এই আর্টিকেলে উম্মু সালামা (রাযি)–র জীবনী, তাঁর অদম্য সাহসিকতা ও নবীজির (সা.)–এর সঙ্গে সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ, আপনি এখানে হিজরত, পারিবারিক ত্যাগ, এবং ১৮টি সহীহ হাদীসের মাধ্যমে ইসলামিক শিক্ষা ও নারীর দৃষ্টান্তিক ভুমিকা জানতে পারবেন। 📖✨
🟢 আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে:
- উম্মু সালামা (রাঃ)–এর হিজরতের দুরূহ অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক ত্যাগ
- স্বামীর মৃত্যুর পর নবী ﷺ–এর সাহচর্য ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বিবাহ
- হুদায়বিয়ার সংকটময় মুহূর্তে তাঁর বিচক্ষণ পরামর্শ ও মানসিক দৃঢ়তা
- নারী সম্পর্কিত ইদ্দত, পর্দা, পবিত্রতা ও হিজরতের শরয়ি বিধান
- রসূল ﷺ–এর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁর দানশীলতা ও ইবাদতের অভ্যাস
- ৩৭৮+ হাদীস বর্ণনায় তাঁর অবদান এবং শিক্ষাবিষয়ক নেতৃত্ব
উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা (রাঃ) সংক্ষিপ্ত জীবনী!

ক. আমি আভিজাত্যের অহংকারে অহংকারী মেয়ে ।
খ. আমি একজন বিধবা মহিলা, আমার সন্তানাদি আছে।
গ. আমি একা, বিয়ের কাজ সম্পাদন করার আমার কেউ নেই ।
নাম ও পরিচয় : রাসূল (সাঃ) এর ষষ্ঠ স্ত্রী ছিলেন উম্মু সালামা (রা)। তাঁর মূল নাম ছিল হিন্দ। ডাক নাম উম্মু সালামা। এ নামেই তিনি পরিচিত হয়ে আছেন। পিতার আসল নাম সুহাইল, ডাক নাম আবূ উমাইয়া। ইনি কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের লোক। মায়ের নাম আতিকা। পিতার দিক থেকে তাঁর বংশ তালিকা ছিল- হিন্দ বিনতে আবূ উমাইয়া সুহাইল ইবনে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনে মাখজুম। আর মায়ের দিক থেকে হিন্দ বিনতে আতিকা বিনতে আমের ইবনে রাবীয়াহ ইবনে মালেক কেনানা ।
সামাজিক মর্যাদা : উম্মু সালামা (রা)-এর পিতা-মাতা উভয় দিক থেকেই তৎকালীন আরবের খুবই মর্যাদাসম্পন্ন বংশের লোক ছিলেন। তাঁর পিতা আবূ উমাইয়া ছিলেন আরবের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি এতটাই উদার, দানশীল এবং হৃদয় খোলা মানুষ ছিলেন যে, ‘যাদুর রাকিব’ উপাধিতে ভূষিত হন । মাঝে মধ্যে যখন সফরে যাওয়ার প্রয়োজন হত তখন আবূ উমাইয়া পুরো কাফেলার ব্যয়ভার নিজেই বহন করতেন। এজন্যই তাঁর উপাধি দেয়া হয় (زَادَ الرَّكِيبِ)
‘যাদুর রাকিব’ বা মুসাফিরের পাথেয়।
প্রথম বিবাহ : উম্মু সালামা (রা)-এর প্রথম বিয়ে হয় তাঁরই চাচাত ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের সাথে। তিনি রাসূল (সাঃ) এর দুধ ভাই ছিলেন। মূল নাম আবদুল্লাহ হলেও পরবর্তীতে তিনি আবূ সালামা নামেই পরিচিতি লাভ করেন।
ইসলাম গ্রহণ ও হিষরত : ইসলামের একান্ত প্রাথমিক অবস্থায়, যখন ইসলাম কবুল করা মানে বিপদের পাহাড়কে নিজের মাথায় তুলে নেয়ার মতো অবস্থা ঠিক এ বিপদ সঙ্কুল অবস্থায় উম্মু সালামা এবং তাঁর স্বামী পরিবার পরিজনের তীব্র বিরোধিতার মুখে ইসলাম কবুল করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ওপর নেমে আসে নানা অত্যাচার-নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত মক্কায় টিকতে না পেরে তাঁরা অন্যান্য মুসলমানদের সাথে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আবিসিনিয়া হিজরত করেন। এখানেই তাঁদের প্রথম সন্তান সালামা জন্মগ্রহণ করেন। এ পুত্র সালামার নামেই স্বামী আবূ সালামা এবং স্ত্রী উম্মু সালামা নামে খ্যাতি লাভ করেন ।
জানা যায়, আবিসিনিয়ার আবহাওয়া সালামা পরিবারের স্বাস্থ্যের অনুকূলে ছিল না। যে কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে রাসূল সালামান-এর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন।
হিজরতের করুণ চিত্র : এখানে উল্লেখ্য যে, উম্মু সালামা (রা) মদীনায় হিজরতকারী প্রথম মহিলা। কিন্তু মদীনায় হিজরতের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই তিক্ত ও দুঃখজনক। ঐতিহাসিক ইবনে আসীর সে ঘটনাটি উন্মু সালামার জবানীতেই পেশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আবূ সালামা যখন মদীনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর কাছে একটি মাত্র উট ছিল। তিনি আমাকে এবং আমার পুত্র সালামাকে তার পিঠে সওয়ার করান। তিনি নিজে উটের লাগাম ধরে রওয়ানা করেন । বনু মুগীরা ছিল আমার সমগোত্রীয় ।
এ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে দেখে ফেলে এবং আবূ সালামাকে বাধা দিয়ে বলে যে, আমরা আমাদের কন্যাকে এত খারাপ অবস্থায় যেতে দেবো না । তারা আবূ সালামার হাত থেকে লাগাম ছিনিয়ে নেয় এবং আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায় । ইতোমধ্যে আবূ সালামার বংশের লোক বনু আবদুল আসাদ এসে পৌঁছে। তারা পুত্র সালামাকে ছিনিয়ে নেয় এবং বনু যুগীরাকে জানিয়ে দেয় যে, তোমরা তোমাদের কন্যাকে স্বামীর সাথে যেতে না দিলে আমরাও আমাদের শিশুকে তোমাদের কন্যার সাথে কিছুতেই যেতে দেব না।
এখন আমি, আমার স্বামী এবং পুত্র সন্তান তিনজনই একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। শোকে-দুঃখে আমার অবস্থা বেগতিক। যেহেতু হিজরতের হুকুম হয়েছিল, তাই আবূ সালামা মদীনায় চলে যান। আমি একা রয়ে যাই। প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বের হতাম এবং একটা পাহাড়ে বসে বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রন্দন করতাম । প্রায় এক বছর আমাকে এ অবস্থায় কাটাতে হয়।
একদিন বনু মুগীরার এক ব্যক্তি, যিনি ছিলেন আমার বন্ধু, আমার এ অস্থিরতা দেখে দয়া পরবশ হয়ে তার বংশের লোকদেরকে একত্রিত করে বললেন, আপনারা এ অসহায়কে কেন ছেড়ে দিচ্ছেন না? একে তো আপনারা স্বামী এবং সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। তার এ কথাগুলো বেশ কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হয়। তারা আমাকে অনুমতি দিয়ে বলে যে, তোমার ইচ্ছে হলে স্বামীর কাছে যেতে পার ।
এটা শুনে বনু আবদুল আসাদের লোকেরাও আমার কাছে সন্তান ফেরত দেয়। এবার উটের পিঠে হাওদা বেঁধে পুত্র সালামাকে বুকে নিয়ে সওয়ার হই। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ একা। এ অবস্থায় কোথায় পৌঁছি। সেখানে ওসমান ইবনে তালহা ইবনে আবূ তালহার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার অবস্থা জানতে পেরে জিজ্ঞেস করেন, তোমার সাথে কেউ আছে? আমি বললাম, না, আমি একা ।
আর আমার এ শিশু সন্তান। তিনি আমার উটের লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যান । আল্লাহ্ সাক্ষী, তালহার চেয়ে ভালো লোক আরবে আমি পাইনি। মনযিল এলে আমার অবতরণ দরকার হলে তিনি গাছের আড়ালে চলে যেতেন। রওয়ানা করার সময় হলে তিনি উট নিয়ে আসতেন। আমি ভালোভাবে বসলে তিনি উটের লাগাম ধরে আগে আগে গমন করতেন। গোটা পথ এভাবে কাটে। মদীনা পৌঁছে বনু আমের ইবনে আওফ-এর জনপদ কোবা অতিক্রমকালে ওসমান ইবনে আবূ তালহা আমাকে জানান যে, তোমার স্বামী এ গ্রামে আছেন। আবূ সালামা এখানে অবস্থান করছেন ।
তাঁর উপর নির্যাতন : আমরা যদি ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে নজর দেই তাহলে দেখবো হিজরতকালীন সময়ে আবূ সালামার গোত্রের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, যে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে অন্যদের বেলায় তেমন হয়নি। উম্মু সালামা নিজেই বলেন, ‘ইসলামের জন্য আবূ সালামার গোত্রকে যে কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, তা আহলে বাইতের আর কাউকে সইতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই ।
উম্মু সালামা এমনই মর্যাদাবান পিতার সন্তান ছিলেন যে, যখন হিজরতকালে তিনি মদীনার কোবা পল্লীতে পৌঁছান তখন তাঁর পরিচয় জানতে পেরে কেউই তা বিশ্বাস করতে চায়নি। কারণ ঐ জাহেলী যুগেও কুরাইশ বংশের আবূ উমাইয়ার · মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা এমনি একা বেড়াতেন না। কিন্তু উম্মু সালামার ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ইসলামের হুকুম আহকাম সর্বোপরি আল্লাহর নির্দেশকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এর কিছুদিন পর হজ্জ করার জন্য কিছু লোক যখন মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় তখন উন্মু সালামা তাঁর পরিবারের কাছে একটা চিঠি পাঠান। এবার সবাই বিশ্বাস করে যে, সত্যিই তিনি কুরাইশ বংশের আবূ উমাইয়ার সন্তান।
স্বামীর সাথে স্বাক্ষাত ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ : আল্লাহর মেহেরবাণীতে স্বামীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। আবূ সালামার সন্ধান দিয়ে ওসমান ইবনে আবূ তালহা মক্কা ফিরে যান। এ ঘটনাটি উম্মু সালামার ওপর খুব প্রভাব ফেলে। তিনি তার সারা জীবনেও ঘটনাটি ভুলেননি এবং ওসমান ইবনে তালহার মহানুভবতার কথা স্মরণ করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন-
مَا رَأَيْتُ صَاحِبًا قَط أَكْرَمُ مِنْ عُثْمَانَ بْنِ طَلْحَةَ .
‘আমি কখনো ওসমান ইবনে তালহার চেয়ে ভালো সাথী কাউকে দেখিনি ৷’ মদীনায় স্বামীর সাথে একত্রিত হওয়ার পর তাঁরা আবার সাংসারিক জীবন শুরু করেন। কিন্তু বেশিদিন একত্র থাকা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ডাক আসে ওহুদ যুদ্ধের। বীর যোদ্ধা আবূ সালামা ওহুদ যুদ্ধে বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ যুদ্ধে তিনি বহু শত্রু সৈন্যকেও নিধন করেন। তবে শত্রুর নিক্ষিপ্ত একটি তীর তাঁর বাহুতে এসে বিদ্ধ হয়। জখমটা ছিল মারাত্মক। দীর্ঘ একমাস চিকিৎসার পর তিনি কোনো রকম সুস্থ হয়ে ওঠেন।
জানা যায় এ ঘটনারও দু’বছর এগার মাস পর রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশে তিনি ‘কতন’ এলাকায় একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বামীর শাহাদাত বরণ এ যুদ্ধে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। এখানেও তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। যতদূর জানা যায়, এ আঘাতটা তাঁর পূর্বের জখমকে কাঁচা করে দেয় এবং তিনি মদীনায় ফিরে আসেন । জখমের তীব্রতা বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামা (রা)-কে এ বলে সান্ত্বনা দিতেন ।
আমি রাসূলে করীম (সাঃ)-এর নিকট শুনেছি, কেউ যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় তাহলে দুঃশ্চিন্তা না করে সে যেন বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ।’
কারণ, আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতিই মু’মিনের জীবনে বিপদের মুহূর্তে প্রশান্তি দিতে পারে। তিনি এ বলেও প্রার্থনা করতে বলেছেন-
اللَّهُمَّ عَظُمَ أَجْرِي وَاحْتَسِبْتُ مُصِيبَتِي هَذِهِ اللَّهُمَّ اخْلُفْنِي خَيْرًا مِنْهَا إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ
‘হে আল্লাহ! আমি আমার এ বিপদে তোমার কাছেই প্রতিদান চাচ্ছি। তুমি আমাকে এর চাইতেও উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করো, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন।’
আবূ সালামার অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। একদিন সকালে রাসূলে (সাঃ) তাঁকে দেখার জন্যে উপস্থিত হলেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিযে যখন তিনি প্রত্যাবর্তন করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তেই আবূ সালামা (রা) ইন্তেকাল করলেন। রাসূলে করীম নিজ হাতে তাঁর চোখ দুটি বুজিয়ে দিলেন এবং আল্লাহর কাছে এ বলে প্রার্থনা করলেন-
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ، وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمُقَرِّبِينَ وَاخْلُفْهُ فِي عَقِبِهِ فِى الْغَابِرِينَ وَاغْفِرْلَنَا وَلَهُ يَا رَبِّ الْعَلَمِينَ وَافْسِحْ لَهُ فِى قَبْرِهِ، وَنَوِّرُ لَهُ فِيْهِ .
হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও, তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে তোমার প্রিয় ও নিকটতম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো, তাঁর পরিবার-পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করো এবং তাঁকে ও আমাদের সকলকে ক্ষমা করো । তাঁর কবরকে আলোকিত ও প্রশস্ত করে দাও।
রাসূল (সাঃ) থেকে তার স্বামী কর্তৃক বর্ণিত সেই দু’আ উম্মু সালামা (রা) স্মরণ হলো । তিনি- ‘হে আল্লাহ! বিপদে তোমার কাছেই এর প্রতিদান চাচ্ছি’- পর্যন্ত বলে থমকে গেলেন এবং মনে মনে বললেন : ‘আবূ সালামার চেয়ে উত্তম জীবন সঙ্গী আর কে হতে পারে?’
হিজরী ৪ সালের জমাদিউল উখরার ৯ তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন। উম্মু সালামার গর্ভে আবু সালামার ঔরসজাত দুইজন পুত্র সন্তান ছিল- সালামা ও উমার ও ২ জন কন্যা ছিল যয়নব (রা) ও রুকাইয়া (রা)।
রাসূল (সাঃ) এর সান্ত্বনা ও দোয়া : আবূ সালামার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে রাসূল (সাঃ) তাঁর বাড়িতে ছুটে যান। শোকাহত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও গভীর শোক প্রকাশ করেন। উম্মু সালামা যখন খুবই কাতর হয়ে বার বার বলছিলেন, ‘অসহায় অবস্থায় কেমন মৃত্যু হয়েছে হায়!’ তখন রাসূল তাঁকে ধৈর্যধারণ করবার ও মরহুমের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে বলেন। বিষয়টি সুনানে নাসাঈ নামক গ্রন্থের ৫১১ পৃষ্ঠায় এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- রাসূল (সাঃ) উন্মু সালামা (রা)-কে বললেন, বলো-
اللهُم أخْلِقْنِي خَيْرًا مِنْهَا .
“হে আল্লাহ! আমাকে তার চেয়ে উত্তম উত্তরাধিকারী দাও।
এরপর নবীজী আবু সালামার মৃতদেহ দেখতে যান এবং অতি গুরুত্বের সাথে তাঁর জানাযার সালাত পড়ান। এ জানাযার সালাতে তিনি ৯টি তাকবীর বলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ভুল হয়নি তো? বললেন, ইনি হাজার তাকবীরের যোগ্য ছিলেন। ইন্তেকালের পর তাঁর চোখ খোলা ছিল। নবীজী নিজ হাতে তাঁর চোখ বন্ধ করে দেন এবং তাঁর জন্য মাগফেরাতের দোয়া করেন।
স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা : উম্মু সালামা (রা) তাঁর স্বামী আবূ সালামাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। আর এ কারণে একবার তার স্বামীকে বললেন, ‘যদি কোনো স্ত্রীর স্বামী জান্নাতবাসী হয়, আর স্ত্রী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর পুনর্বিবাহ না করে, তবে আল্লাহ সে স্ত্রীকেও তার স্বামীর সঙ্গে জান্নাতে স্থান দান করেন। এরূপ যদি স্ত্রীর মৃত্যু হয় তবে স্বামীও তার সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করে।’ অতএব, হে আবূ সালামা! আসুন আমরা উভয়ে চুক্তি করি যে, আপনার পরে আমি অথবা আমার পরে আপনি আর বিয়ে করবেন না।
উত্তরে আবূ সালামা (রা) বললেন, কিন্তু পুনঃ বিয়ে সুন্নাত। আচ্ছা তুমি কি আমার উপদেশ মান্য করবে? উম্মু সালামা (রা) বললেন, কেন করব না? আপনার আনুগত্য ছাড়া আমি আর কোনো কিছুতে খুশি হতে পারব কি? তখন আবূ সালামা (রা) বললেন, তবে শুন! আমি মারা গেলে আমার পরে তুমি বিয়ে করে ফেলো।’ এরপর আবূ সালামা দু’আ করলেন,
আবু সালামার দোয়া : উম্মু সালামা (রা) বলেন, ‘আমার স্বামী আবূ সালামা (রা)-এর মৃত্যুর পর আমি ভাবতাম যে, তাঁর থেকে উত্তম ব্যক্তি কে হতে পারে? এর কিছুদিন পরেই রাসূল (সাঃ) এর সাথে আমার শুভ পরিণয় অনুষ্ঠিত হয়।’
রাসূল (সাঃ) এর সাথে বিবাহ : আবু সালামার ইন্তেকালের সময় উম্মু সালামা অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন। সন্তান (যয়নব) ভূমিষ্ঠের পর বিধবা উন্মু সালামা যখন অভ্যন্ত অসহায়া ও দরিদ্র অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন তখন আবূ বকর (রা) তাঁর অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি এ বিয়েতে রাজি হননি। এক বর্ণনায় আছে ওমর (রা) ও বিয়ের প্রস্তাব দেন। অবশ্য অন্য বর্ণনা মতে ওমর (রা) নিজের জন্য এ প্রস্তাব দেননি। বরং রাসূল (সাঃ) এর হয়ে তিনি এ প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। আসলে ইসলামের জন্য উন্মু সালামার অপরিসীম ত্যাগ, স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে করুণ অবস্থা ইত্যাদির কথা চিন্তা করেই রাসূল (সাঃ) এ প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।
উম্মু সালামা (রা) ছিলেন সুসাহিত্যিক, কাব্যপটু ও অসাধারণ পাণ্ডিত্বের অধিকারিণী একজন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্না মহিলা। নবী (সাঃ) এর স্ত্রীদের মধ্যে সমস্ত দিক দিয়ে আয়েশা (রা)-এর পর তাঁর স্থান ছিল। রূপ-সৌন্দর্য, জ্ঞান প্রজ্ঞায় বিভূষিতা এ মহিলার পক্ষে রাসূল (সাঃ) এর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল না। তাই তিনি প্রস্তাবকারী ওমর (রা)-কে পরিষ্কার ভাষায় বললেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে রাসূল (সাঃ) এর প্রস্তাবকে স্বাগত জানাচ্ছি। এর সাথে সাথে আমি রাসূল (সাঃ) এর দরবারে তিনটি আরজ পেশ করছি-
- ক. আমি আভিজাত্যের অহংকারে অহংকারী মেয়ে বা আমার স্বভাবে আত্মবোধ অত্যাধিক।
- খ. আমি একজন বিধবা মহিলা, আমার সন্তানাদি আছে।
- গ. আমি একা, বিয়ের কাজ সম্পাদন করার আমার কেউ নেই।
ওমর (রা) উম্মু সালামার এ আরজ শোনার পর বললেন, ‘হে উম্মু সালামা! তুমি কেমন মহিলা! আমার প্রস্তাবে রাজি হওনি। এখন রাসূলে করীম -এর প্রস্তাবেও শর্তারোপ করছ।’ বুদ্ধিমতি উন্মু সালামা উত্তর দিলেন, ‘হে ওমর ইবনুল খাত্তাব! আমার ইয়াতিম সন্তান আছে। আমি নিঃস্ব। আমি আমার বাস্তব অবস্থা রাসূল (সাঃ) এর দরবারে কেবল তাঁর অবগতির জন্য পেশ করছি। এ কোন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কিংবা অহংকারবোধের বহিঃপ্রকাশও নয়।’
সব কথা শুনে রাসূল (সা:) উম্মু সালামাকে বললেন, ‘হে উম্মু সালামা! তোমার যে ইয়াতিম সন্তানদের কথা উল্লেখ করেছ তাদের লালন-পালনের ব্যবস্থা আল্লাহই করবেন, আর তোমার কেউ নেই সে সমস্যারও সমাধান হবে।’ তার উত্তরে উন্মু সালামা ছেলে ওমরকে বললেন, যাও মহানবী (সা:) এর সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা কর। এর কিছুদিন পর রাসূল (সা:) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সময়টা ছিল হিজরী চতুর্থ সালের শাওয়াল মাস।
বিয়ের সময় রাসূল (সা:) উম্মু সালামাকে দু’টি যাঁতা, একটি কলসী এবং খুরমার বাকলে ভর্তি একটি চামড়ার বালিশ দান করেছিলেন।
উম্মু সালামা ছিলেন খুবই সুন্দরী ও লজ্জাবতী মহিলা। তাই দাম্পত্য জীবনে স্বাভাবিক হতে একটু বিলম্ব হয়। নবী করীম (সা:) তাঁর গৃহে আসতেই তিনি লজ্জায় কন্যা যয়নবকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন। বিয়ের পর ৪ জন সন্তান-সন্তুতিসহ উম্মু সালামা নবীজীর গৃহে আসেন এবং সংসার জীবন শুরু করেন। নবী স্ত্রীগণ দু’টি দলে বিভক্ত ছিলেন। এর একটির নেতৃত্বে ছিলেন আয়েশা (রা) এবং অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন উম্মু সালামা (রা)।
উম্মু সালামার বিচক্ষণতা : উপস্থিত বুদ্ধির জোরে উম্মু সালামা (রা) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে উত্তরণে রাসূল (সা:)-কে সহযোগিতা করেছিলেন। ঘটনাটি ছিল- হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রাসূল (সা:) সেখানেই সকলকে কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে কেউই রাসূল (সা:)-এর হুকুম মতো কাজ করেননি। বরং চুপচাপ বসেছিলেন। আসলে বাহ্যত হুদায়বিয়ার সন্ধিটা ছিল বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। যে কারণে মুসলমানেরা খুবই মনঃকষ্টে ভুগছিলেন।
রাসূল (সা:) কুরবানী করার জন্য পর পর তিনবার নির্দেশ দেন কিন্তু তবুও মুসলমানেরা যখন কুরবানী না করে চুপ রইলেন তখন অত্যন্ত বিষণ্ন মনে তিনি নিজ তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং উম্মু সালামার কাছে পূর্বাপর সকল কিছু খুলে বললেন। উম্মু সালামা তখন রাসূল (সা:)-কে বললেন, ‘আপনি কাউকে কিছুই বলবেন না বরং বাইরে গিয়ে নিজের কুরবানী নিজে করে ফেলুন এবং ইহরাম ত্যাগ করার জন্য মাথার চুল কেটে ফেলুন।’ তাঁর কথামত রাসূল (সা:) বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের কুরবানী নিজে করলেন এবং মাথা মুড়িয়ে (ন্যাড়া করে) ফেললেন। এরপর দেখা গেল একে একে সবাই রাসূল (সাঃ) এর অনুসরণে কুরবানী করলেন এবং ইহরাম ত্যাগ করলেন। এমন কি মাথা মুড়ানোর জন্য মোটামুটি ভিড় লেগে গিয়েছিল যে, কার আগে কে মাথা মুড়াবে।
বুঝা যায় উম্মু সালামা (রা) কেমন বুদ্ধিমতি মহিলা ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিভিত্তিক ও মনস্তাত্বিক সিদ্ধান্তের কারণেই সেদিন বড় ধরনের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। এ ব্যাপারে ইমামুল হারামাইন বলেছেন, ‘মহিলা জগতের ইতিহাসে সঠিক সিদ্ধান্ত দানের এত বড় দৃষ্টান্ত আর নেই।’ (যুরকানী ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭২)
তাঁর মেধা : উম্মু সালামা সম্পর্কে মাহমুদ বিন লবিদ বলেন, ‘যদিও মহানবী (সাঃ) এর সকল পত্নী আল্লাহর রাসূলের প্রচুর হাদীস স্মৃতিতে ধারণ করেছিলেন, তবু তাদের মধ্যে আয়েশা (রা) এবং উম্মু সালামা (রা)-এর কোনো, প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।’ তিনি রাসূল (সা:)-এর মতোই সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারতেন এবং ছাত্রদের শেখাতেন। তিনি রাসূল (সা:)-এর প্রত্যেকটি কথা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন, মনে রাখতেন এবং আমল করার চেষ্টা করতেন। মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে ইবনে কিয়াম লিখেছেন, “উম্মু সালামার ফতোয়াসমূহ যদি একত্রিত করা যায় তাহলে তা দিয়ে একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা তৈরি হতে পারে ।
হাদীস শিক্ষা ও সম্প্রসারণে উম্মু সালামা (রা)-এর অবদান!
হাদীস শিক্ষা ও বর্ণনায় উম্মু সালামা (রা)-এর অবদান অনস্বীকার্য । হাদীস বর্ণনা ও প্রচারে আয়েশা (রা)-এর পরেই তাঁর স্থান। এ সম্পর্কে মাহ্দ ইবনে লবীদ বলেন-
كَانَ اَزْوَاجُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَحْفَظْنَ مِنْ حَدِيثِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كَثِيرًا وَلَا مَثَلاً لِعَائِشَةَ وَ أُمِّ سَلَمَةَ .
“রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর স্ত্রীগণের বহু হাদীস মুখস্থ ছিল। তবে আয়েশা ও উন্মু সালামা (রা)-এর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না” । (আনসাবুল আশরাফ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪১৫; হায়াতুস সাহাবা)
হাদীস শুনার প্রতি উম্মু সালামা (রা)-এর প্রবল আগ্রহ ছিল। একদিন তিনি চুলের বেনী বাঁধাচ্ছিলেন। এমন সময় রাসূল (সা:) ভাষণ দেয়ার জন্য মসজিদের মিম্বারে দাঁড়ালেন। তিনি কেবল, “ওহে লোক সকল! বলেছেন, আর অমনি উম্মু সালামা (রা) চুল বিন্যস্তকারিণীকে বললেন, ‘চুল বেঁধে দাও।’ সে বলল, এত তাড়াহুড়া কিসের? কেবল তো ‘ওহে লোক সকল! বলেছেন। উম্মু সালামা (রা) বললেন : আমরা কি লোক সকলের অন্তর্ভুক্ত নই। অতঃপর তিনি নিজেই চুল বেঁধে দ্রুত উঠে যান এবং দাঁড়ানো অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -এর পূর্ণ ভাষণটি শুনেন। (মুসনাদ আহমদ, ৬ষ্ঠ খ, পৃ. ৬৯৭)
এমনিভাবে হাদীস শিক্ষার প্রতি তাঁর যেমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, তেমনিভাবে হাদীস বর্ণনা ও সম্প্রসারণের প্রতিও ছিলেন তিনি যথেষ্ট সজাগ ও যত্নবান।
তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাড়াও তাঁর পূর্ব স্বামী আবু সালামা ইবনে আব্দুল আসাদ (মৃ.৪/৬২৫) এবং নবী কন্যা ফাতিমা (রা) (মৃ.১১/৬৩২) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব, ১২শ খন্ড, পৃ. ৪৮৩)
তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৩৭৮টি। তন্মধ্যে ১৩টি মুত্তাফাকুন আলাইহি । আর এককভাবে ইমাম বুখারী (র) ৩টি এবং ইমাম মুসলিম ১৩টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা। মুসনাদ আহমাদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৮৯-৩২৪ পৃষ্ঠায় তাঁর হাদীসগুলো সংকলিত হয়েছে। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা পুনরুক্তিসহ সহীহ আল-বুখারীতে ৪৮টি, সহীহ মুসলিমে ৩৯টি, জামে’ আত-তিরমিযীতে ৩৯টি, সুনান আবূ দাউদে ৫০টি, সুনান আন নাসাঈতে ৬৮টি এবং সুনান ইবনে মাজায় ৫২টি সংকলিত হয়েছে।
উন্মু সালামা (রা)-এর থেকে বর্ণিত হাদীসে শারঈ বিধি-বিধান, ইবাদত, সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, নারীবিষয়ক, পবিত্রতা, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয় স্থান লাভ করেছে। নিম্নে তাঁর বর্ণিত হাদীস থেকে বিষয়ভিত্তিক দু’একটি করে হাদীস উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হলো।
শারঈ বিধান বিষয়ক হাদীস!
🟢 ১. গর্ভবতী নারীর ইদ্দত সংক্রান্ত হাদীস!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّ امْرَأَةً مِنْ أَسْلَمَ يُقَالُ لَهَا سُبَيْعَةُ، كَانَتْ تَحْتَ زَوْجٍ فَتُوُفِّيَ عَنْهَا وَهِيَ حُبْلَى، فَخَطَبَهَا أَبُو السَّنَابِلِ بْنُ بَعْكَكٍ، فَأَبَتْ أَنْ تَنْكِحَهُ، فَقَالَ: وَاللَّهِ مَا يَصْلُحُ أَنْ تَنْكِحِيهِ حَتَّى تَعْتَدِّي آخِرَ الْأَجَلَيْنِ، فَمَكَثَتْ قَرِيبًا مِنْ عَشْرِ لَيَالٍ، ثُمَّ وَلَدَتْ، فَأَتَتْ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَمَرَهَا أَنْ تَنْكِحَ.
বাংলা সারাংশঃ উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুবাই’আ নামে আসলাম গোত্রের এক মহিলার স্বামী মারা যায়, সে ছিল গর্ভবতী। (গর্ভপাত হওয়ায় পর) আবুস সানাবিল ইবনে বা’কাক তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে সে তা অস্বীকার করল। অতঃপর লোকটি বলল : আল্লাহর কসম! দু’ ইদ্দতের শেষ ইন্দত অর্থাৎ চার মাস দশ দিন অভিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তোমার বিবাহ করা ঠিক হবে না। মহিলাটি দশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করল। অতঃপর নবী কারীম সং এর কাছে এসে এ সব কথা জানাল। নবী বললেন তুমি বিবাহ করতে পার। (সহীহ আল বুখারী, ২য় খণ্ড পৃ. ১৩৯; মুসনাদে আহমন, ২য় পত্র, পৃ. ৮০২)
🟢 ২. জুনুব অবস্থায় রোযা রাখা!
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ أَنَّهُ سَالَ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) عَنِ الرَّجُلِ يصبح جنبًا أَبَصُومُ : قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ الله يصبح جنباً ثم يصوم .
বাংলা সারাংশঃ সুলায়মান ইবনে ইয়াসার উন্মু সালামা (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, যদি কেউ ভোরে নাপাকী হয়ে যায় ঐ দিন রোযা রাখতে পারবে? উম্মু সালামা (রা) বললেন : নবী (সাঃ) ভোরে জুনুবী (অপবিত্র) হয়ে উঠলেও ঐ দিন রোযা রাখতেন। (সহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৪)
🟢 ৩. স্বর্ণ ও রূপার পাত্রে পান করার বিধান!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ (رضى) قَالَتْ : قَالَ رَسُولُ اللهِ لهُ مَنْ شَرِبَ فِي إِنَاءٍ مِنْ ذَهَبٍ أَوْفَضْةٍ فَإِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارًا مِّنْ
বাংলা সারাংশঃ উন্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী বলেছেন, যে ব্যক্তি রূপা বা সোনার পাত্রে পান করল, সে যেন তার পেটে দোযখের আগুন ভর্তি করল। (বুখারী ২য় খণ্ড, পৃ-১৩৯)
🟢 ৪. অন্ধ ব্যক্তির পর্দা বিষয়ে নির্দেশ!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كُنْتُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعِنْدَهُ مَيْمُونَةُ، فَأَقْبَلَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ، وَذَلِكَ بَعْدَ أَنْ أُمِرْنَا بِالْحِجَابِ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: احْتَجِبَا مِنْهُ، فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَيْسَ أَعْمَى، لَا يُبْصِرُنَا وَلَا يَعْرِفُنَا؟ فَقَالَ: أَفَعَمْيَاوَانِ أَنْتُمَا؟ أَلَسْتُمَا تُبْصِرَانِهِ؟
বাংলা সারাংশঃ উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলনেঃ আমি নবী (সাঃ) এর কাছে ছিলাম। সেখানে মায়মূনাও (রা) ছিলেন। ইবনে উম্মু মাকতূম আসলেন। এটা পর্দার বিধান নাযিল হবার পরের ঘটনা। নবী (সাঃ) বললেন, তোমরা তাঁর থেকে পর্দা কর। আমরা বললাম : হে রাসূল (সাঃ) সে তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখতেও পারছে না, চিনতেও পারছে না। নবী (সা:) বললেন : তোমরাও কি অন্ধ, তোমরা কি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো না? (সুনানে আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৬৮)
ইবাদত বিষয়ক হাদীস!
৫. এক রাতে নবীজি (সা.)–এর আতঙ্ক ও সতর্কতা!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَيْقَظَ لَيْلَةً فَقَالَ: سُبْحَانَ اللَّهِ! مَاذَا أُنْزِلَ اللَّيْلَةَ مِنَ الْفِتْنَةِ؟ مَاذَا أُنْزِلَ مِنَ الْخَزَائِنِ؟ مَنْ يُوقِظُ صَوَاحِبَ الْحُجُرَاتِ؟ يَا رُبَّ كَاسِيَةٍ فِي الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِي الْآخِرَةِ.
বাংলা সারাংশঃ উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্নিত, নবী (সাঃ) কোন এক রাতে ঘুম থেকে জেগে বললেন : সুবহানাল্লাহ্! কতই না ফিতনা এবং ধনভাণ্ডার এ রাতে নাযিল হয়েছে। এমন কে আছে যে, হুজরার অধিবাসীদেরকে জাগাবে? এমন অনেক লোক আছে যারা দুনিয়ায় কাপড় পরিধান করছে, অথচ আখিরাতে তারা হবে উলঙ্গ।
🟢 ৬. অসুস্থ নারীর জন্য হজ্জে তাওয়াফের বিধান!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: شَكَوْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنِّي أَشْتَكِي، فَقَالَ: طُوفِي مِنْ وَرَاءِ النَّاسِ وَأَنْتِ رَاكِبَةٌ.
বাংলা সারাংশঃ উম্মু সালামা (রা) বলেন, হচ্ছে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট অসুস্থতার অভিযোগ করলে তিনি বললেন : সাওয়ারে আরোহিনী হয়ে লোকদের পিছনে পিছনে তুমি তাওয়াফ কর। আমি তাওয়াফ করলাম, আর রাসূলুল্লাহ (সা:) কা’বা গৃহের পার্শ্বে সূরা তুর পাঠ করে সালাত পড়ছিলেন। (মুসলিম ১ম খণ্ড, পৃ.-৪১৩)
🟢 ৭. মাগরিব আজানের দোয়া!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: عَلَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقُولَ عِنْدَ أَذَانِ الْمَغْرِبِ: اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ، وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ، وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ، فَاغْفِرْ لِي.
উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমায় মাগরিবের আযানের পরে এ দোয়া পড়তে শিখিয়েছিলঃ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: عَلَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقُولَ عِنْدَ أَذَانِ الْمَغْرِبِ: اللَّهُمَّ إِنَّ هَذَا إِقْبَالُ لَيْلِكَ، وَإِدْبَارُ نَهَارِكَ، وَأَصْوَاتُ دُعَاتِكَ، فَاغْفِرْ لِي.
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয় এটি আপনার রাতের আগমন, দিবসের পশ্চাত গমন এবং আপনার আহ্বানের আওয়াজ। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সুনান আবু দাউদ, ১ম খন্ড, পৃ ২৭)
🟢 ৮. একটানা রোযা রাখার অভ্যাস!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَرَمَضَانَ.
বাংলা সারাংশ: উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমি নবী (সাঃ) -কে শা’বান ও রমযান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে ক্রমাগত দু’মাস রোযা রাখতে দেখিনি । (তিরমিযি, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৫)
🟢 ৯. বিচারক হিসেবেও ভুল হতে পারে — সতর্কতা!
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَمِعَ خُصُومًا بِبَابِ حُجْرَتِهِ فَخَرَجَ إِلَيْهِمْ فَقَالَ: إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنَّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلَّ بَعْضَكُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبُ أَنَّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِيَ لَهُ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِشَيْءٍ مِنْ حَقِّ أَخِيهِ، فَلَا يَأْخُذْهُ، فَإِنَّمَا أَقْطَعُ لَهُ قِطْعَةً مِنَ النَّارِ.
বাংলা সারাংশ: যয়নব বিনত আবু সালামা (রা) উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর হুজরার দরজায় ঝাগড়াকারীদের আওয়াজ শুনতে পেলেন। তাঁদের নিকট বের হয়ে এসে বললেন: আমি একজন মানুষ। ঝগড়াকারীরা আমার নিকট আসে। তাদের একেক জন অন্য জনের চেয়ে অধিক বাকপটু । আমার মনে হয় যে, সে সত্য বলেছে। অতঃপর তার পক্ষে আমি রায় দিয়ে দেই। কোন মুসলমানের অধিকার হরণ করে কারো পক্ষে রায় চলে গেলে, তার জানা উচিত সেটা হলো দোজখের আগুনের একটা টুকরা। সে ইচ্ছা করলে সেটা বহনও করতে পারে, আবার ত্যাগও করতে পারে। (মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৭8)
রাজনৈতিক বিষয়ক হাদীস!
🟢 ১০. শাসকের অন্যায় ও মুসলমানের দায়িত্ব!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمُ أُمَرَاءُ، فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ، فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ، وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ، وَلَكِنْ مَنْ رَضِيَ وَتَابَعَ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَلَا نُقَاتِلُهُمْ؟ قَالَ: لَا، مَا صَلَّوْا.
বাংলা সারাংশ: উন্মু সালামা (রা) নবীন থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : এমন কিছু শাসক তোমাদের ওপর নিয়োগ করা হবে। তোমরা তাদেরকে চিনবে এবং অস্বীকার করবে। যে ব্যক্তি অপছন্দ করবে সে নিষ্কৃতি পাবে। আর যে অস্বীকার করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। কিন্তু যে তুষ্ট হবে এবং অনুগত্য প্রকাশ করবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লোকজন বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমরা কি তাদের সাথে যুদ্ধ করব? নবী (সাঃ) বললেন: না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত পড়ছে। (মুসলিম ২য় খন্ড, পৃ. ১২৮-১২৯)
অর্থনৈতিক বিষয়ক হাদিস!
🟢 ১১. সন্তানের ওপর ব্যয় করলে কী সওয়াব আছে?
عَنْ أَمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي أَجْرًا إِنْ أَنْفَقْتُ عَلَى بَنِي أَبِي سَلَمَةَ؟ إِنَّمَا هُمْ بَنِي. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْفِقِي عَلَيْهِمْ، فَلَكِ أَجْرٌ فِي مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ.
বাংলা সারাংশ: উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বললাম আবু সালামার সন্তান-সন্ততি তারা আমারও সন্তান তাদের ওপর আমি যদি সম্পদ ব্যয় করি তবে কি আমার পুণ্য হবে। নবী (সাঃ) বললেন : তুমি তাদের জন্য ব্যয় কর। এর প্রতিদান তুমি অবশ্যই পাবে। (বুখারী, ১ম খধ, পৃ. ১৯৮)
🟢 ১২. স্বর্ণালংকার কি সম্পদের ভাণ্ডার?
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كُنْتُ أَلْبَسُ أَوْضَاحًا مِنْ ذَهَبٍ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَكَنْزٌ هُوَ؟ فَقَالَ: مَا بَلَغَ أَنْ تُؤَدِّيَ زَكَاتَهُ، فَلَيْسَ بِكَنْزٍ.
বাংলা সারাংশ: উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমি স্বর্ণালংকার পরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বললাম, এটি কি সঞ্চিত ধন ভাণ্ডারের অন্তর্ভুক্ত? রাসূল (সাঃ) বললেন তা নিসাব পরিমাণ হলে এবং তার যাকাত আদায় করলে তা সঞ্চিত ধনের মাঝে গণ্য হবে না। আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৮ )
পরিবার ও পারিবারিক বিষয়
🟢 ১৩. নববধূর জন্য রাসূল (সা.)–এর দাম্পত্য ভারসাম্য!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا تَزَوَّجَهَا، أَقَامَ عِنْدَهَا ثَلَاثًا، وَقَالَ: لَيْسَ بِكِ عَلَى أَهْلِكِ هَوَانٌ، إِنْ شِئْتِ سَبْعًا لَكِ وَسَبْعًا لِنِسَائِي.
বাংলা সারাংশ: উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বিবাহ করে তিন দিন তাঁর কাছে অবস্থান করলেন এবং বললেন: আমি এমন কাজ করব না যার কারণে তোমাকে তোমার লোকদের মধ্যে অপমানিত হতে হবে। তুমি যদি চাও তবে সাত দিন তোমার কাছে কাটাব। যদি সাত দিন তোমার কাছে কাটাই, তবে আমার অন্যান্য স্ত্রীদের কাছেও সাতদিন করে কাটাব। (বুখারী ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮৯)
🟢 ১৪. রাসূল (সা.)–এর প্রিয় পোশাক!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمْ يَكُنْ ثَوْبٌ أَحَبُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْقَمِيصِ.
অর্থ: উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : কামীস-এর চেয়ে কোন পোশাকই রাসূলূল্লাহ (সাঃ) -এর নিকট অধিক প্রিয় ছিল না । (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ.-২৫০)
পবিত্রতা বিষয়ক বর্নিত হাদীস!
🟢 ১৫. জানাবাত থেকে পবিত্রতার বিধান!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: أَنَّ امْرَأَةً مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي امْرَأَةٌ أَشُدُّ ضَفَرَ رَأْسِي، أَفَأَنْقُصُهُ لِلْجَنَابَةِ؟ قَالَ: إِنَّمَا يَكْفِيكِ أَنْ تَحْثِيَ عَلَيْهِ ثَلَاثًا.
অর্থ: উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : জনৈকা মুসলিম মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) -কে বললেন : আমার চুল খুব ঘন ও ঝুটি বাঁধা। আমি কি জানাবাত হতে পবিত্র হওয়ার জন্য চুল কমিয়ে ফেলব? নবী বললেন : তিনবার চুলে পানি ঢালাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। (আবু দাউদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩)
🟢 ১৬. রোযা অবস্থায় চুম্বন ও গোসল!
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُقَبِّلُهَا وَهُوَ صَائِمٌ، وَكَانَا يَغْتَسِلَانِ مِنْ إِنَاءٍ وَاحِدٍ.
উম্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : নবী (সা:) রোযা অবস্থায় তাঁকে চুম্বন দিতেন এবং তাঁরা দু’জন একই পাত্র থেকে গোসল করতেন । (মুসনাদে আহমদ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৪৩ )
শিক্ষা বিষয়ক বর্ণিত হাদীস!
🟢 ১৭. তিলাওয়াতে থেমে থেমে পড়ার হাদীস
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّهَا ذَكَرَتْ قِرَاءَةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. يَقْطَعُ قِرَاءَتَهُ آيَةً آيَةً.
অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবন আবু মুলায়কা উন্মু সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। উম্মু সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কুরআন পাঠ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিসমিল্লাহ্-এর পর সূরা ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াত উল্লেখ করে বললেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রতি আয়াতে থেমে থেমে তিলাওয়াত করতেন । (আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৫৬।)
চিকিৎসা বিষয়ক
🟢 ১৮. ‘নজর’ লাগা রোগের চিকিৎসা বিষয়ে হাদীস
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفَعَةٌ، فَقَالَ: اسْتَرْقُوا لَهَا، فَإِنَّ بِهَا النَّظَرَةَ.
অর্থ: উম্মু সালামা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : নবী (সাঃ) তাঁর ঘরে এক মেয়েকে দেখলেন, যার চেহারায় কালো কুচকে দাগ পড়ে গিয়েছে। নবী (সাঃ) বললেন : দোয়া পড়ে তাতে ফুঁক দাও। কেননা এতে নজর লেগেছে।
এরূপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস আমরা তাঁর থেকে লাভ করে থাকি।
উম্মু সালামা (রা) অতিশয় লাজুক প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। বিয়ের পর রাসূল (সাঃ) যখন উম্মু সালামা (রা)-এর ঘরে আসতেন তখন তিনি লজ্জার কারণে মেয়ে যয়নবকে কোলে করে বসে থাকতেন। এ অবস্থা বেশ কিছু দিন বহাল ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয় ।
উম্মু সালামা (রা) ছিলেন অত্যন্ত আমলদার একজন মহিলা। বিদায় হজ্জের সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু যথার্থ ওজর থাকা সত্ত্বেও যখন তিনি রাসূল (সা:)-এর সাথে গমন করেন, তখন রাসূল (সাঃ) তাওয়াফ সম্পর্কে বললেন, ‘উম্মু সালামা, ফজরের সালাত চলাকালে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তুমি তাওয়াফ করবে।’
তিনি মাসে সোমবার, বৃহস্পতিবার ও জুমাবার রোযা রাখতেন। কুরআনের পবিত্রতার আয়াত তাঁর ঘরেই নাযিল হয়। তিনি সালাতের মুস্তাহাব সময় ত্যাগ করা লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘নবীজী যোহরের সালাত তাড়াতাড়ি পড়তেন, আর তোমরা আসরের সালাত তাড়াতাড়ি পড়।’ উম্মু সালামা উদার হাতে দান-খয়রাত করতেন। তিনি একটি খেজুর হলেও তা ভিখারীর হাতে দিতে বলেছেন।
রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর উন্মু সালামা (রা) স্বামীর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তাঁর চুল মুবারক একটা রূপার কৌটায় সংরক্ষণ করে রাখেন এবং দর্শনার্থীদের
দেখাতেন ।
উন্মু সালামা (রা) চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারিণী ছিলেন। তিনি তৎকালীন আরবের একজন রূপবতী মহিলা ছিলেন। রাসূল (সাঃ)-এর কোনো সন্তান তার ঔরসে জন্মগ্রহণ করেননি। পূর্ববর্তী স্বামী আবূ সালামার ঘরে তাঁর দু’পুত্র সালামা ও ওমর এবং দু’ কন্যা দুররা ও বাররা জন্মগ্রহণ করেন। বাররার নাম রাসূল (সাঃ) পরিবর্তন করে রাখেন যয়নব। সালামা বড় হলে হামযা (রা)-এর কন্যা উসামার সাথে বিয়ে দেন। দ্বিতীয় পুত্র ওমর আলী (রা)-এর শাসনামলে ফারেস ও বাহরাইনের শাসনকর্তা ছিলেন।
উম্মু সালামা ইন্তেকাল : উম্মুল মু’মিনীন উম্মু সালামা (রা) ৬৩ হিজরী সনে ৮৪/৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। উচ্ছ্বল মু’মিনীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন। আবূ হুরায়রা (রা) জানাযার সালাত পড়ান। জানাযা শেষে তাকে মদীনার জান্নাতুল বাকীতে সমাধিস্থ করা হয়।
উৎস: কোরআন হাদীসের আলোকে রাসূল (সাঃ) স্ত্রীগণ যেমন ছিলেন।
🟣উম্মু সালামা (রাঃ)-র জীবনশেষের অধ্যায় ও অভ্যাসসমূহঃ
📌 সুন্নত রোযা পালনের অভ্যাস
“তিনি মাসে সোমবার, বৃহস্পতিবার ও জুমাবার রোযা রাখতেন।”
➡ এটি তাঁর ইবাদতে নিষ্ঠা এবং নবীজির সুন্নতের অনুসরণের একটি অনন্য নিদর্শন।
📌 কুরআনের আয়াত নাজিলের স্থান
“কুরআনের পবিত্রতার আয়াত তাঁর ঘরেই নাযিল হয়।”
➡ সূরা আহযাবের আয়াত: إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ — যা উম্মু সালামার ঘরে নাযিল হয় (সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে)। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
📌 সালাত ও সময়ানুগ নির্দেশনা
“নবীজী যোহরের সালাত তাড়াতাড়ি পড়তেন, আর তোমরা আসরের সালাত তাড়াতাড়ি পড়।”
➡ এটি সালাতের সময় সম্পর্কে তাঁর রেফারেন্স নির্দেশনা, যা পাঠকদের জন্য দরকারী।
📌 দানশীলতা ও উদারতা
“একটি খেজুর হলেও তা ভিখারীর হাতে দিতে বলেছেন।” ➡ ইসলামে সামান্যতম দানের ফজিলত, যেটা উম্মু সালামা (রা.) নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন।
📌 নবীজির (সা.) স্মৃতি সংরক্ষণ
“রাসূল (সা.)–এর ইন্তেকালের পর উম্মু সালামা (রা.) তাঁর চুল মুবারক একটি রূপার কৌটায় সংরক্ষণ করে দর্শনার্থীদের দেখাতেন।”
➡ এটি একটি আবেগঘন ইতিহাস—স্মৃতি রক্ষা এবং ভালোবাসা প্রকাশের উপস্থাপন।
📌 ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্য
“তিনি তৎকালীন আরবের একজন রূপবতী মহিলা ছিলেন।” ➡ সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাঁর স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদার প্রমাণ।
🟣 পারিবারিক সম্পর্ক ও সন্তানসমূহ:
-
স্বামী আবু সালামার ঘরে চারটি সন্তান:
-
দুই পুত্র: সালামা, ওমর।
-
দুই কন্যা: দুররা, বাররা → নবীজি (সা.) নাম পরিবর্তন করে রাখেন যয়নব।
-
-
সালামা বড় হলে তাঁর বিবাহ হয় হামযা (রা.)–এর কন্যা উসামা–র সাথে।
-
ওমর ছিলেন ফারেস ও বাহরাইনের শাসক → আলী (রা.)–এর শাসনামলে।
🟣 ইন্তেকালের তথ্য:
“৬৩ হিজরী সনে, ৮৪/৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।” “উম্মুল মু’মিনীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন।” “আবূ হুরায়রা (রা.) জানাযা পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাধিস্থ হন।”
➡ ইসলামের ইতিহাসে তাঁর বয়স, মর্যাদা ও জানাযার তথ্য অত্যন্ত প্রামাণিক ও মূল্যবান।
পাঠকেরা আরও যা জানতে আগ্রহী!
উম্মু সালামা (রা.) কে ছিলেন?
তিনি ছিলেন রাসূল (সা.)–এর স্ত্রী, একজন প্রখ্যাত সাহাবিয়া, এবং বহু সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারী।
তিনি কত বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন?
৬৩ হিজরীতে, প্রায় ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাধিস্থ হন।
উম্মু সালামা (রা.) কতটি হাদীস বর্ণনা করেছেন?
তাঁর নামে প্রায় ৩৭৮টি হাদীস পাওয়া যায়, যার মধ্যে বহু সহীহ হাদীস রয়েছে সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদসহ বিভিন্ন গ্রন্থে।
রাসূল (সা.) তাঁর সাথে কতদিন অবস্থান করেছিলেন বিবাহের পর?
তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামার (রা.) সাথে প্রথমে তিন দিন অবস্থান করেন, পরে বলেন: “তোমার জন্য ৭ দিন এবং অন্যদের জন্যও ৭ দিন।”
তিনি কোন ধরনের দানশীলতা চর্চা করতেন?
তিনি খেজুরের একটি অংশ হলেও দান করতেন এবং রসূল (সা.)–এর দান বিষয়ে বারংবার জিজ্ঞাসা করতেন।
🟢 উম্মে সালামা (রাঃ)-এর জীবন থেকে আমরা কী শিখি:
- তাঁর হিজরত ছিল ঈমান ও পারিবারিক ত্যাগের প্রতীক
- সাহসিকতার সাথে ইসলামের জন্য কষ্ট সহ্য করেছেন
- শোকের মুহূর্তেও দোয়া, ধৈর্য ও আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন
- উহুদ যুদ্ধ ও হুদায়বিয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন
- শিক্ষা, ইবাদত ও হাদীস সংরক্ষণে ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা
- তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাময়ী, দানশীলা এবং সুসাহিত্যিক মুসলিম নারী
📖 উম্মুল মু’মিনীন সিরিজের অন্যান্য পর্ব
রাসূল (সা.)–এর স্ত্রীদের জীবনীভিত্তিক এই সিরিজে ইতোমধ্যে যেসব সাহাবিয়্যাহর ওপর কাজ হয়েছে:
- ➡️ খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রাযি)–র জীবনী
- ➡️ আয়েশা সিদ্দিকা (রাযি)–র ব্যক্তিত্ব ও হাদীস
- ➡️ হাফসা (রাযি)–র সাহস ও কুরআন সংরক্ষণ
- ➡️ সাওদা (রাযি)–র সরলতা ও ঈমানদারী
- ➡️ উম্মুল মু’মিনীন যয়নব বিনতে খুযাইমা (রা)
💡 আগামি পর্বে মায়মূনা (রাযি), জয়নব বিনতে মাজঊন (রাযি), এবং অন্যান্যদের নিয়ে লেখা যুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।
আপনার মতামত দিন!
উম্মু সালামা (রাযি)–র জীবনী ও হাদীস পড়ে আপনি কী শিখেছেন? নিচে মন্তব্য করুন ও আপনার মতামত আমাদের জানান।