দুশ্চিন্তা করে নিজেকে নিঃশেষ করবেন না — সুখী জীবনের ৪৭তম সূত্র

দুশ্চিন্তা কি আপনার সমস্যার সমাধান করছে, নাকি আপনাকেই নিঃশেষ করে দিচ্ছে? জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও কীভাবে ধৈর্য ধরে সুখী থাকা যায়, আসুন জেনে নিই। আপনার জীবন দক্ষতা বাড়াতে ও জীবনকে উপভোগ করতে আমার বাংলা পোস্ট-এর ৪৭তম সূত্রটি পড়ুন।

দুশ্চিন্তা কখনো সমস্যার সমাধান দেয় না

দুশ্চিন্তা কখনোই সমস্যার পূর্ণ কিংবা আংশিক সমাধান দিতে পারে না — বরং দুশ্চিন্তায় মগ্ন থেকে আমরা নিজেরাই নিজেদের শেষ করে দিই। যে মানুষটি দুশ্চিন্তায় রাত কাটায়, সকালে উঠেও সমস্যাটা ঠিক আগের জায়গাতেই থাকে — শুধু সে নিজে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাহলে করণীয় কী? জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিচের ঘটনাটি এর জীবন্ত প্রমাণ।

সাদের ছেলের অসুস্থতার ঘটনা

ভার্সিটিতে আমার একজন ছাত্র ছিলো। তার নাম ছিল সাদ। একবার সে এক সপ্তাহ ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল । এক সপ্তাহ পর ক্লাসে এলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সাদ! তুমি এতোদিন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিলে কেন? কী হয়েছিল তোমার?’

সে বললো, ‘তেমন কিছু না, একটু ব্যস্ত ছিলাম ৷’

অথচ তার চেহারায় আমি দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম । আমি বললাম, ‘কী হয়েছিল?’

সে বললো, “আমার ছেলে অসুস্থ। ওর লিভারে সমস্যা। কয়েক দিন আগ থেকে, আবার তার ব্লাডে ইনফেকশন হয়েছে। গতকাল ডাক্তার সাহেব জানালেন, ইনফেকশন মস্তিস্ক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।’

আমি বললাম,‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ ! ভাই! ধৈর্য ধরো । দোয়া করি, আল্লাহ যেন ওকে সুস্থ করে দেন। আর আল্লাহ যদি তাকে নিয়ে যান, তাহলে কিয়ামতের দিন যেন ওকে তোমার জন্য সুপারিশকারী বানিয়ে দেন।

সে বললো, শায়েখ! আমার ছেলে তো নাবালেগ নয় ।’

‘ওর বয়স কত?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

‘সতেরো বছর ।’ সে জবাব দিলো ।

‘আল্লাহ ওকে সুস্থ করে দিন । ওর ভাই বোনদেরও সুস্থ রাখুন ।’

মাথা নিচু করে সে বললো, ‘শায়েখ! ওর কোনো ভাই বোন নেই । আমার এই একটিই সন্তান । আর ওর এই অবস্থা হয়ে গেলো!”

ছাত্রটির অবস্থা সত্যিই বেদনাদায়ক ছিলো। আমি তাকে সংক্ষেপে বললাম, ‘সাদ! পরিস্থিতি যাই হোক, ভেঙ্গে পড়লে চলবে না । আল্লাহ যা নির্ধারিত করে রেখেছেন, তাই হবে।’

এরপর তাকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়ে চলে এলাম।

হ্যাঁ, আপনিও কখনো দুশ্চিন্তায় ভেঙ্গে পড়বেন না। [২] কেননা, দুশ্চিন্তা কখনোই সমস্যার পূর্ণ কিংবা আংশিক সমাধান দিতে পারে না।

দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বেন না — সাদের ছেলের অসুস্থতার ঘটনা
দুশ্চিন্তা কখনো সমস্যার সমাধান দেয় না — বরং আপনাকেই ভিতর নিঃশেষ করে দেয়।-Amar Bangla Post

আরও পড়ুন: কিছু সমস্যার কোনো সমাধান নেই — সুখী জীবনের ৪৬তম সূত্র

বিপদে ভেঙে না পড়ার অসাধারণ দৃষ্টান্ত

বিপদে ধৈর্য ধরা সহজ কথা নয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা অকল্পনীয় বিপদেও অটল থাকেন — যাদের দেখলে মনে হয় আল্লাহ তাদের হৃদয়ে বিশেষ শক্তি দিয়েছেন। এমন একজন মানুষের কথা বলছি, যার গল্প শুনলে আপনার চোখ ভিজে আসবে — কিন্তু একইসাথে মনে জেগে উঠবে অদম্য সাহস।

ডা. আবদুল্লাহর এগারোজন হারানোর ঘটনা

কিছুদিন আগে আমি মদিনায় গিয়েছিলাম । সেখানে খালিদের সঙ্গে দেখা হলো । সে বললো, ‘ডা. আবদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়?’

আমি বললাম, ‘কেন? কী হয়েছে?

সে বললো, ‘সমবেদনা প্রকাশের জন্য ।’

‘কীসের সমবেদনা?’

তার বড় ছেলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পাশের শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল। ভার্সিটিতে জরুরি কাজ থাকায় তিনি একাই শুধু মদিনায় ছিলেন। ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তারা সবাই নিহত হয়েছেন। পরিবারের এগারোজন সদস্য সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেছে!’ ডা. আব্দুল্লাহ সৎ ও নিষ্ঠাবান একজন ব্যক্তি। তার জীবনের পঞ্চাশটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে । তিনি তো রক্ত মাংসে গড়া একজন মানুষ। তারও আবেগ-অনুভূতি আছে, বুকের মাঝে একটি অন্তর আছে, অশ্রুভরা দু’টি চোখ আছে । তার হৃদয়ও আনন্দে আপ্লুত হয়, বেদনায় কাতর হয়।

তিনি হৃদয়বিদারক খবরটি শুনলেন। তাদের জানাযা পড়লেন। এরপর নিজ হাতে এক এক করে মাটিতে রাখলেন কলিজার এগারোটি টুকরা। এগারটি ‘তাজা’ প্ৰাণ ৷

এরপর বাড়িতে ফিরে বিষণ্ণ হৃদয়ে পায়চারি করেন ঘরের ভেতর । বিক্ষিপ্ত পড়ে থাকা খেলনাগুলোর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। কত দিন হয়ে গেলো এগুলো পড়ে আছে। খালুদ ও সারা এগুলো নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে না। ওরা যে চলে গেছে না ফেরার দেশে।

তিনি বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিছানাটি এলোমেলো পড়ে আছে। তার স্ত্রীও তো আর নেই।

ইয়াসিরের সাইকেলের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। সেই কবে থেকে ওটা এভাবেই নিশ্চল পড়ে আছে। এটি যে চালাতো, সেও তো আজ আর এ নশ্বর পৃথিবীতে নেই।

একসময় বড় মেয়ের কামরায় প্রবেশ করেন। ঘরে কেউ নেই। বিয়ের লাগেজগুলো সাজানো। কাপড়গুলো বিছানায় এলোমেলো। আহ! সেও তাকে ফেলে চলে গেছে!

সুবহানাল্লাহ! ধৈর্য তো আল্লাহর দান! এতো বড় ঝড়-ঝাপটার পরও কী আশ্চর্য ধৈর্য তার! কী দৃঢ় মনোবল তার!

মেহমানরা নিজেরাই সঙ্গে করে চা-কফি নিয়ে আসছেন । কারণ বাড়িতে তার কোনো কাজের লোক নেই।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সমবেদনামূলক কিছু বলতে গেলে তিনিও সমবেদনামূলক শব্দ বলতে শুরু করবেন। অবস্থা দেখে আপনার মনে হবে, তিনি হয়তো সমবেদনা জানাতে আসা মেহমানদের একজন। শোকসন্তপ্ত ব্যক্তিটি মনে হয় অন্য কেউ।

তিনি বারবার বলছিলেন —

‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’! যা দিয়েছিলেন, যা নিয়ে গেছেন কিছুই তো আমার ছিল না। [১] সবই তো আল্লাহর দান! দেয়া ও নেয়া তো তাঁরই কাজ! প্রত্যেক বিষয়ের জন্যই তার আছে নির্দিষ্ট সময়-নির্ধারিত মুহূর্ত।

ডা. আবদুল্লাহর এগারোজন হারানোর ঘটনা — অসাধারণ ধৈর্যের দৃষ্টান্ত
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন — যা দিয়েছিলেন, যা নিয়ে গেছেন, কিছুই তো আমার ছিল না।

এটাই হচ্ছে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। যদি তিনি এমন না করতেন, তাহলে দুশ্চিন্তা করতে করতে নিজেও শেষ হয়ে যেতেন।

অল্পে সুখী মানুষের গল্প

আমার পরিচিত এক লোক, যখনই তাকে দেখি, সুখি বলে মনে হয় । সংক্ষেপে যদি তার অবস্থা বর্ণনা করি, তাহলে তা এমন হবে:

  • খুবই অল্প বেতনের চাকুরি 
  • ছোট্ট একটি বাসা, তাও ভাড়ায় নেয়া
  • একটি মাত্র গাড়ি, তাও পুরোনো
  • অনেকগুলো ছেলেমেয়ে

তবুও সব সময় তার মুখে হাসি লেগেই থাকে। জীবনকে সে উপভোগ করছে।

অল্পে সুখী মানুষের গল্প — জীবন উপভোগের অসাধারণ দৃষ্টান্ত
অল্প বেতন, ছোট বাসা, পুরোনো গাড়ি — তবুও মুখে সবসময় হাসি। এটাই জীবন উপভোগের আসল রহস্য।-Photo by Canva

আপনিও তার মতো জীবনকে উপভোগ করুন। দুশ্চিন্তায় ভুগে নিজেকে নিঃশেষ করবেন না। নিজের সমস্যার কথা মানুষের কাছে বলে বেড়াবেন না। তাহলে তারা আপনার ওপর চেপে বসবে।

নিজের সমস্যা সবার কাছে বলে বেড়াবেন না

মনে করুন, কারো একটি প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। আপনার সঙ্গে দেখা হলেই সে বলতে থাকে

  • আমার ছেলেটা অসুস্থ।
  • ওর জন্য আমার খুব কষ্ট হয়।
  • ছেলেটা আমার বড় অসহায়।

এমন কথা শুনতে আপনার কতো দিন আর ভালো লাগবে?

মনে করুন, কারো স্ত্রী সারাক্ষণ তার সঙ্গে বলতে থাকে,

  • আমাদের বাড়িটা পুরোনো হয়ে গেছে!
  • গাড়িটা তো আর চলার মতো নয়!
  • এই সব কাপড় কি এখন আর পরা যায়?

বলুন তো, কী লাভ এ ধরনের অভিযোগ করে? শুধু কষ্ট বাড়ানো ছাড়া আর কী হয় এর দ্বারা? কবি কত চমৎকার বলেছেন—

আক্ষেপ করে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জীবনটা শেষ করলে! হাত পা গুটিয়ে বসে থেকে বলছো, ‘আমার সময়টা ভালো যাচ্ছে না!’ তুমি নিজে যদি অগ্রসর না হও তাহলে কে তোমার দায়িত্ব নেবে?

আরও পড়ুন: দুশ্চিন্তা ও ঝামেলা এড়িয়ে চলুন — সুখী জীবনের ৪১তম সূত্র

উপসংহার: নিজের কাছে যা আছে তাই নিয়ে সুখী হোন

নিজের কাছে যা আছে তাই নিয়ে সুখি হতে চেষ্টা করুন। আপনি সুখি হবেন। [৩]

আপনি কি কখনো বড় বিপদে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলেছেন? নিচে কমেন্টে জানান।

এরপর পড়ুন: নিয়তির ওপর সন্তুষ্ট থাকুন (coming soon)

আপনি পড়ছেন: জীবনকে উপভোগ করুন বই থেকে। সম্পাদনা ও সংযোজন: সৈয়দ রুবেল উদ্দিন — আমার বাংলা পোস্ট.কম।

অতএব, জীবনকে উপভোগ করার ৪৭তম সূত্র হলো — দুশ্চিন্তা করে নিজেকে নিঃশেষ করবেন না।


উৎস

[১] আল-কুরআন, সুরা আল-বাকারা, ২:১৫৫–১৫৭। বিপদে ধৈর্য ধারণ এবং “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলার নির্দেশনা। কুরআনের আয়াতগুলো পড়ুন ↑

[২] সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯২৬বি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রকৃত ধৈর্য বিপদের প্রথম আঘাতের সময়। Sunnah.com-এ হাদিসটি পড়ুন ↑

[৩] সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৪১–৫৬৪২। মুসলিমের দুঃখ-কষ্ট ও দুশ্চিন্তার কারণে তার কিছু গুনাহ মাফ হওয়ার বর্ণনা। Sunnah.com-এ হাদিসটি পড়ুন ↑

Leave a Reply