনি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘ওহ আচ্ছা! খালেদ তুমি মনে হয় পরীক্ষা দিতে চাও না।’
ছাত্রটি চিৎকার করে বললো, ‘অবশ্যই, আমি পরীক্ষা দেব না।’
শিক্ষক তখন খুব শান্তভাবে বললেন, ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই । যে পরীক্ষা দিতে চায় না, তার ব্যাপারে আমরা বিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।
ছেলেরা! তোমরা লেখ, প্রথম প্রশ্ন : নিচের সমীকরণটির সমাধান বের কর:
এই বলে তিনি একের পর এক প্রশ্ন লেখাতে শুরু করলেন।
গোঁয়ার ছাত্রটি আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না। সে চিৎকার করে বললো, ‘আমি বলেছি, আমি পরীক্ষা দেব না ।’
শিক্ষক শান্তভাবে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছি? তুমি স্বাধীন মানুষ । তুমি যেমন করবে, তেমন ফল পাবে ।’
শিক্ষকের এ কথার পর ছাত্রটি তাকে রাগানোর মতো আর কিছু খুঁজে পেল না । অবশেষে সে শান্ত হয়ে কাগজ- কলম বের করলো এবং সহপাঠীদের সঙ্গে প্রশ্ন লিখতে শুরু করলো।
পরবর্তীতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকের সাথে তার অসদাচরণের উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছিল।
কাল্পনিক এই ঘটনা দুটি থেকে আপনি অবশ্যই বুঝতে পারবেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্যতা সবার এক রকম নয়। কেউ পরিস্থিতিকে উত্তাল করে তোলে, আবার কেউ দ্রুত তা শান্ত করে ফেলতে পারে। গোঁয়ার ব্যক্তির সঙ্গে গোঁয়ার্তুমি করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, আগুনের মোকাবিলা আগুন দ্বারা করা হলে উত্তাপ ও লেলিহান শিখাই বাড়তে থাকবে । অপরদিকে ঠাণ্ডার সঙ্গে সবসময় ঠাণ্ডা ব্যবহার করলে কোনো কাজই ঠিক থাকবে না। সুতরাং মানুষের সঙ্গে আপনার আচরণ কেমন হবে, তা বুঝতে মুয়াবিয়া (রা:)-এর সুতা দর্শনের শরণাপন্ন হতে পারেন।
মুয়াবিয়া (রা:) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি গভর্নর হিসেবে বিশ বছর এবং খলিফা হিসেবে বিশ বছর এত দীর্ঘ সময় কীভাবে শাসন করলেন?’
মুয়াবিয়া বলেছিলেন, ‘আমি জনগণ ও আমার মধ্যে একটি সুতা রেখেছি। সুতার এক প্রান্ত আমার হাতে, অপর প্রান্ত জনগণের হাতে। তারা যখন সুতা ধরে টান দেয় তখন আমি ঢিল দেই, যেন সুতাটা ছিঁড়ে না যায় ৷ আর যখন জনগণ ঢিল দেয় তখন আমি টেনে ধরি।’
মুয়াবিয়া (রা:)-সত্য বলেছেন। মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে এটি একটি যথার্থ উক্তি। কত চমৎকার ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা!
দাম্পত্য জীবনে স্বামী স্ত্রী উভয়ই যদি গোঁয়ার হয়, কেউ কাউকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দিতে না চায় তাহলে তাদের সংসারে কখনো সুখ আসবে না । অনুরূপ দুই পার্টনারের উভয়ে যদি একগুঁয়ে প্রকৃতির হয় তাহলে তাদের অংশিদারিত্ব বেশি দিন টিকবে না ।
একবার আমি এক জেলখানায় ধর্মীয় আলোচনা করেছিলাম । ঘটনাক্রমে আমার আলোচনাটি ছিল জেলখানার সে অংশে যেখানে খুনের আসামীদেরকে রাখা হতো।
আমি যখন আলোচনা শেষ করলাম তখন কয়েদীরা সবাই নিজ নিজ সেলে ফিরে গেল। কিন্তু তাদের একজন এগিয়ে এসে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন । তিনি জেলখানায় বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এদের অধিকাংশের হত্যার মতো অপরাধ সংঘটনের পেছনে কারণ কী?’
তিনি বললেন, ‘রাগ ও ক্রোধই হলো মূল কারণ । এদের কেউ কেউ সামান্য কিছু টাকার জন্য সেলসম্যানের সঙ্গে ঝগড়া করে উত্তেজিত হয়ে কিংবা ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’
তখন আমার রাসূল (সা:)-এর একটি হাদিস মনে পড়ে গেল:
হ্যাঁ, সে প্রকৃতপক্ষে বীর নয়, যে মল্লযুদ্ধে শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে সবাইকে পরাজিত করতে পারে। যদি এটাই বীরত্বের মাপকাঠি হতো তাহলে হিংস্র প্রাণীরা মানুষের চেয়ে শ্রে‘বীর হিসেবে বিবেচিত হতো ।
কোনো পরিস্থিতিতে কী করতে হবে এটা যে বোঝে সেই প্রকৃত বীর । যে দক্ষতার সঙ্গে তার স্ত্রী, সন্তান, উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, সহপাঠী, সহকর্মীসহ সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে সেই তো প্রকৃত মানুষ। হাদীসে আছে
রাসূল (সা:) ধৈর্যের অনুশীলন করার আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন-
সংযম অনুশীলনের মাধ্যমেই ধৈর্য লাভ হয় রাগ নিয়ন্ত্রণে আসে । প্ৰথম বার রাগ নিয়ন্ত্রণ করার সময় আপনার ১০০% কষ্ট হবে, দ্বিতীয় বার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে আপনার কষ্ট হবে ৯০%। এরপর তৃতীয়বার আপনি যখন রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাবেন তখন ৮০% কষ্ট স্বীকার করলেই চলবে। এভাবে আপনি অনুশীলন করতে থাকলে ধৈর্য ও সহনশীলতা একসময় আপনার সহজাত স্বভাবে পরিণত হয়ে যাবে।
একবার আমি একটি বক্তৃতা করার জন্য আমলাজ শহরে গিয়েছিলাম। আমলাজ শহরটি জেদ্দা থেকে তিনশ কিলোমিটার দক্ষিণে। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এক রগচটা যুবক ছিল। সে হঠাৎ রেগে গিয়ে তুগলকি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলত । সে একবার গাড়ি নিয়ে বের হলো। বিশেষ কোনো তাড়া না থাকায় সে ধীরগতিতে গাড়ি ড্রাইভ করছিল । তার পেছনে একটি গাড়ি খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছিল এবং তাকে ওভারটেক করার জন্য বারবার হর্ণ বাজাচ্ছিল।
কিন্তু যুবকটি তার গাড়ির গতি আরো কমিয়ে দিল এবং হাত নেড়ে পেছনের গাড়িটিরও গতি কমাতে বললো। পেছনের গাড়ির চালক খুব বেশি সময় ধৈর্য ধরতে পারল না । সে বিরক্ত হয়ে সাইড দিয়ে ওভারটেক করে চলে গেল । তবে কোনো গাড়িরই কোনো ক্ষতি হলো না।
তবে এটা দেখে যুবকটির মাথা গরম হয়ে গেল । অবশ্য এর চেয়ে তুচ্ছ কিছু ঘটনায়ও সে প্রচণ্ড রেগে যায় । সেও তাদের ধরার জন্য গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল এবং বারবার তাদেরকে থামার জন্য সিগনাল দিতে লাগল । এ অবস্থা দেখে সামনের গাড়িটি থামল । তখন যুবকটি তার মাথার রুমাল খুলে সিটের পাশে রেখে একটি রড (নাটবল্টু খোলার যন্ত্রবিশেষ, বড় রেঞ্চ) হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো । তার চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছিল । এ অবস্থায় সে সামনের গাড়ির যাত্রীদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
সামনের গাড়ি থেকে তিনজন যুবক নেমে আসল । যুবকদের প্রত্যেকেই ছিল পেশিবহুল ও সুগঠিত দেহের অধিকারী। তাদের পেশী যেন তাদের পরিধেয় কাপড় ছিড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে! যুবকরা তার দিকে তেড়ে আসছিল । তারা তার হাতে রডটি দেখে তার মনোভাব বুঝতে পেরেছিল । তাই তারাও প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসছিল।
এটা দেখে যুবকটি খুব ভয় পেয়ে গেল । কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো । সঙ্গে সঙ্গে সে রডটা উচু করে ধরে বললো, “সরি, এটা আপনাদের গাড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল। এটা আপনাদের কাছে ফেরত দিতে এসেছি।’
তিনজনের একজন শান্তভাবে তার হাত থেকে রডটা নিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেল। আর সে দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
সমীকরণ …
গোঁয়ার + গোঁয়ার = বিস্ফোরণ !
এরপর পড়ুন: হৃদয় জয়ের চাবি (Life hacking Tips 22)
উৎস: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে।
আরও পড়ুন
০১. নাস্তিক শিক্ষক (কিশোদের বুদ্ধিদীপ্ত গল্প ৬)
০২. মুসলিম নারীর মর্যাদা ও জীবন বিধান
০৩. শিশুদের জন্য ১০টি ইসলামিক নৈতিক শিক্ষার গল্প (পর্ব ১)
প্রিয় পাঠক পাঠিকা, মুয়াবিয়ার সুতা অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অস্থিরতা বা রাগের মুহূর্তে সংযমই প্রকৃত শক্তি, আর ধৈর্যই জীবনের সৌন্দর্য উপভোগের চাবিকাঠি। গল্পটি ভালো লাগলে এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না।