আশেক যুবক (দরূদ শরীফ পাঠের ফজিলতের গল্প)

দরূদ শরীফবিখ্যাত বুযুর্গ হযরত শিবলী রহঃ। একদিন তিনি কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি এক যুবকের উপর আটকে গেল। তিনি লক্ষ্য করলেন, যুবক তাওয়াফ করছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত দোয়া না পড়ে দরূদ শরীফ পাঠ করছে।

শিবলী রহঃ যুবকের কাছে গেলেন। বললেন—ভাই! তুমি কি দরূদ শরীফ ছাড়া অন্য কোনো দোয়া জানো না? কোন সময় কোন দোয়া পড়তে হয়, সে ব্যাপারেও কি তোমার কোন জ্ঞান নেই? তুমি সর্বত্রই দরূদ শরীফ পাঠ করছো কেন?

যুবক বলল, আমি অনেক দোয়া মুখস্থ পারি। কোন জায়গায় কোন দোয়া পড়তে হয় তাও আমি জানি। কিন্তু দরুদ শরীফ পাঠ করার যে ফজিলত আমি লাভ করেছি অন্য কোনো দোয়ায় তা পাইনি। তাই সর্বত্রই দরূদ শরীফ পাঠ করছি।

শিবলী রহঃ বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইউপর দরূদ শরীফ পাঠ করে তুমি কী উপকার পেয়েছো তা আমি শুনতে পারি কি?

অবশ্যই।

বলো তাহলে।

যুবক বলতে লাগল—আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমি একদিন আমার পিতার সাথে হজ্জে আসছিলাম। বাগদাদে আসার পর আমার আব্বা জীষণ জ্বরাক্রান্ত হলেন এবং কয়েকদিন পর একরাতে তিনি দুনিয়া  থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করলেন। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পর মুহুর্তে দেখা গেল, তাঁর মুখের আকৃতি শুকরের আকৃতি ধারণ করেছে। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আমি সাংঘাতিক কষ্ট পেলাম এবং কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম।

তখন আমার অবস্থা এরূপ হয়েছিল যে, আব্বার আকৃতি পরিবর্তনের বিষয়টি কারো  নিকট বলতেও পারছিলাম না আবার আমার পক্ষে একা তাকে দাফন করাও সম্ভব হচ্ছিল না। এমতাবস্থায় প্রচণ্ড কষ্ট, ভীষণ চিন্তা ও দুর্ভাবনায় এক সময় আমি হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা বলতে পারব না।      

আব্বার আকৃতি পরিবর্তনের সাথে সাথে আমি তাঁর চেহারার উপর একটি কাপড় টেনে দিয়েছিলাম। এবার ঘুমের মধ্যে আমি দেখি—এক সুন্দর সুদর্শন পবিত্র পুরুষ আমার পিতার লাশের কাছে এসে তাঁর চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে নিজ হাত দ্বারা চেহার মুছে দিলেন। এতে বিকৃত চেহারা সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাবস্থায় ফিরে এল এবং এমন সুন্দর ও উজ্বল হয়ে ওঠল যে, তাতে পূর্ণিমার চাঁদের মতো নূরাণী চমক দেখা  গেল। লোকটি তাঁর কাজ শেষ করে চলে যেতে উদ্যত হলে আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আরজ করলাম, হযরত! আপনি আমাকে চরম বিপদের সময় সাহায্য  করে অশেষ অনুগ্রহ করেছেন। দয়া করে আপনার পরিচয়টুকু দিয়ে আমাকে ধন্য করুন।

পরিচয় পাওয়ামাত্র আমি তাঁর পাক কদমে লুটিয়ে পড়লাম।  চুমো খেলাম। তারপর বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার পিতার মৃত্যু সংবাদ আপনি কিভাবে পেলেন? আমি তো এ সংবাদ এখনো কাউকে দেই নি!

জবাবে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার বাবা প্রত্যেক রাতে আমার প্রতি তিনশত বার দরূদ শরীফ পাঠ করত এবং দরূদ পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত এক ফেরেশতা তা আমার কাছে পৌঁছে দিত। আজ রাতে যখন উক্ত ফেরেশতা তোমার পিতার দরূদ আমার কাছে পৌঁছায়নি, তখন আমি ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলাম—অমুকের দুরূদ আমার নিকট আজ পৌঁছাওনি কেন?

তখন ফেরেশতা আমাকে বলল, সে তো আজ মারা গেছে এবং তাঁর আকৃতি পরিবর্তন হয়ে গেছে।

একথা শুনে আমার খুব দুঃখ হলো। সেই সাথে মনে জাগ্রত হলো দয়া আর অনুকম্পা। তাই চলে এলাম। এ বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চলে গেলেন।

তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি অবশিষ্ট রাতটুকু বিস্ময়াভিভূত অবস্থায় কাটালাম।  ফজরের নামাজের পর দেখলাম, আমার পিতার জানাযার নামাজ পড়ার জন্য শহরের চারিদিকি থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসছে। এদের আগমন দেখে আমি আশ্চর্য হলাম। ভাবতে লাগলাম, কে তাদেরকে আমার পিতার মৃত্যু সংবাদ জানালো! অবশেষে আমি তাদেরকেই এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।

জবাবে তারা বলল, আমরা ভোর রাতে আকাশ থেকে একটি গায়েবী আওয়াজ শুনতে পাই। তাতে বলা হয়, অমুক মহলার অমুক স্থানে একজন লোক মারা গেছে। যে ব্যক্তি নিজের যাবতীয় গোনাহ মাফ করাতে চায় সে যেন তাঁর জানাযায় গিয়ে শরীক হয়।

অতঃপর যুবক বলল, দরূদ শরীফের এই মহান মর্যাদা স্বচক্ষে দর্শন করার কারণেই আমি অন্যসব দোয়া ছেড়ে এখন সর্বদা দরূদ শরীফই পাঠ করি।

একথা শুনে হযরত শিবলী রহঃ বললেন, বৎস! তুমি যে খুঁটির সন্ধান পেয়েছে, উহাকে তুমি আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং কখনোই উহাকে ছেড়ে দিও না।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! পবিত্র কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন স্থানে দরূদ শরীফ পাঠ করার জন্য উম্মতকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো মুমিন বান্দা কৃপণ বলে বিবেচিত হওয়ার জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট যে, যখন তাঁর সামনে আমার নাম নেওয়া হয়, তখন সে আমার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করে না। [কিতাবজ্জুহুদ লি ইবলিন মুবারক, পৃষ্ঠাঃ ৩৬৩]

হ্যাঁ, নবীজীর নাম শুনে যে ব্যক্তি তাঁর উপর দরূদ পাঠ করবে না তাকে কৃপণ বলা যথার্থ। কেননা যে নবী উম্মতের উপর বর্ণনাতীত অনুগ্রহ করেছেন, যিনি উম্মতের চিন্তায় রাতের পর রাত বিনিদ্রা রজনী কাটিয়েছেন, যিনি উম্মতকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য সর্বদা ফিকির করেছেন, সেই মহান নবীর কি একজন উম্মতের কাছে এতটুকু পাওনা নেই যে, যখন তাঁর সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উচ্চারণ করা হবে তখন সে তাঁর প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করবে? তাছাড়া আরও বড় কথা হলো, এই দরূদ শরীফ পাঠের দ্বারা নবীজীর উপকার যতটুকুওই হোক না কেন, তাঁর চেয়ে বেশি উপকৃত হয় পাঠক নিজে। সুতরাং উভয় পক্ষের ফায়েদা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই পূণ্যের কাজ থেকে বিরত থাকবে, তাকে কৃপণ ছাড়া আর কি বলা হবে?

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দরূদ পাঠের বিষয়টি বড়ই অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছে—নিশ্চয়ই আল্লাহ তাতালা ও তাঁর ফিরিশতাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করো। [সূরাঃ আহযাবঃ ৫৬]

প্রিয় বন্ধুগণ! লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে আল্লাহ তাআলা একথা বলেননি যে, তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করো। বরং কথার শুরুটা তিনি এভাবে করেছেন—আল্লাহ ও তদীয় ফিরিশতাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করেন। এভাবে বলার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য তোমাদের দরূদ পাঠের কোনো প্রয়োজন করেন। তবে তোমরা যদি তোমাদের কল্যাণ চাও তাহলে তোমরাও এতে অংশ গ্রহণ করতে পারো।

তাছাড়া উল্লেখিত আয়াতে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নবীজির উপর দরূদ পাঠ করা কোনো সাধারণ আমল নয়; বরং এ এক এমন অসাধারণ আমল যার মধ্যে বান্দার সাথে আল্লাহ শরীক রয়েছেন। পক্ষান্তরে অন্যান্য ইবাদতে বান্দার সাথে আল্লাহ শরীক থাকেন না। যেমন, বান্দা নামাজ পড়ে কিন্তু আল্লাহ নামাজ পড়েন না। বান্দা রোজা রাখে, কিন্তু আল্লাহ রোজা রাখেন না। এসব আমল বান্দা একাই করে থাকে। কিন্তু দরূদ শরীফ এমন একটি আমল, যে আমল সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন—আল্লাহ ও তদীয় ফিরিশতাগণ দরূদ শরীফ পাঠ করেন। সুতরাং তোমরাও এতে অংশগ্রহণ করো। প্রিয় পাঠক! এবার আপনারাই বলুন, এমন আমলের কি কোনো তুলনা হতে পারে?

হযরত উলামায়ে কেরাম বলেছেন, পৃথিবীতে এমন কোনো দোয়া নেই যেটা কবুল হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু দরূদ শরীফ এমন একটি দোয়া যা কবুল হওয়া একশ ভাগ নিশ্চিত। কারণ এই দোয়া করার পূর্বেই আল্লাহ পাক ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, আমি ও আমার ফিরিশতাগণ তোমাদের দোয়ার পূর্বেই হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছি। তাই এর কবুলিয়্যতের ব্যাপারে কোনোরূপ সংশয়ের অবকাশ নেই। এ কারণেই বুযুর্গানেদীন বলেছেন, যখন তোমরা কোনো লক্ষ্যে দোয়া করবে তখন সেই দোয়ার শুরু এবং শেষে অবশ্যই দরূদ শরীফ পাঠ করবে। কারণ, দরূদ শরীফ কবুল হওয়াটা শতভাগ নিশ্চিত। তাই দয়ালু মাবুদ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের ওসিলায় আমরা এই আশা করতে পারি যে, দরূদ শরীফের মাঝখানে যে দোয়া করা হবে, দরূদ শরীফের ওসিলায় সেটাও তিনি কবুল করে নিবেন।

হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাযিঃ বলেন, একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকালয় থেকে বেরিয়ে একটি খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন এবং সিজদায় পড়ে গেলেন। আমি তাঁর সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষায় বসে রইলাম। কিন্তু তিনি এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমি অপেক্ষা করতে করতে মনে মনে এই সংশয় বোধ করতে লাগলাম যে, তাঁর আবার প্রাণবায়ূ উড়ে যায় নি তো! তাই ভাবলাম, হাতটা একটু নাড়া দিয়ে দেখবো কি? তিনি দীর্ঘক্ষণ পর সিজদা থেকে মাথা উঠালেন। আমি লক্ষ্য করলাম, তাঁর চেহারা মোবারক আনন্দে উজ্জ্বল। প্রশ্ন করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমি এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি, যা ইতোপূর্বে কখনো দেখে নি। আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে আমি তো মনে মনে ভাবছিলাম, আপনার প্রাণবায়ূ উড়ে গেল কি না! আচ্ছা, এত বড় সিজদা করার কারণ কি? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, কারণ হলো—হযরত জিব্রাঈল আঃ বললেন, (হে আল্লাহর নবী!) আমি আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যে ব্যক্তি একবারও আপনার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করবে আমি তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করবো। যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাম পাঠ করবে আমি তাঁর প্রতি শান্তি বর্ষণ করবো। আমি এই সুসংবাদ ও নিয়ামতের কৃতজ্ঞতায় সিজদা আদায় করেছি।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা! আসুন আমরা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই। এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করি। বিশেষ করে তাঁর নাম শুনলে এবং দোয়ার পূর্বে ও পরে অবশ্যই দরূদ পাঠের এহতেমাম করি। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন।

[সূত্রঃ আনীসুল ওয়ায়েজীন #ইসলাহী খুতুবাত, খন্ড-৬]

লেখকঃ মাওলানা মুফীজুল ইসলাম। আদর্শ যুবক যুবতি ১ থেকে। 

For more update please follow our Facebook, Twitter, Instagram , Linkedin , Pinterest , Tumblr And Youtube channel.

Rubel

Creative writer, editor & founder at Amar Bangla Post. if you do like my write article, than share my post, and follow me at Facebook, Twitter, Youtube and another social profile.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!