হারুন অর রশীদের ছেলের গল্প: দুনিয়াবিমুখ এক বাদশাহজাদা

রাজপ্রাসাদের আরাম ছেড়ে সপ্তাহে মাত্র একদিন শ্রমিকের কাজ করত খলিফা হারুন অর রশীদের ছেলে। মৃত্যুর আগে তার একটি কথা আজও ভাবিয়ে তোলে: নতুন কাপড়ের জন্য জীবিত লোকেরাই বেশী উপযোগী। পড়ুন সেই হৃদয়স্পর্শী কাহিনী মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলামের কলমে।

হারুন অর রশীদের ছেলে: রাজপ্রাসাদের এক ব্যতিক্রমী বালক

খলীফা হারুন অর রশীদ ছিলেন একজন পূণ্যবান বাদশাহ। তিনি ৭৮৬ খৃষ্টাব্দে মাত্র ২৫ বছর বয়সে বাগদাদের সিংহাসনে আরোহন করেন । [১] প্রত্যহ নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ছাড়াও তিনি দৈনিক ১০০ রাকাত নফল নামায পড়তেন। ২৩ বছরের রাজত্বে তিনি ৯ বার হজ্বব্রত পালন করেন এবং প্রতিবারেই যাবতীয় খরচ বহন করে ১০০ আলেমকে হজ্ব করান। [২] নিষ্ঠা, সততা, ধর্মপরায়নতা ও উদারতা তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। অবশ্য রাজকীয় আড়ম্বর ও জাঁকজমকে পরিবেষ্টিত থাকার অসাধারণ মোহও তাঁর ছিল।

খলীফা হারুন অর রশীদের ছিল ষোল বছরের এক ছেলে। [৩] তাকওয়া-পরহেজগারী ও দ্বীনদারীতে সে ছিল অতুলনীয়। বুজুর্গানে দ্বীনের মজলিশে সে বেশী বেশী আসা যাওয়া করত এবং প্রায়ই কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদেরকে সম্বোধন করে বলত-

হে কবরবাসীগণ! তোমরা একদিন এই দুনিয়ার মালিক ছিলে। তোমাদের কথায় কত মানুষ উঠা-বসা করত। কত সুস্বাদু খাবারই না তোমরা খেয়েছ। কত মূল্যবান পোষাক পরিধান করেছ। কত প্ৰভাব প্রতিপত্তিই না ছিল তোমাদের। কত বিশাল সহায় সম্পত্তির মালিক ছিলে তোমরা। কিন্তু আজ এগুলো কোথায়? দুনিয়া তোমাদের ধরে রাখতে পারেনি। তোমরা নির্জন কবরে পৌঁছে গিয়েছ। আফসোস! আমি যদি জানতাম তোমাদের কি অবস্থা হয়েছে এবং তোমরা কিরূপ প্রশ্নোত্তরের সম্মুখীন হয়েছ। একথা বলে সে অধিকাংশ সময় একটি কবিতা আবৃত্তি করত। যার অর্থ নিম্নরূপঃ

“জানাযাসমূহ প্রতিদিন আমাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে দেয় এবং মুর্দার জন্য কান্না-কাটিকারিনী মেয়েদের কান্না আমাকে চিন্তাযুক্ত করে রাখে।”

রাজকীয় জীবন ছেড়ে বসরায় যাত্রা

একদিন এই ছেলে সাধারণ একটি কাপড় পরিধান করে মাথায় একটি লুঙ্গি বেঁধে বাদশাহর দরবারে হাজির হল। এতে উপস্থিত সভাসদগণ একথা বলে কানাঘুষা করতে লাগল যে, এই ছেলের চালচলন বাদশাহকে অন্যান্য রাজা-বাদশাহের নিকট হেয় প্রতিপন্ন করেছে। খলিফা যদি ছেলেকে সতর্ক করে দিতেন তবে অবশ্যই সে এরূপ অশোভনীয় আচরণ থেকে বিরত থাকত। তাদের এ কানাঘুষা খলীফার কানে পৌঁছলে তিনি ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন, বেটা! বাদশাহের ছেলে হিসেবে তুমি একটু ভদ্র হয়ে চলাফেরা কর। তুমি তো আমাকে মানুষের সামনে লজ্জিত করছ। এরূপ করা তোমার জন্য মোটেও সমীচীন হচ্ছে না।

ছেলেটি পিতার কথার কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ নিকটে বসা একটি পাখিকে লক্ষ্য করে বলল, সেই জাতের কসম দিয়ে বলছি, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তার হুকুমে আমার হাতে এসে বস। পাখিটি তৎক্ষণাত তার হাতে এসে বসল। আবার উড়ে গিয়ে আপন স্থানে বসার নির্দেশ দিলে পাখিটি তাই করল।

খলীফা হারুন অর রশীদ ছেলের কারামতী দেখে আশ্চর্য হলেন। ভাবলেন, আমার বাদশাহী তো কেবল মানুষের উপর চলে, আর আমার পুত্রের বাদশাহী পশু-পাখির উপরও চলে।

মরুভূমিতে উটের পিঠে এক মুসাফিরের সিলুয়েট - হারুন অর রশীদের ছেলের গল্পের প্রতীকী ছবি
মরুভূমিতে উটের পিঠে এক মুসাফিরের প্রতিকী ছবি। উৎস Canva.

এবার ছেলেটি পিতাকে সম্বোধন করে বলল, আব্বাজান! আপনি যে দুনিয়াকে মহব্বত করেন তাই আমাকে বেইজ্জত করে রেখেছে। দুনিয়ার আরাম আয়েশ আর আভিজাত্যকে আমি মোটেও পছন্দ করি না। আমি দৃঢ় সংকল্প করেছি যে, আপনি অনুমতি দিলে আমি অনেক দূরে চলে যাব। একথা বলে সে এক জিল্‌দ কোরআন শরীফ ও তার মায়ের দেয়া একটি মূল্যবান আংটি সঙ্গে নিয়ে সোজা বসরা শহরে চলে গেল।

বসরায় শ্রমিকের জীবন ও আবু আমের বসরীর সাক্ষাৎ

বসরা আসার পর সে কেবল শনিবার দিন কাজ করত এবং এক দিরহাম ও এক ষষ্ঠাংশ পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করত । এই সামান্য পয়সা খরচ করে সপ্তাহের বাকী দিনগুলো চলত এবং মহান আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিত।

আবু আমের বসরী (র.) বলেন, আমার একটি ভাঙ্গা দেয়াল ছিল। উহা মেরামত করার জন্য আমি একজন রাজ মিস্ত্রি তালাশ করছিলাম। এমতাবস্থায় একজন লোক আমাকে বলল, এখানে একটি ছেলে থাকে। সেও রাজ মিস্ত্রির কাজ করে। আপনার ইচ্ছে হলে তাকে দিয়েও কাজ করাতে পারেন।

লোকটির কথা শুনে আমি ছেলেটিকে খুঁজতে শুরু করি। এক সময় পেয়েও যাই। দেখি সে অত্যন্ত সুললিত কণ্ঠে কালামে পাক তেলাওয়াত করছে। তিলাওয়াত শেষ হওয়ার পর বললাম, বেটা! মজদুরী করবে? সে বলল, কেন করব না? মজদুরী করার জন্যই তো দুনিয়াতে এসেছি। বলুন, আপনার কি খেদমত করতে পারি?

আমি বললাম, একটি দেয়াল মেরামত করতে হবে। সে বলল, ঠিক আছে। তবে শর্ত হল, নামাযের সময় আমাকে ছুটি দিতে হবে এবং এক দিরহাম ও এক ষষ্ঠাংশের বেশী মজুরী নেয়ার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করতে পারবেন না।

আমি উভয় শর্ত মেনে নিলাম এবং তাকে কাজে লাগিয়ে বাইরে চলে গেলাম। মাগরিবের সময় আমি তার কাজ দেখে সীমাহীন বিস্মিত হলাম । দেখলাম, সে একা দশজনের কাজ করে ফেলেছে। আমি খুশি হয়ে তাকে দুই দিরহাম মজুরী দিলাম। সে অতিরিক্ত নিতে অস্বীকার করল এবং এক দিরহাম ও এক দানেক নিয়ে চলে গেল।

ইট গাঁথা শ্রমিকের হাত - হারুন অর রশীদের ছেলের গল্পের প্রতীকী ছবি
ইট গাঁথা শ্রমিকের হাত। ছবিঃ প্রতীকী। উৎসঃ Canva

পরে আবার তাকে খোঁজ করলাম। কিন্তু কোথাও তাকে পেলাম না। লোকজন বলল, সে কেবল শনিবারেই কাজ করে। আমি তার কাজে সন্তুষ্ট ছিলাম। তাই ছয়দিন কাজ বন্ধ রেখে পরের শনিবারে তার খোঁজে আবার বের হই। দেখি সে এবারও মধুর কন্ঠে পবিত্র কালাম তিলাওয়াত করছে।

আমি তাকে সালাম দিয়ে কাজের কথা বললে সে আগের মতই দুটি শর্তারোপ করল। আমি শর্ত দুটি মঞ্জুর করে আবারও তাকে কাজে লাগিয়ে দিলাম।

গত শনিবারের কাজ দেখে আমার মনে কৌতুহল জাগে যে, সে একা কিভাবে দশজনের কাজ করে তা আমাকে দেখতে হবে। তাই আমি আজ বাইরে না গিয়ে লুকিয়ে তার কাজ দেখতে লাগলাম। তার কাজের অবস্থা দেখে আমি আশ্চর্য না হয়ে পারলাম না। দেখলাম, সে গারা নিয়ে দেয়ালে রেখে দেয়ার সাথে সাথে ইটগুলি অটোমেটিক এসে জোড়া লেগে যায়। এ দৃশ্য অবলোকন করে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, এ ছেলে নিশ্চয় আল্লাহর ওলী হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের পক্ষে তা মোটেও সম্ভব নয়।

সন্ধ্যা বেলা আমি তাকে তিন দিরহাম দিতে চাইলাম। কিন্তু সে অস্বীকার করে বলল, আমি এত পয়সা দিয়ে কি করব? আমার জন্য তো সামান্য পয়সাই যথেষ্ট । একথা বলে সে আগের সমপরিমাণ পয়সা নিয়েই বিদায় নিল।

নতুন কাপড়ের জন্য জীবিত লোকেরাই বেশী উপযোগী

তৃতীয় শনিবার তার খোঁজে আবার বের হলাম। লোকজন বলল, সে আজ তিন দিন যাবত অসুস্থ অবস্থায় অমুক জঙ্গলে পড়ে আছে। আমি দেরী না করে তৎক্ষনাত সেখানে গিয়ে দেখি সে বেহুঁশ হয়ে শুয়ে আছে। তার মাথার নীচে একটি ইটের টুকরো রয়েছে। আমি তাকে পর পর দু’বার সালাম দেয়ার পর সে চোখ খুলল এবং আমাকে চিনে ফেলল। আমি তাড়াতাড়ি তার মাথার নীচ থেকে ইট সরিয়ে দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলাম। এমন সময় সে কয়েকটি হৃদয়গ্রাহী কবিতা পাঠ করল। তন্মধ্যে দুটির অর্থ হল-

হে বন্ধু! দুনিয়ার নেয়ামতের ধোকায় পড়ো না। কেননা দুনিয়ার নেয়ামত চিরস্থায়ী নয়। একদিন তা শেষ হয়ে যাবে। তদুপরি তুমি কিন্তু ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছ। তুমি যখন কোন জানাযা কাঁধে নাও তখন মনে করবে যে, তোমাকেও একদিন এভাবে নেয়া হবে।

তারপর সে আমাকে বলল, জনাব! আমার প্রাণবায়ু যখন উড়ে যাবে, তখন আপনি নিজের হাতে গোসল দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় দিয়েই আমাকে কাফন দিবেন। আমি বললাম, ভাই! তোমার জন্য নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা হলে অসুবিধা কি? সে বলল, নতুন কাপড়ের জন্য জীবিত লোকেরাই বেশী উপযোগী। কাফন পুরানো হোক আর নতুন হোক তা একদিন পঁচেই যাবে। কবরে মানুষের সঙ্গে কেবল ঈমান আর আমলই থাকবে। আমার এই লুঙ্গি ও পাত্রটা কবর খননকারীকে দিয়ে দিবেন। আর মেহেরবানী করে এই আংটি ও কোরআন শরীফখানা খলীফা হারুন অর রশীদের নিকট পৌঁছে দিবেন। তাকে বলবেন, এগুলো একটি পরদেশী মুসাফির ছেলের আমানত। আমার পক্ষ থেকে তাকে একথাও বলবেন যে, গাফলত ও ধোকার হালতে যেন তার মৃত্যু না আসে। একথা বলার পর সে ইহলোক ত্যাগ করে মহা প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেল।

খলীফার দরবারে আমানত ও স্বপ্নে সুসংবাদ

এতক্ষণে আমার ধারণা হলো, ছেলেটি নিশ্চয় বাদশাহজাদা হবে। আমি অসিয়ত মোতাবেক তাকে দাফন করে আংটি ও কুরআন শরীফ নিয়ে বাগদাদ পৌঁছলাম। আমি শাহী বালাখানার নিকট গিয়ে দেখলাম, বাদশাহের সাওয়ারী বের হচ্ছে। প্রথমে আনুমানিক ১০০০ লোকের বাহিনী বের হল। আমি একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলাম। এরপর আরও দশটি অনুরূপ বাহিনী বের হল। দশম বাহিনীর মধ্যে স্বয়ং আমীরুল মুমেনীন ছিলেন। আমি তাকে দেখতে পেয়ে উচ্চস্বরে আওয়াজ দিয়ে বললাম, হে আমীরুল মুমেনীন! হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়তার উছীলা দিয়ে বলছি, আপনি একটু থামুন।

আমার আওয়াজ শুনে খলীফা থেমে গেলেন। আমি তাড়াতাড়ি তার নিকট গিয়ে বললাম, আমি একটি বিদেশী ছেলের আমানত নিয়ে এসেছি। এগুলো পৌঁছাতে সে আমাকে অসিয়ত করে গিয়েছিল। এ বলে আমি তার নিকট আংটি ও কোরআন শরীফ সোপর্দ করলাম।

কুরআন ও সাধারণ কাপড়ের প্রতীকী ছবি - হারুন অর রশীদের ছেলের গল্প
ছবিঃ প্রতীকী চিত্র (এআই দিয়ে তৈরি)। ডিজাইনঃ Amar Bangla Post

এগুলো দেখামাত্র খলীফা সবকিছু বুঝে ফেললেন। কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে রাখলেন। এ সময় তার চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর তিনি দারোয়ানকে বললেন, আমি ফিরে এলে এ লোকটিকে আমার নিকট পৌঁছাবে। একথা বলে তিনি চলে গেলেন।

খলীফা ফিরে আসার পর দারেয়ানকে ডেকে বললেন, লোকটিকে আমার নিকট হাযির কর। আমি জানি, সে আমার ব্যাথাকে তাজা করে দিবে।

দারোয়ান এসে আমাকে বলল, আমীরুল মুমেনীন বড় চিন্তাযুক্ত আছেন। সাবধানে কথা বলিও। দশটি কথা বলতে চাইলে পাঁচটি বলেই ক্ষান্ত হইও।

আমি খলীফার নিকট গিয়ে দেখি তিনি একটি নির্জন কক্ষে একাকী বসে আছেন । আমাকে দেখে কাছে নিয়ে বসালেন । তারপর অশ্রুসজল নয়নে বললেন, তুমি কি আমার সেই ছেলেকে চিন?

: জ্বী হা।

: সে কি কাজ করত?

: রাজমিস্ত্রির কাজ।

খলীফা পুনরায় বললেন, তুমি কি তাকে দিয়ে কোন কাজ করিয়েছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, করিয়েছি। তিনি বললেন, সে যে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয় একথা কি তোমার খেয়াল হয়নি? আমি বললাম, আমীরুল মুমেনীন! প্রথমে আমি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাই। তারপর আপনার নিকটও ক্ষমা চাচ্ছি। প্রকৃত কথা হল, তখন তার ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। ইন্তেকালের সময় আমি জানতে পেরেছি।

তারপর খলীফা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি নিজ হাতে তাকে গোছল দিয়েছ?

আমি বললাম, জ্বী হ্যা। আমি নিজ হাতেই তাকে গোছল দিয়েছি ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করেছি। তিনি বললেন, তোমার হাতটি এদিকে দাও। আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে হাতখানা তার সিনার সাথে মিশিয়ে নিলেন। অতঃপর কয়েকটি বয়াত পাঠ করলেন । যার অর্থ নিম্নরুপ-

হে মুসাফির! তোমার জন্য আমার হৃদয় গলে যাচ্ছে। চক্ষু থেকে অবিরাম ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। হে প্রিয়! তোমার কবর তো এখান থেকে অনেক দূরে কিন্তু তোমার ফিকির আমার অতি নিকটে। নিশ্চয় মৃত্যু যে কোন শান্তির অবসান ঘটিয়ে দেয়। সেই মুসাফির একটি চাঁদের টুকরো ছিল। সে চাঁদের টুকরোও আজ কবরে পৌঁছে গেল।

অতঃপর খলীফা হারুন অর রশীদ আমাকে সঙ্গে নিয়ে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বসরা শহরে গেলেন। সেখানে কবরের পাশে দন্ডায়মান হওয়ার পর তার দু’চোখে দেখা দিল উপচানো অশ্রুধারা । মনে হল; কি একটা শুন্যতা, কি একটা অভাব যেন তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। প্রিয় পুত্রের বিয়োগ ব্যথায় মুক্তধারার মতো দুগন্ড বেয়ে অশ্রুধারা বেয়ে পড়ছে। ফোঁপানো কান্নার সকরুণ সুর আর বাধভাঙ্গা অশ্রু মুছে এক সময় তিনি কয়েকটা কবিতা পড়লেন । যার অর্থ হল-

হে মুসাফির! তোমার এ সফর আর কোনদিন শেষ হবে না ৷ কোন দিন আর তুমি ফিরে আসবে না। অল্প বয়সেই মৃত্যু তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল।

হে আমার চোখের পুতুল! তুমি মৃত্যুর ঐ পিয়ালা পান করেছ যা অতিসত্তর তোমার বৃদ্ধ পিতাও পান করবেন। শহরবাসী হোক আর গ্রামবাসী হোক প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। তাই মৃত্যুর জন্য সকলকেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত।

এভাবে দীর্ঘক্ষণ কবিতা পাঠ করার পর খলীফা বাগদাদে চলে এলেন । আমিও আমার বাড়ীতে চলে গেলাম । বাড়ীতে যাওয়ার পর ঐ রাত্রেই আমি যখন অযীফা শেষ করে শুয়ে পড়ি তখন স্বপ্নযোগে একটি নূরের কোব্বা দেখতে পাই। যার উপর মেঘমালার ন্যায় শুধু নূর আর নূর রয়েছে। সেই নূরের মেঘমালা থেকে ছেলেটি আওয়াজ দিয়ে বলল, আবু আমের! আল্লাহপাক তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন । তুমি আমার উপযুক্ত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেছ। আমার অসিয়ত যথাযথভাবে পালন করেছ।

আমি বললাম, হে প্রিয় বৎস! তোমার অবস্থা কি? সে বলল, আমি এখন এমন এক মনিবের আশ্রয়ে আছি, যিনি বড়ই দয়ালু এবং অতিশয় মেহেরবান। তিনি আমার উপর অত্যন্ত রাযী খুশী আছেন ৷ তিনি আমাকে এমন সব বস্তু দান করেছেন যা কোন চক্ষু দর্শন করেনি, কোন কর্ণ শ্রবণ করেনি এবং কোন অন্তর তা কল্পনাও করতে পারেনি।[৪]

তারপর সে বলল, আল্লাহপাক কসম খেয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে আমার মত হয়ে আসবে তাকে আমার মতই ইজ্জত ও সম্মান দান করা হবে।

প্রিয় পাঠকের প্রতি আহ্বান

প্রিয় পাঠক! চিন্তা করার বিষয় যে, ষোল বছরের এ বালক কি পরিমান তাকওয়া-পরহেজগারী এখতিয়ার করেছে। কি পরিমান খোদার সান্নিধ্য সে লাভ করেছে। জীবনের এ স্বল্প পরিসরে আখেরাতের জন্য সে কতবেশী পুঁজি সংগ্রহ করেছে। অথচ আমাদের বয়স আজ ত্রিশ চল্লিশ ষাট কিংবা আশিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমরা ছোট্ট এই বালকের তুলনায় আখেরাতের জন্য কতটুকু পুঁজি সংগ্রহ করেছি। আমরা কি প্রতিদিন মৃত্যুর কথা স্মরণ করি? আমরা কি প্রত্যহ একথা চিন্তা করি যে, আমাকে নির্জন কবরে একাকী শুইতে হবে। সেখানে আমার ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন কিছুই কাজে আসবে না। সেখানে তো কেবল ঈমান আর আমলই আমার কাজে আসবে। আমরা কি চিন্তা করি যে, হাশরের ময়দানে খোদার সামনে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি মানুষের সামনে আমাকে গোটা জীবনের হিসেব দিতে হবে।

প্রিয় পাঠক ভাইগণ! একটু চিন্তা করুন। এ দুনিয়াতে আপনারা যাকেই ভাল বাসুন না কেন একদিন তাকে ছেড়ে চলে যেতেই হবে। যত ধন-সম্পদই উপার্জন করুন না কেন, একদিন তা আপনার হাতছাড়া হবেই। তাই মেহেরবাণী করে চিরস্থায়ী জিন্দেগীর জন্য কামাই করতে সচেষ্ট হোন। দুনিয়ার তুলনায় আখেরাতকে প্রাধান্য দিন। বেশী বেশী জিকির করুন। কালামে পাক ভক্তি সহকারে তিলাওয়াত করুন। যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বিরত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, সাময়িক আনন্দের জন্য লক্ষ কোটি বছরের শাস্তি মাথা পেতে গ্রহণ করা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোকে সাবধানে পরিচালনা করুন। বেগানা নারীর দিকে দৃষ্টি করা থেকে চোখকে হেফাযত করুন। নিজেও আপন দেহকে অপরের দর্শন দান থেকে হেফাযত করুন। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে দেখে, আর যে দেখায়, তাদের উভয়ের উপর আল্লাহ তাআলা লানত বর্ষণ করেন। [৫] গীবত শেকায়েত ও পরনিন্দা থেকে জবানকে রক্ষা করুন। কারণ এগুলো মারাত্মক কবীরা গুনাহ। গীবত করাকে আল্লাহপাক মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য পাপ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[৬] আল্লাহপাক আমাদের সকলকে যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে আখেরাতের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন। (সূত্র : ফাযায়েলে ছাদাকাত)

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, হারুন অর রশীদের ছেলের এই গল্প থেকে আমরা তিনটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি:

  • দুনিয়ার আরাম-আভিজাত্য চিরস্থায়ী নয়। গল্পে বাদশাহর ছেলে কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদের স্মরণ করে মনে করিয়ে দিত, দুনিয়া কাউকে ধরে রাখতে পারে না।
  • অল্পে তুষ্টি ও হালাল উপার্জনের সৌন্দর্য। ছেলেটি সপ্তাহে একদিন কাজ করে নির্দিষ্ট মজুরি নিত, বেশি দিতে চাইলেও নিতে চাইত না।
  • কবরে সঙ্গী হয় ঈমান ও আমল। গল্পে মৃত্যুর আগে ছেলেটির উক্তি ছিল, কবরে মানুষের সঙ্গে কেবল ঈমান আর আমলই থাকবে। এটি গল্পের চরিত্রের কথা, কোনো ফিকহি বিধান নয়।
📖 যে গল্প হৃদয় কাড়ে বইয়ের আরও গল্প

লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। বইঃ যে গল্প হৃদয় কাড়ে (হৃদয় গলে ৫)  সংযোজন ও তথ্য বিশ্লেষণ: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন।_ABP


তথ্যসূত্র ও টীকা

    1. হারুন অর রশীদের শাসনকাল ও বয়স: TDV İslâm Ansiklopedisi-তে হারুন অর রশীদের খিলাফতের সময়কাল ৭৮৬–৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। তাই ২৫ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণের দাবিটি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। TDV İslâm Ansiklopedisi ↑
    2. নামাজ ও হজের বিবরণ: ইসলামওয়েবের ঐতিহাসিক নিবন্ধে আল-খতিব আল-বাগদাদির তারিখ বাগদাদের বরাতে হারুন অর রশীদের প্রতিদিন ১০০ রাকাত নামাজ পড়া এবং হজে গেলে ১০০ ফকিহ ও তাঁদের সন্তানদের সঙ্গে নেওয়ার বিবরণ উদ্ধৃত হয়েছে। তবে একই নিবন্ধে আল-মাসউদির সূত্রে হজের একাধিক বছরের তালিকা রয়েছে, যা গল্পে উল্লেখিত নয়বারের সংখ্যার সঙ্গে মেলে না। ইসলামওয়েব: হারুন অর রশীদ ↑
    3. হারুন অর রশীদের পুত্রের কাহিনির উৎস: ২০১৮ সালে Acta Islamica জার্নালে প্রকাশিত “Story of Harun Rashid’s Son: A story with Archetypal hero” গবেষণাপত্রে কাহিনিটিকে মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভীর Fazail-e-Sadaqat গ্রন্থের ৫৪ নম্বর গল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকেরা কাহিনিটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাই এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়, প্রচলিত নীতিশিক্ষামূলক কাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করাই সতর্কতাপূর্ণ। গবেষণাপত্র (PDF) | আরবি কাহিনির একটি সংস্করণ ↑
    4. চক্ষু, কর্ণ ও অন্তর যা কল্পনা করতে পারে না: এই বাক্যাংশটি সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৩২৪৪-এ বর্ণিত আল্লাহর বাণীর সঙ্গে মিলে যায়। সেখানে নেককার বান্দাদের জন্য এমন নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে কল্পনাও উদয় হয়নি। তবে এই মিল স্বপ্নের কাহিনিটিকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করে না। সহিহ আল-বুখারি ৩২৪৪ ↑
    5. “যে দেখে, আর যে দেখায়”—বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা: “لعن الله الناظر والمنظور إليه” অর্থাৎ “আল্লাহ দর্শনকারী ও যার দিকে দৃষ্টিপাত করা হয়, উভয়কে অভিশাপ দিয়েছেন”—এই বর্ণনাটি ইমাম আল-বায়হাকির সূত্রে হাসান আল-বসরির কাছ থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। শায়খ ইবনে বায বর্ণনাটিকে দুর্বল বলেছেন এবং এর সমর্থনে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি জানা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। তাই এটিকে নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিস হিসেবে উদ্ধৃত করা উচিত নয়। শায়খ ইবনে বাযের হাদিস-পর্যালোচনা ↑
    6. গীবত ও মৃত ভাইয়ের গোশতের উপমা: পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২-তে গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কুরআন ৪৯:১২ | HadithBD: সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২-এর তাফসির দেখুন ↑

একটি আহ্বান!

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, হারুন অর রশীদের ছেলের এই গল্পটি ভালো লাগলে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, হয়তো আপনার একটি শেয়ার কারও অন্তরে আখেরাতের চিন্তা জাগিয়ে তুলবে। বইয়ের আরও গল্প পড়তে উপরের তালিকা থেকে বেছে নিন।

Leave a Reply