বিশ্বাস যেমন ফলাফলও তেমন।

বিশ্বাস যেমন ফলাফলও তেমন এটি ইসলামিক শিক্ষণীয় গল্প। সম্মানিন লেখক প্রখ্যাত বুযুর্গ মালেক বিন দিনার (রা.) জীবনের একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন। 

বিশ্বাস যেমন ফলাফলেও তেমন – শিক্ষণীয় ইসলামিক গল্প!

একটি কাক। খুব দ্রুত উড়ে যাচ্ছে। মুখে একখানা তাজা রুটি। মনে হয় কিছুক্ষণ পূর্বে বানানাে। কাকটির উড়া দেখে যে কেউ ভাববে, তার জন্য এমন কোনাে সময় নির্দিষ্ট আছে, যার মধ্যে তাকে আপন গন্তব্যে পৌছতেই হবে। এ জন্যেই বােধ হয় তার এত তাড়াহুড়া-এত ব্যস্ততা।

বিখ্যাত বুযুর্গ হযরত মালেক বিন দিনার (রা.) হজ্জ্ব শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে একটি কাকের চলার ভঙ্গি দেখে তার মনে সন্দেহ হলাে। ভাবলেন, নিশ্চয়ই এর কোনাে কারণ আছে। রহস্য আছে। এ রহস্য আমাকে উদঘাটন করতে হবে। তিনি কৌতুহলী মন নিয়ে কাকটির পিছনে দ্রুত চলতে লাগলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলেন, কাকটি উড়তে উড়তে একটি গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

ছবিঃ কাক। কাককে পাখিজগতের সর্বাপেক্ষা চালাক পাখি বলে মনে করা হয়। – উইকিপিডিয়া!

হযরত মালেক বিন দিনার (রা.) বলেন, সেখানে গিয়ে আমি একটি বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম। দেখলাম, সেই গর্তের মধ্যে হাত-পা বাধা অবস্থায় এক লােক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। আর কাকটি রুটি ছিড়ে ছিড়ে তাকে খাওয়াচ্ছে। একজন অসুস্থ স্বামীর মুখে তার স্ত্রী যেভাবে সােহাগ ভরে খাবার উঠিয়ে দেয়, কাকটির অবস্থা দেখে আমার তাই মনে হলাে।

বেশ কিছুক্ষণ এ দৃশ্য অবলােকন করার পর আমি যখন আরেকটু অগ্রসর হলাম, তখন কাকটি উড়ে গেল। আমি লােকটির নিকটে গেলাম। আমাকে দেখে সে কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, আপনি কে? এখানে কিভাবে এলেন? আপনার অবস্থাই বা এমন কেন?

উত্তরে সে বলল, আমি হজ্জ্ব করে দেশে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে ডাকাতদল আমার সমুদয় মাল-পত্র ও টাকা-পয়সা কেড়ে নেয়। অতঃপর যাওয়ার সময় আমাকে হাত-পা বেঁধে এ গর্তের মধ্যে ফেলে রেখে চলে যায়।

ডাকাত দল চলে যাওয়ার পর একই অবস্থায় আমার পাঁচ দিন কেটে যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। মনে হলাে, এই বুঝি আমার প্রাণবায়ু চিরদিনের মতাে বের হয়ে চলে যাবে। কিন্তু খােদার অপরিসীম দয়ায় এখনাে আমি বেঁচে আছি।
পাঁচদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমি এ বলে প্রার্থনা করলাম, হে মহান সেই সত্ত্বা, যিনি আপন গ্রন্থ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন“যখন কোনাে অসহায় ব্যক্তি তার নিকট প্রার্থনা করে, তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দেন এবং তার সমস্যা দূর করে দেন।” হে আল্লাহ! আজ আমি অসহায়। ডাকাতদল আমার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে। এ নির্জন গুহায় কোনাে লােকজনও হয়ত আসবে না। হে দয়াময় খােদা! আমার অসহায় অবস্থা তুমি ভাল করেই প্রত্যক্ষ করছ। একমাত্র তুমি ছাড়া আমার আর কোনাে সাহায্যকারী নেই। মেহেরবানী করে তুমি আমার জীবন রক্ষার ব্যবস্থা কর এবং আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর। আমার প্রতি দয়া প্রদর্শন কর।”

আমি যেদিন দোয়া করেছিলাম, সেদিন থেকে দয়াময় আল্লাহ আমার জন্য এ কাকটি নিযুক্ত করে দিয়েছেন। কাকটি প্রত্যহ তিনবার আহারের সময় আমার নিকট খাবার নিয়ে আসে এবং নিজেই ঠোট দিয়ে ছিড়ে ছিড়ে খাইয়ে দিয়ে আবার চলে যায়।
ইতিমধ্যে আমি তার হাত পায়ের বাধন খুলে দিয়েছি। বাধন মুক্ত হয়ে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর বলল, মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার মতাে ভাষা আমার নেই। তিনি আমাকে একটি কাকের মাধ্যমে আহারের ব্যবস্থা করেছেন। আবার আমাকে উদ্ধারের জন্য আপনাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

এরপর আমরা লােকালয়ের দিকে ফিরে এলাম। পথিমধ্যে আমাদের ভীষণ পিপাসা হলাে। কিন্তু সাথে কোনাে পানি ছিল না। তাই পিপাসায় কাতর হয়ে আমরা এদিক সেদিক পানি খোঁজ করতে লাগলাম। হঠাৎ দূরে মাঠের মধ্যে একটি কূপ দেখতে পেলাম। সাথে সাথে আমরা এও দেখলাম যে, সেখানে এক পাল হরিণ ঘােরাফেরা করছে এবং কয়েকটি হরিণ মুখ লাগিয়ে কূপ থেকে পানি পান করছে। এ দৃশ্য দেখে আমরা আল্লাহর শােকর আদায় করলাম এবং বললাম, আমরা পানি পেয়ে গেছি। তৃষ্ণায় আমাদের প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম। সুতরাং কূপ দেখতে পেয়ে আমরা খুবই খুশি হলাম এবং একটু দ্রুত হেটেই কূপের নিকট পৌঁছলাম।

আমাদের দেখে হরিণের দল ছুটে পালাল। আমরা কুপের কিনারায় গিয়ে দেখি, পানি একেবারে তলদেশে পৌঁছে গেছে। এরপর আমরা রশি ও বালতির সাহায্যে সেই কুপ থেকে পানি উত্তোলন করে তৃপ্তি সহকারে পান করলাম। অতঃপর আমি আমার মহান প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“হে পরওয়ার দিগারে আলম! আমরা মানুষ। আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা জীব। আমরা তােমার ইবাদত করি। রুকু দেই। সিজদা করি। তােমার কালাম তিলাওয়াত করি। আর হরিণ? সে তাে জানােয়ার। তাদের মধ্যে বিবেক নেই, বুদ্ধি নেই। তারা তােমার ইবাদত করে না। রুকুও করে না। সিজদাও দেয় না। তথাপি তাদের জন্য কূপের পানি উপরে তুলে দিলে? আর আমাদেরকে কূপের তলদেশ থেকে কষ্ট করে পানি উত্তোলন করে পান করতে হলাে। হে খােদা! তােমার এ খেলা বুঝে আসল না।”
এমন সময় গায়েব থেকে আওয়াজ এলাে।
হে মালেক বিন দিনার! শুনে রাখ, হরিণ সর্বদা আমার প্রতি ভরসা রাখে। পানি পানের দরকার হলে রশি-বালতি তালাশ করার প্রয়ােজন বােধ করে না। আমিই তাদের পানি পানের সুব্যবস্থা করব-এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই তারা আগমন করে। সুতরাং আমি তাদের বিশ্বাস মতােই তাদের সাথে মােয়ামেলা করে থাকি।

আর তােমরা? তােমরা তাে পানির পিপাসা হলে রশি-বালতির খোঁজ করতে থাক। বিভিন্ন মাধ্যম তালাশ কর। সুতরাং তােমাদের সাথেও আমি ঐরূপ ব্যবহারই করে থাকি যেরূপ তােমরা বিশ্বাস রাখ । মনে রেখাে, আমার প্রতি তােমাদের বিশ্বাস যেমন হবে, ফলাফলও ঠিক তেমনি হবে। তােমাদের বিশ্বাস যদি ঐসব প্রাণীদের মতাে হতাে, তাহলে আমিও তােমাদের সাথে এমন ব্যবহার করতাম, যেমন ব্যবহার তাদের সাথে করে থাকি ।

প্রিয় পাঠক! তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা সংক্রান্ত ২/৩টি ঘটনা হৃদয় গলে সিরিজের পূর্ববর্তী অংশগুলােতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে এতদ্‌সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত আলােচনাও সেখানে স্থান পেয়েছে। তাই আমি সেই সব আলােচনার পুনরাবৃত্তি না ঘটিয়ে এখন কেবল তাওয়াক্কুল সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও হাদীস আপনাদের খেদমতে তুলে ধরার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
১। নিশ্চয়ই শয়তানের রাজত্ব ঐসব লােকের উপর চলে না যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে ও আপন প্রতিপালকের উপর ভরসা রাখে। (সুরা নাহল, আয়াত : ১৩)

২। মুমিনদের একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করা উচিত। (সূরা মায়েদা, আয়াত : ১১)

৩। যদি তােমরা মুমিন হও তবে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর। (সূরা মায়েদা, আয়াত : ২৩)

৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তিনি তাকে জয়যুক্ত করেন। কেননা আল্লাহ তাআলা জবরদস্ত হেকমত ওয়ালা । -(সূরা আনফাল, আয়াত : ৪৯)

৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ক্ষুধার্ত কিংবা অভাবগ্রস্থ হয়ে আপন অভাবের কথা কারও নিকট প্রকাশ না করে, আল্লাহ তা’আলা আপন মেহেরবানী দ্বারা তার জন্য এক বৎসরের হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দেন। – মিশকাত শরীফ

৬। অন্য এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সমৃদ্ধি চায়, তিনি তাকে সমৃদ্ধি দান করেন। যে ব্যক্তি পাপ থেকে পবিত্রতা চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্রতা দান করেন। উপরের হাত নীচের হাত থেকে উত্তম। এমন কোনাে লােক নেই যে ভিক্ষার দ্বার খােলে অথচ আল্লাহ তাআলা তার জন্য অভাবের দ্বার খােলেন না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত তাওয়াক্কুল নসীব . করুন। আমীন। ]

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। লেখকের যদি এমন হতাম গল্পের বই থেকে নেওয়া। 

আরও জনপ্রিয় গল্পের লিংক!

Please follow our Facebook, Twitter, Instagram, Linkedin, Pinterest, Tumblr, And Youtube channels for more updates.

Leave a Comment

error: Content is protected !!