উম্মুল মু’মিনীন যয়নব বিনতে খুযাইমা (রা)

ওহুদ যুদ্ধ
আসলে ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হওয়ার ফলে ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বিধবাদের একটি লম্বা কাফেলা দাঁড়িয়ে যায়। যাঁরা ছিলেন একান্তই অসহায়। কারণ মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনরা তাঁদেরকে একটু আশ্রয় পর্যন্ত ও দিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল (স) এ অসহায় মুসলমান বিধবা মহিলাদেরকে বিয়ে করার জন্য সাহাবীদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন । ছবিঃ জিমিনি আই

কে ছিলেন যয়নব বিনতে খুযাইমা (রা)? 

নাম ও বংশ : নাম তাঁর যয়নব । ডাকনাম أمُّ الْمَسَاكِينِ বা গরীব দুঃখীর মা। পিতার নাম খুজাইমা ইবনুল হারেস এবং মাতার নাম মানদাব বিনতে আউফ। তাঁর নসবনামা এ রকম- যয়নব বিনতে খুযাইমা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনে আবদে মান্নাফ ইবনে হেলাল ইবনে আমের ইবনে সা’আসা’আ ।

জন্ম : তিনি নবুওয়্যাতের ছাব্বিশ বছর আগে বনু বকর ইবনে হাওয়াযেনে হেলালীয়া গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ : তুফায়েল ইবনুল হারিছের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয় ৷ প্রথম স্বামীর সাথে তাঁর বনিবনা হয়নি। এ জন্য প্রথম স্বামী তাকে তালাক দিলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে বিয়ে হয়। এ আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে তিনি একই সময়ে ইসলাম কবুল করেন। জাহাশ ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবীদের একজন। তিনি বলেছেন, আমি ওহুদ যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাব এবং প্রতিপক্ষ আমার ঠোঁট, নাক ও কান কেটে ফেলবে এবং আমি এ অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হবো। তখন আমাকে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবে, হে আবদুল্লাহ! তোমার ঠোঁট, নাক ও কান কাটা কেন, আমি আরজ করব, হে আল্লাহ! তোমার এবং তোমার রাসূল (সাঃ) এর জন্য।’

তাঁর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করেন। তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়ে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে শত্রুর তরবারীর আঘাতে তাঁর তরবারি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তখন রাসূল (সা:) তাঁর হাতে একটি ডাল তুলে দেন। তিনি ডালটিকেই তরবারী হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন এবং এক সময় শাহাদাত বরণ করেন । যুদ্ধ শেষে দেখা গেল মুশরিকরা তাঁর ঠোঁট, নাক এবং কান কেটে ফেলেছে। যেমন তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন ।

যয়নবসহ আরো বহু বিধবা : আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা) শাহাদাত বরণ করলে বিধবা যয়নব (রা) খুবই অসহায় হয়ে পড়েন। আসলে ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হওয়ার ফলে ইসলামের সেই প্রথম যুগেই বিধবাদের একটি লম্বা কাফেলা দাঁড়িয়ে যায়। যাঁরা ছিলেন একান্তই অসহায় । কারণ মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনরা তাঁদেরকে একটু আশ্রয় পর্যন্তও দিতে রাজি ছিল না। এমতাবস্থায় রাসূল (সা:) এ অসহায় মুসলমান বিধবা মহিলাদেরকে বিয়ে করার জন্য সাহাবীদেরকে উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন।

রাসূলের সাথে বিবাহ : যয়নব (রা) ছিলেন ওহুদ যুদ্ধের ফলে যাঁরা বিধবা হয়েছিলেন তাদের অন্যতম । তিনি বিধবা হওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের দ্বারে দ্বারে মাথা ঠুকেছেন একটু আশ্রয়ের জন্য কিন্তু তারা তাঁকে পাত্তা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত রাসূল (সা:) তাকে সমাজে পুন:প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বিয়ে করেন। এক বর্ণনায় জানা যায়, ‘অসহায়া যয়নব নিজেকে বিনা মোহরে রাসূল (সা:) এর কাছে পেশ করেন। তবে অন্য বর্ণনা মতে রাসূল (সা:) ও তাঁর বিয়ের মোহরানা ধার্য হয়েছিল চার শত দিরহাম। হিজরী তৃতীয় সনে রাসূল (সা:) ও যয়নব (রা)-এর মধ্যে এ বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ সময়ে যয়নব (রা)-এর বয়স ছিল ৪১ বছর এবং রাসূল -এর বয়স ছিল ৫৫ বছর ।

চরিত্র : যয়নব (রা) ছিলেন জন্মগতভাবেই প্রশস্ত হৃদয় ও উদার প্রকৃতির মানুষ । তিনি ছোটবেলা থেকেই ভূখা, নাঙা ও গরীব-দুঃখীদের বন্ধু ছিলেন। তিনি ধনাঢ্য পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও গরীবদের দুঃখ সইতে পারতেন না। এমন বহু ঘটনা আছে যে, তিনি খেতে বসেছেন- এমন সময় ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক এসে খাবার চেয়েছে, ব্যাস! তিনি নিজের খাবারটাই দিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য ইসলাম গ্রহণের আগে সে বাল্যকালেই তিনি (أمُّ الْمَسَاكِينِ ) উন্মুল মাসাকীন বা মিসকীনদের মা নামে আরবে পরিচিতা হয়ে ওঠেন।

সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে এ ধরনের খেতাব নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বড় ব্যাপার । জানা যায় উম্মাহাতুল মু’মিনীনগণ কোন এক সময় রাসূল (সা:) এর নিকট জানতে চান, ‘হে আল্লাহর রাসূল । আমাদের মধ্যে সকলের আগে কে পরলোক গমন করবেন।’

রাসূল (সা:) আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী উত্তর দিলেন, (أَسْرَعُكُنَّ لُحُونًا بِي بی . أَطْوَلَكُنَّ بَدًا) তোমাদের মধ্যে যার হাত সর্বাপেক্ষা বড় সে সকলের আগে মৃত্যুবরণ করবে।’ সকলেই ভাবলেন মাপের দিক দিয়ে সওদা (রা)-এর হাত তুলনামূলকভাবে যেহেতু বড় সেহেতু সম্ভবত তিনি সবার আগে ইন্তেকাল করবেন। কিন্তু সবার আগে যখন যয়নব (রা) ইন্তেকাল করলেন তখন সবাই বুঝলেন রাসূল (সা:) কী বুঝাতে চেয়েছিলেন। আসলে রাসূল (সা:) যয়নব (রা)-এর দান-খয়রাতের হাতকে বড় বলেছিলেন।

ওফাত : যয়নব (রা) রাসূল (সা:) এর সাথে বিয়ের মাত্র তিন মাস পরেই ইন্তেকাল করেন। তিনি রাসূল (সা:) এর উপস্থিতিতেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা:)। উম্মাহাতুল মু’মীনীনদের মধ্যে এ ভাগ্য আর কারো হয়নি। যদিও খাদীজা (রা)ও রাসূল (সা:) এর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, খাদীজা (রা) যখন ইন্তেকাল করেন তখন জানাযার সালাতের হুকুম হয়নি।

মৃত্যুকালে এ সৌভাগ্যবতী যয়নব (রা)-এর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪১ বছর। এত কম বয়সেও রাসূল (সা:) এর কোন স্ত্রী ইন্তেকাল করেননি। তাঁকে মদীনার বিখ্যাত কবরস্থান জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয় ।

উৎস: কুরআন হাদীসের আলোকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন বই থেকে। 

Leave a Comment

Discover more from Amar Bangla Post

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading