সতী নারীর গল্প – সতী নারীরা এমনই হয়!

সতী নারীর গল্প পড়লে বুঝা যায়, সতী-সাধ্বী নারীর সম্ভ্রম খোয়ানো যায় না। নষ্ট করা যায় না- তার ইজ্জত-সম্মান। সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার প্রশ্নে প্রয়োজনে সে জীবনটা পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়। বিলিয়ে দেয় সবকিছু। এ চির সত্যটিই প্রমাণ করার জন্য ইমাম খাত্তাবী রহ. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আদালাতুস্ সামা’য় একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। পড়ুন সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: বাগদাদের এক কসাইয়ের গল্প

আজ থেকে চল্লিশ বছর পূর্বে বাগদাদ শহরে এক কসাই ছিল। ফজরেই অনেক আগেই সে দোকানে চলে যেত। সেখানে ছাগল জবাই করত এবং রাত থাকতেই বাড়ী ফিরে আসত। অতঃপর কিছুটা বেলা উঠলে সবকিছু ঠিকঠাক করে গোশত বিক্রির জন্যে দোকান খুলে বসত।

একদিন সে ছাগল জবাই করে বাড়ি ফিরছিল। তখনো রাতের আধার কাটেনি। আজ অনেক রক্ত লেগেছে তার জামা-কাপড়ে। পথিমধ্যে সে গলির ভিতর থেকে একটা কাতর আর্তনাদ শুনতে পায়। আর্তনাদের আওয়াজ লক্ষ্য করে সে দ্রুত সামনে অগ্রসর হয়। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই হঠাৎ একটা মানব-দেহের সাথে ধাক্কা লেগে মাটিতে পড়ে যায়।

কসাই বেচারা সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে দেখল— একটা লোক মাটিতে পড়ে আছে। ছুরির আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত। যখম গুরুতর। ওকে বাচাতে হলে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। এখনো দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। ছুরিটা এখনো গেঁথে আছে পিঠের উপরিভাগে।

একটা ঝটকা টানে ছুরিটা বের করে ফেলে কসাই। তারপর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লোকটিকে কাঁধে তুলে খুব দ্রুত চলতে শুরু করে। কিন্তু লোকটির হায়াত শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই কসাইর কাঁধেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

মিথ্যা অভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ড

অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে জড়ো হলো বেশ কিছু লোক। কসাইয়ের হাতে ছুরি! মৃত লোকটির গায়ে টাটকা রক্ত! এসব দেখে লোকজনের স্থির বিশ্বাস জন্মাল, এই ব্যক্তির হত্যাকারী এই কসাই-ই।

কসাই মনে মনে চিন্তা করল, এখন আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি যতই অস্বীকার করি না কেন, তা তারা মানবে না। বিশ্বাসও করবে না। বিশ্বাস করার কথাও না। তাই সে চুপ রইল। হ্যাঁ/না কিছুই বলল না । ফলে তাকেই হত্যাকারী হিসাবে অভিযুক্ত হতে হলো এবং শেষ পর্যন্ত বিচারে তার মৃত্যুদণ্ডের ফয়সালা হলো।

যখন তাকে হত্যা করার জায়গায় আনা হলো এবং সে বুঝতে পারল- মৃত্যু তার অবধারিত, এখনই তাকে হত্যা করা হবে— তখন সে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলে উঠল- হে উপস্থিত জনতা! আমি আসলে এই লোকটিকে হত্যা করিনি। তবে আজ থেকে ২০ বছর আগে আমি অপর একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ছিলাম আজ যদি আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তাহলে তোমরা ধরে নিও, আমার এই মৃত্যুদণ্ড মোটেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে নয়, বরং ওই হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে!

আসল ঘটনা: বিশ বছর আগের এক পাপ

লোকজন তার পূর্বের সেই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ শুনতে চাইল। সে বলতে লাগল— আজ থেকে ২০ বছর আগে আমি ছিলাম এক টগবগে যুবক। নৌকা চালাতাম। লোকজনকে পারাপার করতাম। একদিন এক ধনবতী যুবতী তার মাকে নিয়ে আমার নৌকায় পার হলো। পরদিন আবার তাদেরকে পার করলাম। এভাবে প্রতিদিনই আমি তাদেরকে আমার নৌকায় পার করতাম। এ পারাপারের সুবাদে যুবতীর সাথে আমার আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠল। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেললাম। এক সময় আমি তার পিতার নিকট বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম । কিন্তু আমার মতো দরিদ্র মাঝির কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে তিনি অস্বীকার করলেন।

এরপর আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। যুবতী আর এদিকে আসত না। তার মাও না। সম্ভবত যুবতীর বাবা নিষেধ করে দিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভুলতে পারলাম না। এভাবে কেটে গেলো দুই থেকে তিন বছর।

মাঝি যুবক ও তার হারানো প্রেম

একদিন আমি নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় এক মহিলা ছোট্ট একটা মেয়েকে নিয়ে ঘাটে উপস্থিত হলো এবং আমাকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করল। আমি তাকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম। মাঝ নদীতে এসে তার চেহারার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। চিনতে পারলাম- সে আমার পূর্বেকার সেই প্রাণপ্রিয় ‘প্রেয়সী’। আমি তখন মনে মনে ভাবলাম, যদি ওর পিতা আমাদের মাঝে বিচ্ছেদের পর্দা টেনে না দিত তাহলে সে আজ আমারই স্ত্রী থাকত!

নদীর ওপর সূর্যাস্তের দৃশ্য, প্রতীকী ছবি — হারানো প্রেম ও মাঝির গল্প
নদীর বুকে সূর্যাস্তের মতোই একদিন মিলিয়ে গিয়েছিল মাঝির সেই ভালোবাসা (প্রতীকী ছবি) Photo by Robert Stokoe from Pexels

যাহোক, এতদিন পরে প্রেয়সীকে দেখে আমি যারপর নাই আনন্দিত হলাম। অতীতের বিভিন্ন মধুময় স্মৃতির ডালি একে একে তার সামনে মেলে ধরতে লাগলাম। জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, বিগত জীবনের নানান কথা! সে খুব সতর্কতার সাথে জবাব দিচ্ছিল। একটু পর সে জানাল, সে বিবাহিতা এবং সঙ্গের শিশুটি তারই সন্তান!

সেই ভয়ংকর দিন: নদীর মাঝে

বিবাহের কথা শুনে আমার মন বড় অস্থির হয়ে গেল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। একটা অশুভ ইচ্ছা আমাকে তাড়া করল। আমি তাড়িতও হলাম। কামনার আগুন জ্বলে উঠল আমার হৃদয়-মনে। তাই এক পর্যায়ে আমি স্বীয় মনোবাসনা নিবৃত্ত করার জন্য তার উপর চাপাচাপি শুরু করলাম। তখন সে আমাকে মিনতি করে বলল- ভাই! আল্লাহকে ভয় করো! আমার সর্বনাশ করো না! আমি তো আরেকজনের বিবাহিতা স্ত্রী!

আমি মানলাম না। আমি ফিরলাম না। আমি তার দিকে হাত বাড়ালাম! তখন অসহায় নারীটি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করল। আর শিশু-কন্যাটি শুরু করে দিল বুকফাটা আর্তনাদ! আমি তখন তার শিশু-কন্যাটির মুখ চেপে ধরলাম। বললাম-তুমি আমার আহ্বানে সাড়া না দিলে তোমার সন্তানকে আমি পানিতে ডুবিয়ে মারব!

মায়ের অটল সিদ্ধান্ত, সন্তানের আত্মত্যাগ

তখন সে ডুকরে কেদে উঠল। হাত জোড় করে মিনতি জানাতে লাগল। কিন্তু আমি এমনি অমানুষে পরিণত হলাম যে, নারীর অশ্রু ও কান্না কিছুই আমার কাছে আমার প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার চেয়ে মূল্যবান মনে হলো না আমি নিষ্ঠুরভাবে শিশু-কন্যাটির মাথা পানিতে চেপে ধরলাম। মরার উপক্রম হতেই আবার বের করে আনলাম । বললাম-জলদি রাজি হও! নইলে একটু পরেই এর লাশ দেখবে!

: কিন্তু সন্তানের মায়ায় এবং সতীত্বের ভালোবাসায় অশ্রু ও বিলাপের অস্ত্র সে বারবার ব্যবহার করতে লাগল, যা ছিল আমার কাছে একেবারে অর্থহীন!

আমি আবার শিশুটির মাথা পানিতে চেপে ধরলাম । শিশুটি তখন হাত- পা নাড়ছিল। জীবনের বেলা ভূমিতে আরো অনেক দিন হাঁটার স্বপ্নে দ্রুত হাত-পা ছুড়ছিল। কিন্তু ওর জানা ছিল না- কেমন হিংস্রের হাতে পড়েছে ও। এবার আমি আর মাথাটা তুলে আনলাম না। ফল যা হবার তাই হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল! চিরদিনের জন্য চলে গেল এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে!

আমি এবার যুবতীর মুখের দিকে তাকালাম । কিন্তু মেয়ের করুণ মৃত্যুও তাকে নরম করতে পারল না। সে তার সিদ্ধান্তে অনড়, অবিচল। ওর দৃষ্টি যেন বলছিল—সন্তান গিয়েছে, প্রয়োজনে আমিও যাব! জান দেব! তবু মান দেব না!!

কিন্তু আমার মনুষ্যত্ব সেদিন হারিয়ে গিয়েছিল। ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল বিবেক-বুদ্ধি! আমার মাঝে তখন কাজ করছিল- পশু-সত্ত্বা। আমি নেকড়ের মতো তার দিকে এগিয়ে গেলাম। চুল মুষ্টিবদ্ধ করলাম। তারপর তাকেও পানিতে চেপে ধরলাম। বললাম ভেবে দেখো জলদি! জীবনের মায়া যদি করো তবে আবার ভাবো!’

সে ঘৃণাভরে ‘না’ বলে দিলো। আবারো প্রত্যাখ্যান করল আমার প্রস্তাব। আমিও তাকে চেপে ধরে রাখলাম। এক সময়ে আমার হাত ক্লান্ত হয়ে এলো। সাথে সাথে ওর দেহটাও নিথর হয়ে গেলো। আমি ওকে পানিতে ফেলে দিয়ে ফিরে এলাম!আমার এই অপরাধের কথা এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানল না।

এই করুণ কাহিনী শুনে উপস্থিত সবার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। কারো কারো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা তপ্ত অশ্ৰু!! এরপর তার শিরোচ্ছেদ করা হলো।

শিক্ষা: সতী নারীরা কেন আপোষহীন হয়?

সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ! দেখলেন তো সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষায় সতী-সাধ্বী নারীরা কতটা আপোষহীন? নিজের মেয়েটা নিজের সামনে জীবন দিল। তবুও সে আপোষ করল না। অতঃপর নিজের জীবনটাও বিলিয়ে দিল। তবুও সে নিজের ইজ্জত হারাতে সম্মত হলো না! একটা কাঁটাও ফুটতে দিল না তার সতীত্ব ও সম্ভ্রমের গায়ে! হ্যাঁ, সতী নারীরা এমনিই হয়!

উপসংহার

এই করুণ কাহিনী আমাদের শেখায়, সতীত্ব ও সম্ভ্রম রক্ষার প্রশ্নে প্রকৃত ঈমানদার নারীরা কোনো আপোষ করেন না — এমনকি নিজের সন্তানের জীবনের বিনিময়েও নয়। পাশাপাশি এই গল্প এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, পাপের শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পায় না — আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজস্ব হিকমতে অনেক সময় দুনিয়াতেই তার প্রতিফল দিয়ে দেন।

ঘটনার মূল সূত্র : আদালাতুস্ সামা, ইমাম খাত্তাবী রহ।

এরপর পড়ুন: আদর্শ যুবক : আদর্শ মা

লেখক: মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, তার আদর্শ যুবক যুবতি ২ বই থেকে সংগ্রহিত ও সংযোজিত।

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading