উপভোগ করুণ আচরণগত দক্ষতা (Life hack Tips)

আপনার আচরণগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কিভাবে মানুষের মন ও স্বভাব পরিবর্তন করবেন তা জানতে ও শিখতে সম্মানিত লেখকের উপভোগ করুণ আচরণগত দক্ষতা আর্টিকেলটি পড়ুন। 

08. উপভোগ করুণ আচরণগত দক্ষতা (Life hacking tips 8)

উন্নত আচরণগত দক্ষতার সুফল শুধু পরকালে পাওয়া যাবে এমন নয়; বরং এর ফলাফল আপনি বাস্তব জীবনে এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে উপভোগ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে  আপনি জবনের প্রকৃত আনন্দ ও সুখ অনুভব করতে সক্ষম হবেন। তাই এ দক্ষতাকে উপভোগ করতে শিখুন।

সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের সঙ্গে এর অনুশীলন করুণ। বড়-ছোট, ধনী-গরীব, আত্মীয় ও অনাত্মীয় নির্বিশেষে সবার সঙ্গে এ দক্ষতার চর্চা করুণ।

অন্যের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে কিংবা তাঁদের ভালোবাসা লাভ করতে অথবা তাঁদের সংশোধনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করুণ।

হ্যাঁ, অন্যের সংশোধনের জন্য প্রয়োজন আচরণগত দক্ষতার যথার্থ ও সুষ্ঠু ব্যবহার।

আলী বিন জাহাম ছিলেন একজন স্বভাবকবি। কিন্তু তিনি ছিলেন বেদুঈন। সভ্য জগতের রীতি-নীতি কিছুই তাঁর জানা ছিল না। সে শুধু জানত মরুভূমির যাযাবরদের জীবন-জীবিকা ও আবেগ-অনুভূতির কথা।

সমকালিন খলিফা মুতাওয়াক্কিল ছিলেন একজন প্রতাপশালী শাসক। তাঁর ইচ্ছা আর মর্জি অনুযায়ী চলতো সবকিছু।

বেদুঈন কবি আলী বিন জাহম একদিন বাগদাদ শহরে উপস্থিত হলেন। কেউ একজন তাঁকে জানালো, ‘সাহিত্যপূর্ণ ছন্দে খলিফার প্রশংসা করতে পারলে তাঁর দরবারে বিশেষ মর্যাদা লাভ করা যায় এবং প্রচুর উপহার-উপঢৌকন পাওয়া যায়।

একথা শুনে আলী খুব খুশী হলেন। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে খলিফার প্রাসাদের দিকে রওয়ানা করলেন। দরবারে প্রবেশ করে দেখলেন, বহু কবি, সাহিত্যিক, জ্ঞানী ও গুণী সেখানে উপস্থিত। তাঁরা কবিতার মাধ্যমে বাদশাহর প্রশংসা করছে আর বহু মূল্যবান উপহার উপঢৌকন গ্রহণ করছে। আলী যথারীতি দরবারে আসন গ্রহণ করে কবিতার মাধ্যমে খলিফার প্রশংসা করতে লাগলেন।

তাঁর সে প্রশংসাসূচক কবিতার প্রথম চরণগুলো ছিল নিম্নরূপ—

অনুরাগের মান রক্ষার ক্ষেত্রে আপনি কুকুরের ন্যায়!

আর দুর্যোগ দুর্বিপাকে ষাড়ের মত অবিচল!

আপনি বিশাল এক বালতির ন্যায়,

যার মাধ্যমে নিবারণ হয় সবার পিপাসা।

অন্যান্য কবিরা যেখানে বাদশাহকে তুলনা করেছেন চন্দ্র, সূর্য ও পাহাড়ের সঙ্গে, সেখানে আলী বিন জাহম যাযাবর জীবনের প্রথা অনুযায়ী তাঁর কবিতায় বাদশাহকে তুলনা করতে লাগলেন কুকুর, ষাড় ও বালতির সঙ্গে।

খলিফা তাঁর কবিতা শুনে প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়লেন। প্রহরীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ল। জল্লাদ তরবারি খাপমুক্ত করলো। তাঁকে হত্যা করতে সবাই প্রস্তুত হলো।

কিন্তু খলিফা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আলী বিন জাহম তাঁর নিন্দা করতে চান নি। যাযাবর জীবনের স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি এভাবে তুলনা করেছেন।

খলিফা তাঁর এ দুর্বলতা পাল্টে দিতে চাইলেন। তিনি তাঁকে এক মনোরম প্রাসাদে পৌঁছিয়ে  দিতে বললেন। যেখানে সকাল সন্ধ্যা রাজ্যের সব রূপসী দাসীরা ভোগ বিলাসের যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকবে।

আলী বিন জাহম রাজপ্রাসাদে বসবাস করে ভোগবিলাসের সাথে জীবন উপভোগ করতে লাগলেন। আরামদায়ক মখমলের সোফায় হেলান দিয়ে, কোমল গালিচায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বিখ্যাত সব কবি-সাহিত্যিকেরা সঙ্গে গল্প করে দিন কাটাতে লাগলেন। এভাবে কেটে গেল সাতটি মাস।

এরপর একদিন খলিফা রাত্রিকালিন গল্পের আসর জমালেন। আলী বিন জাহমকে ডাকা হলো। আলী উপস্থিত হলেন। খলিফা বললেন, ‘আলী! আমাকে কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও।’

খলিফার নির্দেশে তিনি প্রশংসাসূচক কবিতা রচনা করতে শুরু করলেন। তবে এবার তাঁর কবিতার প্রথম শ্লোকগুলো ছিল নিম্নরূপ—

রুসাফা আর জিসরের (সেতুর) মধ্যবর্তী এলাকার প্রেয়সীর

ডাগর ডাগর মায়াবী চোখগুলো,

জানা-অজানা কত পথে আমার দিকে

ভালোবাসার মায়াবান ছুড়েছে।

সে মায়ার বানে বিদ্ধ হয়ে আমার বিস্মৃত

প্রেমের স্মৃতিগুলো আবার জেগে উঠেছে।

হায়! আমার হৃদয়! হায়!

তুষের আগুনের ন্যায় ধিক ধিক করে জ্বলছে।

এখানে কবি আলো ইবনে জাহম সেকালের আরবি কবিতার প্রচলিত নিয়ম অনুসারে স্ততিমূলক কবিতা শুরু করার আগে একটি স্মৃতিচারণমূলক ভূমিকা দিয়ে তাঁর কাব্যগাথা শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ভাব ও আবেগের মিশ্রনে শ্রোতাদেরকে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে গেছেন। এরপর তিনি খলিফাকে একে একে চন্দ্র-সূর্য, তারকা ও তরবারির সঙ্গে তুলনা করে কবিতা রচনা করেছেন।

প্রিয় পাঠক লক্ষ্য করে দেখুন, কীভাবে খলিফা আলী বিন জাহমের কবি স্বভাব পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেন। আমাদের বন্ধু-বান্ধব ও সন্তান-সন্ততির স্বভাব ও আচর-আচরণে আমরা কত বিব্রত হই। কিন্তু আমরা কি কখনো চেষ্টা করেছি তাঁদের সেই স্বভাব পরিবর্তন করতে?

তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করা। নিজের দুর্বলতাগুলো ধীরে ধীরে দূর করার চেষ্টা করুণ। নিজে বদলে যান অপরকে বদলে দিন। দুঃখকে হাসিতে রূপান্তর করুণ। গোস্বাকে সহনশীলতায় এবং কার্পণ্যকে দানশীলতায় পরিবর্তন করুণ। এটা খুব কঠিন কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন শুধু সংকল্প আর অবিরাম অনুশীলন। তাই এখনি উদ্যমী হোন। কার্যকরী উদ্যোগ নিন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবন চরিত্র অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাই মানুষের সঙ্গে তিনি কত অমায়িক আচরণ করেছেন। চরিত্রের সুরভি দিয়ে তিনি মানুষের অন্তর কীভাবে জয় করে নিয়েছেন। তিনি সুন্দর চরিত্রের অভিনয় করেন নি। তিনি কখনো এমন করেন নি যে, বাইরের মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করেছেন, ধৈর্য দেখিয়েছেন আর ঘরে গিয়ে রাগ দেখিয়েছেন।

কিংবা অন্য সবার সঙ্গে ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল আর নিজের ঘরে এসে হয়েছেন ম্রিয়মান।

বরং তিনি সবসময় সর্বক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সেরা আচরণটিই করেছেন। তাঁর আচরণে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। তাঁর চরিত্র ছিল অকৃত্রিম, সরল ও অমায়িক। চাশত ও তাহাজ্জুদের নামাযের মতই মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণকেও তিনি ইবাদত মনে করতেন। মুচকি হাসিকে তিনি আল্লাহ তায়ালার নৈক্যট অর্জনের মাধ্যমে মনে করতেন। নম্র ব্যবহারকে তিনি মনে করতেন ইবাদত। ক্ষমা এ দয়াসুলভ আচরণকে তিনি গণ্য করতেন নেক আমল হিসেবে।

সদাচরণকে কেউ ইবাদত মনে করলে সর্বাবস্থায় সে তা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকে। যুদ্ধ, শান্তি, ক্ষুধা, তৃপ্তি, সুস্থতা, অসুস্থতা, আনন্দ-বেদনা, লাভ-ক্ষতি কোনো অবস্থায়ই সে সদারচরণ বর্জন করে না।

অনেক স্ত্রী নিজেদের ঘরে বসে অন্যদের কাছে নিজের স্বামীদের উদারতা, দানশীলতা ও সদাচরণের মত মহৎ গুণাবলির কথা শোনেন। কিন্তু তাঁরা বাড়িতে এর কিছুই দেখেন না; বরং ঘরে সে উদার স্বামীর ব্যবহার থাকে অনুদার, মেজাজ থাকে রুক্ষ, হৃদয় থাকে সংকীর্ণ, চেহারা হয়ে যায় মলিন। কোমলমতি স্ত্রীদের প্রতি তাঁরা হয়ে যায় নির্দয়, পাষাণ, ঝগড়াটে, হিসেবী ও খোটাদানকারী।

অথচ ঘরের ভেতরে রাসূলের আচরণ কেমন ছিল? তিনি নিজেই তা বলেছেন—

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি যে তাঁর স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম। আর পরিবারের সঙ্গে সদাচরণের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। (সুনানে তিরমিযীঃ ৩৮৩০, সুনানে ইবনে মাজাঃ১৯৬৭)

এবার দেখুন,

কেমন ছিল পরিবারের সঙ্গে রাসূলের আচরণ?

আসওয়াদ বিন ইয়াজিদ (রহঃ) বলেন, ‘আমি আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল (সাঃ) বাড়িতে কীরূপ আচরণ করতেন?’

তিনি উত্তরে বললেন, ‘পরিবারের বিভিন্ন কাজ-কর্মে সাহায্য করতেন। নামাযের সময় হলে অযু করে নামাযের জন্য বের হয়ে যেতেন।’

মা বাবার সঙ্গেও সবসময় সুন্দর আচরণ করতে হবে। অনেকেই অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, হাসোজ্জ্বল চেহারার কথা বলে এবং বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহার করে। কিন্তু বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানের মতো যারা নিকটাত্মীয়, যারা উত্তম আচরণ পাওয়ার অধিক হকদার, তাঁদের সঙ্গে অশোভনীয় আচরণ করে।

যে তাঁর স্ত্রী, সন্তান, মা, বাবা ও অধীনস্থ লোকজনের সঙ্গে তথা ঘরে-বাইরে সবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করে সে-ই উত্তম।

একদিন আবূ লায়লা (রাঃ) রাসূলের কাছে বসা ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ রাসূলের নাতি হাসান বা হুসাইন রাসূলের কাছে চলে এলো। রাসূল (সাঃ) তাঁকে আদর করে কোলে বসালেন।

একটু পরেই সে রাসূলের কোলে পেশাব করে দিল!

আবূ লায়লা বলেন, আমি দেখলাম, রাসূলের কোল থেকে পেশাব গড়িয়ে পড়ছে। আমি দ্রুত রাসূলের কোল থেকে তাঁকে নিতে হাত বাড়ালাম।

রাসূল বললেন, ‘আমার প্রিয় সন্তান’কে আমার কোলেই থাকতে দাও। তাঁকে তোমরা ভয় দেখিও না।’

পেশাব করা শেষ হলে রাসূল পানি আনতে বললেন এবং নিজ হাতেই কোলে পানি ঢেলে দিলেন। (আহমদ ও তাবরানি)

কী চমৎকার নববী আখলাক! উত্তম আখলাক রাসূল (সাঃ) নিজে বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং অন্যদেরকেও তাঁর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এ কারণেই ছোট-বড় তথা আবাল-বৃদ্ধ বনিতা সবাইর হৃদয় তিনি জয় করে নিয়েছিলেন।

সিদ্ধান্ত….

অন্ধকারকে গালি না দিয়ে প্রদীপটি মেরামত করে নাও।

উৎস : আপনার জীবনকে উপভোগ করুন

এরপর পড়ুন : গরীব দুঃখীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন?

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Leave a Comment

error: Content is protected !!