কুরআনে উল্লেখিত নারীগণ — নাম, অর্থ ও পরিচয়

পবিত্র কুরআনে অসংখ্য নারীর কথা উল্লেখ আছে — কেউ ঈমান ও ধৈর্যের অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে, কেউ শিক্ষণীয় সতর্কবার্তা হিসেবে। কিন্তু একটি চমকপ্রদ তথ্য অনেকেরই অজানা — কুরআনে সরাসরি নাম উল্লেখ করে মাত্র একজন নারীর কথা বলা হয়েছে! বাকি সব নারীকে কুরআনে সম্পর্ক বা উপাধি দিয়ে চেনানো হয়েছে (যেমন “ফিরআউনের স্ত্রী”, “ইমরানের স্ত্রী”), তাঁদের প্রকৃত নাম আমরা জানি হাদিস ও তাফসীর থেকে।

এই আর্টিকেলে আমরা জানব — কুরআনে নাম উল্লেখিত একমাত্র নারী কে, এবং আর কোন কোন মহীয়সী নারীর প্রসঙ্গ কুরআনে এসেছে, তাঁদের নামের অর্থ ও সংক্ষিপ্ত পরিচয়সহ।

যাঁর নাম সরাসরি কুরআনে উল্লেখিত — মরিয়ম (আঃ)

জানেন কি? কুরআনে সরাসরি নাম উল্লেখ করে একমাত্র নারী হলেন মরিয়ম (আঃ)। কুরআনের ৩১টি আয়াতে তাঁর নাম এসেছে, এবং তাঁর নামে একটি সম্পূর্ণ সূরা (সূরা মারইয়াম) নাযিল হয়েছে — যা কুরআনে কোনো নারীর প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান প্রদর্শনের একটি নিদর্শন।

নামের অর্থ: মরিয়ম শব্দটি হিব্রু/আরামাইক উৎস থেকে এসেছে বলে ভাষাবিদদের অভিমত, যার অর্থ নিয়ে মতভেদ থাকলেও সাধারণত “পূজারী” বা “পবিত্রা” অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়।

وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ

সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৪২: স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতারা বলেছিল, “হে মরিয়ম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীদের মধ্য থেকে তোমাকে মনোনীত করেছেন।”

পরিচয় ও কুরআনে অবস্থান: মরিয়ম (আঃ) ছিলেন ইমরানের কন্যা এবং ঈসা (আঃ)-এর মাতা। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, এবং ঈসা (আঃ)-এর জন্মের অলৌকিক ঘটনা কুরআনের সূরা আলে-ইমরান (আয়াত ৪২-৪৭) ও সূরা মারইয়াম-এ (আয়াত ১৬-৩৪) বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও সূরা আল-আম্বিয়ার ৯১ নং আয়াতেও তাঁর কথা এসেছে।

মরিয়ম (আঃ)-কে ফেরেশতারা স্বয়ং সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বের নারীদের মধ্য থেকে মনোনীত করেছেন (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ৪২)। তাঁর ধৈর্য, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য তাঁকে ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে সম্মানিত নারীদের একজনে পরিণত করেছে।

দুই মুসলিম বোন একসাথে কুরআন পড়ছে - কুরআনে উল্লেখিত নারীদের অনুপ্রেরণা।
কুরআনে বর্ণিত মহীয়সী নারীদের জীবনী আমাদের কন্যাসন্তানদের জন্য এক অনন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। Photo by Firman Marek_Brew

যাঁদের প্রসঙ্গ কুরআনে এসেছে, নাম এসেছে হাদিস ও তাফসীর থেকে

নিচের নারীদের কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে সম্পর্ক বা উপাধি দিয়ে, প্রকৃত নাম নয়। তাঁদের নাম আমরা জানি হাদিস, তাফসীর ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে।

নাম নামের অর্থ কুরআনে পরিচয়/উপাধি আয়াত রেফারেন্স সংক্ষিপ্ত পরিচয়
হাওয়া (আঃ) জীবন্ত, প্রাণবতী আদমের স্ত্রী সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৩৫ মানবজাতির প্রথম নারী, আদম (আঃ)-এর সহধর্মিণী
আসিয়া (আঃ) সান্ত্বনাদায়িনী ফিরআউনের স্ত্রী সূরা আত-তাহরীম ১১, সূরা আল-কাসাস ৭-৯ অত্যাচারী স্বামীর প্রাসাদে থেকেও ঈমানে অবিচল ছিলেন, মূসা (আঃ)-কে লালন-পালন করেন
বিলকিস অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে, কোনো সুনির্দিষ্ট আরবি অর্থ প্রতিষ্ঠিত নয় সাবা রাজ্যের রাণী সূরা আন-নামল, আয়াত ২২-৪৪ প্রজ্ঞাবান নারী শাসক, সুলাইমান (আঃ)-এর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন
সারা (আঃ) রাজকুমারী, সম্ভ্রান্ত নারী ইবরাহিমের স্ত্রী সূরা হুদ, আয়াত ৭১-৭৩ ইসহাক (আঃ)-এর মাতা, বার্ধক্যে সন্তানের সুসংবাদ পান
হাজেরা (আঃ) অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে (কুরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই, হাদিসে বিস্তারিত) হাদিস-ভিত্তিক (সাফা-মারওয়া প্রসঙ্গ) ইসমাইল (আঃ)-এর মাতা, সাফা-মারওয়ার মধ্যে পানি খোঁজার ঘটনা হজ্জের অংশ হয়ে আছে
জুলাইখা ঐতিহ্যগতভাবে “উজ্জ্বল সৌন্দর্যময়ী” অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি কুরআনে উল্লেখিত নাম নয় মিসরের আজিজের স্ত্রী সূরা ইউসুফ, আয়াত ২৩-৩৪ ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীতে উল্লেখিত চরিত্র
মূসার মাতা মূসার মা সূরা তাহা ৩৭-৪০, সূরা আল-কাসাস ৭-১৩ আল্লাহর নির্দেশে নবজাতক মূসাকে নীলনদে ভাসিয়ে দেওয়ার পরও অবিচল আস্থা রাখেন

দ্রষ্টব্য: নূহ (আঃ) ও লূত (আঃ)-এর স্ত্রীদের কথাও কুরআনে (সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ১০) দৃষ্টান্ত হিসেবে এসেছে, তবে তাঁদের নাম নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

কেন কুরআনে বেশিরভাগ নারীর নাম উল্লেখ নেই?

এই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে আসে। তাফসীরবিদদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়:

  • আরবি সাহিত্যিক শৈলী — ক্লাসিক্যাল আরবি বর্ণনারীতিতে প্রায়ই ব্যক্তিকে তাঁর সম্পর্ক বা পরিচয় দিয়ে উল্লেখ করার প্রচলন ছিল, নাম দিয়ে নয় — এটি শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, অনেক পুরুষ চরিত্রের ক্ষেত্রেও (যেমন “আজিজে মিসর”) একই রীতি দেখা যায়।
  • শিক্ষার উপর গুরুত্ব — কুরআনের মূল লক্ষ্য ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণ নয়, বরং প্রতিটি কাহিনী থেকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান। তাই নাম-পরিচয়ের চেয়ে চরিত্রের কর্ম ও শিক্ষার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
  • মরিয়ম (আঃ)-এর ব্যতিক্রম বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ — যেহেতু তিনিই একমাত্র নাম উল্লেখিত নারী, এটি তাঁর অনন্য মর্যাদা ও গুরুত্বকে ইঙ্গিত করে বলে অনেক আলেম মনে করেন।

দ্রষ্টব্য: এই ব্যাখ্যাগুলো তাফসীরবিদদের সাধারণ অভিমত, কুরআনে এই কারণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

কুরআনে কতজন নারীর নাম সরাসরি উল্লেখ আছে?

কুরআনে সরাসরি নাম উল্লেখ করে মাত্র একজন নারীর কথা বলা হয়েছে — তিনি হলেন মরিয়ম (আঃ)।

মরিয়ম (আঃ) ছাড়া আর কারো নাম কেন কুরআনে নেই?

কুরআনের বর্ণনারীতিতে অনেক চরিত্রকেই (পুরুষ-নারী উভয়) সম্পর্ক বা উপাধি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নাম দিয়ে নয়। এটি ক্লাসিক্যাল আরবি সাহিত্যিক শৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য এবং কুরআনের মূল লক্ষ্য নৈতিক শিক্ষা প্রদান, ঐতিহাসিক নথিভুক্তি নয়।

আসিয়া, বিলকিস, জুলাইখার মতো নাম কোথা থেকে এসেছে?

এই নামগুলো কুরআনের টেক্সটে নেই, বরং এসেছে হাদিস, তাফসীর ও ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইসলামি ঐতিহ্যে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।

কুরআনে নারীদের নামে কোনো সূরা আছে কি?

হ্যাঁ, সূরা মারইয়াম মরিয়ম (আঃ)-এর নামে নাযিল হয়েছে। এছাড়াও সূরা আন-নিসা (নারীজাতি) নামে একটি সূরা আছে, যদিও এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে নয়।

তথ্যসূত্র

  • বাংলা উইকিপিডিয়া — কুরআনে নারী
  • আয়াত রেফারেন্স যাচাই — Quran.com (তাফসীরসহ)

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, কুরআনে উল্লেখিত নারীগণের নাম ও নামের অর্থ ও তাদের পরিচয় জেনে আপনার ভালো লেগেছে। এটি শেয়ার করতে ভুলবেন না।

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading