ফাঁসির মঞ্চে প্রেমের পরীক্ষা – শহীদের হৃদয়ের গোপন বার্তা

ফাঁসির মঞ্চে প্রেমের পরীক্ষা—এ এক অনন্য কাহিনি যেখানে প্রেমের সংজ্ঞা দুনিয়াবি নয়, বরং রাসূল ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার শুদ্ধতম বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রেমিক তাঁর প্রাণের বিনিময়ে প্রমাণ করেন, ঈমানের মর্মস্পর্শী শক্তি কিভাবে একজন মুসলিমকে দৃঢ় রাখে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও। এই গল্প পাঠকের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে সেই প্রশ্ন—যে ভালোবাসা শহীদ হওয়ার সাহস জোগায়, তা কেমন ভালোবাসা!

ফাঁসির মঞ্চে প্রেমের পরীক্ষা – শহীদের হৃদয়ের গল্প, ইসলামিক থিম

ফাঁসির মঞ্চে প্রেমের পরীক্ষা (রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার শহীদ গাথা!)

গাজী ইলমুদ্দীন ৷ একটি নাম। একটি ইতিহাস। ঝিমিয়ে পড়া মুসলিম জাতির অনুপ্রেরণার উৎস । রাসূল প্রেমে আত্মহারা টগবগে এ যুবক নিজেকে ফাঁসির মঞ্চে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করে দিয়ে রাসূলের প্রতি মহব্বত ও ভালবাসার যে চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন মুসলিম জাতি যুগ যুগ ধরে তা গর্বের সাথে স্মরণ রাখবে।

ইহুদী-খৃষ্টান তথা সকল কাফের মুশরিক কখনোই মুসলমান- দের বন্ধু ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও হবে না। যেমন, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৫১)

বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিও অনেক সময় কাফেরদেরকে মুসলমান- দের প্রতি সহানুভূতি ও করুণা প্রদর্শন করতে দেখা যায় তথাপি মুসলিম জাতিকে একথা খুব ভাল করেই স্মরণ রাখতে হবে যে, এ সকল সদাচরণ ও দয়া প্রদর্শন তারা সুদূরপ্রসারী কোন নীল নক্‌শা বাস্তবায়ন ও আপন স্বার্থ উদ্ধারের জন্যেই করে থাকে। তারা দুনিয়াতে প্রভুত্ব চায় । চায় সমগ্র পৃথিবীর রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। আর এ সকল নাপাক উদ্দেশ্য হাসিলের পথে তাদের একমাত্র বাধা হচ্ছে ইসলাম ও মুসলিম জাতি। তাই ছলে-বলে কৌশলে তারা বাঁধার এ প্রাচীরকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।

ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য বেঈমান কাফেররা হাজারো ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। আল্লাহর পেয়ারা রাসূল আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত-পবিত্র চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টাও তাদের সেইসব ষড়যন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু সিংহের জাতি মুসলমানগণ কখনোই কাফেরদের এ সকল ঘৃণ্য অপচেষ্টাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। বরং জীবনের শেষ রক্ত বিন্দুটুকু দিয়ে হলেও তারা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজ্জত- সম্মান ও মহান চরিত্রের উপর আক্রমণকারী পাপাত্মাগুলোকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়ে তাঁর প্রতি প্রেম ও ভালবাসার অপূর্ব নজীর স্থাপন করেছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত দুটি ঘটনা সম্মানিত পাঠকদের সম্মুখে উপস্থাপন করছি-

রঙ্গিলা রাসূল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত-পবিত্র ও উন্নত চরিত্রে মারাত্মক হামলা চালিয়ে লাহোরের ‘রাজপাল‘ নামক এক আর্যসমাজী পান্ডা কর্তৃক লিখিত একটি জঘন্য পুস্তক। এ পুস্তকে এমন সব কাল্পনিক মিথ্যা অপবাদের সমাবেশ ঘটানো হয় যে, এর প্রতিবাদে সমগ্র উপমহাদেশের ক্ষুদ্ধ মুসলিম সত্তা যেন এক সাথে চিৎকার দিয়ে উঠে।

গাজী ইলমুদ্দীন ছিলেন ক্ষোভ ও আক্রোশে ফেটে পড়া সেইসব তৌহিদী জনতারই একজন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, যে পাপিষ্ঠ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান চরিত্রের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাঁর নির্মল ও নিষ্কলুষ চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা চালিয়েছে, তাকে তিনি যে কোন উপায়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিবেনই। তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত তার অস্থির চিত্ত কখনো শান্ত হবে না।

গাজী ইলমুদ্দীন তার প্রতিজ্ঞাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সুযোগ খুঁজছিলেন। একদিন সুযোগ পেয়ে সেই আশেকে রাসূল নবী- প্রেমে আত্মহারা বীর যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে পাপাত্মা রাজপালের বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে অগণিত মুমিন হৃদয়ের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন।

গাজী ইলমুদ্দীনের ছুরির আঘাতে সাথে সাথে দুরাত্মা রাজপালের ভবলীলা সাঙ্গ হয়। সে বুঝতে পারে, রাসূল প্রেমীরা এখনও জীবিত আছে।

যা হোক, রাজপালকে হত্যার দায়ে গাজী ইলমুদ্দীনকে গ্রেফতার করা হয় এবং এক পর্যায়ে ইংরেজের বিচারালয়ে তাঁর প্রতি ফাঁসির আদেশ হয়। নিম্ন আদালতের সে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল দায়ের করা হয়।

মুসলিম নেতৃবৃন্দ আপীল দায়ের করার পর কারাগারে গিয়ে গাজী ইলমুদ্দীনের সাথে সাক্ষাত করেন এবং এ মর্মে আবেদন করেন যে, তিনি যেন নিম্ন আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দী অস্বীকার করে শুধু এতটুকু বলেন যে, আমি রাজপালকে হত্যা করিনি।

কিন্তু আল্লাহর হাবীবের সে আশেক যুবক এ বলে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন যে, ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি পিয়ারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা থেকে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। আমি তার পাক কদমে লুটিয়ে পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি। আপনারা অনর্থক আমার সে আকুল প্রতীক্ষা দীর্ঘায়িত করবেন না।’

শেষ পর্যন্ত এ বীর যুবক এক প্রকার স্বেচ্ছায়ই ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলে আকাঙ্খিত শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন । লক্ষ লক্ষ ভক্ত মুসলমান তার নামাযে জানাযা আদায় করে লাহোরের অমর সাধক মিয়া মীরের মাজার-পার্শ্বে তাঁকে দাফন করেন।

যে প্রেম ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিল  (রাসূলের প্রতি ভালোবাসার অমর কাহিনি!)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান চরিত্রের উপর বিভিন্ন প্রকার কটুক্তি ও অপবাদ আরোপ করে ২য় বইটি লিখা হয় ১৯৩৩ সালে। বইটির নাম “হিষ্ট্ৰী অব ইসলাম” । এ বইটি ‘নাথুরাম‘ নামক এক পাপিষ্ঠ রচনা করে। সে ছিল তদানীন্তন সিন্ধু প্রদেশের আর্য সমাজ নামক সংগঠনের প্রধান সম্পাদক । এ বইয়ের বিরুদ্ধেও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় । তারা লেখকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।

দীর্ঘকাল পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে বৃটিশ আইনে লেখকের দু’বছর জেল ও মামুলী ধরণের জরিমানা হলেও আপীল দায়ের করার পর উচ্চতর আদালত আপীলের শুনানী সাপেক্ষে দুর্বৃত্ত নাথুরামকে জামিনে মুক্ত করে দেয়। এতে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ক্ষোভে-দুঃখে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। তারা সংখ্যাগুরু হিন্দু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির পক্ষ থেকে আল্লাহর পেয়ারা হাবীবের বিরুদ্ধে একের পর এক পরিচালিত এসব জঘন্য হামলার কি প্রতিকার করা যায় এ নিয়ে পরামর্শ সাপেক্ষে আন্দোলন শুরু করলেন।

এদিকে ‘আব্দুল কাইয়ূম’ নামক ২৩/২৪ বছরের এক যুবক করাচীর সদর জামে মসজিদে নামায আদায় করার পর ইমাম সাহেবের মুখে শুনতে পেলেন যে, প্রভাবশালী এক পাপাত্মা পেয়ারা নবীজির প্রতি ঘৃণ্য অপবাদ আরোপ করে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানী চেতনাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে।

আব্দুল কাইয়ূম ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তিনি কিছুদিন আগেকার গাজী ইলমুদ্দীনের বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্বের কথা জানতেন। মুসলিম যুবকরা তখনকার দিনে গর্বের সাথে গাজী ইলমুদ্দীনের নাম উচ্চারণ করত।

ইমাম সাহেবের অগ্নিঝরা বক্তব্য শুনে আব্দুল কাইয়ূমের ঈমানী চেতনা তাকে অস্থির করে তুলল। ভাবলেন, রাসূলের আশেক কোন যুবক কি এখন বেঁচে নেই? থাকলে কিভাবে, কোন সাহসে আর্য সমাজের এই দুবৃত্ত এমন ঘৃণ্য তৎপরতায় লিপ্ত হল? কথা কয়টি তার মস্তিস্কে ঘুরপাক খেতে খেতেই তিনি তার কর্তব্য স্থির করে ফেললেন। প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি নিজে বুকের শেষ রক্ত বিন্দুটুকু দিয়ে হলেও ওদের দেখিয়ে দিবেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভক্ত উম্মতেরা এখনও বেঁচে আছে। তার পবিত্র মর্যাদার খাতিরে জীবন উৎসর্গ করার মত লোকের এখনও অভাব হয়নি । মনে মনে কর্তব্য স্থির করে তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে পকেটে রক্ষিত সামান্য ক’টি টাকা দিয়েই বাজার থেকে ধারালো একটি ছু রি ক্রয় করে নিলেন।

১৯৩৪ সাল। সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ। দু’জন ইংরেজ জজ করাচীর উচ্চ আদালতে নাথুরামের আপীল মামলার শুনানী গ্রহণ করছেন। আদালত প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। আইনজীবী ও মামলার তদবীরকারকগণের দ্বারা আদালত কক্ষ পরিপূর্ণ । বিচারপতিগণ নাথুরামের আইনজীবীর পক্ষ থেকে পেশকৃত বক্তব্য শ্রবণ করছেন।

আব্দুল কাইয়ূম সদ্য কেনা ধারালো ছুরিটি লুকিয়ে রেখে ধীর-শান্ত পদক্ষেপে আদালত কক্ষে প্রবেশ করলেন। প্রথমে তিনি আইনজীবীদের পিছনের সারিতে দর্শকদের সাথে একটি কুরসীতে বসলেন। নাথুরামকে তিনি চিনতেন না। তাই মামলার কার্যধারা লক্ষ্য করে তিনি প্রথমে তার শিকার ঠিকমত সনাক্ত করে নিলেন। দেখলেন, সেই কুখ্যাত নাথুরাম তার পাশের চেয়ারেই বসে আছে। অত্যন্ত গভীরভাবে তিনি একবার তার আপাদমস্তক দেখে নিলেন।

বেশ কিছুক্ষণ পর বিচারকের একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য নাথুরাম উঠে দাঁড়াল। পাশে উপবিষ্ট আব্দুল কাইয়ুম মনে মনে বললেন, এই তো সুযোগ! সুতরাং আর দেরী নয় ৷ তিনি ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় উঠে দাঁড়ালেন এবং কক্ষ ভর্তি লোকজন কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই চোখের পলকে পাপিষ্ঠ নাথুরামের কন্ঠনালী বরাবর তীক্ষ্ণ ছুরি আমূল বসিয়ে দিলেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো। কিন্তু তিনি থামলেন না। ছুরি টেনে বের করলেন এবং একের পর এক আরও দুটি অব্যর্থ আঘাত করে বিশালবপু নরাধমকে একেবারে ধরাশায়ী করে ছাড়লেন।

নাথুরামের চিৎকারে আদালত ভবন প্রকম্পিত হল। কামরা ভর্তি লোকগুলো কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিন্তু আব্দুল কাইয়ুমের মধ্যে মোটেও কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। প্রচুর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পালাবার চেষ্টা করলেন না। রক্ত মাখা ছুরিটা হাতে নিয়েই তিনি নির্ভীক বিজয়ী বীরের ন্যায় ধীর শান্ত ভাবে নিজেকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন।

এমন একটা লোমহর্ষক ঘটনা আদালত কক্ষে ঘটে গেছে এটা প্রথমে বাইরে অপেক্ষমান হাজার হাজার লোক বুঝতেই পারেনি। খবর প্রচারিত হওয়ার পর সহস্র কণ্ঠের তাকবীর ধ্বনীতে করাচীর আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠলো।

আব্দুল কাইয়ূম পুলিশের হেফাজতে চলে যাওয়ার পর ইংরেজ জজ আসন ছেড়ে নেমে এলেন এবং তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি এই লোকটাকে খুন করেছ?

আব্দুল কাইয়ূম দেয়ালে ঝুলানো পঞ্চম জর্জের ছবিটির প্রতি ইশারা করে বললেন, এটা তো আপনাদের রাজার ছবি। কেউ যদি এ রাজাকে অপমান করে তবে কি আপনারা তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করবেন না? এই পাপিষ্ঠ নাথুরাম আমার হৃদয় রাজ্যের সম্রাট প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এমন অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেছে, যা আমার ঈমানী চেতনায় নিদারুণ আঘাত করে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। তাই আমি ওর নাপাক অস্তিত্ব দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছি।

আব্দুল কাইয়ূমের বিরুদ্ধে মোকাদ্দমা চালানো হলো। সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন হল না । কারণ প্রকাশ্য আদালতে তিনি নিজেই স্বীকার করলেন যে, আমি নাথুরামকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছি। বিচারে আব্দুল কাইয়ূমের মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করা হলো । রায় শুনে তিনি বিচারককে লক্ষ্য করে বললেনঃ

মাননীয় জজ! আমি আপনার প্রতি এজন্য কৃতজ্ঞ যে, আমাকে আপনি মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন। আমার তো একটিই জীবন! বিশ্বাস করুন, যদি আমার লক্ষ জীবন থাকতো, তবুও আমি আল্লাহর প্রিয় হাবীবের পূত-পবিত্র মর্যাদার জন্য তা লুটিয়ে দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হতাম না।

করাচির নেতৃস্থানীয় মুসলমানগণ এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল দায়ের করলেন এবং সৈয়দ মোঃ আসলাম নামক একজন শীর্ষ স্থানীয় আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। উক্ত আইনজীবী যখন মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে কথা বলার জন্য আব্দুল কাইয়ূমের সাথে সাক্ষাত করে বললেন, আপনি পূর্বোক্ত জবানবন্দী প্রত্যাহার করে নিলে আমাদের পক্ষে আপনার মুক্তির ব্যাপারে কাজ করে যাওয়া সহজ হবে। তখন রাসূল প্রেমে আত্মহারা এই সাচ্চা যুবক দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিলেন :

“বিচারকের সামনে আমি যে স্বীকৃতিমূলক জবানবন্দী দিয়েছি, তা প্রত্যাহার করে আমার পরকালীন পুরস্কার খাটো করতে পারবো না।”

অতঃপর উপায়ান্তর না দেখে জনাব আসলাম আদালতে এভাবে যুক্তি পেশ করলেন যে, আল্লাহর রাসূলের প্রতি মুসলমানদের যে শর্তহীন আনুগত্য এবং আবেগময় প্রেমের সম্পর্ক, সেটা ব্যাখ্যা করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে । এজন্য ইসলামী শরীয়তের বিধান হচ্ছে, যে কোনভাবে কেউ আল্লাহর পেয়ারা হাবীবের মর্যাদা হানির চেষ্টা করলে তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড।

তিনি আরো বললেন, কাউকে যদি উস্কানী দিয়ে উত্তেজিত করা হয় এবং এ অবস্থায় যদি সে কাউকে হত্যা করে, তবে বৃটিশ আইনের ৩০২ নং ধারা মোতাবেক তাকে চরম পর্যায়ের শাস্তি দেয়া যায় না। যেমন, কেউ যদি তার স্ত্রী বা কন্যাকে কারো হাতে লাঞ্চিত হতে দেখে এবং সে উত্তেজিত হয়ে লাঞ্চনাকারীকে হত্যা করে, তবে হত্যাকারী মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয় না।

মাননীয় বিচারক! মুসলমানদের হৃদয় রাজ্যের একচ্ছত্র সম্রাট, আল্লাহর প্রিয়নবী, দোজাহানের বাদশাহ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজ্জত-সম্মানে আঘাত করার চাইতে বড় উস্কানী একজন মুসলমানের পক্ষে আর কি হতে পারে? তাই আব্দুল কাইয়ূম আইনের উক্ত ধারা মোতাবেকই চরম শাস্তির পরিবর্তে লঘু দন্ড পাওয়ার অধিকারী।

জনাব! একজন মুসলমানের অনুভূতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা কত উচ্চ এবং তাতে আঘাত লাগলে তার অনুভূতি কতটুকু আহত হয় তা আমি আপনাকে ভাষায় বুঝাতে পারবো না। আমি মাননীয় আদালতের সামনে একথা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, যতক্ষণ একজন মুসলমান জীবিত থাকবে, ততক্ষণ সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য মর্যাদাহানিকর যে কোন তৎপরতার বিরুদ্ধে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত হবে না। এক্ষেত্রে তারা আইনের ভ্রুকুটি বা ফাঁসির রজ্জুর প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করবে না।

বিজ্ঞ আইনজীবীর যুক্তির প্রতি মোটেও গুরুত্ব না দিয়ে ইংরেজ বিচারকগণ আপীল খারিজ করে দিলেন।

মুসলিম নেতৃবৃন্দ শেষ চেষ্টা হিসেবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, তারা তৎকালীন বড় লাটের নিকট গমন করবেন এবং আব্দুল কাইয়ূমের মৃত্যুদন্ড রহিত করে তা আজীবন কারাদন্ডে পরিবর্তন করার জন্য একটি আবেদন পেশ করবেন । কিন্তু রাসূল প্রেমিক আব্দুল কাইয়ূম কোন অবস্থাতেই করুণা ভিক্ষার আবেদনে স্বাক্ষর করতে সম্মত হলেন না। তিনি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজ্জত রক্ষার এ লড়াইয়ে শহীদের মর্যাদা লাভ করার জন্য বারবার ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে লাগলেন৷

শেষ পর্যন্ত নেতৃস্থানীয় মুসলমানগণ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লামা ইকবালের নিকট হাজির হলেন। আল্লামা ইকবাল আব্দুল কাইয়ূম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন :

সে কি মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছে ?

নেতৃবৃন্দ জবাবে বললেন, সে মানসিকভাবে দূর্বল তো হয়ইনি বরং অনুকম্পা ও দয়া প্রার্থনার দরখাস্তে দস্তখত করতে পর্যন্ত রাজী হচ্ছে না।

আল্লামা বললেন, সে কি বলে?

নেতৃবৃন্দ জবাব দিলেন, সে বলে, আমাকে পিয়ারা নবীজীর মর্যাদা রক্ষার এ জিহাদে শহীদ হতে দিন।

এবার আল্লামার কন্ঠ জড়িয়ে এলো। একটু ক্ষোভ মিশ্রিত স্বরেই তিনি বলতে লাগলেন, আল্লাহর পেয়ারা হাবীবের এক আশেক যখন জীবন উৎসর্গ করে তার এশকের দাবী প্রমাণ করতে চায়, তখন আমাদের পক্ষে সে পবিত্র আকাঙ্খার পথে বাধা সৃষ্টি করা কি উচিত হবে?

এতটুকু বলে আল্লামা ইকবাল থেমে গেলেন। তিনি আর বলতে পারলেন না। তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হল।

অতঃপর নেতৃবৃন্দ নিরাশ হয়ে করাচী ফিরে এলেন। নির্ধারিত দিনে নবী-প্রেমিক আব্দুল কাইয়ুমের ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেল। করাচীর হাজার হাজার মুসলমান এ অমর শহীদের লাশ জেল ফটক থেকে বহন করে আনলেন। জানাযা পড়লেন এবং পূর্ণ শহীদী মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করলেন ।

কিছুদিন পর আল্লামা ইকবাল গাজী ইলমুদ্দীন ও আব্দুল কাইয়ূমের স্মরণে তার বিখ্যাত কবিতা ‘লাহোর ও করাচী’ রচনা করেন। এই কবিতারই একটি পংক্তি নিম্নরূপ :

ফাঁসির মঞ্চে প্রেমের পরীক্ষা

“এ শহীদদের জীবনের বিনিময় গির্জা অনুসারীদের কাছে চেয়ো না; যাদের রক্তের দাম কাবার চাইতেও বেশী।”

— আল্লামা ইকবাল। 

আলোচ্য ঘটনাদ্বয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিটি মুসলমানকে এরূপ সংকল্প করা উচিত যে, আমি জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইজ্জত-সম্মানে আঘাতদানকারী কোন পাপিষ্ঠ দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে পারবে না। জীবনের শেষ রক্ত বিন্দুটুকু দিয়ে হলেও আমি পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত-পবিত্র চরিত্রে অপবাদ আরোপকারী নরাধমকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েই ছাড়বো। 

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম। 

রাসূল ﷺ-এর প্রেম নিয়ে আরো গল্প গুলো: 

  1. এক আশেকে রাসূল প্রেমিকের আশ্চর্য ঘটনা
  2. রাসূলের মুচকি হাসি (দাম্পত্য জীবনের গল্প)
  3. আশেক যুবক (দরূদ শরীফ পাঠের ফজিলতের গল্প)

আপনি কি নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সম্পর্কে নিচের তথ্যগুলো জানেন? 

  1. মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবারের নাম ও উপকারিতা
  2. নবী করীম (সা:) এর বহু বিবাহের সমালোচনার প্রতিবাদ
  3. মুহাম্মদ নামের অর্থ কি
  4. নবীজির স্ত্রীদের নাম অর্থসহ তালিকা
  5. নবীজির ছেলেদের নাম ও মেয়েদের নাম
  6. নবীজির গুণবাচক নাম সমূহ বাংলা অর্থসহ
  7. ২৬ জন নবীদের পবিত্র নামের তালিকা

রাসূল ﷺ ও সাহাবিদের জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্পগুলো

আরও হৃদয় ছোঁয়া ইসলামিক গল্প জানতে আমাদের গল্প বিভাগের পেজ ভিজিট করুন।

আরও ইসলামিক গল্প পড়ুন →

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading