আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪৮তম সূত্রটি পড়ুন।
একজন কোটিপতি শিল্পপতি, একজন বড় ইঞ্জিনিয়ার, সমাজে যাদের ছিল সম্মান আর সম্পদ। আজ তাঁরা একটি মানসিক হাসপাতালে। অথচ বাইরে অনেকেই ভাবছি, “আমার কিছুই নেই।” এই মোটিভেশনাল ঘটনা আমাদের শেখায়, আল্লাহ যা দিয়েছেন তার মূল্য কত বড়। নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকুন, আজকের এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে জানুন সুখী জীবনের সেই চাবি।
মানসিক হাসপাতালে এক শিক্ষণীয় সফর
কখনো কখনো নিজের নিয়ামতের মূল্য বোঝার জন্য অন্যের পরীক্ষার দিকে তাকাতে হয়। লেখক একবার এমনই এক সফরে গিয়েছিলেন, একটি মানসিক হাসপাতালে। সেখানে যা দেখেছেন, তা পড়তে মন ভারী হবে, কিন্তু হৃদয়ে শুকরিয়ার অনুভূতিও জাগবে। চলুন, তাঁর সঙ্গেই সেই সফরে যাই।
হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
একবার কয়েকটি আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করতে এক শহরে গেলাম ৷ একটি বড় মানসিক হাসপাতাল থাকায় শহরটি খুব প্রসিদ্ধ ছিল। মানুষ এটাকে বলত ‘পাগলের হাসপাতাল।’ সে শহরে গিয়ে আমি সকাল থেকে পর-পর দুটি বক্তৃতা দিয়ে বের হলাম। জোহরের আযানের তখনও এক ঘণ্টা বাকি৷
আমার সাথে আবদুল আজীজ নামের এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই শহরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দাঈদের একজন। আমরা একই গাড়িতে ছিলাম। আমি তাকে বললাম, ‘আবদুল আজীজ, এ শহরে একটি জায়গা আছে যদি সময় থাকে তাহলে ওখানে যাবো।’
আবদুল আজীজ বললো, ‘কোথায়? আপনার বন্ধু শায়খ আব্দুল্লাহর ওখানে? নাকি ডা. আহমদের কাছে? আমি তাকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু তিনি রিসিভ করেন নি। নাকি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগারটি দেখতে যেতে চাচ্ছেন?’
আমি বললাম, কোনোটাই না। আমি আসলে বলছিলাম মানসিক হাসপাতালটির কথা৷
আশ্চর্য হয়ে সে জিজ্ঞেস করলো, পাগলগুলোকে দেখবেন!!
‘হ্যাঁ, পাগলগুলোকেই দেখব। আমি জবাব দিলাম।
ও হেসে মজা করে বললো, কেন? আপনি কি আপনার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান?
বললাম, না, তবে অনেক উপকার হবে। আমরা অনেক কিছু শিখতে পারব। আমাদের উপর আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতগুলো বুঝতে পারব।

আমার কথা শুনে আবদুল আজীজ ওদের অবস্থা চিন্তা করতে করতে কিছুটা মনমরা হয়ে গেলো। সে আসলে বেশ কোমল মনের অধিকারী ও আবেগ প্রবণ মানুষ। সে আমাকে তার গাড়ি দিয়েই ওখানে নিয়ে গেল। আমরা গুহার মতো একটা বিল্ডিং-এর কাছে গিয়ে থামলাম। চতুর্পার্শ্বে গাছ-গাছালি বেষ্টিত জায়গাটি দেখলেই কেমন যেন রাজ্যের বিষণ্ণতা এসে জড়ো হয়।
প্রথম দুটি কক্ষের দৃশ্য
একজন চিকিৎসকের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। আমাদের আগমণের উদ্দেশ্য জেনে তিনি ঘুরে ঘুরে গাইডের মতো আমাদেরকে হাসপাতালটি দেখাতে লাগলেন। আমাদেরকে ওদের বিভিন্ন রকমের অবস্থার কথাও বললেন। তিনি আরো বললেন, ‘প্রত্যক্ষণ আর শ্রবণ কখনো এক হয় না।’
তিনি আমাদেরকে নিয়ে একটি লম্বা করিডোর পার হলেন। করিডোরটির দুই পাশে রোগিদের ওয়ার্ড ছিল। সেখান থেকে বিভিন্ন রকম আওয়াজ আসছিল। আমরা ডানদিকের একটি রুম পার হয়ে ভেতরে গেলাম । সেখানে দশটির বেশি বেড খালি পড়ে ছিল। শুধু একটিতে একজন লোক শুয়ে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করছে।
আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কী হচ্ছে? তিনি বললেন, সে একজন পাগল। তার মৃগী রোগও আছে। পাঁচ/ছয় ঘণ্টা পরপর তার মৃগীরোগ দেখা দেয়। আমি ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, প্রকৃত শক্তি ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।
এরপর জিজ্ঞেস করলাম, কতদিন যাবৎ তার এই অবস্থা?
বললেন, ‘দশ বছরের বেশি।’
এ কথা শুনে বড় একটি আঘাত পেলাম। আমার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। কোনোমতে তা সংবরণ করে নীরবে সামনে এগোলাম। কয়েক পা এগুতেই আরেকটি কামরার সামনে এসে পৌঁছলাম। দরজাটি তালাবদ্ধ। তাতে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রয়েছে। এখান দিয়ে ভেতর থেকে একজন লোক ইশারায় আমাদেরকে কি কি যেন বোঝাচ্ছিল। কিন্তু আমরা কিছুই বুঝলাম না। উঁকি দিয়ে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, কামরাটির দেয়াল ও মেঝে সব বাদামি রঙের। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কী ?
তিনি বললেন, পাগল!!
লক্ষ করলাম ডাক্তার সাহেব আমার প্রশ্নটিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তাই বললাম, আমি জানি সে পাগল। ভালো হলে তো আর এখানে তাকে দেখা যেত না। তার সমস্যাটা কী? তিনি বললেন, দেয়াল দেখলেই এই লোকটির মাথায় রক্ত উঠে যায়। হাত-পা অস্থির হয়ে ওঠে এবং দেয়ালে কিল-ঘুষি বা চড় মারতে থাকে। কখনও বা লাথি মারে আবার কখনও মাথা ঠুকতে থাকে। এভাবে একদিন হাতের আঙ্গুলগুলো ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়, আরেকদিন পা কেটে যায়। কোনোদিন তো মাথা ফেটে যায়। আরেকদিন… এতটুকু বলেই ডাক্তার সাহেব কষ্টে মাথা নিচু করে ফেললেন। এরপর বললেন, তার কোনো চিকিৎসাই আমরা করতে পারছি না। তাই এই ঘরে আটকে রেখেছি। দেখতেই তো পাচ্ছেন। এ কামরার দেয়াল ও মেঝেতে ফোম লাগানো আছে ৷ যখন যেভাবে খুশি আঘাত করুক। কিচ্ছু হবে না।
ডাক্তার সাহেব নিরবে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তখনও আমি ও আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে রইলাম। মৃদু আওয়াজে শুধু বললাম,
“সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে এদের মতো পরীক্ষায় ফেলেন নি।”
বন্ধনে আবদ্ধ রোগীদের কক্ষ
তারপর আবার করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। যেতে যেতে একটি কামরার সামনে গিয়ে থামলাম। এখানে কোনো বিছানা পাতা নেই। ত্রিশ জনের বেশি মানুষ হবে। এখানে একেক জনের একেক অবস্থা। কেউ আযান দিচ্ছে কেউ গান গাইছে । কেউ শুধু ঘুরছে। কেউ নাচছে। এদের মধ্যে তিনজনকে চেয়ারে বসিয়ে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এরা এদিক- ওদিক তাকাচ্ছে আর বন্ধনমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আশ্চর্য হয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, এই লোকগুলোর কী সমস্যা? সবাইকে না বেঁধে ওদেরকে বেঁধে রাখা হয়েছে কেন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, এরা সামনে কোনো কিছু পেলেই তার উপর চড়াও হয়ে বসে। দরজা-জানালা সব ভেঙ্গে ফেলে। এয়ার কন্ডিশনার, লাইট, ফ্যান ইত্যাদি কোনো কিছুই তাদের সামনে নিরাপদ নয়। এজন্যই আমরা এদেরকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এভাবেই বেঁধে রাখি।
একবুক ব্যথা নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তারা এই অবস্থায় কতদিন যাবৎ অতিবাহিত করছে? বললেন, এ এসেছে দশ বছর হলো। আর এর সাত বছর। আর এই লোক নতুন এসেছে, মাত্র পাঁচ বছর হয়েছে।
এ কক্ষ থেকে বেরিয়ে ওদের কথা চিন্তা করে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করছিলাম। আল্লাহ আমাদেরকে এসব বিপদ থেকে মুক্ত রেখেছেন।
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, বের হওয়ার পথটা কোনো দিকে? ডাক্তার বললেন, এখনও একটি কক্ষ বাকি আছে। হয়তো ওখানেও আপনি শেখার মতো কিছু পাবেন। একথা বলে আমার হাত ধরে একটি বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। এ ঘরের ভেতরেও ছিল এক দল রোগি। একেক জনের একেক রকম অবস্থা। কেউ নাচছে কেউ ঘুমুচ্ছে। একজন লোককে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় দেখে আমার চেহারার রং ফ্যাকাসে হয়ে গেল। রাগে লাল হয়ে গেলাম। ডাক্তারের দিকে ফিরে তাকালাম। ডাক্তার আমার চেহারায় রাগের চিহ্ন দেখে বললেন, এতো তাড়াতাড়ি রাগ করবেন না। আমি তার ব্যাপারটা আপনাকে খুলে বলছি। এই লোকটিকে যখনই আমরা কোনো কাপড় পরিয়েছি সে তা দাঁতে কামড়ে ছিড়ে ফেলেছে। আমরা একদিনে তাকে দশটি কাপড়ও পরিয়েছিলাম, সে সবগুলোর একই অবস্থা করেছে। এই লোক তার শরীরে কাপড়ের একটি ছিটেফোঁটাও রাখতে চায় না। তাই আমরা ওকে শীত-গ্রীষ্মে এভাবেই ফেলে রাখি। এর আশেপাশের সবাই যেহেতু মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত তাই তারা এর অবস্থা ওভাবে অনুভব করে না। আমি এ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম। এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। ডাক্তারকে বললাম, চলুন তাড়াতাড়ি বের হই। তিনি বললেন, আরো অনেক কিছু তো রয়ে গেল।
আমি বললাম, যা দেখলাম উপদেশ গ্রহণের জন্য তা-ই যথেষ্ট।
যাদের সবকিছু ছিল, তবু সব হারালেন
ডাক্তার হাঁটতে লাগলেন। আমরাও সাথে সাথে চললাম। তিনি একের পর এক কক্ষ পার হতে লাগলেন। আমরাও নিরবে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। হঠাৎ ডাক্তার ঘুরে দাঁড়ালেন। ভাবখানা এমন যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভুলে গিয়েছেন। এরপর তিনি বললেন, জনাব, এখানে একজন বড় শিল্পপতি আছেন। তিনি ছিলেন কোটিপতি। দুই বছর আগে হঠাৎ মাথায় সমস্যা হওয়ায় তার ছেলেরা এখানে এনে রেখে গেছে। আর একজন ছিলেন বড় ইঞ্জিনিয়ার। আরেকজন… । এভাবে ডাক্তার সাহেব একেকজনের কথা বলতে লাগলেন, যারা সমাজে অনেক সম্মানিত ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ধনী ছিলেন কিন্তু এখন সব শেষ।
আরও পড়ুন: দুশ্চিন্তা করে নিজেকে নিঃশেষ করবেন না — সুখী জীবনের ৪৭তম সূত্র
নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকুন — আল্লাহর নিয়ামতের দিকে তাকান
হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে লেখকের মনে যে ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেয়েছে, সেটাই এই সূত্রের মূল কথা। দুনিয়ার বণ্টন আমাদের হিসাবে চলে না। আল্লাহ কাউকে দেন, কারো কাছ থেকে নিয়ে নেন। এই বাস্তবতা বুঝতে পারলে নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকা সহজ হয়ে যায়।
আল্লাহর বণ্টন ও মানুষের সীমাবদ্ধতা
রোগিদের কক্ষ দু’পাশে রেখে হেঁটে যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম আল্লাহর কী লীলাখেলা ! রিজিক বণ্টন করেছেন। কাউকে দিয়েছেন কাউকে বঞ্চিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা কোনো লোককে মাল-সম্পদ, বংশগত মর্যাদা ও পদমর্যাদা সব দেয়ার পরও কখনো কখনো বিবেক-বুদ্ধি ও হুশ-জ্ঞান ছিনিয়ে নেন। তাইতো প্রচুর সম্পদের অধিকারী ও অনেক শক্তিশালী লোককেও আপনি পাগলা গারদে বন্দী দেখতে পাবেন। আবার অনেকে আছে অনেক উচ্চ বংশীয়, সম্পদশালী ও জ্ঞান-গরিমাসম্পন্ন।
কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ। ফলে বিশ-ত্রিশ বছর তাকে বিছানায় শুয়ে-বসে পার করতে হচ্ছে। তার বিত্ত-বৈভব ও সহায়-সম্পদ কোনোই কাজে আসছে না।
আবার অনেকেই এমন আছেন যারা সুস্থ-সবল। জ্ঞান বুদ্ধিও আছে যথেষ্ট পরিমাণে। তবে ধন-দৌলত নেই। তাই তারা হয়তো হাঁটে-বাজারে নিম্নমানের কাজ করছে অথবা ভিক্ষা করে জীবনযাপন করছে। তাদের ভাগ্যে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও হয়তো জুটছে না। কাউকে আল্লাহ দিচ্ছেন, আবার কারও কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছেন।
‘আপনার প্রভু যা চান তা সৃষ্টি করেন এবং যাকে চান তাকে বেছে নেন৷ এতে কারো কোনো এখতিয়ার নেই। তাঁর সাথে যারা যা কিছু শরিক করে তিনি তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।’[১]
আপনার কাছে যা আছে তার হিসাব নিন
তার ইচ্ছা ও ক্ষমতায় সকল কিছুর সৃষ্টি । মানুষের ইচ্ছায় কী হয়? কিছুই হয় না। সুতরাং আল্লাহর দেয়া পরীক্ষার বস্তুগুলোকে হিসেব করার আগে প্রত্যেক পরীক্ষাগ্রস্ত ব্যক্তিরই উচিত আল্লাহর দেয়া নিয়ামতসমূহ নিয়ে ভেবে দেখা। আপনাকে মাল দেয়া হয় নি, তো কী হয়েছে? সুস্থতা তো দেয়া হয়েছে। এর কোনোটিই পান নি আপনি, আপনার তো জ্ঞান আছে। এগুলোর কোনোটিই আপনার ভাগ্যে জুটে নি, আপনাকে কমপক্ষে ইসলাম তো দেয়া হয়েছে । অভিনন্দন আপনাকে! এটা নিয়েই বেঁচে থাকুন এবং এর উপরই মৃত্যু বরণ করুন। তাই এক্ষুনি অন্তরের অন্তস্থল থেকে উচ্চস্বরে বলুন “আলহামদুলিল্লাহ ।”

আরও পড়ুন: কিছু সমস্যার কোনো সমাধান নেই — সুখী জীবনের ৪৬তম সূত্র
সাহাবিদের সন্তুষ্টির দৃষ্টান্ত: আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
নিয়তি ও আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকার যে শিক্ষা আমরা পেলাম, সাহাবায়ে কিরামের জীবনে তার অসাধারণ নমুনা আছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে যিনি নিজের মত ছেড়ে দিয়ে ঐক্য ও আনুগত্যকে বড় করে দেখেছিলেন, সেই আবূ ওবায়দা (রাঃ)-এর ঘটনাটি দেখুন।
যাতুস-সালাসিলের যুদ্ধে আবূ ওবায়দা (রাঃ)-এর বিনয়
এমনই ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ‘যাতুস-সালাসিলের’ যুদ্ধে আমর ইবনুল আস (রাঃ)-কে শাম অভিমুখে পাঠালেন । তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন, শত্রুপক্ষের লোকবল অনেক বেশি। তাই তিনি হুজুর (সাঃ)-এর কাছে অতিরিক্ত সাহায্যের জন্য খবর পাঠালেন। হুজুর (সাঃ) উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) কে দলপতি বানিয়ে একটি বাহিনী পাঠালেন। তাতে প্রথম শ্রেণির অনেক মুহাজির এবং আবূ বকর ও ওমর (রাঃ) ছিলেন। তাদেরকে বিদায় জানানোর সময় রাসূল (সাঃ) ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-কে বললেন, আমর বিন আসের সাথে কোনো বিষয়ে দ্বিমত করবে না। আবূ ওবায়দা আবার রওনা হলেন। আমর ইবনুল আস (রাঃ)-এর কাছে যাওয়ার পর আমর তাকে বললেন, তুমি আমার জন্য সাহায্য হিসেবে এসেছে। আমি হচ্ছি পুরো কাফেলার আমীর। আবূ ওবায়দা বললেন, না; বরং আমি আমার মতো থাকবো আর আপনি আপনার মতো থাকবেন। আমি আমার সাথে আসা সাথিদের আমীর আর আপনি আপনার সাথে থাকা সাথিদের আমীর। আবূ ওবায়দা (রাঃ) একজন সহজ সরল লোক ছিলেন, দুনিয়ার কোনো মূল্যই তার কাছে ছিল না।
আমর বললেন, না; (আমিই আমীর) তুমি আমার সাহায্যকারী। আবূ ওবায়দা (রাঃ) বললেন, হে আমর! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বলেছেন, “তোমরা দু’জন কোনো বিষয়ে দ্বিমত করবে না।” সুতরাং আপনি আমার বিরোধিতা করলেও আমি আপনার অনুসরণ করব। আমর বললেন, আমি তোমারও আমীর। আর তুমি শুধুই সাহায্যকারী। আবূ ওবায়দা (রা:) মেনে নিলেন। আমর সামনে অগ্রসর হয়ে ইমাম হয়ে সবাইকে নিয়ে নামায আদায় করলেন। যুদ্ধের পর আওফ ইবনে মালিক সর্বপ্রথম মদিনায় আসলেন। তিনি হুজুর (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। রাসূল (সাঃ) তাকে দেখে বললেন, “যুদ্ধের খবর যা জানো শোনাও।” তিনি যুদ্ধের সব ঘটনা রাসূল (সা:)-কে শোনালেন। আমর ইবনুল আস ও আবূ ওবায়দা (রা:)-এর মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিও শোনাতে ভুললেন না। সব শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর ওপর রহম করুন।’ আল্লাহ তাআলা আবূ ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর প্রতি রহম করুন।[২]

উপসংহার: নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকুন, সুখী হোন
যা নেই তা নিয়ে আক্ষেপ নয়, যা আছে তার জন্য শুকরিয়া, এটাই নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকার আসল অর্থ। আজ আপনি যে শ্বাসটুকু নিচ্ছেন, যে ঈমান নিয়ে বেঁচে আছেন, সেটাই আল্লাহর বিশাল দান। তাই নিজের অভাবের হিসাব কষার আগে একবার নিয়ামতের হিসাব করে দেখুন।
এরপর পড়ুন: পাহাড়ের মতো দৃঢ় হোন (coming soon)
আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন (Enjoy your life in bangla) বই থেকে।
সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন — আমার বাংলা পোস্ট.কম।
অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪৮তম সূত্র হলো — নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।
তথ্যসূত্র ও টীকা
- আল-কুরআন: সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৬৮। আয়াতটিতে আল্লাহর সৃষ্টির ক্ষমতা, ইচ্ছা ও মনোনয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতটি পড়ুন | তাফসির দেখুন। ↑
- যাতুস-সালাসিলের অভিযান: আমির ইবনু শারাহিল আশ-শাবি (রহ.) থেকে বর্ণিত এ অভিযানের একটি বিবরণ ইমাম আহমদের মুসনাদ-এ (হাদিস ১৬৯৮) পাওয়া যায়। সেখানে আবু উবাইদা (রা.)-কে মুহাজিরদের এবং আমর ইবনুল আস (রা.)-কে বেদুইনদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁদের পরস্পর সহযোগিতা করার নির্দেশের কথা এসেছে। তবে বর্ণনাটির সনদ মুরসাল; শুয়াইব আল-আরনাউতও একে মুরসাল বলেছেন। এখানে লেখায় বর্ণিত পুরো ঘটনাক্রম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে উদ্ধৃত শেষ উক্তিটি এই সূত্রে পাওয়া যায় না। তাই সেগুলোকে নিশ্চিত সহিহ হাদিস হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। মুসনাদ আহমদ, হাদিস ১৬৯৮ | হাদিসের মান যাচাই। ↑
একটি আহ্বান!
আপনার কাছের কেউ কি যা নেই তা নিয়ে আক্ষেপে ভুগছেন? এই লেখাটি তার সাথে শেয়ার করুন। হয়তো একটি লাইনই তার জীবন বদলে দিতে পারে।
আপনি আজ আল্লাহর কোন নিয়ামতের জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ? নিচে কমেন্টে শেয়ার করুন।