সিন্দাবাদের সাত সমুদ্র অভিযানের গল্প

জনপ্রিয় টিভি সিরিজ আলিফ লায়লা’র সিন্দাবাদের গল্প এটি যা ছোট বড় সবাই শুনতে পছন্দ করে। সিন্দাবাদের সাত সমুদ্র অভিযানের দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর লােমহর্ষক গল্পটি পড়ুন আমার বাংলা পোস্ট.কমে!

সিন্দাবাদের সমুদ্র অভিযান (ছোটদের আরব্য রজনীর সেরা গল্প ৫)

বাগদাদ শহরে এক বিশাল বাড়ি। চলছে উৎসব। খুশবু-আতরের গন্ধে খানা-পিনা। কত অতিথি কত মেহমান। এই বাড়ির মালিকের নাম সিন্দাবাদ। হাসি ঠাট্টায় মশগুল তিনি। অপ্যায়ন করছেন অতিথিদের। খোঁজ খবর নিচ্ছেন ।

সেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল এক দীনহীন কুলি। সারাদিনের ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত চেহারা তার। ঘাম ঝরছে দরদর করে। ক্ষুধায়, পিপাসায় বহু কাতর সে। বাড়ির সামনে এসে চুপ করে বসে পড়ল। গরিবের কত দুঃখ।

ভেতর থেকে সিন্দাবাদ গরিব কুলিকে দেখলেন, প্রহরী পাঠালেন। যাও ওকে ডেকে আনো। গরিব কুলি ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল। কী সুন্দর ঘরের আসাবপত্র। দামি দামি সব জিনিস। চমৎকার ফুলের বাগান। তার মধ্যে সাজানাে-গোছানাে ঘর।

সিন্দাবাদ বললেন, ‘হাত মুখ ধুয়ে তৈরি হও। তারপর তােমার সাথে আলাপ হবে। গরিব কুলি খাওয়া-দাওয়া করল। এমন খাবার সে জীবনে কখনও খায়নি। এরপর তাকে সিন্দাবাদ নিজের ঘরে নিয়ে এলেন। ‘কী নাম তোমার? কী কর?’

‘আমার নাম সিন্দাবাদ, কুলিগিরি করি আমি! হাে হাে করে হেসে উঠলেন সিন্দাবাদ। তুমি তাে আমার মিতা হে। এসো আমরা হাত মিলাই। খানাপিনা শেষ হবার পর সিন্দাবাদ বললেন, আজকে যে অবস্থায় তুমি দেখতে পাচ্ছো একদিন আমার এ অবস্থা ছিল না। বড় বিচিত্র আমার জীবন কাহিনী ; কত উত্থানপতন! কত দুঃখকষ্ট। কত হতাশা বেদনা। একমাত্র পরিশ্রমই পারে মানুষকে বড় করতে। তুমি আশ্চর্য হয়ে যাবে যদি আমার জীবনের পরিশ্রমের সেই সব কাহিনী শুনাে। ‘এই বলে সিন্দাবাদ শুরু করল তার জীবনের গল্প। তার সমুদ্র অভিযানের গল্প।’

প্রথম অভিযানের গল্প!

আমার বাড়ি ছিল বাগদাদে। বাবা ছিলেন একজন সওদাগর। অগাধ টাকাপয়সা, ধন-সম্পত্তি ছিল তার। বাবা যখন মারা গেলেন তখন আমি নিতান্ত শিশু। বাবার সম্পত্তি হাতে পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেল আমার। বন্ধু-বান্ধব জুটিয়ে টাক ওড়াতে লাগলাম। বসে বসে খেলে একদিন রাজভাণ্ডারও উজাড় হয়ে যায়। টাকা-পয়সা ফুরিয়ে গেলে আমার বুদ্ধি উদয় হল। বাণিজ্যে বেরুতে হবে। কিছু মালপত্র কিনে বন্দরে গেলাম। জাহাজে চেপে রওয়ানা দিলাম ছােট বড় সওদাগরদের সাথে।

জাহাজ চলল। উত্তাল নীল জলরাশি। আকাশ মিশে গেছে সাগরের সঙ্গে। চারিদিকে ধু ধু অনন্ত শূন্য!

কয়েকমাস পর। শূন্য শ্যামল এক দ্বীপে এসে জাহাজ নােঙর করল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে যেন বাঁচলাম। একাধারে জাহাজে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছি। দ্বীপে নেমেই গােসল করলাম। কেউ কেউ গাছতলায় শুয়ে-বসে বিশ্রাম করতে লাগল। কাঠ যােগাড় করে রান্নাবাড়ার ব্যবস্থা করতে গেল কেউ কেউ।

এমন সময় কেঁপে উঠল দ্বীপটা : যেন পানির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে। জাহাজের কাপ্তেন চিৎকার করে জানাল, শিগগির জাহাজে ফিরে এসো। এটা দ্বীপ নয়। মস্ত একটা তিমি মাছ। ফিরে এসো সবাই।

আশেপাশের লােকেরা দ্রুত ফিরে গেল জাহাজে। আমরা উঠতে যাব এমন সময় ভুশ করে তিমিটা দিল ডুব। ছিটকে পড়লাম সাগরের পানিতে। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য! হাতের সামনেই পেলাম একটা কাঠের গুড়ি। গুড়িটা ধরে কোনও মতে ভেসে রইলাম : ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে গেল আমার জাহাজটা। মিলিয়ে গেল দিগন্তে।

সাগরের বুকে ধীরে ধীরে নেমে এল সন্ধ্যা। রাত্রি গাঢ় হল। ভাসতে ভাসতে কোথায় চললাম কে জানে। ভোর হল। সূর্য উঠল আকাশে। ছায়ার মতাে তীরের রেখা দেখতে পাচ্ছি। তীর নয় খাঁড়া এক পাথরের দেয়াল। সমুদ্রের মাঝখান থেকে উঠে গেছে এক পাহাড়। কী করে এই পাহাড়ের উপর উঠব? দু-একবার চেষ্টা করলাম। হাত-পা ছড়ে গেল ।

একখানে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম সেখানেই। সকালে দেখি মাথার সামনে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে এক ঝরনা। ফুলের সুবাস আসছে। কয়েকটা ফলের গাছও চোখে পরল। ফল খেয়ে ঝরনার পানি পান করতেই চাঙ্গা হয়ে উঠল শরীরটা। ঝরনাধারার পথ বেয়ে হাঁটা ধরলাম সামনে।

হাঁটতে হাঁটতে টের পেলাম—আমি এসে পড়েছি সমদ্রের ধারে। জায়গাটা খুব সুন্দর। কিন্তু কোনও জনমানুষের সাড়া নেই। দেখতে পেলাম—একটা গাছের ডালে বাঁধা রয়েছে একটা তাগড়া ঘােড়া। ঘােড়া দেখে তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। লাফ মেরে ঘােড়ার পিঠে চেপে বসলাম।

তখুনি চিৎকার আর চেঁচামেচি। ছুটে এল একটা লম্বা-চওড়া লােক –‘কে তুমি? এত দুঃসাহস তােমার! কোত্থেকে এসেছ তুমি?’ দুঃখে কাতর হয়ে সব ঘটনা বললাম লােকটিকে। লােকটির মনে যেন দয়া হল। সে নিয়ে গেল তার গুহায়। ভালাে ভালাে খাবার দিল। বলল—তাদের সুলতানের নাম মিরজান। মিরজানের সৈন্যবাহিনীর ঘােড়া প্রতিপালন করাই তার কাজ। 

আমি সুলতান মিরজানের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। সুলতান বড় ভালাে মানুষ! খুশি হলেন আমার দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনী শুনে। আমাকে বন্দরের প্রধান করে দিলেন।

ছবি: কাঠের জাহাজ। Photo by Henry Simon from Pexels

বেশ ভালাে হল আমার। দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝে মাঝেই মন হু হু করে কেঁদে উঠত বাগদাদের কথা মনে পড়লে। বন্ধুদের কথা ভাবলেই ভারি কান্না পেত! বন্দরে বসে বসে দূর সমুদ্রের পানে তাকিয়ে থাকতাম। আহা, বাগদাদে যাওয়ার কোনও জাহাজ যদি এসে ভিড়ত!

দেখতে দেখতে কত দিন কেটে গেল কে জানে! একদিন এক জাহাজ এসে নােঙর করল বন্দরে। কী কী মালপত্র রয়েছে পরীক্ষা করার জন্য জাহাজে উঠলাম। কাপ্তেন বলল, আমার জাহাজে কিছু মাল রয়েছে অন্য সওদাগরের। সেই সওদাগরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তার মালপত্র পৌছে দেব তার ওয়ারিশদের। কেমন শিরশির করতে লাগল বুকটা আমার। সেই সওদাগরের নাম কী তােমরা জান?

‘হ্যা—তার নাম সিন্দাবাদ।’

চমকে উঠলাম আমি। আত্মহারা হয়ে গেলাম আমি আনন্দে। আমিই, আমিই সেই সিন্দাবাদ। দ্বীপ ভেবে উঠেছিলাম তিমির পিঠে। তিমি ডুবে গেলে ছিটকে পড়ে যাই সাগরের পানিতে। আল্লার দয়ায় বেঁচে গেছি আমি।

জাহাজের কাপ্তেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে চান না। খালাসি আর নাবিকরা আমাকে চিনে ফেলল! আমার খুশি আর তখন দেখে কে! খােলা হল আমার মালপত্র। সুলতানকে মূল্যবান কয়েকটি উপহার-সামগ্রী পাঠালাম। কিছু জিনিশ বিক্রি করে লাভও হল বেশ। সুলতান মিরজানও অমূল্য কিছু অলঙ্কার উপহার দিলেন আমাকে। সবচেয়ে বড় কথা, বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হলাম আমি। ব্যবসাও বেশ জমে উঠল। তারপর একদিন রওনা দিলাম নিজের দেশে জন্মভূমিতে। আমাকে ফিরে পেয়ে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। আবার ফিরে পেলাম সুখের দিন। আবার ওড়াতে লাগলাম টাকা-পয়সা।

নাবিক সিন্দাবাদের কাহিনী শুনে অবাক হয়ে গেল কুলি সিন্দাবাদ। নাবিক সিন্দাবাদ তাকে একশো সােনার মােহর উপহার দিল। আবার এসো। আগামীকাল শােনাব আমার দ্বিতীয় অভিযানের গল্প।

দ্বিতীয় অভিযানের গল্প!

পরদিন। কুলি সিন্দাবাদ ছুটে এল সেই বিশাল বাড়িতে। নাবিক সিন্দাবাদ তখন খেতে বসেছেন। গায়ে তাঁর আলখাল্লা। মাথায় পাগড়ি। ধপধপে একমুখ দাড়ি। কুলি সিন্দাবাদকে পাশে নিয়ে বসালেন। রকমারি ফলমূল আদর করে খাওয়ালেন তাকে।

তারপর শুরু করলেন তাঁর দ্বিতীয় সমুদ্র অভিযানের রােমাঞ্চকর গল্প। প্রথমবার বাণিজ্য করে ফিরে এলাম মৃত্যুর দুয়ার থেকে। অবশ্য টাকা-পয়সা আয় হয়েছিল যথেষ্ট। বছরখানেক বেশ নিশ্চিন্ত মনে খরচাপাতি করলাম। আনন্দে-ফুর্তিতে কাটতে লাগল দিনগুলাে। কিন্তু রক্তে রয়েছে আমার সুদূরে টান। অজানাকে জানার নেশা। দুর্জয়কে জয় করার ইচ্ছে।

আবার লটবহর গােছালাম। মাল-সামান কিনে বাক্স বাধলাম। প্রস্তুত হলাম। এবার নিজের কেনা জাহাজেই রওনা দেব। সাজালাম বাণিজ্যতরী। মাস্তুলে উড়িয়ে দিলাম লাল-নীল পতাকা। নামি ও সাহসী এক কাপ্তেন নিলাম। দক্ষ মাঝি, দক্ষ মাল্লা রইলাম। 

চলল আমাদের জাহাজ। এ-দেশ থেকে ও-দেশ। দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তর। বাজার গঞ্জে চলছে জিনিসপাতির কেনাবেচা। এইভাবে একদিন সুন্দর এক দ্বীপে এসে নােঙর করলাম। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য। সবুজের সমারােহ চারপাশে। গাছের ফল আর ঝরনার জল খেয়ে জুড়িয়ে গেল প্রাণ। মধুর বাতাস বইছে কী এক ভালাে লাগার আবেশে বুজে এল দুই চোখ। নেশায় বিভাের হয়ে কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না।

ফিরে এসে দেখি, জাহাজ নেই। কী ব্যাপার! আমাকে ফেলেই জাহাজ চলে গেছে। শরীর হিম হয়ে এল আমার। এই নিরালা দ্বীপে এখন কী করব আমি, কোথায় যাব? এ কী কঠিন পরীক্ষা আমার? বেশ তাে সুখেই ছিলাম। কেন আবার লোভ হল আমার? হায় হায়—এখন আমি কী করব। কিন্তু হতাশায় ভেঙে পড়লে চলবে না। বিপদের সময় সাহসে বুক বেধে দাড়াতে হবে। 

উঁচ এক গাছের মগডালে চেপে দেখে নিলাম দ্বীপটাকে। দেখি দূরে একটা গম্বুজের মতাে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই গম্বুজে প্রবেশের কোনো পথ নেই। হঠাৎ দেখি—চারিদিকে ঘন অন্ধকার নেমে এল। ঝড়ের কালাে মেঘের মতাে কী যেন ঢেকে ফেলল আকাশটাকে। বুঝলাম, রাত্রি নামেনি। আকাশে মেঘ জমেনি। এ হচ্ছে রকপাখি। দেখতে এরা ছােটখাট পাহাড়ের মতাে। গম্বুজটা আসলে হচ্ছে রকপাখির ডিম। পাখা গুটিয়ে পাখিটা ডিমের ওপরে বসল  তড়িৎ আমার মাথয় বুদ্ধি খেলে গেল। মাথার পাগড়ি খুলে পাখির সাথে নিজেকে বেঁধে নিলাম।

যেই পাখি আকাশে উঠল অমনি আমিও চললাম। উঁচু-উঁচু—অনেক উঁচুতে। পাখিটা নামল গিয়ে একটা পাহাড়ের পাথুরে চূড়ায়। বাঁধন আলগা করে সেখানেই নেমে পড়লাম আমি। কিন্তু হায়! কোথায় এলাম? চারপাশে ভয়ঙ্কর সব সাপ কিলবিল করছে। বিপজ্জনক উপর থেকে বুঝে শুনে নেমে এলাম উপত্যকায়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। কী আশ্চর্য! পায়ের দিকে তাকাতেই দেখি অসংখ্য হাড়ের টুকরো। বিচিত্র বর্ণবাহার। ভয়াল সাপগুলাে পালিয়ে যাচ্ছে যে যার গর্তে। রকপাখির ‘আক্রমণের ভয়ে। সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম আশ্রয়ের সন্ধানে। খিদেয় কাতর আমি। প্রায় মরাে মরাে অবস্থা। সন্ধ্যার সময় একটা নিরাপদ গুহা খুঁজে পেলাম। পা দিয়ে গুহার মুখ আটকে দিতেই ভেতরে দেখি একটা সাপ। কুণ্ডলি পাকিয়ে ডিমে তাপ দিচ্ছে। দেখেই হিম হয়ে গেলাম আমি। তারপর জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরল সকালে।

অনাহারে শরীর যেন বশ হয়ে যাচ্ছে আমার। কোনওমতে টলতে টলতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। চারপাশে পড়ে আছে মাংসের খান্ড। ব্যাপারটা কী? অবাক হলাম। আসলে মাংসখণ্ড দিয়ে হিরে সংগ্রহ করে জহুরিরা। কাঁচা মাংসের গায়ে হিরের কিছু টুকরাে গেঁথে যায়। বাজপাখিরা এসে ছোঁ মেরে মাংসের টুকরোকে তুলে নিয়ে যায় নিজের বাসায়। জহুরিরা সেখান থেকে হিরের টুকরাে সংগ্রহ করে।

মাথায় বিদ্যুতের মতাে বুদ্ধি খেলে গেল। কিছু বড় বড় হিরে কোমরে বেঁধে নিলাম। তারপর একখণ্ড বড় মাংসপিণ্ডের সঙ্গে নিজেকে শক্ত করে বাধলাম। পাথরের ওপর উঁচু হয়ে শুয়ে রইলাম চুপচাপ। কিছুক্ষণ পরেই শোঁ শোঁ করে নেমে এল বিশাল এক বাজপাখি; মাংস ভেবে ছোঁ মেরে তুলে নিল আমাকে। পাখির সঙ্গে উড়ে উড়ে আমিও চললাম : গিয়ে নামলাম আস্তানায়।

একটু পরেই সেখানে এল এক বুড়াে জহুরি। আমাকে দেখে তাে সে অবাক! মানুষের মুখ দেখে ভারি আনন্দ হল আমার। লাফাতে লাফাতে আমি তার কাছে গেলাম। কিন্তু বুড়ো আমাকে দেখে খুশি হয়েছে বলে মনে হল না। চটেমটে সে বলল, ‘তুমি কে? কোখেকে তােমার আগমন। হিরের ভাগ কিন্তু তুমি পাবে না। এ আমার বংশগত অধিকার।

আমি তখন হাে হাে করে হেসে ফেললাম। আপনি ভুল করছেন : আমি ভাগ বসাতে আসিনি আমি একজন সওদাগর। ভাগ্যের ফেরে আজ আমার এই দশা। আমি জানে বাচতে চাই। 

বলেই বড় বড় হিরেগুলাে আমি বুড়ােকে দিলাম। লােভে চকচক করে উঠল বুড়াের চোখ। ‘জন্মেও তাে এ-রকম হিরের টুকরাে আমি পাইনি। ধন্যবাদ। ধন্যবাদ তােমাকে। বলো, তােমার কী বিত্তান্ত? কোখেকে তুমি এলে এখানে? হিরের টুকরেই-বা সংগ্রহ করতে কীভাবে?’ জহুরিকে তারপর সব কথা বললাম। বুড়াে জহুরি জানাল, ‘আজ পর্যন্ত ঐ পাহাড় থেকে কেউ বেঁচে ফিরতে পারেনি। তােমার সাহস আছে বটে । স্রেফ ভাগ্যের জোরেই তুমি বেঁচে এসেছ।

বুড়াের সঙ্গে গেলাম ওদের তাঁবুতে। ভরপুর খাওয়া-দাওয়া করে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। সকালে ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, দেহমন বেশ ঝরঝরে। বুড়াের সঙ্গেই এলাম সমুদ্রের ধারে। একটা সওদাগরি জাহাজে চেপে এলাম কপূরদ্বীপে। হিরে বিক্রি করে সােনার মুদ্রা সংগ্রহ করলাম। কপূর-দ্বীপে রয়েছে একধরনের গাছ। এই গাছের রস থেকে কপূর পাওয়া যায়। অবশ্য এখানে এসে ভয়ঙ্কর এক জানােয়ারের সাক্ষাৎ পাই। নাম এদের কারকাড়ন। দেখতে অনেকটা গণ্ডারের মতাে। বড় বড় হাতিকে পর্যন্ত এরা অনায়াসে মেরে ফেলতে পারে। জাহাজে চেপে আবার রওনা দিলাম অন্য দ্বীপের উদ্দেশ্যে। এই বন্দর থেকে সেই বন্দর। এই দেশ থেকে অন্য দেশ।

তারপর একদিন বাণিজ্যতরী এসে ভিড়ল বাগদাদে। বহুদিন বাদে জন্মভূমিতে এসে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম আমি। খুশিতে মেতে উঠলাম আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে  হৈ-হল্লা করে আনন্দেই দিন কাটতে লাগল আমার।

আগামীকাল দেখি, তােমাকে তৃতীয় সমুদ্র অভিযানের গল্প শোনাব। সে-ও জীবনের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা ; কুলি সিন্দাবাদ আজও একশ সােনার মােহর নিয়ে বিদায় নিল । নাবিক সিন্দাবাদ ভাবতে লাগলেন, তৃতীয়বারের সমুদ্র অভিযানের দুঃসাহসিক গল্প।

তৃতীয় অভিযানের গল্প!

পরদিন আবার এল কুলি সিন্দাবাদ। ধুমসে খানাপিনা চলল। নাবিক সিন্দাবাদ শুরু করলেন তাঁর তৃতীয় সমুদ্র অভিযানের গল্প।আনন্দেই কেটে গেল একটা বছর। তারপর আবার উড় উড় হয়ে উঠল আমার মন। ভুলে গেলাম বিপজ্জনক সেইসব দিনের কথা। অলসভাবে জীবন ধারণ করা আমার রক্তে নেই। আবার জাহাজে চেপে বসলাম। পালে লাগল হাওয়া, যাত্রা হল শুরু।এবারে সঙ্গে নিলাম আরবের আতর আর বাগদাদের হাতের কাজ-করা মূল্যবান শৌখিন সামগ্রী। 

বন্দরে বন্দরে নামি ; সওদা বিক্রি করি। প্রচুর লাভ হয়৷ মন নেচে ওঠে আনন্দে : জাহাজ চলছে তাে চলছেই। একদিন কাপ্তেন চিৎকার করে জানাল: ‘সর্বনাশ! আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। সামনেই রয়েছে বাঁদর-দ্বীপ।

জাহাজ ঘোরানাের অনেক চেষ্টা করলেন কাপ্তেন। লাভ হল না কোনও। জাহাজ গিয়ে ঠেকল বাঁদর-দ্বীপের চরায়। হাজার হাজার বাঁদর এসে ঘিরে ধর জাহাজ। পাটাতনে উঠে দাঁতমুখ খিচিয়ে অসভ্যতা শুরু করলে ওরা। বিকট ওদের চিৎকার। বীভৎস ওদের চেহারা। ধাক্কা দিয়ে আমাদের নামিয়ে দিল জাহাজ থেকে তীরে। ওরা তখন নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে চলে গেল মাঝ সাগরে।

সব হারিয়ে অকূল দ্বীপে নেমে অনেকেই তখন কান্নাকাটি শুরু করেছে। এখন কী উপায়? কিন্তু বিপদে ভেঙে পড়লে চলবে না। অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানিয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে বেরোলাম। ঝরনার জল আর গাছের মিষ্টি ফল খেয়ে শান্তি এল প্রাণে। এখন দরকার আশ্রয়। এগিয়ে চললাম সামনে। গাছপালার ফাক দিয়ে দেখা গেল মনােরম এক রাজপ্রাসাদ, কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। পচা মাংসের দুর্গন্ধ পেলাম। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের হাড়গোড়। ভয়ে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

বিকট শব্দে জ্ঞান ফেরে আমাদের। সূর্য তখন ভুবতে বসেছে। তাকিয়ে দেখি সামনেই এক বিরাট দৈত্য। দেখতে কুৎসিৎ এবং ভয়াবহ : প্রথমেই আমাদের কাপ্তনের মুণ্ডটা টেনে ছিড়ে খেয়ে ফেলল সে। কারণ কাপ্তেন ছিল বেশ তাগড়া এবং মোটাসােটা’ তারপর কাপ্তেনকে খেয়ে, হাড়গােড়গুলাে ছুড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। আয়েশ করে ঘুম দিল প্রাসাদের দােরগোড়ায়। আমাদের তখন কী অবস্থা তা না বলাই ভালো। রাত কাটল কোনওমতে। সকলে দৈত্যটা চলে গেল আপন কাজে। সকালে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাঁদরে উৎপাতে আবার ফিরে এলাম সেই প্রসাদে। পরদিনও ঘটল সেই একই ব্যাপার। আরেকজনের মুণ্ড চিবিয়ে খেল সেই দৈত্য।

এরপর আমি সবাইকে বললাম, মরতে যদি হয় তবে এইভাবে নয়। সারাদিন কষ্ট করে সবাই মিলে একটা ভেলা বানালাম। চুলায় আগুন জ্বালিয়ে লােহার শিক গরম করল।

সন্ধ্যায় এলাম সেই ভৌতিক দৈত্যপুরীতে। আবার একজনের প্রাণ গেল। ঢেঁকুর তুলে ঘুমাল সেই দৈত্য। আমরা এবার গরম লােহার শিক গেঁথে দিলাম দৈত্যের চোখে। ভয়ঙ্কর আর্তনাদ করে উঠল দৈত্যটা : কিন্তু চোখে সে দেখতে পারল না কাউকে। আমরাও প্রাণভয়ে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পালিয়ে গেলাম। চেপে বসলাম তৈরি করা ভেলায়। দৈতটা পাগলের মতাে ছুটতে ছুটতে এল তীরে। প্রচণ্ড বেগে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল ভেলা লক্ষ্য করে। পাথরের আঘাতে দু-একজন মারাও গেল আমাদের মধ্যে।

একটানা দুইদিন দুইরাত্রি চললাম আমরা। অজানা আরেক দ্বীপে এসে আমাদের ভেলা ভিড়ল। সারা দ্বীপ জুড়ে রয়েছে বিরাট বিরাট সাপ। বিশাল হাঁ করে গােটা মানুষটাকে গিলে ফেলে তারা। বিপদের পর বিপদ। এখন বাঁচব কী করে? অনেক কষ্টে রাতটা আমরা একটা বড় গাছের ডালে চেপে কাটিয়ে দিলাম! ইতিমধ্যে দু-একজন সঙ্গীসাথী সাপের পেটে চলে গেছে। আমি আতঙ্কে দ্বীপ ছেড়ে পালানাের কথা ভাবলাম। বিবেক সায় দিল না। সারা শরীরে কাঠের পাটাতন বেঁধে শুয়ে রইলাম। সাপে খেয়ে ফেললেও হজম করতে পারবে না। হলও তাই। একটা সাপ সারা রাত কসরত করল লাভ হল না কিছুই।

পরদিন দ্বীপের কুলে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দূরে দেখা যাচ্ছে একটা জাহাজের আভাস। পাগড়ি খুলে জোরে জোরে দোলাতে লাগলাম । কাপ্তেন আমায় খেয়াল করলেন, জাহাজ এসে ভিড়ল। ওরাই আমাকে খাওয়াল। সাজপোশাক দিল। আমার দুঃসাহসিক কাহিনী শুনে খালসিরা খুব প্রশংসা করল আমার। কাপ্তেন বললেন, ‘আরা বেরিয়েছি বাণিজ্যে। তুমিও তাে সওদাগর। ভাগ্যের ফেরে আজ নিঃস্ব। কিন্তু আমার কাছে আরেক হতভাগ্য সওদাগরের জিনিসপত্র রয়েছে। এগুলো বিক্রি করে লাভটা তুমি নিও। আসল দামটা আমি সেই নাবিকের আপনজনদের ফেরত দিয়ে দেব। মালপত্র দেখে তাে আমি অবাক! এ তো আমারই সম্পদ। বাক্স পেটরায় লেখা আছে সিন্দাবাদ। দ্বিতীয় অভিযানের সময় এক জাহাজ আমাকে এক দ্বীপে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। সেই জাহাজের মালপত্রই এগুলাে। কাপ্তেন বলল, ‘দায়মুক্তি ঘটল আমার। এগুলাে পেয়েছি আমি আরেক জাহাজ থেকে। সত্যি তুমি ভাগ্যবান।’

সওদাপাতি বিক্রি করে ভালােই লাভ হল আমার। ব্যবসা-বাণিজ্য সার্থক। হাসতে হাসতে প্রচুর অর্থ বিত্ত নিয়ে দেশে ফিরে এলাম। আগামিকাল শােনাব চতুর্থ অভিযানের গল্প। কুলি সিন্দাবাদকে আজও একশো মােহর নিয়ে বিদায় করল বুড়াে সিন্দাবাদ।

চতুর্থ অভিযানের গল্প!

চতুর্থ অভিযানে প্রচুর লাভ হয়েছিল আমার। দিন কাটছিল পরম সুখে। কিন্তু ঘর ছাড়ার নেশা যার আছে সে কীভাবে স্থির থাকে? একঘেয়ে বিলাসবহুল জীবন আমার ধাতে সইল না। আবারও মাথায় চাপল বিদেশ যাবার ভূত।

এবার সঙ্গে নিলাম রংবাহারী দামি দামি জিনিস। যা বিদেশের হাটে সহজে মেলে না। দিনক্ষণ দেখে চেপে বসলাম জাহাজে। দিনের পর দিন যায়। জাহাজ চলল তাে চললই। আকাশের ঈশান কোণে কালাে মেঘ দেখে একদিন কাপ্তেন বলল, ‘ভয়ঙ্কর ঝড় উঠবে এখন। জাহাজ এগোবে না আর। এখানেই নােঙর ফেলতে হবে।’ ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গেল আমাদের। মাঝ দরিয়ায় ঝড় প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল ।

আমি একটা কাঠের টুকরাে ধরে ভাসতে লাগলাম। ভাসতে ভাসতে এসে পৌছলাম সাগর সৈকতে। পড়ে রইলাম মরার মতো। সকালে টের পেলাম, আমার সাথীদের অনেকেই বেঁচে আছে। সমুদ্রতীরে একটা সাদা রঙের বাড়ি দেখতে পেলাম। আমাদের দেখেই একদল কালাে মানুষ হৈ হৈ করে ঘিরে ধরল। কথা নেই, ইশারায় আমাদের ভিতরে নিয়ে গেল ওরা। বিশাল এক সিংহাসনে বসে আছেন তাদের সম্রাট।

তিনি আমাদের বসতে বললেন। খাবার এল আমাদের জন্য! দেখতে অদ্ভুত মাংস, আমি মুখে নিতে পারলাম না। সঙ্গীরা খিদে-পেটে গােগ্রাসে তাই খেল। সাবাড় করে ফেলল সব। 

আমি বুঝতে পারল, এই কালাে লোকগুলো নরমাংসভােজী। ওরা মানুষের মাংস খায়। মানুষ ধরে এনে ওদের খাইয়ে-দাইয়ে মােটা বানায় আদর-যত্ন করে শরীরে চর্বি জমলে জ্যান্ত মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে কাবাব বানায়। সম্রাট এই কাবাব খেতে ভারি পছন্দ করেন।

এইসব জানার পর খিদে ভুলে গেলাম আমি : জীবন ধারণ করতে লাগলাম শুধু পানি খেয়ে। একজন পাহারাদার নিয়ে যেত বনে। গাছ থেকে ফলমূল পেড়ে খাওয়াত। আমি ছুঁয়ে দেখতাম না কিছুই। দিনে দিনে শুকিয়ে কড়িকাঠের মতাে হয়ে গেলাম আমি : আমার বন্ধুরা খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিয়ে মোটা হতে লাগল। একদিন বনে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম আমি। রােগা পটকা, শুকনাে বলে পাহারাদার আমাকে বড় অবহেলা করে। “কিরে কী হয়েছে তাের? অসুখ করেছে? থাক ব্যাটা তুই পড়ে। তােকে তাে খাবে শকুনেরা।

আমাকে বনে ফেলে রেখেই পাহারাদার চলে গেল। এই রকম সুযােগের অপেক্ষাতেই আমি ছিলাম। সাত দিন সাত রাত হাঁটার পর নতুন এক দেশে এলাম আমি। সেই দেশে দেখলাম, আমারই মতাে সব লােকজন। কথা হল আমারই ভাষায়।

ওরা জিজ্ঞেস করল, কে তুমি? কেন তােমার এই দশা? আমি ওদের সবিস্তারে আমার দুঃখের কথা বললাম। শুনে ওরা বিস্মিত হল। পরম মমতায় ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল আমাকে। পেটপুরে খাওয়াল। জাহাজ চাপিয়ে নিয়ে গেল ওদের সুলতানের দরবারে। তিনি একটা দ্বীপে চমৎকার প্রাসাদে থাকেন । শহরটাও ভারি সুন্দর । একদম বাগদাদের মতাে। তাগড়াই ঘােড়া উট গাধা সবই রয়েছে এখানে। কিন্তু অবাক হলাম। -লাগাম ছাড়া, জীন ছাড়া, ঘােড়া চালায় এরা।

সুলতানকে বললাম, ‘জীন-লাগাম বানিয়ে দেব আমি। শুধু আরামের নয়, দেখতেও খুব সুন্দর লাগবে তাতে। সুলতান রাজি।

একজন ছুতের-মিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে চমৎকার গদি বসানাে কাঠের জীন বানিয়ে দিলাম। সােনার জরিতে কাজ করে দিলাম। তাগড়াই এক ঘােড়ায় লাগালাম সেই জীন আর লাগাম । ঘোড়ার যে এমন সাজ হতে পারে সুলতান তা ভাবতেই পারেননি ! মহা খুশি তিনি! তখুনি লাফিয়ে উঠলেন ঘোড়ার পিঠে। আমির ওমরাহরাও সাবাস সাবাস করতে লাগল।

সুলতান তার এক পরমা সুন্দরী কন্যার সাথে আমার বিয়ে দিলেন। কন্যা যেমন রূপ তেমন বিদূষী । সুলতানের বড় প্রিয়পাত্র হলাম আমি। বিয়ের পর আমার জীবনের মােড় ঘুরে গেল। বড় আনন্দে কাটতে লাগল প্রতিটি দিন  রাজপ্রাসাদে কন্যার আদর-যত্নে সুখ যেন উপচে পড়তে লাগল। এত সুখে থেকেও মনে পড়তাে দেশের কথা। বন্ধুবান্ধব-পরিজনদের কথা। ভাবতাম আবার ফিরে যাব । কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। একদিন আমার প্রতিবেশীর বউ মারা গেল। সে কী কান্নাকাটি তার! আমি তাকে বােঝানাের চেষ্টা করলাম। শােকে এত ভেঙে পড়লে চলে না। কিন্তু তার কাছ থেকে সাংঘাতিক এক খবর শুনলাম। এদেশের বড় ভয়ঙ্কর আইন। বউ মারা গেলে বউয়ের সঙ্গে স্বামীকেও যেতে হবে কবরে। মৃত্যু একেবারে নিশ্চিত!

শরীর শিউরে উঠল আমার। এ কী রকমের প্রাণদণ্ড! ছুটে গেলাম সুলতানের কাছে ; বললাম, আমার বউ যদি আগে মারা যায়, আমাকে কি তার সাথে মরতে হবে?’ সুলতান বললেন, নিশ্চয়ই। আইন সবার জন্যে সমান। এদেশের নিয়ম আমাকে মানতেই হবে ।

কথায় আছে, কপাল যার খারাপ বিপদ তার অসবেই। হলও তাই। আমার বউ কয়েকদিনের মধ্যেই কঠিন অসুখে পড়ল। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত্রি হয়। আমার বউ সত্যি সত্যি মারা গেল। আমার অবস্থা তখন বুঝতেই পারছ ! পালাব সে পথ নেই। সুলতানের কাছে অনেক মিনতি করলাম। সুলতান বললেন, ‘শাস্ত্রের বিধান। সংসারের মায়া ত্যাগ কর। হাসিমুখে মৃত বউয়ের সঙ্গে কবরে যাও।

আমার বউকে সাজানাে হল সাদা কাপড়ে। পরানাে হল দামি দামি গয়না । লাশ নিয়ে দলেবলে লােকেরা চলল পাহাড়ের ধারে! একটা গভীর কুয়ার সামনে দাঁড়ালাম। বউয়ের লাশটা নামিয়ে দেয়া হল নিচে। এবার আমার পালা। আমাকেও নিচে নামাল ওরা। তারপর পাথর-চাপা দিয়ে কুয়াের মুখ বন্ধ করে দিল । আমাকে সঙ্গে দিল সাতখানা রুটি। এক কলসি পানি। আমি কুয়াের তলায় বসে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলাম। সারাটা দিন সারাটা রাত কেটে গেল আধামরার মতাে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। পরদিন ঘুম ভাঙল। পেটে প্রচণ্ড খিদে। এক টুকরাে রুটি খেলাম । চারদিকে ভালাে করে তাকিয়ে দেখি, অসংখ্য মরা মানুষের হাড়গােড় পড়ে আছে। একদিন রুটি ফুরিয়ে যাবে। অনাহারে আমারও অবস্থা হবে ওরকম।

 দেখতে দেখতে সাতদিন কেটে গেল। খাব না, খাব না করেও রুটির শেষ টুকরােটা খেয়ে ফেললাম। তারপর শুরু হল খিদের জ্বালা। একদিন এক বুড়াে এল তার বিবির মৃতদেহের সঙ্গে। ন্যায়-অন্যায় তখন বুঝি না। হাড়ের আঘাতে বুড়ােটাকে হত্যা করলাম। বেশ কয়েকদিন কাটল বুড়াের রুটি আর পানি খেয়ে। মানুষের কাছে তার নিজের জীবন সবচেয়ে প্রিয়। জীবন্ত কেউ এলেই তাকে আমি হত্যা করি। কেড়ে খাই তার খাবার!

এইভাবে অনেকদিন বেঁচে রইলাম আমি। একদিন শুয়েছিলাম। হঠাৎ অদ্ভুত এক শব্দে ধড়মড় করে জেগে উঠলাম। অন্ধকারে মনে হল, কোনও প্রাণী ছুটে যাচ্ছে। হাড়ের ডাণ্ডা হাতে তার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকি। এইভাবে অনেকক্ষণ চলার পর হঠাৎ আলাের ঝলকানি এসে পড়ল আমার মুখে। আলোর নিশানা ধরে এবার এগিয়ে চললাম। আলাে আমার আলাে। আলাের বন্যায় ঝলসে গেল আমার চোখ। খুঁজে পেলাম মুক্তির পথ।

হিংস্র জন্তুরা মরামানুষ খাবার লােভে পাহাড়ের গা কেটে তৈরি করেছে এই সুড়ঙ্গ। মুক্ত হওয়ায় প্রাণ ভরে নিঃশাস নিলাম। সমুদ্রের ধারে দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলাম অপলক। যদি কোনও জাহাজ দেখা যায়! রাত্রে ফিরে গেলাম সেই মৃত্যুকূপে । এবারে মরা মানুষের শরীর থেকে সংগ্রহ করলাম মূল্যবান হিরে-মানিক, চুনি-পান্না : সাদা কাপড়ের পুঁটলি বেঁধে নিয়ে বসে রইলাম সমুদ্র-ধারে।

দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর একখানা জাহাজ দেখতে পেলাম। মাথার পাগড়ি খুলে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম কাপ্তেনের। ভাগ্য সহায় হল। জাহাজে চাপতেই কাপ্তেন সুধালেন, কে তুমি? হিংস্র জন্তু-জানােয়ারের দেশে এলেই-বা কী করে? এখানে তাে আজ পর্যন্ত কোনাে মানুষের ছায়া দেখিনি। আমি শোনালাম বিচিত্র অভিযানের কাহিনী। হিরা-মানিক সংগ্রহের অংশটুকু চেপে গেলাম। শুধু দামি গয়না উপহার দিলাম কাপ্তেনকে। কাপ্তেন তা গ্রহণ করলেন না। বললেন, “তুমি নিঃস্ব। এই দুনিয়াটা হচ্ছে সরাইখান আজ আছি কাল নেই। আমরা যদি কারও উপকারে আসতে পারি সেটাই তাে বড় কথা।

জাহাজের খােলা পাটাতনে বসে বসে দিন কাটতে লাগল আমার। ঘন নীল পানির দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি, কারও জীবনে কি এসব ঘটনা ঘটতে পারে? বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না এসব কথা।

‘একদিন জাহাজ এসে ভিড়ল বসরার বন্দরে। বাগদাদে গিয়ে আবার আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হলাম! সে কী আনন্দ তখন! সাত সাত চৌদ্দ দিন লােকজনদের ভুরিভােজন করলাম। প্রচুর টাকা-পয়সা দান করলাম গরিবদের।

বুড়াে সিন্দাবাদ নাবিকের চোখে মুখে উজ্জ্বল আলাে। বললেন, ‘আগামীকাল শােনাব পঞ্চম অভিযানের কাহিনী। কুলি সিন্দাবাদ আজও একশো সােনার মােহর পেল। তারপর চলল খাওয়া দাওয়া। সেদিনের মতাে ভঙ্গ হল দুঃসাহসিক সমুদ্র অভিযানের গল্পের আসর।

পঞ্চম অভিযানের গল্প!

বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আনন্দেই দিন কাটতে লাগল আমার। ভুলে গেলাম দুঃখ-কষ্ট-মাখা দিনগুলাের কথা। মন যেন বলতে থাকে, আবার বাণিজ্যে যেতে হবে। সিন্দাবাদ বেরিয়ে পড়, ঘরের কোণে বন্দি হয়ে থাকা তােমার ধর্ম নয়। তােমার রক্তে ঘর ছাড়ার দুরন্ত বাসনা।

আনকোরা নতুন জাহাজ কিনে বােঝাই করলাম মাল-সামান। মােটা মাইনেয় বহাল করলাম অভিজ্ঞ এক কাপ্তেনকে। সঙ্গে নিলাম চাকর-নফর-বান্দা। কয়েকজন বাছাই করা সওদাগর নিলাম।

বসরাহ থেকে যাত্রা শুরু হল আমাদের । চলার পথে অনেক শহর বন্দর। আমাদের দেশের জিনিশ তাদের কাছে বিক্রি করি। তাদের দেশের জিনিশ কিনে নিই। অন্য দেশে চড়া দামে বিক্রি হবে এই আশায়।

একদিন এলাম এক অজানা দ্বীপে। লােকজন নেই। শুধু বন-জঙ্গল আর ধু ধু প্রান্তর। দূর থেকে দেখা গেল গোল এক গম্বুজ। বুঝলাম এ হচ্ছে রকপাখির ডিম। সঙ্গীরা বলল, আপনি এই ডিম আগে দেখেছেন। আমরা দেখিনি। জাহাজ ভেড়ানাে হােক। দেখে আসি।

জাহাজটা নােঙর করা হল।

হৈ হৈ করে ওরা ডিম দেখতে গেল। আমি জাহাজেই রইলাম। কিছুক্ষণ পর এরা ফিরে এল ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে । শুনে আমার হৃদপিণ্ড কাঁপতে লাগল। ডিম দু’টোকে নড়ানাের চেষ্টা করেছিল ওরা। তারপর মহা উল্লাসে পাথর ছুড়ে ডিম দুটো ভেঙে ফেলেছে।

আমি বললাম, ‘সর্বনাশ। রকপাখি মানুষের কোনাে ক্ষতি করে না। ওদের অনিষ্ট করলে আর রক্ষা নেই। নােঙর ওঠাও। জাহাজ ছাড়ো শিগগির।

দ্রুত জাহাজ নিয়ে চলে এলাম আমরা মাঝ দরিয়ায়। ভাবলাম—বিপদ বুঝি কেটে গেছে ! কিন্তু না! দূর আকাশে দেখলাম-কালাে দুই খণ্ড মেঘ। হয়তাে তুফান উঠবে। সে আমাদের ভুল । দুটি রকপাখি শো শো করে নেমে এল নিচে। পায়ে ধরা বিশাল দুটো পাথরের খণ্ড।

তারপর আর কী!

একটি পাথর চাপা পড়ে অনেকে মরল! অন্য পাথরের আঘাতে জাহাজ গেল ডুবে? কে কোথায় গেল বলতে পারব না। একখণ্ড ভাঙা জাহাজের কাঠ ধরে ভাসতে লাগলাম আমি। ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চললাম। অবশেষে এলাম এক দ্বীপের কিনারে । শরীরে শক্তি বলে কিছু নেই। মনে সাহস নিয়ে ঢুকলাম দ্বীপের ভেতরে।

দেখি এক মনােরম বাগান। রংবাহারী ফল ফুল। ঝকঝকে ঝর্ণা। সুন্দর পাখি। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। বাগানেই বসে রইলাম । রাত নামলে ভয়ে গা ছমছম করতে লাগল। সকাল হতেই দ্বীপটা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।

চোখে পড়ল ছোট্ট একটা জলপ্রপাত। পাশে একটা সাঁকো। ওখানে রয়েছে এক বুড়ো। ভাবলাম, আমারই মতাে হতভাগ্য কেউ । বুড়াের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলাম। কিন্তু সে কোনও জবাব দিল না। চোখের ইশারায় বােঝাল—তার চলার শক্তি নাই। কাঁধে করে তাকে বাগানের ঝর্ণার তলায় নিয়ে যেতে হবে।

এ আর বেশি কথা কী। অক্ষম বুড়ো মানুষের উপকার করা উচিত। বুড়ােকে কাঁধের ওপর বসালাম। দুহাত দিয়ে সে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। ঝর্ণার পাশে এসে তাকে নামাতে চেষ্টা করলাম! বুড়াে নামবে না। বরং শক্ত করে চেপে ধরল আমার গলা। যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আমি মরে যাব।

আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে। বুড়াের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা। বুড়াে লাথি মারল তলপেটে ব্যথায় আর্তাদ করে উঠলাম। বুঝলাম, বুড়াের গায়ে অসুরের বল। প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমার নেই।

আমার কাঁধে চেপে সে গাছের ফলমূল খায়! ঝরনার জল খায়। দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। রাতেও সে আমাকে চেপে ধরে শুয়ে থাকে। আমি যেন তার হাতের খেলার পুতুল। এইভাবে দিনের পর দিন লোকটার অমানুষিক অত্যাচার চলতে লাগল। আমি ভেবে পাই না, কী করে এর হাত থেকে রক্ষা পাব। একদিন ঢুকলাম আঙুর বাগানে। বুদ্ধি খেল তখন। লাউয়ের খােসায় অনেকগুলাে আঙুর পুরে মুখটা এঁটে রেখে দিলাম মাটির তলায়! বুড়াে অবশ্য ঘাড়ে বসে সবই দেখল। কয়েকদিনেই আঙুর পচে টলটলে মদ তৈরি হল। কয়েক চুমুক খেতেই দেখি বেশ চাঙ্গা লাগছে। ধেই ধেই করে নাচ শুরু করলাম আমি। ঘাড়ের ওপরের বােঝাকে আর বােঝা মনে হল না। বুড়ােও সব দেখল। আঙুরের রস খেয়েই আমার শক্তি বেড়েছে। তার শক্তি দরকার ! ইশারায় সে লাউয়ের খোলটা চাইল। বেশ মিষ্টি টকটকে স্বাদ। ঢক ঢক করে সবটুকুই খেয়ে ফেলল। অতখানি কড়া মদ পেটে পড়ায় বুড়াে নেশায় বুদ হয়ে গেল! হাত-পায়ের বাঁধন আলগা হয়ে এল তার। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে আমি তাকে মাটিতে ফেলে দিলাম। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল সে। আমার মাথায় তখন প্রতিশােধের খুন উঠেছে। আবার কোনদিন কার সর্বনাশ করবে এই শয়তান বুড়াে, কে জানে! একখণ্ড পাথর নিয়ে ঠুকে দিলাম ওর মাথায়। লােকটা গােঙাতে লাগল। মাথাটা গুঁড়াে গুড়াে হয়ে গেছে তার।

এইভাবে শয়তানের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে ভারি আনন্দ হল আমার। গান গাইতে গাইতে গেলাম সমুদ্রের তীরে। তখন সবে একখানা জাহাজ কিনারায় ভিড়ে নোঙর করেছে। নেমে এল কাপ্তেন আর মাঝি-মাল্লারা। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, এই দ্বীপে কেন নামলেন আপনারা? তারা জানাল, ‘জানি সব। তবে এখানে ঝরনার পানি বড় মিষ্টি। ফলমূল সংগ্রহ করে আবার চলে যাব। কিন্তু তুমি এখানে কেন?’ 

সংক্ষেপে আমার দুর্ভাগ্যের কাহিনী বললাম ওদের। তারা আমাকে জাহাজে তুলে নিল। ওরাই নতুন পােশাক-আশাক দিল। হাতে পয়সা দিল। দিন চলতে লাগল ওদের দয়াতেই।

কিছুদিন চলার পর চমৎকার এক বন্দরে আমাদের জাহাজ ভিড়ল। দ্বীপটার নাম বদ-শহর। এখানে শুধু নারকেল হয়। সব জায়গায় নারকেলের খুব চাহিদা ‘আমি আগে কখনও এই ফলটি দেখিনি। নারকেল পাড়ার কায়দাটিও বেশ মজার। থলে ভর্তি পাথরের নুড়ি ভরে নিল সবাই। দল বেঁধে গেল নারকেল বাগানের ধারে। লম্বা লম্বা গাছ। গাছের মাথায় বাঁদরের বসবাস। আমরা পাথর ছুড়ে মারতে লাগলাম। বাঁদুরেরা গাছ থেকে নারকেল ছিড়ে ছুড়ে মারতে লাগল আমাদের লক্ষ্য করে। সেই নারকেল সংগ্রহ করতে লাগলাম আমরা। জাহাজ বােঝাই করলাম নারকেলে।

বন্দরে বন্দরে বিক্রি করতে লাগলাম সেগুলাে। হাতে বেশ পয়সা এসে গেল আমাদের। কাপ্তেন ছিলেন বড় ভালো মানুষ এবং দুঃসাহসী। তিনি বললেন, “এবার যাব আমরা মুক্তো-সাগরে। ঝিনুকের খােলে মুক্তো পাওয়া যায়। ভাগ্য ভালো থাকলে মুক্তো সংগ্রহ করে প্রচুর টাকা আয় করা সম্ভব। আমার সৌভাগ্য। অধিকাংশ ঝিনুকেই বড় বড় মুক্তো পেলাম আমি। হাতে অনেক টাকা এসে গেল। মন চঞ্চল হয়ে উঠল তখন বাড়ির জন্য। জাহাজ ছেড়ে নৌকা ভাড়া করে বসরা হয়ে গিয়ে উঠলাম আমি। সেখান থেকে বাগদাদে। নিজের দেশে। নিজের ঘরে। ‘বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সুখে-স্বচ্ছন্দে দিন কাটতে লাগল আমার।

ষষ্ঠ অভিযানের কাহিনী!

পরদিন সকালে আবার এল কুলি সিন্দাবাদ। নাস্তাপানির পর শুরু হল ষষ্ঠ অভিযানের কাহিনী।

একদিন গিয়েছি বন্দরে ঘুরতে। দেখি সেখানে কয়েকজন বিদেশি সওদাগর। কথাবার্তায় বুঝলাম-বাণিজ্যে বেরিয়েছে ওরা। রক্ত চনমন করে উঠল আমার । বললাম, আমিও যাব । আমাকে সঙ্গে নেবেন? ওরা বলল, ‘ভারি আনন্দের কথা! মালপত্র বাধাছাদা করে জাহাজে চেপে বসলাম। নিরুদ্দেশের পথে আবার যাত্রা। নতুন নতুন নোঙর করি। সওদাপত্র ফেরি করি। কত অজানা দেশ দেখা হয়।

একদিন রাতে। কাপ্তেনের চিৎকারে ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। অজানা অচেনা সমুদ্রে এসে পড়েছি। কী হবে কিছুই জানি না। এদিকে ঝড় উঠেছে সমুদ্রে। প্রবল ঝড়! তুফানের দাপটে উথালপাতাল করতে লাগল জাহাজখানা। ডুবাে পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চুরমার হয়ে গেল সব। আমি দিশেহারার মতাে পাহাড়ের এবড়ো খেবড়াে পাথর আঁকড়ে ধরে কোনওরকমে পড়ে রইলাম! মানুষজন, জিনিশপাতি কোথায় গেল কে জানে।

পাহাড়টা খাডড়া উঠে গেছে। উপরে উঠার আশা দুরাশা। তবে লক্ষ করলাম, পাহাড়টা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে শুরু হয়েছে একটা দ্বীপ। অনেক কষ্টে সেই দ্বীপে পৌছলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখি, সেই দ্বীপে পড়ে আছে শত শত জাহাজের ভাঙা টুকরাে। পথ হারিয়ে কত জাহাজ যে চুরমার হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই : বাক্স-প্যাটরা মালপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

একটু এগােতেই চোখে পড়ল, ছােট্ট একটা নদী এগিয়ে চলেছে কুলকুল করে। নদীটা এঁকেবেঁকে পাহাড়ের এক গুহার মধ্যে গিয়ে হারিয়ে গেছে। নদীটার দুই তীরে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নুড়ি পাথর। আসলে সেগুলাের বেশির ভাগই হচ্ছে হিরা চুনি পান্না। অপূর্ব সব রত্ন। সূর্যের আলােয় সেখানে বহু বিচিত্র রঙের খেলা! এই অতুল সম্পদের অবশ্য এখানে কোনও মূল্যই নেই। মানুষ হয়তাে এগুলো সংগ্রহই করতে পারবে না কোনওদিন।

প্রচুর সম্পদ এই দ্বীপে। কিন্তু কোনও খাদ্যদ্রব্য নেই। খিদের জ্বালয় হন্যে হয়ে ঘুরলাম। খিদের যে কী কষ্ট তা কীভাবে বােঝাই । নিজের ওপর রাগ হল কেন আবার বাণিজ্যে বেরিয়েছিলাম। কী দরকার ছিল? এখন জনশূন্য এই দ্বীপে না খেয়ে মরতে হবে আমাকে। কেউ মনেও রাখবে না আমার কথা।

হঠাৎ আমার খেয়াল হল, আচ্ছা এই যে ছােট্ট নদী—এর উৎস কোথায়? মত্যু যখন অবধারিত তখন নদীর জলে ভেসেই রওনা দেয়া যাক। কয়েক বস্তা মণি-মাণিক্য সংগ্রহ করে কাঠের ভেলায় রওনা দিলাম। ভেলাটা এক সময় ঢুকে গেল সুড়ঙ্গের মধ্যে। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। পথ যেন আর ফুরােয় না। সময়-সময় জ্ঞান লুপ্ত হল আমার। সবার মতাে চলেছি তাে চলেছি।

হঠাৎ একদিন জ্ঞান ফিরল আমার। টের পেলাম, ঘাসের জমিতে শুয়ে আছি আমি। আমার চারপাশে অনেকগুলো উৎসুক মুখ। কেউ কারও কথা বুঝি না । কিন্তু ওদের চেহারায় রয়েছে সমবেদনার ছাপ। আমি ইশারায় বোঝলাম পেটে প্রচণ্ড খিদে। ওরা খাবার আনতে ছুটল! খেয়েদেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম আমি। একজনকে দেখে মনে হল, সে হয়তাে আমার ভাষা বুঝবে।

তাকে সব বৃত্তান্ত খুলে বললাম। সে দোভাষীর মতাে অন্যদের বুঝিয়ে দিল। শুনে সবাই তাজ্জব। এমন দুঃসাহসিক কাণ্ড কেউ করতে পারে!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ জায়গাটার নাম কী?’ দোভাষী বলল, ‘সারণ দ্বীপ। চল তােমাকে নিয়ে যাই সম্রাটের কাছে।’ সাদর অভ্যর্থনা পেলাম সম্রাটের কাছে। অতি ভালাে মানুষ তিনি। তাকে কয়েকটা মূল্যবান পাথর উপহার দিলাম আমি। খুব খুশি তিনি। আমার অভিযানের কাহিনী বললাম, তাঁকে।

প্ৰকাণ্ড বড় দেশ এই সারণ দ্বীপ। এর উত্তরে রয়েছে বড় পাহাড়ের চূড়া। লােকে বলে, ওখানে নাকি পাওয়া যাবে পথিবীর অমূল্য রত্নরাজি।

সম্রাট বাগদাদ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বাগদাদের শাসনব্যবস্থা কেমন ? সুলতান হারুন-আল-রশিদই-বা কতটা জনপ্রিয় শাসক? 

আমি তাকে জানালাম হারুন-আল-রশিদের মতাে সুশাসক অন্য কোথাও আছে কি-না জানা নেই । প্রজারা তাকে প্রাণ দিয়ে ভালােবাসে।

বড় খুশি হলেন সারণ: দ্বীপের সুলতান! বাগদাদের খালিফার জন্যে উপহার পাঠাতে চাইলেন তিনি। জাহাজ সাজানাে হল। মূল্যবান রত্নপাথর দিলেন। সাপের চামড়ার গালিচা দিলেন। হাতির দাঁতের নকশা-করা বহুবিচিত্র জিনিস দিলেন।

স্বদেশকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি । সারণের সুলতান আমাকে ভালােবেসে ফেলেছিলেন। বিষন্ন মনে আমি জাহাজে গিয়ে উঠলাম। সুলতান বললেন, তোমার জন্যে আমার দরজা সবসময় খোলা রইল।

নিরাপদেই আমি ফিরে এলাম বসায়। সেখান থেকেই গেলাম খলিফা হারুন-আল-রশিদের কাছে। সুলতানের উপহার আর চিঠি দিলাম।

আমার অভিযান কাহিনী শুনেও খলিফা মুগ্ধ হলেন। খলিফা অসম্ভব আদর যত্ন করলেন আমাকে । বললেন, আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। তােমার দুঃসাহসের জয় হােক।

খলিফা অনেক মূল্যবান উপহার দিলেন আমাকে। সারণ দ্বীপের সুলতানের জন্যে জাহাজ আনলেন উপহারসামগ্রী পাঠানাের লক্ষ্যে। আমি ন্যায়পরায়, মহানুভব খলিফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম নিজ দেশে। এই হচ্ছে আমার ষষ্ঠ অভিযান। সমুদ্রযাত্রার এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

সপ্তম অভিযানের গল্প!

পরদিন খানাপিনার আসর বসল জাঁকজমকের সঙ্গে। যেন এক উৎসব। সময়মতাে কুলি সিন্দাবাদ এসে হাজির ; আলাপ-আলােচনা চলতে থাকে । তারপর কাহিনী বলতে শুরু করেন বৃদ্ধ নাবিক সিন্দাবাদ।

‘ততদিনে আমার বয়স হয়েছে। প্রতিটি অভিযানেই সঞ্চয় করেছি তিক্ত অভিজ্ঞতা। মরণফাঁদ থেকে উদ্ধার পেয়ে বেঁচে এসেছি বারবার। সমুদ্র অভিযানের সংকল্প মন থেকে মুছে ফেললাম একেবারে ‘ আমি এখন বাগদাদের সেরা ধনী। আমার খ্যাতিও এখন যথেষ্ট। কিন্তু মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই যথেষ্ট নয়।
খলিফা হারুন-আল-রশিদ একদিন ডেকে পাঠালেন। বললেন, “সিন্দাবাদ, সারণ দ্বীপের সুলতানের কাছে শুভেচ্ছ আর কিছু উপহার পাঠাব। তুমি আমার দূত হয়ে তার কাছে যাও।

খলিফার ইচ্ছাই আদেশ। এ ছাড়া আমারও কিছুটা আগ্রহ ছিল। খলিফা শ্রেষ্ঠ উপহার সামগ্রী দিলেন। মখমলের বিছানা, হাজারও সাজপােশাক, রেশমি কাপড়, সােনার ফুলদানি আরও কত কিছু।
জাহাজ ভাসল সাগরে। চলল একটানা দুই মাস এলাম সারণ দ্বীপে। সুলতান দারুণ খুশি হলেন আমাকে পেয়ে। সুলতান বললেন, “যতদিন খুশি তুমি থেকে যাও। আদর-যত্নের কোনও অভাব রইল না। রাজার মতাে সম্মান পেলাম, কিন্তু আমি খলিফার দূত হয়ে এসেছি। সময়মতাে আমাকে ফিরে যেতে হবে।
বিদায় নিয়ে চললাম বসরার দিকে। লাগল হাওয়া। খুব সুন্দর সমুদ্রযাত্রা আমাদের। এক সপ্তাহ পরে সিন দ্বীপে এসে নােঙ্গর করলাম। এখানে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য হল।

সিন ছাড়িয়ে সবে সমুদ্রের মাঝ বরাবর এসেছি এমন সময় পথের নিশানা হারিয়ে ফেল কাপ্তেন। দ্রুত সে উঠে গেল মাস্তুলে। খবর ভালাে নয়। আমরা এসে পড়েছি মরণফাঁদ এক দ্বীপের মুখােমুখি। এমন সময় উঠল ঘূর্ণিঝড়! কাছেই ছিল ছােট একটা দ্বীপ। কিন্তু বড় ভয়ানক সে জায়গা। পাহাড়ের মতাে বড় বড় অজগর সাপ আছে সেখানে। সাপের পেটে না গিয়ে জলে ডুবে মরাই ভালাে ।

কাপ্তেন চোখ বড় বড় করে সাদা গুড়াে বের করে নাকে পুরে নিল। তারপর একটা বই বের করে জাদুমন্ত্র আওড়াতে লাগল। কাপ্তেন বলল, “সামনের দ্বীপে আছে সুলমানের সমাধি। আজ পর্যন্ত কেউ ওখানে যেতে পারেনি। এখানে এলেই তেড়ে আসতে থাকে তুফান। দ্বীপে রয়েছে বিষধর সাপ আর বিরাট বিরাট দানব।

দেখতে দেখতে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে গেলাম। প্রচণ্ড ধাক্কায় টলে উঠল জাহাজই৷ ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগল পাটাতনে। কে কোথায় বাঁচল না মরল, সে কথা মনে নেই। আমি যথারীতি ভাঙা কাঠের টুকরাে আঁকড়ে ভাসতে লাগলাম , এলাম সুন্দর একটা দ্বীপের কিনারায়। শান্ত শ্যামল ফলে-ফুলে ভরা।

এখানেও দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে বিকিরে এক নদী। ফলমূল খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। নদীর জলে ভাসিয়ে দিলাম ভেলা। এ-রকম নদীই আমায় একবার বাঁচিয়েছিল : ননীর ধারে রয়েছে এক ধরনের গাছ। সুগন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ভেলার সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে নিলাম এই গাছের ডালপালা। স্রোতের টানে ভেসে চলেছে ভেলা। অজ্ঞানের মতাে পড়ে রইলাম। জ্ঞান যখন ফিরল, প্রাণপণে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম। কারা যেন আমার হাত-পা বেঁধে রেখেছে ,কানে এল, কিছু লােকের চিৎকার। ওরা একদল জেলে । জাল ফেলে আমাকে তীরে তুলল।
শীতে আমি তখন ঠকঠক করে কঁপছি। ওরা আমাকে কাপড়-চোপড়ে ঢেকে দিল। একজন বুড়াে পরম মমতায় তেলমালিশ করে সুস্থ করে তােলেন আমাকে। বুড়াে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন আমাকে। চমৎকার সব খাবার এনে দিলেন।

বুড়ােকে বললাম আমার সমুদ্র অভিযানের বিচিত্র সব কাহিনী। বুড়াে মন্ত্রমুগ্ধের মতাে শুনল সব, জানাল তােমার সঙ্গে যে মূল্যবান মালপত্র রয়েছে সেগুলাে বাজারে নিয়ে এখুনি বিক্রি করে দাও ‘ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মালপত্র কোথায় আমার? বুড়াে বলল, তুমি যে গাছের ডালগুলাে সঙ্গে এনেছ সেগুলো মূল্যবান চন্দন কাঠ : দুষ্প্রাপ্য এবং দামি।

বুড়াে বাজারে গিয়ে চন্দন কাঠগুলাে নিলামে তুলে দাম ঠিক করলেন। এবং নিজেই কিনতে চাইলেন আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, আপনি চাইলে আমি এমনিতেই এইসব দিতাম। লজ্জা দিলেন আপনি। পরদিন বুড়াে তার মনের কথা খুলে বললেন আমাকে। বুড়াের রয়েছে অগাধ সম্পত্তি আর পরমাসুন্দরী এক মেয়ে। রূপে-গুণে অন্য অনেকেই এই মেয়েকে বিয়ে করতে চায় শুধু সম্পত্তির লােভে।

বুড়াে বললেন, তােমার মতাে সৎ নিষ্ঠাবান ও সাহসী লােকই আমি খুঁজছিলাম। তুমিই পারবে আমার মেয়েকে সুখী করতে আর আমিও শান্তিতে মরতে পারব।
এই বৃদ্ধ আমার জীবন বাঁচিয়েছে : তিনি যা বলবেন তা না করে কী করি। বুড়াের একটাই অনুরােধ, যে কটা দিন তিনি বেঁচে থাকবেন, মেয়েটাকে নিয়ে তার কাছে থাকতে হবে। বুড়াে মারা গেলে বিষয়-সম্পত্তি বেচে দেশে ফিরে গেলেও কোনও আপত্তি নেই ।
আমি রাজি হলাম। মহা ধুমধামে বিয়ে হল আমাদের। সেই বউকে নিয়েই এখনও আমাদের সুখের সংসার। বউকে নিয়ে ভালোভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল আমা। একদিন আমার শ্বশুর ইন্তেকাল করলেন। শােকে ভেঙে পড়ল সারা দেশের লোক। যথাযোগ্য মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হল।

শ্বশুরের ব্যবসাপাতি দেখাশুনা শুরু করলাম। দিনে দিনে ওদের দেশেরই একজন হয়ে গেলাম।

প্রতি বছর এখানে বসন্তকালে বিশাল এক উৎসব হয়। উৎসবে এরা নানা রকম খেলাধুলা করে। পিঠে ডানা বেধে এরা আকাশে ওড়ার চেষ্টা করে। সে বছর আমারও সাধ হল এই খেলায় অংশগ্রহণ করব। আমাকে ওরা ভালােবাসে বলে বারবার মানা করল। কিন্তু কোনও দুঃসাহসিক কাজেই আমার আগ্রহ বেশি।

নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ে চলেছি আমরা। মনের আনন্দে গান গাইছি । হঠাৎ দমকা হাওয়ায়-ওলােট-পালোট হয়ে গেল সব! ডানা ভেঙে পড়লাম এক পাথরের টিলায়। আল্লাহ আমার সহায়। দেখি সামনে দাঁড়িয়ে দুজন বালক। বলল, আমরা জাদুকর। তারাই আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিল।
এদিকে আমার বউ আশা ছেড়ে দিয়ে কেঁদে কেঁদে অস্থির। আমাকে ফিরতে দেখে আনন্দে আত্মহারা। বউ বলল, এই হতচ্ছাড়া দেশে আর থাকব না। চল, বাগদাদে তােমার দেশেই ফিরে যাই আমরা। সয়সম্পত্তি সব বেচে দাও।’ভালাে দামে অগাধ সম্পত্তি বিক্রি করে জাহাজে চেপে একদিন ঠিক ঠিক বাগদাদে পৌছে গেলাম।

ইতিমধ্যে দীর্ঘদিন প্রবাসে কেটেছে আমার। ভালােবাসার মানুষেরা ধরেই নিয়েছে আমার ফিরে আসার আর কোনও আশা নেই। আমাকে পেয়ে তারা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। দারুণ আদর-যত্নে আত্মীয়-স্বজনেরা আমার ভিনদেশি বিবিকে ঘরে তুলল। এই হচ্ছে আমার শেষ অভিযান।

বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য গুছিয়ে নিয়ে আমি এখন বাগদাদের সেরা ধনী। সেরা সুখী মানুষ। তারপর দেশ ছেড়ে আর কোথাও যাইনি। মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের মতাে পুরনাে দিনের কথা মনে পড়ে। এখন বয়স হয়েছে। মন চাইলেও শরীর কুলােবে না। বিগত দিনের কাহিনীগুলাে এখন স্বপ্নের মতােই মনে হয়। সুখে শান্তিতেই আমার দিন কেটে যাচ্ছে।

অনেক বন্ধু-বান্ধব রয়েছে আমার। ভালো কিছু বন্ধু পাওয়া জীবনের পরম সৌভাগ্য। বলে গল্প শেষ করলেন বুড়াে নাবিক সিন্দাবাদ। কুলি সিন্দাবাদকে বললেন, ‘যখন ইচ্ছে হয়, তখনই তুমি বাড়ি আসবে । আমার বাড়িকে তােমার নিজের বাড়ি মনে করবে।

কুলি সিন্দাবাদ বলল, ‘মালিক আমি ভুল বুঝতে পেরেছি মানুষ জীবনে উন্নত করে অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে। চেষ্টা করে অর্জন করতে হয় সম্পদ।

সেদিন থেকে দুই সিন্দাবাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। গরিব কুলি সিন্দাবাদ দুঃখে কাতর হয়নি আর কখনও। বন্ধুর কাছে গেলেই তিনি সব দুঃখ ভুলে যেতেন। এই হচ্ছে সিন্দাবাদের সাত সমুদ্র অভিযানের দুঃসাহসিক রোমাঞ্চকর লােমহর্ষক গল্প।

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Leave a Comment

error: Content is protected !!